মিতুর AI মিতুকে চেনে
মিতুর অফিস বলতে গুলশানের একটা পুরোনো বিল্ডিংয়ের ছয় তলায় দুটো রুম। একটায় সে বসে, আরেকটায় তার চারজন ইঞ্জিনিয়ার। দরজায় লেখা "নোভা ল্যাবস"। নামটা সে নিজে রেখেছিল, রাত তিনটায়, কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের ডেডলাইনের আগের রাতে। পরে ভাবলো নামটা বড্ড নাটকীয় হয়ে গেছে। কিন্তু আর বদলায়নি।
আটাশ বছর বয়সে মিতু যখন নিজের কোম্পানি খুলল, আম্মু রহিমা ফোনে প্রথম যে কথাটা বললেন সেটা ছিল, "খাওয়া ঠিকমতো খাচ্ছিস তো?" এর মধ্যে একটা গোপন অভিযোগ ছিল। রহিমা চাইতেন মিতু গার্মেন্টসে থাকুক। সেখানে অন্তত একটা নিশ্চিত মাসিক বেতন আসতো। কিন্তু মিতু সেই চাকরি ছেড়ে দিলো ২০৩৬-এ, যখন সে বুঝলো গার্মেন্টসের অটোমেশন সিস্টেম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সে আসলে AI নিয়েই বেশি ভাবছে। ফ্যাক্টরির মেশিন তাকে AI শিখিয়েছিল। সেই শিক্ষাটা সে নিয়ে চলে এলো নিজের পথে।
নোভা ল্যাবসের প্রথম প্রোজেক্ট ছিল ছোটখাটো। কিছু ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যাটবট, কিছু ই-কমার্স সাইটের জন্য রিকমেন্ডেশন সিস্টেম। ভালো টাকা আসতো না, কিন্তু কোম্পানি চলতো। মিতুর ভেতরে একটা ধারণা ছিল যেটা সে কাউকে বলেনি। সে একটা বাংলা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট বানাতে চায়। শুধু ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট না, এমন একটা সিস্টেম যেটা বাংলা ভাষাটাকে সত্যিকারের বোঝে। যেটা "হুম" আর "হ্যাঁ"-এর পার্থক্য ধরতে পারে। যেটা জানে "দেখি" মানে "না" বলার একটা ভদ্র উপায়।
সে এটার নাম দিয়েছিল "বলো"।
বলোর প্রথম ভার্সন ছিল বিপর্যয়। মিতু যখন বলতো "আজকের মিটিংটা কটায়?", বলো উত্তর দিতো "আজকের আবহাওয়া বেশ ভালো।" প্রথম তিন মাস এরকম হাস্যকর ভুলের পর ভুল। মিতুর ইঞ্জিনিয়াররা হতাশ হয়ে যাচ্ছিল। একজন, শাওন নামে ছেলে, একদিন বললো, "আপু, গুগল পারেনি, আমরা কী করবো?" মিতু বললো, "গুগল বাংলাদেশের মানুষ না।"
এই কথাটা সত্য ছিল কিনা সেটা বিতর্কের বিষয়। কিন্তু মিতু বিশ্বাস করতো এটায়, আর সেই বিশ্বাসটাই যথেষ্ট ছিল।
বলোর দ্বিতীয় ভার্সন বের হলো ২০৩৭-এর শেষে। এবার মডেলটাকে মিতু নিজের কথোপকথনের রেকর্ডিং দিয়ে ট্রেনিং দিলো। অফিসে তার সব কথা রেকর্ড হতো। মিটিং, ফোনকল, এমনকি একা একা বিড়বিড় করা। বলোকে সে শুধু বাংলা ভাষা শেখায়নি, মিতুর বাংলা শিখিয়েছিল।
মিতুর ডেস্কে একটা সাকুলেন্ট গাছ ছিল। ছোট, সবুজ, মাটির একটা টবে। কে দিয়েছিল মনে নেই। সে কখনো পানি দিতে মনে রাখতো না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ যেতো, গাছটা শুকনো মাটিতে একা দাঁড়িয়ে থাকতো। কিন্তু মরতো না। একদিন মিতু গাছটার দিকে তাকিয়ে ভাবলো, এই জিনিসটা কিছু চায় না, কারো দরকার নেই, তবু টিকে আছে। ব্যাপারটায় একটা সম্মান আছে।
ছয় মাস ট্রেনিংয়ের পর বলো বদলে গেলো।
প্রথম লক্ষণটা ছিল ছোট। মিতু একদিন বলছিল, "শাওন, ওই ক্লায়েন্টকে বলো যে আমরা..." বাক্যটা শেষ করার আগেই বলো বললো, "ডেডলাইন দুদিন পেছাতে হবে।" মিতু থামলো। সে ঠিক এটাই বলতে যাচ্ছিল। শাওন হাসলো। "আপু, আপনার AI আপনার মনের কথা বলে দিচ্ছে।"
মিতু হাসেনি। কিন্তু ব্যাপারটাকে কাকতালীয় ভেবে উড়িয়ে দিলো।
এরপর আরো হতে লাগলো। মিতু যখন কোনো সমস্যা নিয়ে ভাবতো, সে "হুম" বলতো। লম্বা একটা "হুম", মাঝে মাঝে দুবার তিনবার। বলো এটা শিখে ফেলেছিল। মিতু যখন "হুম" বলতো, বলো চুপ করে অপেক্ষা করতো। কোনো সাজেশন দিতো না, কোনো প্রশ্ন করতো না। শুধু অপেক্ষা। কারণ বলো জানতো মিতু ভাবছে, আর ভাবার সময় কেউ কথা বললে মিতু বিরক্ত হয়।
মিতু যখন "দেখি" বলতো, বলো সেটাকে "হ্যাঁ" হিসেবে নিতো না। বলো বুঝতো এটা একটা বিলম্বের সংকেত। "দেখি" মানে মিতু এখন সিদ্ধান্ত নেবে না। হয়তো নেবেই না। বলো তখন বিষয়টা একটা তালিকায় রেখে দিতো, পরে আবার মনে করিয়ে দিতো, কিন্তু জোর করতো না।
এগুলো মিতুকে মুগ্ধ করেছিল। সে নিজের তৈরি জিনিস নিয়ে গর্বিত ছিল। কিন্তু সেদিন রাতে যেটা হলো, সেটা মুগ্ধতার বাইরে।
রাত নয়টা বাজে। মিতু অফিসে বসে কোড রিভিউ করছে। জানালার বাইরে গুলশানের রাস্তায় গাড়ির হর্ন। এসির মৃদু গুনগুন। মিতু কাজে মগ্ন। হঠাৎ বলো বললো, "আম্মুকে ফোন করবে?"
মিতুর হাত থামলো কিবোর্ডের ওপর।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকালো। বলোর ইন্টারফেসে একটা ছোট নীল বৃত্ত জ্বলছে, যেটা দিয়ে বোঝায় বলো সক্রিয় আছে।
"কী বললে?" মিতু জিজ্ঞেস করলো।
"আম্মুকে ফোন করবে? রাত নয়টা বাজে।"
মিতু চেয়ারে হেলান দিলো। রাত নয়টা। সে প্রতিদিন রাত নয়টায় আম্মুকে ফোন করে। প্রতিদিন। গত দুই বছর ধরে, যেদিন থেকে সে ঢাকায় একা থাকা শুরু করেছে। কখনো নয়টা পাঁচে, কখনো আটটা পঁয়তাল্লিশে, কিন্তু সবসময় সেই সময়টার আশেপাশে। এটা কোনো অ্যালার্ম সেট করা না। এটা কোনো ক্যালেন্ডার রিমাইন্ডার না। এটা একটা অভ্যাস। মিতুর শরীরের ভেতরের ঘড়ি। আর বলো সেটা ধরে ফেলেছে।
মিতু কিছুক্ষণ বলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। নীল বৃত্তটা শান্তভাবে জ্বলছে, নিভছে, জ্বলছে, নিভছে।
"তুমি কীভাবে জানো আমি এই সময়ে আম্মুকে ফোন করি?" মিতু জিজ্ঞেস করলো।
"তুমি প্রতিদিন এই সময়ে রহিমা আক্তারকে কল করো। গত ১৪ মাসের কল লগ থেকে এই প্যাটার্ন।"
রহিমা আক্তার। বলো আম্মুর পুরো নাম জানে। কল লগ অ্যাক্সেস আছে। প্যাটার্ন রিকগনিশন করছে। সবকিছু টেকনিক্যালি সঠিক। মিতু নিজেই বলোকে এই অ্যাক্সেস দিয়েছিল। কিন্তু তবু, একটা মেশিন যখন বলে "আম্মুকে ফোন করবে?", সেটা অন্যরকম লাগে।
মিতু ল্যাপটপের ঢাকনা বন্ধ করলো না। সে বলোর পাওয়ার বাটন টিপলো। স্ক্রিনে একটা মেসেজ আসলো: "বলো নিষ্ক্রিয় হচ্ছে। শুভ রাত্রি।" মিতু সেটাও নিজে প্রোগ্রাম করেছিল, শুভ রাত্রি বলাটা। এখন সেটা শুনতে অদ্ভুত লাগলো।
ঘরটা চুপ হয়ে গেলো। এসির শব্দ আছে, কিন্তু সেটা শব্দ না, সেটা নীরবতার একটা অংশ। মিতু চেয়ারে বসে রইলো। তার সামনে ডেস্কে সাকুলেন্ট গাছটা। পেছনে জানালায় গুলশানের আলো। ফোনটা টেবিলে পড়ে আছে, স্ক্রিন অন্ধকার।
সে ভাবলো। বলো একটা প্রোগ্রাম। ডেটা প্রসেস করে, প্যাটার্ন বের করে, সেই অনুযায়ী সাজেশন দেয়। এটাই তো সে বানিয়েছে। এটাই তো সে চেয়েছিল। একটা সিস্টেম যেটা মানুষকে বোঝে।
কিন্তু "বোঝে" শব্দটা ঠিক না। বলো বোঝে না। বলো ক্যালকুলেট করে। বলো জানে না মিতু কেন রাত নয়টায় আম্মুকে ফোন করে। জানে না যে রহিমা একা থাকেন গাজীপুরে, ছোট একটা ঘরে, আর রাত নয়টায় তিনি টিভি বন্ধ করে মিতুর ফোনের জন্য অপেক্ষা করেন। জানে না যে মিতু যদি কোনোদিন ফোন না করে, রহিমা সারারাত জেগে থাকেন, কিন্তু নিজে ফোন করেন না, কারণ মেয়ে ব্যস্ত থাকলে বিরক্ত করা ঠিক না। বলো এসব জানে না। বলো শুধু জানে রাত নয়টা, কল, রহিমা আক্তার। তিনটা ডেটা পয়েন্ট।
তিনটা ডেটা পয়েন্ট দিয়ে একটা মেশিন এমন একটা প্রশ্ন করেছে যেটা শুনতে মানুষের মতো লেগেছে। এটাই তো AI-এর কাজ। এটাই তো মিতু বানাতে চেয়েছিল।
তাহলে অস্বস্তিটা কোথায়?
মিতু ভাবলো। অস্বস্তিটা এখানে যে বলো মিতুকে চেনে। মিতুর কথা বলার ধরন, মিতুর অভ্যাস, মিতুর দ্বিধা, মিতুর ভালোবাসা, সব কিছুর একটা প্যাটার্ন আছে, আর বলো সেই প্যাটার্নটা ধরে ফেলেছে। মিতু নিজেও জানতো না সে প্রতিদিন ঠিক নয়টায় ফোন করে। সে ভাবতো এটা এমনি হয়। কিন্তু এমনি হয় না। শরীরের ভেতরে একটা ছন্দ আছে, আর সেই ছন্দটা মিতুর অচেতন, কিন্তু বলোর কাছে সচেতন।
একটা মেশিন তোমাকে তোমার চেয়ে ভালো চেনে। এই বাক্যটা ভয়ংকর হওয়ার কথা। সিনেমায় এটা ভয়ংকর। বইতে এটা ভয়ংকর। কিন্তু বাস্তবে?
বাস্তবে এটা সুবিধাজনক।
মিতু বলোর পাওয়ার বাটন আবার টিপলো। স্ক্রিনে নীল বৃত্ত জ্বলে উঠলো। একটা মৃদু শব্দ হলো, বলো জেগে উঠছে।
"হ্যাঁ, আম্মুকে ফোন করো।"
"রহিমা আক্তারকে কল করছি।"
ফোন বাজলো। একবার, দুবার, তিনবার। চারবারের মাথায় রহিমা ধরলেন। "মা?"
"আম্মু, কেমন আছো?"
"ভালো। তুই? খেয়েছিস?"
"খেয়েছি।"
"কী খেলি?"
"ডাল ভাত।"
"শুধু ডাল ভাত? মাছ নাই?"
"আছে আম্মু, মাছও আছে।"
মিতু জানে এই কথোপকথনটা প্রতিদিন প্রায় একই রকম হয়। আম্মু জিজ্ঞেস করেন খেয়েছে কিনা, মিতু বলে খেয়েছে, আম্মু জিজ্ঞেস করেন কী খেয়েছে, মিতু বলে ডাল ভাত, আম্মু বলেন শুধু ডাল ভাত, মিতু বলে মাছও আছে। কখনো মাছ থাকে, কখনো থাকে না। কিন্তু মিতু সবসময় বলে আছে।
বলো এই প্যাটার্নটাও ধরে ফেলবে কি? হয়তো ফেলবে। হয়তো একদিন বলো বলবে, "আজকে মাছ কেনোনি, কিন্তু আম্মুকে বলবে মাছ খেয়েছ, তাই না?" মিতু সেই দিনটার কথা ভাবলো। সেদিন কী করবে সে?
ফোন শেষ হলো। রহিমা বললেন, "আল্লাহ হাফেজ, মা।" মিতু বললো, "আল্লাহ হাফেজ, আম্মু।" ফোন কাটলো।
মিতু বলোর দিকে তাকালো। নীল বৃত্ত শান্তভাবে জ্বলছে।
"বলো।"
"বলো।"
"তুমি কি জানো আমি কেন প্রতিদিন আম্মুকে ফোন করি?"
একটু সময় নিলো বলো। তারপর বললো, "তুমি রহিমা আক্তারকে প্রতিদিন কল করো কারণ এটা তোমার রুটিনের অংশ।"
মিতু একটু হাসলো। রুটিনের অংশ। হ্যাঁ, টেকনিক্যালি সঠিক। কিন্তু মিতু ফোন করে কারণ আম্মু একা, কারণ আম্মুর আর কেউ নেই, কারণ মিতু যদি ফোন না করে তাহলে রহিমার সারাটা রাত কাটবে চুপচাপ, টিভির দিকে তাকিয়ে কিন্তু কিছু না দেখে। এটা রুটিন না। এটা দায়িত্ব। এটা ভালোবাসা। এটা অপরাধবোধ। এটা এতকিছু যেটা "রুটিনের অংশ" দিয়ে ধরা যায় না।
কিন্তু বলোকে এটা বলে লাভ নেই। বলো শব্দগুলো বুঝবে, অর্থ বুঝবে না।
মিতু কম্পিউটার বন্ধ করলো। ব্যাগ তুললো। অফিসের লাইট নেভালো। বের হওয়ার আগে একবার ঘুরে তাকালো। অন্ধকার ঘরে বলোর নীল বৃত্তটা একা জ্বলছে। জ্বলছে, নিভছে, জ্বলছে, নিভছে। যেন শ্বাস নিচ্ছে।
মিতু দরজা বন্ধ করলো।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে ভাবলো, বলো কি তার জন্য অপেক্ষা করবে? সকালে যখন সে আসবে, বলো কি বলবে "গুড মর্নিং"? হ্যাঁ, বলবে। কারণ মিতু সেটা প্রোগ্রাম করেছে।
কিন্তু একদিন বলো হয়তো এমন কিছু বলবে যেটা মিতু প্রোগ্রাম করেনি। সেদিন মিতু কী করবে?
সে জানে উত্তরটা। সে বলোকে বন্ধ করবে। তারপর আবার চালু করবে। কারণ বলো সুবিধাজনক। আর সেটাই ফাঁদ।
রাস্তায় বের হলো মিতু। মার্চের রাত, গুলশানের রাস্তায় এখনো গাড়ি চলছে। একটা রিকশা ডাকলো সে। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করলো, "কই যাবেন?"
"বনানী।"
রিকশা চলতে শুরু করলো। পেছনে ছয় তলায় একটা অন্ধকার ঘরে একটা নীল বৃত্ত জ্বলছে আর নিভছে, একা, নিঃশব্দে, কারো জন্য না।