করিমের গ্রামে রোবট

পর্ব ৭২ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

অধ্যায় ৮: দ্বিতীয় ঢেউ — ২০৩৮

---

করিমের বয়স চৌষট্টি। ঢাকায় একটা বহুতল ভবনের গেটে বসে বসে বারো বছর কেটে গেছে। রাতের শিফট। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর ছয়টা। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার, একটা সাইনবোর্ড যেখানে লেখা "অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ", আর একটা রেজিস্টার খাতা। এই তার দুনিয়া।

পীরগঞ্জে শেষবার গেছিল কবে, করিম নিজেও মনে করতে পারে না। আট বছর? দশ? তার বড় ভাইয়ের ছেলে জাহিদের বিয়ে ঠিক হয়েছে। ভাই ফোন করে বলল, "আইসো। এতদিন পর অন্তত একবার আইসো।" করিম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "আসুম।"

বাসে উঠল গাবতলী থেকে। রংপুর এক্সপ্রেস। রাত দশটার বাস। করিম জানালার ধারে বসল। বাসের ভেতরে এখন আর আগের মতো গন্ধ নেই। ফ্রেশনার দেয়। এসি চলে। সিটে চামড়ার কভার। কিন্তু করিম এসবের দিকে তাকায় না। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। ঢাকার আলো ধীরে ধীরে কমে আসে। তারপর অন্ধকার। মাঝে মাঝে একটা পেট্রোল পাম্পের আলো চোখে লাগে, আবার অন্ধকার।

করিম ঘুমায় না। ঘুমাতে পারে না। রাতের শিফটের মানুষ রাতে জাগে। এটা অভ্যাস। শরীরের ভেতরে একটা ঘড়ি বসে গেছে যেটা আর বদলায় না।

---

বিয়ের বাড়িতে পৌঁছাল সকাল নয়টায়। বাড়িটা চেনা। কিন্তু চারপাশ বদলে গেছে। রাস্তা পাকা হয়েছে। আগে যেখানে একটা বটগাছ ছিল, সেখানে একটা মোবাইল টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে। বটগাছটা নেই। করিম একবার সেদিকে তাকাল, তারপর ভেতরে ঢুকল।

ভাই আব্দুল করিমকে দেখে চোখ মুছল। বলল, "কত রইগা হইয়া গেছস রে।" করিম হাসল। বলল, "তুইও তো মোটা হইয়া গেছস।" দুই ভাই পাশাপাশি বসল। চা খেল। কথা বলল অল্প। দুজনেরই কথা বলার অভ্যাস কমে গেছে। বয়সের সাথে মানুষ চুপচাপ হয়ে যায়। যেন শব্দগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

বিয়ের খাবার দুপুরে। মাংস, পোলাও, সালাদ, বোরহানি। আর একটা মাছের তরকারি। রুই মাছ। করিম এক কামড় দিয়ে থেমে গেল। স্বাদটা ঠিক হালিমার রান্নার মতো। হালিমা তার স্ত্রী ছিল। সাত বছর আগে মারা গেছে। লিভারে সমস্যা ছিল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছিল। করিম মাছের তরকারির দিকে তাকিয়ে রইল। কাউকে কিছু বলল না। কিন্তু তিন বার ভাত নিল। তিনবারই মাছের ঝোল দিয়ে খেল। শেষবার একটু বেশিই হয়ে গেল। পেট ভারী লাগল। কিন্তু সে থামল না।

---

বিকেলে করিম একা বের হলো। বলল ভাইকে, "একটু জমি দেইখা আসি।" ভাই বলল, "কোন জমি? তোর জমি তো বেচা হইয়া গেছে।" করিম বলল, "জানি। দেখতে যামু শুধু।"

হেঁটে গেল। পনেরো মিনিটের রাস্তা। আগে এই রাস্তায় কাদা থাকত। বর্ষায় হাঁটু পর্যন্ত পানি উঠত। এখন সিমেন্টের রাস্তা। দুপাশে ইটের দেয়াল। কারও বাড়ির সামনে একটা সোলার প্যানেল। করিম এসব খেয়াল করে, কিন্তু কিছু বলে না।

জমির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জমি চেনা। মাটির রঙ চেনা। এই মাটিতে সে তিরিশ বছর কাজ করেছে। বাবার সাথে, তারপর একা। ধান, পাট, সরিষা। শীতে মুলা আর লাউ। গরমে ধান। সবসময় ধান। ধান ছাড়া রংপুরের কৃষকের আর কী আছে?

কোল্ড স্টোরেজটা আগেও ছিল। সেটা চলছে। বড় হয়েছে। আগে একটা ভবন ছিল, এখন দুইটা। টিনের ছাদ বদলে পাকা ছাদ হয়েছে। গেটে একটা ডিজিটাল সাইনবোর্ড, নাম পড়া যায় না দূর থেকে।

কিন্তু করিমের চোখ কোল্ড স্টোরেজে আটকে থাকল না। তার চোখ আটকে গেল পাশের মাঠে।

---

মাঠটা তার জমি। মানে, আগে তার জমি ছিল। এখন কার জমি, করিম জানে না। কিন্তু জমিতে ধান আছে। সবুজ, ঘন, একেবারে সারিবদ্ধ। প্রতিটা গাছ সমান উচ্চতায়। যেন কেউ স্কেল দিয়ে মেপে লাগিয়েছে। করিম কৃষক মানুষ। সে জানে ধান এভাবে হয় না। ধানের মাঠে কিছু গাছ লম্বা হয়, কিছু বেঁটে থাকে। কিছু জায়গায় ঘন, কিছু জায়গায় পাতলা। পানির লেভেল সমান থাকে না। মাটির গুণ সমান থাকে না। কিন্তু এই মাঠে সবকিছু সমান। প্রকৃতি এত সুশৃঙ্খল হয় না।

তারপর সে দেখল ড্রোনটা।

ছোট একটা জিনিস। ধূসর রঙ। কোনো শব্দ নেই বললেই চলে। একটা মৃদু গুঞ্জন, যেন দূরে কোথাও একটা মৌমাছি উড়ছে। ড্রোনটা মাঠের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। নিচু হয়ে। ধীরে ধীরে। তার নিচ থেকে একটা সরু ধারায় কিছু বের হচ্ছে। কীটনাশক। করিম বুঝতে পারল। সে নিজেও কীটনাশক দিত। পিঠে একটা ভারী ট্যাংক বেঁধে, হাতে পাম্প ধরে, মুখে কাপড় বেঁধে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গরমে ঘামে ভিজে একাকার হয়ে যেত। চোখ জ্বলত। নাকে, গলায় কীটনাশকের গন্ধ ঢুকত। রাতে কাশি হতো। কিন্তু পরদিন আবার একই কাজ।

ড্রোনটা স্প্রে করছে। কিন্তু কোনো অপচয় নেই। প্রতিটা ফোঁটা ঠিক জায়গায় পড়ছে। মাটিতে পড়ছে না, বাতাসে উড়ে যাচ্ছে না। গাছের পাতায়, ডগায়, ঠিক যেখানে দরকার সেখানে। করিম দাঁড়িয়ে দেখল। মিনিট পাঁচেক। ড্রোনটা একটা সারি শেষ করে ঘুরে গেল পরের সারিতে। গণিতের মতো নিখুঁত। একটা ফোঁটাও বাজে যায়নি।

মাঠের এক কোণে একটা ছোট ঘর। ঘরের ছাদে সোলার প্যানেল। ঘরের সামনে একটা মেশিন দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাক্টরের মতো, কিন্তু ট্রাক্টর না। চাকা আছে, কিন্তু ড্রাইভারের সিট নেই। কোনো মানুষ নেই মাঠে। একজনও না। পুরো মাঠে শুধু ধান আর মেশিন। ধান বাড়ছে, মেশিন কাজ করছে। মানুষের কোনো প্রয়োজন নেই।

করিম আইলের ওপর বসে পড়ল।

সে চাষ করেছে এই মাটিতে। পায়ের নিচে কাদা মাখিয়ে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে। ফসল ভালো হলে একটু হাসি, ফসল মরলে ঋণ। এই ছিল জীবন। প্রতি বছর একটা জুয়া। মাটি, আকাশ, পানি, পোকা, সবকিছু মিলিয়ে একটা জুয়া। কখনো জিতত, কখনো হারত। কিন্তু সেটা তার জুয়া ছিল। তার হাতে ছিল। তার শ্রমে ছিল।

এখন ড্রোন স্প্রে করে। মেশিন চাষ করে। কোনো একটা কম্পিউটার ঠিক করে দেয় কখন পানি দিতে হবে, কতটুকু সার দিতে হবে, কোন পোকা এসেছে, কোন ওষুধ লাগবে। আর ফলন? করিম মাঠের দিকে তাকাল। এই ধান সে যতদিন চাষ করেছে, এত ভালো ধান কখনো হয়নি। গাছগুলো স্বাস্থ্যবান। শিষ ভারী। কোনো পোকার দাগ নেই। কোনো হলুদ পাতা নেই। নিখুঁত।

তার চেয়ে ভালো। তার তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতার চেয়ে ভালো। তার বাবার শেখানো কৌশলের চেয়ে ভালো। তার ক্লান্ত হাতের চেয়ে, পুড়ে যাওয়া পিঠের চেয়ে, ফেটে যাওয়া পায়ের চেয়ে ভালো। একটা মেশিন, যেটা কোনোদিন ক্লান্ত হয় না, কোনোদিন ভুল করে না, কোনোদিন ঋণ নেয় না, সেটা তার চেয়ে ভালো ফসল ফলায়।

করিম উঠে দাঁড়াল।

মাঠের ওপারে একজন বুড়ো মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। করিম তাকে চেনে না। বুড়ো মানুষটাও মাঠের দিকে তাকাল। তারপর মাথা নিচু করে চলে গেল। কিছু বলল না।

---

সন্ধ্যায় করিম বিয়ে বাড়িতে ফিরে এল। জাহিদের বিয়ে হচ্ছে। ঢোল বাজছে। মাইকে গান। মেয়ের পক্ষের লোকজন এসে গেছে। করিম একটা কোণায় বসে রইল। কেউ তার সাথে কথা বলল না। সে কারও সাথে কথা বলল না। এটা তার স্বভাব। ঢাকায়ও সে এরকম। গেটে বসে থাকে। লোকে আসে, যায়। কেউ তাকে চেনে না। সে কাউকে চেনে না।

রাত নয়টায় করিম ভাইকে বলল, "আমি যামু।" ভাই বলল, "এত রাইতে? কাইল যাইও।" করিম বলল, "না, যামু। ডিউটি আছে।" মিথ্যা কথা। কাল রাতে ডিউটি। কিন্তু করিম থাকতে চায় না। এই জায়গায় আর থাকতে চায় না।

রংপুর বাস স্টেশন থেকে রাতের বাসে উঠল। ঢাকার বাস। এবারও জানালার ধারে। বাস ছাড়ল। শহরের আলো কমে এল। অন্ধকার।

করিম নিজের হাতের দিকে তাকাল।

হাতদুটো নরম। আগে এই হাত শক্ত ছিল। তালুতে চামড়া মোটা হয়ে গিয়েছিল। আঙুলের জোড়ায় জোড়ায় ফাটল ছিল। কীটনাশকের দাগ ছিল। নখের নিচে মাটি থাকত সবসময়। যতই ধুক না কেন, মাটি যেত না। মাটি ঢুকে যেত চামড়ার ভেতরে।

এখন হাতদুটো নরম। গার্ডের হাত। রেজিস্টার খাতায় নাম লেখার হাত। গেট খোলা-বন্ধ করার হাত। চায়ের কাপ ধরার হাত। এই হাত দিয়ে কোনো ফসল ফলে না। কোনো মাটি ওলটায় না। কোনো বীজ পড়ে না।

করিম হাত মুঠো করল। তারপর খুলল। আবার মুঠো করল।

ফাটলগুলো নেই। সেই শীতের সকালে হাতের চামড়া ফেটে রক্ত বের হতো, হালিমা সরিষার তেল মাখিয়ে দিত। সেই ফাটল নেই। হালিমাও নেই।

বাস চলছে। জানালার বাইরে অন্ধকার। মাঝে মাঝে একটা ট্রাকের হেডলাইট ঝলসে ওঠে, তারপর চলে যায়। করিম চোখ বন্ধ করল। ড্রোনটার কথা মনে পড়ল। সেই মৃদু গুঞ্জন। সেই নিখুঁত স্প্রে। একটা ফোঁটাও বাজে যায়নি।

তার হাতে কীটনাশক দিলে অর্ধেক মাটিতে পড়ত, অর্ধেক বাতাসে উড়ে যেত। সে জানত। সবাই জানত। কিন্তু আর কোনো উপায় ছিল না। মেশিন ছিল না। টাকা ছিল না। শুধু দুটো হাত ছিল। সেই হাত দিয়ে যা হয়, তাই করত।

এখন সেই হাতের দরকার নেই।

করিম হাত নামিয়ে রাখল কোলে। বাস ঝাঁকুনি খেল একটা গর্তে পড়ে। তারপর আবার সমান।

সে ভাবল, ফাটলগুলো ফিরে আসবে না আর। সরিষার তেলও লাগবে না। হালিমাও নেই যে মাখিয়ে দেবে। সব শেষ। পরিষ্কারভাবে, নিঃশব্দে শেষ।

বাসের ভেতরে কেউ একজন নাক ডাকছে। করিম জানালার কাচে কপাল ঠেকাল। কাচটা ঠান্ডা।

সে হাতের তালু উল্টে ধরল। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা ম্লান আলোয় তাকাল। মসৃণ। পরিষ্কার। কোনো দাগ নেই।

ফাটলগুলোর কথা মনে পড়ল। সে সেগুলো ফেরত চায়।