গিগ ইকোনমির সন্ধ্যা
গাজীপুরের টঙ্গী বাইপাসের পাশে, রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকান। দোকানটা পাকা না, টিনের চালা। সামনে একটা বেঞ্চ, পেছনে আরেকটা। দেয়ালে একটা পুরনো টেলিভিশন ঝুলছে, বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা টি-টোয়েন্টি চলছে। তামিম সেঞ্চুরির কাছাকাছি। কিন্তু কেউ দেখছে না। ছয়জন মানুষ বেঞ্চে বসে আছে, সবার হাতে ফোন, সবাই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। পরের পিং-এর অপেক্ষা।
রহিমা চা-টা নিল। পনেরো টাকা। সে হিসাব করল মনে মনে, এটা একটা ডেলিভারির সমান। আজকে বারোটা ডেলিভারি দিয়েছে। মানে বারো কাপ চা। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সে এখানে বসে আছে, বাকিরাও একে একে এসেছে। এটা তাদের আড্ডার জায়গা, প্রতিদিন সন্ধ্যায়। কেউ ঠিক করে দেয়নি, এমনিতেই হয়ে গেছে।
হাসান ভাই সবার আগে এসেছিল। হাসান ভাইয়ের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, আগে গার্মেন্টসে কাটিং মাস্টার ছিল। ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ার পরে রাইড শেয়ারিং শুরু করেছিল, তারপর সেটাও ছেড়ে ডেলিভারিতে এসেছে। বলল, "আজকে কয়টা হইছে রহিমা?"
"বারো।"
"বারো? ভালো তো। আমার নয়।"
"ভালো কিসের ভাই। বারোটায় কত পাইলাম জানেন? চারশো আশি টাকা।"
হাসান ভাই চুপ করে রইল। হিসাবটা সবাই জানে। চল্লিশ টাকা পার ডেলিভারি, তার থেকে তেলের খরচ বাদ, ফোনের ডাটা বাদ, বাইকের কিস্তি বাদ। শেষে কত থাকে সেটা কেউ জোরে বলে না। জোরে বললে লজ্জা লাগে।
মিলন এসে বসল। মিলনের বয়স তেইশ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ পাশ। চাকরি পায়নি। ডেলিভারি দেয় দুই বছর ধরে। মিলন বলল, "আমি আজকে বিশটা দিছি।"
সবাই তাকাল।
"বিশটা? চার ঘণ্টায়?"
"হ্যাঁ। দুপুর বারোটা থেকে চারটা। একটানা।"
রহিমা বলল, "তাইলে তো বোনাস পাইবা।"
মিলন হাসল। হাসিটা অদ্ভুত ছিল, মুখে হাসি কিন্তু চোখে কিছু নেই। বলল, "পাইছি। পঞ্চাশ টাকা।"
"পঞ্চাশ?"
"হ্যাঁ। বিশটা ডেলিভারি চার ঘণ্টায় কমপ্লিট করলে পঞ্চাশ টাকা বোনাস। মানে প্রতি ডেলিভারিতে সাড়ে বারো টাকা বেশি।"
কেউ কথা বলল না। তারপর সবাই একসাথে হাসল। হাসিটা চায়ের দোকানের টিনের চালায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। টেলিভিশনে তামিম ক্যাচ আউট হলো, ধারাভাষ্যকার চিৎকার করে উঠল, কেউ শুনল না।
আলম মিয়া একটু পরে এল। আলম মিয়া সবসময় দেরিতে আসে। সে আসলে রাতের শিফট করে, গভীর রাত পর্যন্ত। বলে রাতে ডেলিভারি বেশি পায়, কম্পিটিশন কম। রহিমা ভাবে, রাতে রাস্তায় একা বাইক চালানো কতটা নিরাপদ, কিন্তু বলে না। আলম মিয়ার পরিবারে খাওয়ার মানুষ পাঁচজন।
আলম মিয়া বসতে বসতে বলল, "জসিম ভাইরে দেখছ কেউ?"
রহিমা বলল, "হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিছে। আসতেছে বলছে।"
"ও তো আজকে ডেলিভারি দেয়নি।"
"কেন?"
আলম মিয়া চা অর্ডার দিল। তারপর বলল, "অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট হইছে।"
সবাই চুপ হয়ে গেল। ডিঅ্যাক্টিভেট, এই শব্দটা তাদের কাছে মৃত্যুর মতো। আপনি সকালে উঠলেন, অ্যাপ খুললেন, দেখলেন লেখা "Your account has been deactivated." ব্যস। কোনো নোটিশ নেই, কোনো চিঠি নেই, কোনো ফোন কল নেই। আপনি আর নেই। আপনার বাইক আছে, আপনার ব্যাগ আছে, আপনার হেলমেট আছে, কিন্তু আপনি আর নেই।
হাসান ভাই বলল, "রেটিং কত ছিল?"
"তিন পয়েন্ট চার বলতেছে।"
"তিন পয়েন্ট পাঁচের নিচে গেলে তো..."
"হ্যাঁ। কিন্তু কেন কমল সেটা তো বলে না।"
মিলন বলল, "আমার একবার তিন পয়েন্ট ছয়ে নামছিল। একজন কাস্টমার ওয়ান স্টার দিছিল, কারণ আমি দশ মিনিট লেট হইছিলাম। রাস্তায় জ্যাম ছিল। কাস্টমার তো জ্যাম দেখে না, সে দেখে অ্যাপে ম্যাপ, ম্যাপে দেখায় আমি দাঁড়াইয়া আছি।"
রহিমা বলল, "আমারেও একবার এক মহিলা টু স্টার দিছিল। কারণ আমি ডেলিভারির সময় হাসি নাই বলে। ফিডব্যাকে লিখছিল, 'delivery person looked unfriendly.' আমি সারাদিন রোদে বাইক চালাইয়া চৌদ্দটা ডেলিভারি দিয়া ক্লান্ত, আমার হাসতে ইচ্ছা করে নাই, এটা দোষ?"
কেউ উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার কিছু নেই। তারা সবাই জানে, রেটিং সিস্টেমটা একটা ফাঁদ। কাস্টমার রেটিং দেয় মেজাজের ওপর, ক্ষুধার ওপর, আবহাওয়ার ওপর। কিন্তু সেই রেটিং দিয়ে ঠিক হয় কে কাজ করবে আর কে করবে না। একটা ওয়ান স্টার রেটিং ফেলে দিতে পারে আপনার পুরো সপ্তাহের গড়। আপনি কিছু করতে পারবেন না। আপিলের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু আপিল করলে একটা অটোমেটেড মেসেজ আসে, "We have reviewed your case and the decision stands." কে রিভিউ করল? কোথায় করল? কেউ জানে না।
জসিম ভাই এল। লুঙ্গি পরা, গায়ে একটা ময়লা টি-শার্ট। ডেলিভারি ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামায়নি, অভ্যাসবশত বয়ে নিয়ে এসেছে। বসল বেঞ্চের কোনায়। চা নিল না।
রহিমা বলল, "জসিম ভাই, কী হইছে শুনলাম।"
জসিম ভাই মাথা নাড়ল। "সকালে অ্যাপ খুলছি, দেখি ডিঅ্যাক্টিভেটেড। সাপোর্টে কল দিছি, কেউ ধরে না। চ্যাটে মেসেজ দিছি, বট রিপ্লাই দেয়। বলে রেটিং থ্রি পয়েন্ট ফাইভের নিচে। কিন্তু আমি তো জানতামই না আমার রেটিং কমতেছে। কোনো ওয়ার্নিং দেয়নি।"
হাসান ভাই বলল, "ওয়ার্নিং দিবে কেন? তুমি তো এমপ্লয়ি না। তুমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কন্ট্রাক্টর।"
শব্দটা তিক্ত হয়ে ভাসল হাওয়ায়। ইন্ডিপেন্ডেন্ট কন্ট্রাক্টর। তারা সবাই এই শব্দ জানে। এর মানে হলো, তোমার কোনো ছুটি নেই, কোনো বোনাস নেই (পঞ্চাশ টাকা বোনাস ছাড়া), কোনো ইন্স্যুরেন্স নেই, কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। তুমি অসুস্থ হলে কেউ তোমার খোঁজ নেবে না, তোমার অর্ডার অন্য কাউকে দিয়ে দেবে। তুমি "স্বাধীন"। তোমার বস নেই।
কিন্তু বস তো আছে। বসের নাম অ্যালগরিদম।
জসিম ভাই বলল, "আমি তিন বছর ধরে এই কোম্পানির হয়ে কাজ করছি। তিন বছরে একদিনও ছুটি নেই নাই। বৃষ্টিতে ডেলিভারি দিছি, ঈদের দিন ডেলিভারি দিছি। তিন বছরে কোম্পানি আমারে একটা চিঠিও দেয়নি, একটা ফোনও করে নাই। আজকে বন্ধ করে দিছে, একটা কারণও বলে নাই।"
মিলন বলল, "বলবে কেন? তোমার সাথে তো কোনো চুক্তি নাই। তুমি তাদের অ্যাপ ব্যবহার করতা, তারা তোমারে ব্যবহার করতে দিত। ব্যস।"
আলম মিয়া চুপচাপ চা খাচ্ছিল। সে বলল, "আমি একবার সাপোর্টে ফোন করে জিজ্ঞেস করছিলাম, আমার রেটিং কমল কেন, কোন কাস্টমার কম দিছে, কী কারণে দিছে। মেয়েটা বলল, 'ভাইয়া, আমরা সেই ইনফরমেশন শেয়ার করতে পারি না।' আমি বললাম, 'কিন্তু এটা তো আমার রেটিং, আমার কাজের রেটিং, আমি কেন জানতে পারব না?' মেয়েটা বলল, 'পলিসি অনুযায়ী পারি না।' আমি বললাম, 'এই পলিসি কে বানাইছে?' মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ থাকল, তারপর বলল, 'ভাইয়া, আমি জানি না।'"
রহিমা হাসল। হাসিটা তিক্ত ছিল। বলল, "আমাদের বস কোথায় থাকে কেউ জানে?"
হাসান ভাই বলল, "সিঙ্গাপুরে।"
মিলন বলল, "ক্লাউডে।"
সবাই হাসল। এবারের হাসিটা আগেরবারের চেয়ে ক্লান্ত ছিল। চায়ের দোকানের মালিক রশিদ মিয়া তাদের দিকে তাকাল। রশিদ মিয়া তাদের চেনে, প্রতিদিন আসে ওরা। রশিদ মিয়া জানে না ওরা কী নিয়ে হাসে, কী নিয়ে চুপ থাকে। সে শুধু জানে পনেরো টাকা করে চা।
রহিমা ফোনের দিকে তাকাল। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটা মেসেজ এসেছে। "গাজীপুর গিগ ওয়ার্কার্স" গ্রুপে কেউ একজন লিখেছে, "ভাইয়েরা, নতুন আপডেট আসছে, রেটিং সিস্টেম চেঞ্জ হবে, এখন থেকে এআই ফেসিয়াল রিকগনিশন দিয়ে ভেরিফাই করবে ডেলিভারি।" নিচে কেউ লিখেছে, "মানে এখন হাসতেও হবে?" তার নিচে একটা হাহা রিঅ্যাক্ট।
রহিমা মেসেজটা সবাইকে দেখাল। জসিম ভাই দেখল, কিন্তু কিছু বলল না। তার কাছে এখন আর এসবের কোনো মানে নেই। তার অ্যাকাউন্ট নেই।
হাসান ভাই বলল, "জসিম, এখন কী করবা?"
জসিম ভাই কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, "অন্য অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলব। আর কী করব? বাইক আছে, ব্যাগ আছে।"
"অন্য অ্যাপেও তো একই।"
"একই। কিন্তু করার কিছু নাই।"
মিলন বলল, "আমি কাল একটা রিজিউমে বানাব ভাবতেছি।"
সবাই তাকাল।
"কীসের রিজিউমে?"
"চাকরির জন্য। ডেলিভারি ছাড়ব।"
হাসান ভাই একটু হাসল। "চাকরি? কোথায়? গার্মেন্টসে? সব অটোমেশন হয়ে গেছে। কলসেন্টারে? সব এআই চ্যাটবট। অফিসে? এন্ট্রি লেভেলে দশ হাজার অ্যাপ্লিকেশন পড়ে একটা পজিশনে।"
মিলন চুপ হয়ে গেল।
আলম মিয়া বলল, "আমার মেয়ে বলে, বাবা, তুমি কোথায় কাজ কর? আমি কী বলব? কোনো অফিস নাই, কোনো ফ্যাক্টরি নাই, কোনো দোকান নাই। আমি বলি, বাবা, আমি ফোনে কাজ করি। মেয়ে বলে, ফোনে কী কাজ? আমি বলি, মানুষের খাবার পৌঁছে দিই। মেয়ে বলে, সেটা তো রাইডারের কাজ। আমি বলি, হ্যাঁ বাবা, আমি রাইডার। মেয়ে বলে, বাবা, রাইডারদের বস কে? আমি কী বলব?"
কেউ কথা বলল না।
রহিমা দ্বিতীয় কাপ চা নিল। আরো পনেরো টাকা। আরেকটা ডেলিভারি। সে ভাবল, আজকে মোট বারোটা ডেলিভারি দিয়েছে, দুই কাপ চায়ে ত্রিশ টাকা গেল, মানে প্রায় একটা ডেলিভারি। সে যা কামাই করে, তার একটা অংশ দিয়ে চা খায়, আরেকটা অংশ দিয়ে বাইকে তেল দেয়, আরেকটা অংশ দিয়ে ফোনে ডাটা কেনে, আরেকটা অংশ কোম্পানি কেটে নেয়। শেষে যা থাকে সেটা দিয়ে ছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচ চালায়। চালায়, কিন্তু কতদিন চালাবে?
রহিমা জানে, সে পঁয়ত্রিশ বছর ধরে বেঁচে আছে এই দেশে। প্রথম পনেরো বছর বাবার টাকায় খেয়েছে, পরের দশ বছর স্বামীর টাকায়, তারপর স্বামী চলে যাওয়ার পরে নিজে কামাই করা শুরু করেছে। গার্মেন্টসে ছিল তিন বছর, ফ্যাক্টরি বন্ধ। তারপর বাসার কাজ করত, সেটাও ছেড়ে দিল। এখন ডেলিভারি দেয়। এটাই তার পেশা, এটাই তার পরিচয়। কিন্তু এই পেশায় তার কোনো নাম নেই। অ্যাপে সে একটা নম্বর, একটা ছবি, একটা রেটিং। কাস্টমার তাকে দেখে না, কাস্টমার দেখে স্ক্রিনে একটা আইকন, যেটা রাস্তার ওপর দিয়ে সরে যাচ্ছে। রহিমা সেই আইকন।
জসিম ভাই হঠাৎ বলল, "একটা কথা বলি?"
সবাই তাকাল।
"আমি তিন বছর ডেলিভারি দিছি। তিন বছরে কোম্পানির কোনো মানুষের সাথে আমার দেখা হয়নি। একজনেরও না। আমি জানি না কোম্পানির অফিস কোথায়, জানি না কে এটা চালায়, জানি না কে আমার রেটিং দেখে, কে সিদ্ধান্ত নেয়। আমি তিন বছর কাজ করছি এমন কারো জন্য যাকে আমি কোনোদিন দেখিনি।"
হাসান ভাই বলল, "সেটাই তো গিগ ইকোনমি।"
"গিগ ইকোনমি। সুন্দর নাম।" জসিম ভাই থুথু ফেলল রাস্তায়। "আগে মালিক চিনতাম। মালিক খারাপ ছিল, মারত, গালি দিত, কিন্তু অন্তত একটা মুখ ছিল। এখন মুখও নাই।"
রহিমার ফোনে একটা পিং এল। সে তাকাল। নতুন অর্ডার। টঙ্গী থেকে বোর্ডবাজার, বার্গার কিং। তিন পয়েন্ট সাত কিলোমিটার, পঁয়ত্রিশ টাকা। সে হিসাব করল, তেল লাগবে বিশ টাকার মতো, নেট পনেরো টাকা। একটা চা।
সে দাঁড়াল। বলল, "অর্ডার আসছে। যাই।"
হাসান ভাই বলল, "যা। কাল দেখা হবে।"
"হবে ইনশাআল্লাহ।"
রহিমা হেলমেট পরল, ব্যাগটা পিঠে নিল, বাইক স্টার্ট দিল। অ্যাপে ট্যাপ করল, "Accept Order." বাইকটা ছেড়ে দিল। টঙ্গী বাইপাসের ধুলো উড়ল।
পেছনে চায়ের দোকানে বাকিরা বসে রইল। জসিম ভাই একটা চা নিল, জীবনে প্রথমবার। পনেরো টাকা। মিলন স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে, সেও অর্ডারের অপেক্ষায়। আলম মিয়া মেয়ের কথা ভাবছে। হাসান ভাই কিছু ভাবছে না, শুধু বসে আছে।
টেলিভিশনে ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ হেরেছে না জিতেছে কেউ জানে না। স্ক্রিনে এখন বিজ্ঞাপন চলছে, একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে একটা ছেলে হাসিমুখে বাইক চালাচ্ছে, পেছনে একটা রঙিন ব্যাগ, হাতে একটা ফোন, স্ক্রিনে সবুজ টিক মার্ক। নিচে লেখা, "Be Your Own Boss."
কেউ দেখল না।