বাংলায় AI বলে
তানিয়ার ঘরে একটা পুরোনো টেবিল ফ্যান ছিল। সেটা ঘুরতো, কিন্তু বাতাস দিতো না বললেই চলে। মিতু বলতো, "এটা দিয়ে কী হবে?" তানিয়া বলতো, "শব্দটা ভালো লাগে।" এই নিয়ে ওদের তর্ক হতো না। কিছু জিনিস শুধু থাকে, কারণ আছে।
দুই হাজার পঁয়ত্রিশ সালের মার্চ মাসে তানিয়ার তৈরি বাংলা টেক্সট-টু-স্পিচ টুলটা পঞ্চাশ হাজার মানুষ ব্যবহার করছিল। সংখ্যাটা তানিয়ার কাছে অবাস্তব লাগতো। সে ধানমন্ডির একটা ছোট ফ্ল্যাটে বসে কোড লিখেছিল, মিতু পাশে বসে চিপস খেতে খেতে বাগ রিপোর্ট করেছিল, আর এখন দেশের নানা প্রান্তে মানুষ সেই টুল দিয়ে বাংলা শুনছে। স্কুলের বাচ্চারা পাঠ্যবই শুনছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষেরা খবরের কাগজ শুনছে। কেউ কেউ শুধু নিজের লেখা গল্প শুনছে, যন্ত্রের গলায়, দেখতে চাইছে কেমন শোনায়।
একদিন বিকেলে তানিয়ার ফোনে একটা ইমেইল এলো। পাঠানো হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে। নাম রফিকুল ইসলাম। প্রফেসর। বাংলা সাহিত্যের।
ইমেইলটা খুব ছোট ছিল। "আপনার টুলটি ব্যবহার করতে চাই। একটু সাহায্য লাগবে। দেখা করা সম্ভব?"
তানিয়া অবাক হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। বাংলা সাহিত্যের। তার টুল নিয়ে আগ্রহী। মিতুকে দেখালে মিতু বললো, "যাই। দেখি কী বলেন।"
পরদিন সকালে ওরা গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বিল্ডিং। সিঁড়ি ভাঙা। দেয়ালে স্যাঁতা। কিন্তু করিডোরে একটা আলো ছিল, জানালা দিয়ে আসা, যেটা পুরোনো জায়গাগুলোকে একটু মর্যাদা দেয়।
রফিকুল স্যারের রুমটা দোতলায়। দরজা খোলা। ভেতরে বইয়ের স্তূপ। টেবিলে, চেয়ারে, মেঝেতে। একটা জায়গায় বসার জন্য বই সরাতে হলো।
রফিকুল স্যার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। লম্বা মানুষ। চুল পাকা। চোখে কালো চশমা। হাতে একটা লাঠি, হাঁটার জন্য, কাঠের, মাথায় একটা টিয়া পাখি খোদাই করা। লাঠিটা সুন্দর। পালিশ করা কাঠ, টিয়ার ঠোঁটটা একটু হলুদ রঙ করা। তানিয়া লাঠিটার দিকে তাকালো। রফিকুল স্যার বললেন, "আমার স্ত্রী বানিয়েছেন। তিনি কাঠের কাজ করেন।" তারপর একটু থেমে বললেন, "টিয়া পাখি কেন, জিজ্ঞেস করবেন না। উনি বলেন, তোমার সাথে মেলে।"
তানিয়া হাসলো। মিতুও হাসলো।
রফিকুল স্যার চেয়ারে বসলেন। লাঠিটা টেবিলে হেলান দিলেন। বললেন, "আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। জন্ম থেকে না। আট বছর আগে চোখ গেছে। গ্লুকোমা।" কথাটা বললেন এমনভাবে, যেমন কেউ বলে আজকে একটু বৃষ্টি হয়েছিল।
"আমি সারাজীবন বাংলা পড়েছি। পড়িয়েছি। এখন পড়তে পারি না। স্ক্রিন রিডার আছে, কিন্তু ইংরেজিতে ভালো কাজ করে, বাংলায় ভাঙা ভাঙা। আপনার টুলটার কথা একজন ছাত্র বললো। ইনস্টল করে দিলো।"
তানিয়া বললো, "আপনি ব্যবহার করেছেন?"
"করেছি।"
"কেমন লাগলো?"
রফিকুল স্যার একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "একটা জিনিস দেখাই। মানে, শোনাই।"
তিনি পকেট থেকে ফোন বের করলেন। স্ক্রিনে কিছু দেখতে পান না, কিন্তু আঙুলের অভ্যাসে নেভিগেট করলেন। তানিয়ার টুলটা খুললেন। একটা টেক্সট পেস্ট করলেন। প্লে চাপলেন।
যন্ত্রের গলা ঘরে ভরে গেল।
"বনলতা সেন" পড়ছে। জীবনানন্দ দাশের।
"হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে..."
তানিয়া শুনলো। প্রতিটা শব্দ স্পষ্ট। উচ্চারণ সঠিক। যতি ঠিক জায়গায়। ব্যাকরণগতভাবে, প্রযুক্তিগতভাবে, কোনো ভুল নেই।
কিন্তু কিছু একটা নেই।
কবিতা শেষ হলো। ঘর চুপ।
রফিকুল স্যার ফোনটা টেবিলে রাখলেন। বললেন, "শুনলেন?"
তানিয়া বললো, "হ্যাঁ।"
"কেমন লাগলো?"
তানিয়া একটু ভাবলো। সত্যি কথা বলতে গেলে, সে নিজেও বুঝতে পারছিল যে কিছু একটা অনুপস্থিত। কিন্তু কী, সেটা ভাষায় বলা কঠিন।
রফিকুল স্যার বললেন, "এটা বাংলা বলছে, কিন্তু বাংলা বোঝে না।"
কথাটা ঘরে ঝুলে রইল। তানিয়া কিছু বললো না। মিতুও চুপ।
তারপর মিতু জিজ্ঞেস করলো, "বোঝা মানে কী?"
রফিকুল স্যার মিতুর দিকে মুখ ঘোরালেন। চোখ দেখতে পান না, কিন্তু মুখ ঘোরানোর অভ্যাসটা রয়ে গেছে। বললেন, "ভালো প্রশ্ন।"
একটু চুপ করে রইলেন। জানালা দিয়ে বাইরে একটা কাক ডাকলো। দুপুরের রোদ ঘরে ঢুকছিল, বইয়ের স্তূপের ওপর পড়ে একটা হলুদ ছায়া তৈরি করছিল।
"শব্দের পেছনে নদী আছে, বৃষ্টি আছে, মায়ের কান্না আছে," রফিকুল স্যার বললেন। "যখন জীবনানন্দ লেখেন 'নিশীথের অন্ধকারে', সেই অন্ধকারটা শুধু আলোর অনুপস্থিতি না। সেটা একটা জীবনের ক্লান্তি। হাজার বছর হাঁটার ক্লান্তি। আর যখন তিনি লেখেন 'বনলতা সেন', সেই নামটার ভেতরে একটা গ্রাম আছে, একটা নদীর পাড় আছে, সন্ধ্যার আলো আছে।"
তিনি থামলেন।
"যন্ত্র শব্দ বলে, কিন্তু নদী দেখে না।"
তানিয়া চুপ করে বসে ছিল। মিতুও। কথাটার ভেতরে একটা সত্য আছে, যেটা তারা জানতো, কিন্তু এভাবে কেউ বলেনি।
তানিয়া বললো, "আমরা প্রোসোডি নিয়ে কাজ করছি। মানে, কথার ওঠানামা, আবেগের স্তর। পরের ভার্সনে..."
রফিকুল স্যার হাত তুললেন। "আমি অভিযোগ করছি না।"
তানিয়া থামলো।
"আমি বলছি, এটা বাংলা বোঝে না। সেটা সত্য। কিন্তু সেটা অভিযোগ না। সেটা একটা পর্যবেক্ষণ।"
তিনি একটু হেলান দিলেন চেয়ারে। লাঠিটা একটু কাত হলো, টিয়া পাখির মাথাটা আলোতে চকচক করলো।
"আমি আপনাকে একটা গল্প বলি," তিনি বললেন। "চোখ যাওয়ার পর প্রথম বছরটা খুব কঠিন ছিল। আমি সারাজীবন পড়েছি। বই ছাড়া আমার দিন কাটে না। হঠাৎ একদিন সব বন্ধ। অন্ধকার।"
ঘরটা নিরব। বাইরে কাকটা আবার ডাকলো।
"স্ক্রিন রিডার শিখলাম। ইংরেজিতে মোটামুটি চলে। কিন্তু বাংলায়? বাংলায় তখন কিছু ছিল না বলতে গেলে। যা ছিল, সেগুলো এত খারাপ ছিল যে শুনতে কষ্ট হতো। শব্দ ভেঙে যেত। মাত্রা উল্টে যেত। 'কবিতা' বলতে গিয়ে 'কোবিতা' বলতো।"
মিতু বললো, "সেটা তো কষ্টকর।"
"কষ্টকর। কিন্তু আসল কষ্ট সেটা না। আসল কষ্ট হলো, আমার ভাষায় আমি কিছু শুনতে পারছিলাম না। আমার চোখ নেই, ঠিক আছে। কিন্তু আমার ভাষাও কি নেই? আমি বাংলায় পড়তে পারি না, বাংলায় শুনতেও পারি না, তাহলে আমি কোথায়?"
তানিয়ার বুকে কিছু একটা চাপ দিলো। সে এই দিক থেকে কখনো ভাবেনি।
রফিকুল স্যার বললেন, "তারপর আপনার টুলটা পেলাম। সেই ছেলেটা ইনস্টল করে দিলো। আমি প্রথমে একটা খবরের কাগজের লেখা শুনলাম। পরিষ্কার। স্পষ্ট। প্রতিটা শব্দ ঠিক।"
তিনি একটু থামলেন।
"তারপর জীবনানন্দ দিলাম। শুনলাম। আপনি ঠিকই বলেছেন, ফ্ল্যাট। আবেগ নেই। নদী নেই। কিন্তু..."
তিনি সোজা হয়ে বসলেন।
"কিন্তু শব্দগুলো আছে। 'হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি', এই কথাটা আমি আট বছর পর বাংলায় শুনলাম। যন্ত্রের গলায়, ঠিক। আবেগ নেই, ঠিক। কিন্তু শব্দগুলো আমার চেনা। আর সেই শব্দগুলো শুনে আমি নিজে নদী দেখতে পাই। যন্ত্র দেখে না, আমি দেখি।"
মিতু কিছু বলতে গিয়ে থামলো।
রফিকুল স্যার বললেন, "আপনারা চিন্তা করছেন, যন্ত্র বোঝে না। সেটা সত্য। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, বোঝা কি সব সময় দরকার? আমার চোখ না থাকলে, শব্দটুকুই যথেষ্ট।"
তানিয়া তাকালো মিতুর দিকে। মিতু তাকালো তানিয়ার দিকে।
"যথেষ্ট," রফিকুল স্যার আবার বললেন। শব্দটা যেন নিজেই একটা পূর্ণ বাক্য।
তানিয়া বললো, "আমরা আরো ভালো করবো। প্রোসোডি, ইমোশন, সব আসবে।"
রফিকুল স্যার হাসলেন। "করবেন। কিন্তু আজকে যেটুকু আছে, সেটুকু নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই।"
"কী?"
"ধন্যবাদ।"
তানিয়ার চোখ ভিজে গেল। সে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। মিতু টের পেলো, কিন্তু কিছু বললো না।
রফিকুল স্যার উঠে দাঁড়ালেন। লাঠিটা তুললেন। টিয়া পাখির মাথায় হাত বুলালেন, অভ্যাসের মতো।
"আমি আপনাদের আর একটু সময় নেবো না। আমার ক্লাস আছে।"
মিতু বললো, "আপনি এখনো পড়ান?"
"পড়াই। চোখ না থাকলে কী হবে, কবিতা তো মুখস্থ।"
তারা বেরিয়ে এলো। করিডোরে রফিকুল স্যার তাদের সাথে হাঁটলেন সিঁড়ি পর্যন্ত। লাঠিটা মেঝেতে ঠকঠক করছিল। টিয়া পাখির মাথাটা তাঁর হাতের মুঠোয়।
সিঁড়ির কাছে তিনি থামলেন। বললেন, "একটা কথা।"
তানিয়া বললো, "বলুন।"
"জীবনানন্দের কবিতায় একটা লাইন আছে। 'তবুও তো কেউ কথা রাখেনি।' আপনারা কথা রেখেছেন।"
তানিয়া বুঝলো না তিনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন। কার কথা? কোন কথা? কিন্তু জিজ্ঞেস করলো না। কিছু কথা না বুঝলেও সুন্দর।
ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামলো। বাইরে রোদ। ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীরা হাঁটছে। একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে গাছের ছায়ায়, রিকশাওয়ালা ঘুমাচ্ছে।
মিতু বললো, "তুই কাঁদছিলি?"
তানিয়া বললো, "না।"
"মিথ্যা।"
"হ্যাঁ, মিথ্যা।"
তারা চুপচাপ হাঁটলো কিছুক্ষণ। ক্যাম্পাসের পুরোনো গাছগুলোর নিচ দিয়ে। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই।
মিতু বললো, "আমরা ভালো কিছু বানিয়েছি, তাই না?"
তানিয়া বললো, "জানি না। ভালো কি না জানি না। কিন্তু কাজের।"
মিতু বললো, "কাজের মানেই তো ভালো।"
তানিয়া কিছু বললো না। সে ভাবছিল রফিকুল স্যারের কথা। যন্ত্র শব্দ বলে, কিন্তু নদী দেখে না। কিন্তু যে শোনে, সে দেখে। তাহলে নদীটা কোথায়? যন্ত্রে? না মানুষে?
সন্ধ্যায় ফ্ল্যাটে ফিরে তানিয়া ল্যাপটপ খুললো। কোড দেখলো। তার তৈরি মডেলের ভেতরে হাজার হাজার বাংলা শব্দ সাজানো আছে। প্রতিটা শব্দের ধ্বনিতাত্ত্বিক গঠন, উচ্চারণের নিয়ম, যতিচিহ্নের বিরতি, সব ম্যাপ করা। কিন্তু কোথাও নদী নেই। কোথাও বৃষ্টি নেই। কোথাও মায়ের কান্না নেই।
সে ভাবলো, সেগুলো কি কোড দিয়ে লেখা যায়? আবেগের একটা অ্যালগরিদম? দুঃখের একটা ফাংশন? না। সম্ভবত না। কিন্তু প্রোসোডি যোগ করা যায়। কথার ওঠানামা, ছন্দের গতি, একটু থামা, একটু নামা। সেটা আবেগ না, কিন্তু আবেগের ছায়া।
মিতু রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে এলো। দুটো কাপ। একটা তানিয়ার পাশে রাখলো।
"কী করছিস?"
"ভাবছি।"
"কী ভাবছিস?"
"নদীর কথা।"
মিতু কিছু বললো না। চা খেলো। তানিয়াও চা খেলো।
রাত হলো। তানিয়া ঘুমাতে গেল। কিন্তু ঘুম এলো না। সে অন্ধকারে শুয়ে ভাবলো রফিকুল স্যারের কথা। উনি প্রতিদিন এই অন্ধকারে থাকেন। প্রতিদিন। আর সেই অন্ধকারে বসে, একটা যন্ত্রের ফ্ল্যাট গলায়, বনলতা সেন শোনেন। আর নিজের ভেতরে নদী দেখেন।
সেটা কি যথেষ্ট?
উনি বলেছেন, যথেষ্ট।
তানিয়ার মনে হলো, হয়তো "যথেষ্ট" শব্দটার ভেতরেও একটা নদী আছে। একটা গভীর, শান্ত, অদেখা নদী।
পরদিন সকালে তানিয়া কোড খুললো। একটা নতুন ফাইল তৈরি করলো। নাম দিলো prosody.py। প্রথম লাইনে লিখলো একটা কমেন্ট।
সে কমেন্টটা মুছে দিলো। আবার লিখলো। আবার মুছলো।
শেষে শুধু লিখলো: "নদী"।
তারপর কোড লেখা শুরু করলো।
বাইরে ঢাকার রাস্তায় সকালের আলো পড়েছিল, আর কোথাও একটা রিকশার ঘণ্টা বাজছিল, ধীরে, যেন কেউ কাউকে ডাকছে, কিন্তু তাড়া নেই।