জাহিদের খাতা

পর্ব ৬৬ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

দোকানে খদ্দের নেই।

জাহিদ বসে আছে প্লাস্টিকের চেয়ারে। সামনে কেটলি। পেছনে দেয়ালে একটা ছবি, রিয়াদের স্কাইলাইন, ল্যামিনেট করা। ছবিটা কবে তুলেছিল মনে নেই। ২০২৫ নাকি ২০২৬। কিংডম সেন্টারের চূড়া দেখা যেত একসময়। এখন রোদে পুড়ে রঙ উঠে গেছে। বিল্ডিংগুলো ধোঁয়ার মতো, আবছা, যেন কেউ ইরেজার দিয়ে মুছে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। জাহিদ ছবিটা নামায়নি। নামাবেও না। কেন নামাবে না সেটা জাহিদ নিজেও জানে না।

বিকেল তিনটা। মার্চের রোদ। চায়ের দোকানের টিনের চালে রোদ পড়ে ভেতরটা চুলার মতো গরম। একটা মাছি উড়ছে চিনির বয়ামের চারপাশে। জাহিদ তাকিয়ে আছে মাছিটার দিকে। তারপর মাছি থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল রাস্তার দিকে।

রাস্তায় একটা রিকশা যাচ্ছে। রিকশার পেছনে একটা মেয়ে বসে আছে, স্কুলের ব্যাগ কোলে। জাহিদের মেয়ে তানিয়াও একসময় এভাবে যেত। এখন তানিয়া ঢাকায়। ব্র্যাক ব্যাংকে চাকরি করে। মাসে একবার ফোন করে। "বাবা, কেমন আছ?" জাহিদ বলে, "ভালো।" তানিয়া বলে, "খেয়েছ?" জাহিদ বলে, "হ্যাঁ।" তারপর দুজনেই চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ফোন রেখে দেয়।

ছেলে ইমরান মালয়েশিয়ায়। দুই বছর হলো।

জাহিদ চায়ের কেটলিতে পানি ঢালল। গ্যাসের চুলা জ্বালাল। একটু পরে কেউ আসবে হয়তো। না এলেও ক্ষতি নেই। চা বানানো একটা কাজ। কাজ থাকলে সময় কাটে।

সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে জাহিদ ঘরে ফিরল।

রশিদা সেলাই মেশিনে বসে আছে। পাশে কাপড়ের স্তূপ। আজকাল রশিদার কাজ বেড়েছে। মহল্লার মেয়েরা আসে, থ্রি-পিস বানায়, ব্লাউজ বানায়। রশিদার হাতের কাজ ভালো। সুন্দর নকশা করে। মেশিনে যেমন, হাতেও তেমন। রশিদার আয় এখন জাহিদের দোকানের চেয়ে বেশি। এটা জাহিদ জানে। রশিদাও জানে। দুজনের কেউ এই নিয়ে কিছু বলে না।

"খাবার টেবিলে আছে।"

জাহিদ হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসল। ভাত, ডাল, আলুভর্তা, শুকনো মরিচ ভাজা। খেতে খেতে জাহিদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। আকাশে একটা তারাও নেই। মেঘ করেছে। বৃষ্টি হবে হয়তো।

খাওয়া শেষে জাহিদ ঘরে গেল। আলমারি থেকে একটা লুঙ্গি বের করতে গিয়ে হাত লাগল কিছু একটায়। শক্ত। চ্যাপ্টা। জাহিদ টেনে বের করল।

একটা খাতা।

খাতাটা পুরোনো। মলাট ছিল সবুজ, এখন ধূসর। কোণাগুলো ভাঁজ হয়ে গেছে। একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা ছিল, রাবারটা শুকিয়ে ছিঁড়ে গেছে। জাহিদ খাতাটা হাতে নিয়ে বসল বিছানায়।

প্রথম পাতা খুলল।

জাহিদের নিজের হাতের লেখা। ছোট ছোট অক্ষর, সারি সারি। তারিখ, টাকার অঙ্ক, কারণ।

"২৩/০৪/২০২৩। ২৫,০০০ টাকা। বাবার চিকিৎসা।"

জাহিদ একটু থামল। বাবা। বাবা মারা গেছে ২০২৯ সালে। জাহিদ তখন রিয়াদে। জানাজায় আসতে পারেনি। ভিসা ছিল না। মানে ভিসা ছিল, কিন্তু বের হওয়ার পারমিশন ছিল না। কাফিল দেয়নি। জাহিদ ফোনে জানাজার সময় কান্না করেছিল। পাশের রুমে পাকিস্তানি ছেলেটা, নাম ফয়সাল, চুপচাপ পানি এনে দিয়েছিল। কিছু বলেনি। কী বলবে?

"১৫/০৬/২০২৩। ১৫,০০০ টাকা। তানিয়ার স্কুল।"

তানিয়া তখন ক্লাস সেভেনে। রশিদা ফোনে বলেছিল, "তানিয়া ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে।" জাহিদ বলেছিল, "ভালো।" সেই রাতে জাহিদ ছাদে গিয়ে বসেছিল। রিয়াদের আকাশে তারা দেখা যায় না। আলো বেশি। জাহিদ তারা খুঁজছিল না অবশ্য। সে কী খুঁজছিল সেটা সে নিজেও জানত না।

"০২/০৯/২০২৩। ৩০,০০০ টাকা। ঘরের চাল।"

ঘরের চাল উড়ে গিয়েছিল ঝড়ে। রশিদা ফোনে কাঁদছিল। জাহিদ বলেছিল, "কান্না করো না। টাকা পাঠাচ্ছি।" তারপর বিকাশে টাকা পাঠিয়েছিল। টাকা পাঠানোর পর জাহিদ শুয়ে পড়েছিল। ঘুম আসেনি। ঘুম আসত না বেশিরভাগ রাতে।

জাহিদ পাতা উলটাতে লাগল।

খাতাটা বারো বছরের। ২০২৩ থেকে ২০৩৪।

প্রতিটা পাতায় একই জিনিস। তারিখ। টাকা। কারণ।

"তানিয়ার কোচিং।" "মায়ের ওষুধ।" "ইমরানের জামাকাপড়।" "ঈদের খরচ।" "বাড়ির ট্যাক্স।" "রশিদার অপারেশন।" "তানিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়।" "ইমরানের পাসপোর্ট।" "ইমরানের ভিসা।"

বারো বছর।

জাহিদ ধীরে ধীরে পাতা উলটাচ্ছে। প্রতিটা লাইন পড়ছে। প্রতিটা অঙ্ক। প্রতিটা তারিখ। কিছু তারিখের পাশে ছোট ছোট দাগ আছে, যেন জাহিদ কিছু লিখতে চেয়েছিল কিন্তু লেখেনি। একটা তারিখের পাশে একটা ক্রস চিহ্ন। জাহিদ মনে করতে পারছে না সেটা কেন দিয়েছিল। হয়তো টাকা পাঠাতে পারেনি সেই মাসে। হয়তো অন্য কিছু।

একটা পাতায় লেখা: "১২/০৩/২০২৮। ৪০,০০০ টাকা। তানিয়ার বিয়ের কেনাকাটা।"

তানিয়ার বিয়ে হয়নি শেষ পর্যন্ত। ছেলেটা রাজি ছিল না। কিনা ছেলের বাবা রাজি ছিল না। প্রবাসীর মেয়ে, বাবা দেশে নেই, কে দেখবে। জাহিদ এই কথা শুনে কিছু বলেনি। বলার কী আছে? লোকটা ভুল বলেনি।

পরের পাতায় সেই টাকার কোনো উল্লেখ নেই। ফেরত আসেনি। রশিদা কাপড় কিনে ফেলেছিল ততদিনে।

জাহিদ পড়তে থাকল।

খাতার শেষের দিকে লেখা কমে গেছে। ২০৩৩ সালের পর মাসে একটা দুটো এন্ট্রি। কাজ কমে গিয়েছিল তখন। কোম্পানিতে নতুন সিস্টেম এসেছিল। সব কিছু অ্যাপে। কে কোথায় কাজ করবে, কতক্ষণ, কোন শিফটে, সব ঠিক করে দিত একটা সফটওয়্যার। জাহিদের মতো পুরোনো লোকদের শিফট কমে গেল। নতুন ছেলেরা এল, কম বেতনে, বেশি সময় খাটবে। সিস্টেম হিসেব করে বের করেছিল কে বেশি প্রোডাক্টিভ। জাহিদের নম্বর কম ছিল। বয়স বায়ান্ন। পিঠে ব্যথা। চোখে কম দেখে। সিস্টেমের কাছে জাহিদ একটা সংখ্যা। আউটপুট পার আওয়ার। কস্ট পার ইউনিট। সিস্টেম জানে না যে জাহিদ বারো বছর ধরে একদিনও ছুটি নেয়নি। সিস্টেম জানে না যে জাহিদ রমজানে রোজা রেখে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি গরমে কাজ করেছে। সিস্টেম জানে না যে জাহিদের বাবা মারা গেছে, সে জানাজায় যেতে পারেনি, সে সেই রাতে বিছানায় শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে বালিশ ভিজিয়েছে।

সিস্টেম শুধু জানে: ইউনিট ৪৭, ব্যাজ নম্বর ৮৮১২, প্রোডাক্টিভিটি ইনডেক্স ০.৭৩।

জাহিদ শেষ পাতাগুলো পড়ল।

"০৭/২০৩৪। ১০,০০০ টাকা। রশিদার সেলাই মেশিন।"

এটা শেষের দিকের এন্ট্রি। রশিদা তখন সেলাইয়ের কাজ শুরু করেছে। জাহিদ জানত, সে ফিরে এলে দোকান দিয়ে যা আয় হবে তা দিয়ে সংসার চলবে না। রশিদাকে কাজ করতে হবে। রশিদা কোনোদিন অভিযোগ করেনি। একটা দিনও না।

তারপর দুটো শেষ এন্ট্রি।

জাহিদের হাতের লেখা বদলে গেছে এখানে। আগে ছিল ছোট, পরিষ্কার। এখানে বড়, অগোছালো। যেন তাড়াহুড়ো করে লিখেছে। কিংবা হাত কাঁপছিল।

"ফেরত।"

শুধু এটুকু। তারিখ নেই। টাকার অঙ্ক নেই। শুধু একটা শব্দ।

তারপর তার নিচে, আরেকটা লাইন।

"ইমরান মালয়েশিয়া। ইতিহাস।"

জাহিদ খাতাটা বন্ধ করল না। খোলা রেখে দিল কোলের ওপর। শেষ পাতাটা দেখছে। "ফেরত।" "ইমরান মালয়েশিয়া। ইতিহাস।"

ইতিহাস। ইমরান চলে গেছে সেই পথে যে পথে জাহিদ গিয়েছিল। একই দালাল। একই ধার। একই প্রতিশ্রুতি। "পাঁচ বছরে লাখপতি।" জাহিদ পাঁচ বছরে লাখপতি হয়নি। বারো বছরেও হয়নি। জাহিদ বারো বছরে যা পাঠিয়েছে তার পুরোটাই খরচ হয়ে গেছে। চিকিৎসায়, পড়াশোনায়, ঘরের চালে, ঈদে, বিয়ের কেনাকাটায় যে বিয়ে হয়নি। কিছু জমেনি। জাহিদ ফিরে এসেছে খালি হাতে।

এখন ইমরান। একই খাতা খুলবে। একই কলাম। তারিখ। টাকা। কারণ।

জাহিদ ভাবল, ইমরানের জন্যও কি একটা সিস্টেম আছে? একটা সফটওয়্যার যেটা ইমরানকে চেনে শুধু একটা নম্বর হিসেবে? ব্যাজ নম্বর কত হবে ইমরানের?

জাহিদ বসে রইল।

ঘড়িতে রাত নয়টা বাজল। তারপর সাড়ে নয়টা।

রশিদা ঘরে এল।

সেলাই শেষ করে হাত ধুয়ে এসেছে। চুলে তেলের গন্ধ। রশিদা বিছানায় বসতে গিয়ে দেখল জাহিদ খাতা নিয়ে বসে আছে। রশিদা খাতাটা চিনল। এই খাতা সে আগেও দেখেছে। জাহিদ যখন টাকা পাঠাত, ফোনে বলত, "খাতায় লিখে রাখছি।" রশিদা বলত, "লিখে রাখো।"

রশিদা কিছু বললো না। জাহিদের পাশে বসল। খাতার দিকে তাকাল। জাহিদের কাঁধের ওপর দিয়ে পড়ল।

তারিখগুলো। অঙ্কগুলো। কারণগুলো।

রশিদা চিনতে পারছে প্রতিটা লাইন। "বাবার চিকিৎসা", এটা শ্বশুরের হার্টের অপারেশন, অপারেশন হয়নি শেষ পর্যন্ত, ওষুধেই সেরে গিয়েছিল কিছুটা। "তানিয়ার স্কুল", সেই বছর তানিয়ার প্রাইভেট টিউটরের বেতন দিতে হয়েছিল, টিউটর স্যার খুব ভালো ছিলেন, তানিয়া তাঁর কথা এখনো বলে। "ঘরের চাল", সেই ঝড়ের রাতে রশিদা তানিয়াকে আর ইমরানকে নিয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল।

প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা গল্প আছে। কিন্তু খাতায় গল্প নেই। খাতায় শুধু সংখ্যা।

রশিদা শেষ পাতাটা দেখল। "ফেরত।" "ইমরান মালয়েশিয়া। ইতিহাস।"

দুজনেই চুপ।

বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। পাশের বাড়ির ছেলেটা টিভি দেখছে, আওয়াজ আসছে।

জাহিদ বলল, "এই খাতায় আমার জীবনটা আছে। কিন্তু আমি নেই।"

রশিদা কিছু বলল না।

জাহিদ বলল না যে বারো বছর ধরে সে একা একা খেয়েছে। বলল না যে ঈদের দিন সে অন্যের ঘরের আলো দেখে বসে থাকত। বলল না যে রাতে ঘুম না এলে সে তানিয়ার ছোটবেলার ছবি দেখত ফোনে, বারবার, যতক্ষণ না চোখ জ্বলত। বলল না যে একবার সে ছাদে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়েছিল, অনেকক্ষণ, তারপর নেমে এসেছিল, কারণ ইমরানের পরীক্ষা ছিল পরের মাসে।

এসব খাতায় নেই।

খাতায় আছে কী? তারিখ। টাকা। কারণ। তিনটা কলাম। পরিষ্কার। গোছানো। যেন একটা স্প্রেডশিট। যেন একটা ডেটাবেস। যেন সেই সিস্টেম, যেটা জাহিদকে চিনত শুধু ব্যাজ নম্বর ৮৮১২ হিসেবে।

জাহিদ নিজেই নিজের জীবনটাকে তিনটা কলামে ভরে রেখেছিল। সে নিজেই নিজেকে একটা সংখ্যা বানিয়ে ফেলেছিল। কেউ তাকে বাধ্য করেনি। সে করেছিল, কারণ এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। অনুভূতি লিখলে খাতা শেষ হয়ে যেত। অনুভূতি লিখলে কাজে যেতে পারত না পরের দিন। তাই সে লিখেছিল: তারিখ, টাকা, কারণ। ব্যস।

সিস্টেম জাহিদকে সংখ্যা বানিয়েছিল। জাহিদ নিজেকে সংখ্যা বানিয়েছিল। তফাৎটা কোথায়?

জাহিদ খাতাটা বন্ধ করল।

উঠে গেল আলমারির কাছে। খাতাটা রাখল সেই জায়গায়, লুঙ্গির নিচে। আলমারি বন্ধ করল।

রশিদা বিছানায় বসে আছে। জাহিদ ফিরে এসে বসল।

"ঘুমাও," রশিদা বলল।

জাহিদ শুয়ে পড়ল। রশিদা আলো নেভাল। অন্ধকারে জাহিদ চোখ খুলে তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। সিলিংয়ে ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের একটা পাখা সামান্য বাঁকা, তাই প্রতিটা ঘূর্ণনে একটু কাঁপে। টুক। টুক। টুক।

রশিদার শ্বাসের আওয়াজ ধীরে ধীরে সমান হলো। ঘুমিয়ে পড়েছে।

জাহিদ চোখ বন্ধ করল না। সে শুয়ে আছে। ফ্যানের শব্দ শুনছে। আলমারিটা অন্ধকারে একটা কালো চৌকো আকৃতি। তার ভেতরে, লুঙ্গির নিচে, একটা ধূসর মলাটের খাতা। খাতার ভেতরে বারো বছর। বারো বছরের ভেতরে একটা মানুষ। মানুষটার কোনো মুখ নেই। শুধু কলাম আছে।

বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। প্রথমে আস্তে, তারপর জোরে। টিনের চালে বৃষ্টির আওয়াজ। জাহিদ শুনছে। বৃষ্টি পড়ছে দোকানের চালেও। দোকানের দেয়ালে সেই ছবি, রিয়াদের ফ্যাকাশে স্কাইলাইন, বৃষ্টির অন্ধকারে একেবারেই অদৃশ্য।