তানিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী একটা AI

পর্ব ৭৩ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

*2038*

---

তানিয়ার অফিসে একটা গাছ ছিল যেটা মরে গিয়েছিল। টবসহ মরে গিয়েছিল। পাতা ঝরে গিয়েছিল, ডালগুলো শুকিয়ে কালো হয়ে গিয়েছিল, মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। অফিসের দারোয়ান আলম ভাই বলেছিলেন, "ম্যাডাম, ফালায়া দেন। মরা গাছ রাখলে ঘরে ভূত আসে।" তানিয়া ফেলেনি। কেন ফেলেনি সেটা তানিয়া নিজেও জানে না। হয়তো ভুলে গিয়েছিল, হয়তো অলসতা, হয়তো অন্য কিছু। কিন্তু গাছটা এই মার্চে ফুল দিয়েছে। ছোট ছোট সাদা ফুল। কেউ আশা করেনি। তানিয়া একদিন সকালে অফিসে ঢুকে দেখে ফুল। চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর নিজের কাজে বসল। গাছের ফুল ফোটা নিয়ে কিছু বলার নেই। ফুল ফুটেছে, এটুকুই।

তানিয়ার বয়স আটত্রিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক। পাশাপাশি একটা ছোট কোম্পানি চালায়, নাম "শব্দবীজ।" বাংলা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং। দশ বছর ধরে কাজ করছে বাংলা ভাষার ওপর। বাংলা টেক্সট থেকে অর্থ বের করা, বাংলা বাক্য বোঝা, বাংলা ভুল ধরা, বাংলা লেখার ধরন চেনা। দশ বছর।

দশ বছর মানে কী সেটা যারা কাজ করে তারাই জানে। বাংলা ভাষার জন্য ডেটা নেই। ইংরেজিতে বিলিয়ন বিলিয়ন শব্দের ডেটাসেট আছে, কোটি কোটি বাক্য সাজানো-গোছানো, লেবেল করা, পরিষ্কার করা। বাংলায়? বাংলায় তানিয়া আর তার তিনজনের টিম নিজেদের হাতে ডেটা বানিয়েছে। পুরনো পত্রিকার আর্কাইভ ঘেঁটেছে, বইয়ের PDF থেকে টেক্সট তুলেছে, ফেসবুক কমেন্ট স্ক্র্যাপ করেছে, রেডিওর ট্রান্সক্রিপ্ট বসে বসে টাইপ করেছে। দশ বছর ধরে। মানুষের হাতে।

শব্দবীজের অফিস বলতে পুরান ঢাকার একটা পুরনো বাড়ির দোতলায় দুইটা রুম। একটা রুমে তিনটা ডেস্ক, তিনটা কম্পিউটার। আরেকটা রুমে একটা সার্ভার, যেটাকে সার্ভার বলা উচিত হয় না, আসলে একটা পুরনো ডেস্কটপে উবুন্টু বসানো, সেটাই সার্ভার। এই সার্ভারে তানিয়ার মডেল ট্রেন হয়। রাতের বেলা, কারণ দিনে বিদ্যুৎ যায়, UPS তো আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে না।

তানিয়ার মডেলের নাম "পদ্মা।" নামটা তানিয়ার ছাত্রী শিউলি রেখেছিল। পদ্মা বাংলা টেক্সট ক্লাসিফিকেশন করে, সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস করে, প্রশ্নের উত্তর দেয়, সারাংশ করে। পারফেক্ট না। অনেক ভুল করে। কিন্তু বাংলায় করে, এটাই বড় কথা। বাংলাদেশে বাংলায় NLP করার মতো টুল তানিয়ার আগে ছিল না বললেই চলে। ছিল, কিন্তু কাজের না। তানিয়ার পদ্মা কাজের। পুরোপুরি কাজের না, কিন্তু কিছুটা কাজের। আর কিছুটা কাজের হওয়াটাও বাংলাদেশে একটা বিশাল ব্যাপার।

সরকারি কিছু অফিস পদ্মা ব্যবহার করে। দুই-তিনটা ব্যাংক ব্যবহার করে। একটা সংবাদপত্র ব্যবহার করে নিউজ ক্যাটাগরি করতে। তানিয়ার কোম্পানি টাকা আয় করে, কিন্তু প্রচুর না। তানিয়ার বেতন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসে, কোম্পানি থেকে আসে তার তিনজনের টিমের বেতন আর সার্ভারের বিল। লাভ বলতে যা থাকে সেটা দিয়ে তানিয়া আরো ডেটা কেনে, আরো কম্পিউট ভাড়া করে। দশ বছর ধরে এভাবে চলছে। পদ্মার প্রতিটা আপডেটে একটু একটু ভালো হচ্ছে। ধীরে ধীরে। পিঁপড়ার গতিতে।

---

ঘটনাটা ঘটল মঙ্গলবার সকালে। তানিয়া ক্লাসে ঢুকেছে, মাস্টার্সের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস, কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিকস। বিশজন ছাত্রছাত্রী, তার মধ্যে বারোজন উপস্থিত। বাকি আটজনের অনুপস্থিতির কারণ তানিয়া জিজ্ঞেস করে না, কারণ কারণগুলো সবসময় একই: ঘুম, জ্যাম, অথবা "আসতেছিলাম ম্যাম, কিন্তু..."

ক্লাস শুরু হওয়ার আগে রাফি নামের একটা ছেলে হাত তুলল। রাফি ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্র। ভালো মানে মেধাবী, খারাপ মানে তানিয়ার চেয়ে বেশি খবর রাখে, যেটা মাঝে মাঝে বিরক্তিকর।

"ম্যাম, দেখেছেন? Axiom এর নতুন মডেল?"

তানিয়া দেখেনি। সকালে উঠে চা খেয়েছে, ট্রাফিক জ্যামে আটকে থেকেছে, তারপর সরাসরি ক্লাসে এসেছে। খবর দেখার সময় হয়নি।

"কোন মডেল?"

রাফি ফোন বের করে দেখালো। Axiom Labs, সিলিকন ভ্যালির কোম্পানি। তানিয়া নামটা জানে, ওরা মাল্টিলিঙ্গুয়াল মডেল নিয়ে কাজ করে। গতবছর ওদের একটা মডেল বের হয়েছিল, সেখানে বাংলা ছিল, কিন্তু বাংলাটা ছিল হাস্যকর। "আমি একটা বিড়াল আছি" টাইপের বাংলা। তানিয়া আর তার ছাত্ররা মিলে সেটা নিয়ে হেসেছিল।

কিন্তু এবারের মডেল আলাদা। Axiom-Bangla 2.0। তানিয়া রাফির ফোনে পড়ল। ওরা বাংলাদেশ থেকে একটা পুরো টিম হায়ার করেছে। ত্রিশ জন এনোটেটর, ছয় মাস ধরে কাজ করেছে। কোটি কোটি টোকেনের ডেটা। GPT ক্লাসের আর্কিটেকচার, শত শত GPU-তে ট্রেন করা। আর ফ্রি। সম্পূর্ণ ফ্রি। ওপেন সোর্স। যে কেউ ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারবে।

তানিয়া ফোনটা ফেরত দিল।

"ভালো," বলল।

ক্লাস শুরু করল। ক্লাসে মন ছিল না, কিন্তু তানিয়া ক্লাস নেওয়া জানে মন না থাকলেও। পনেরো বছর ধরে পড়াচ্ছে। পড়ানো একটা পারফর্মেন্স, আর তানিয়া ভালো পারফর্মার।

---

ক্লাসের পর তানিয়া অফিসে গেল। মানে শব্দবীজের অফিসে, পুরান ঢাকায়। মিরপুর থেকে পুরান ঢাকা, রিকশায়, কারণ এই রাস্তায় গাড়ি ঢোকে না। রিকশাওয়ালা খুরশিদ মিয়া তানিয়াকে চেনে, প্রতিদিন নেয়। খুরশিদ মিয়া রিকশা চালাতে চালাতে রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন। তানিয়া শোনে। আজ তানিয়া শুনছিল না।

অফিসে ঢুকে দেখল তিনজনই আছে। শিউলি, নাহিদ, আর রুমান। তিনজনের তিনটা মুখ দেখে তানিয়া বুঝল, তারাও দেখেছে।

শিউলি বলল, "আপু, দেখেছেন?"

"হ্যাঁ।"

নাহিদ বলল, "আমি ডাউনলোড করে টেস্ট করছি। সকাল থেকে।"

"কেমন?"

নাহিদ একটু চুপ করে থাকল। তারপর বলল, "ভালো। আমাদের চেয়ে ভালো।"

তানিয়া চেয়ারে বসল। "কোন কোন কাজে?"

"সব কাজে।" নাহিদের গলায় কিছু নেই, রাগ নেই, দুঃখ নেই। শুধু তথ্য। নাহিদ এরকমই, আবেগ কম, তথ্য বেশি। "ক্লাসিফিকেশন, সামারাইজেশন, কোয়েশ্চান আনসারিং, ট্রান্সলেশন। সব কিছুতে পদ্মার চেয়ে ভালো স্কোর। কিছু কিছু জায়গায় অনেক ভালো।"

রুমান বলল, "আর ফ্রি।"

হ্যাঁ, আর ফ্রি। তানিয়ার পদ্মা ফ্রি না। পদ্মার API ব্যবহার করতে টাকা লাগে, কারণ সেই টাকায় শিউলি-নাহিদ-রুমানের বেতন হয়, সার্ভারের বিল হয়। Axiom এর মডেল ফ্রি, কারণ Axiom এর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আছে, বিলিয়ন ডলারের ফান্ডিং আছে, হাজার হাজার GPU আছে। ওদের জন্য বাংলা একটা চেকবক্স, "Supported Languages" লিস্টে আরেকটা টিক মার্ক। তানিয়ার জন্য বাংলা সবকিছু।

তানিয়া বলল, "বেঞ্চমার্ক পাঠাও আমাকে।"

নাহিদ পাঠালো। তানিয়া ল্যাপটপে খুলে দেখল। সংখ্যাগুলো পরিষ্কার। প্রতিটা মেট্রিকে Axiom-Bangla 2.0 পদ্মার চেয়ে এগিয়ে। কোথাও সামান্য, কোথাও অনেকটা। দশ বছরের কাজ আর ছয় মাসের কাজ পাশাপাশি রাখলে দশ বছরের কাজটা পাতলা দেখায়।

তানিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করল। "চলো, চা খাই।"

---

নিচে নেমে রাস্তার ধারের দোকানে চা খেল চারজন। দোকানের নাম "বাবু চা স্টল," কিন্তু বাবু নামের কেউ নেই, দোকানটা চালায় মতিন নামের একজন লোক যে কোনোদিন ব্যাখ্যা করেনি নাম বাবু কেন। তানিয়া কখনো জিজ্ঞেসও করেনি। কিছু প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে শিউলি বলল, "আমরা কী করব এখন?"

তানিয়া বলল, "চা শেষ করব।"

"আমি সিরিয়াসলি বলছি, আপু।"

তানিয়া জানে শিউলি সিরিয়াসলি বলছে। শিউলি তানিয়ার প্রথম ছাত্রী, মাস্টার্সের থিসিস তানিয়ার তত্ত্বাবধানে করেছে, তারপর শব্দবীজে জয়েন করেছে। ছয় বছর হলো। শিউলির বেতন মাসে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা, যেটা ঢাকার জন্য কম, কিন্তু শিউলি কোনোদিন অভিযোগ করেনি। শিউলি বিশ্বাস করে তানিয়ায়, পদ্মায়, বাংলা NLP-তে। সেই বিশ্বাসের ওপর ছয় বছর চলেছে।

তানিয়া বলল, "আমি জানতাম এটা হবে।"

"জানতেন?"

"হ্যাঁ। সবাই জানত। যে কেউ এই ফিল্ডে কাজ করে সে জানত যে বড় কোম্পানিগুলো একদিন বাংলায় আসবে। প্রশ্ন ছিল কবে, কিভাবে না। প্রশ্ন ছিল আমাদের কতটুকু সময় আছে।"

"দশ বছর পেয়েছিলেন," নাহিদ বলল।

"হ্যাঁ। দশ বছর পেয়েছিলাম। মন্দ না।"

রুমান বলল, "কিন্তু এখন?"

তানিয়া চায়ের কাপটা টেবিলে রাখল। "এখন? এখন জানি না।"

এটা বলতে তানিয়ার কষ্ট হলো না। আশ্চর্যজনকভাবে কষ্ট হলো না। তানিয়া ভেবেছিল এই মুহূর্তটা আসলে কষ্ট হবে, রাগ হবে, অপমান লাগবে। কিন্তু লাগল না। হয়তো কারণ তানিয়া অনেকদিন ধরে এই মুহূর্তটার জন্য প্রস্তুত ছিল। মানসিকভাবে। শরীরটা প্রস্তুত ছিল না, হাতটা একটু কাঁপছে, কিন্তু সেটা চায়ের কারণেও হতে পারে। চায়ে চিনি বেশি দিয়েছে মতিন আজ।

---

বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে তানিয়া দেখল ডিপার্টমেন্টের গ্রুপ চ্যাটে তোলপাড়। সবাই Axiom-Bangla 2.0 নিয়ে কথা বলছে। কয়েকজন কলিগ তানিয়াকে ট্যাগ করেছে। "তানিয়া আপা, আপনার কী মনে হয়?" "তানিয়া আপা, এটা কি পদ্মার চেয়ে ভালো?"

তানিয়া উত্তর দিল না।

করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে এক ছাত্রী, ফারজানা, এসে বলল, "আপু, Axiom এর মডেলটা দেখেছেন? ওটা তো আপনার টুলের চেয়ে ভালো।"

তানিয়া থামল। ফারজানার দিকে তাকালো। ফারজানার চোখে কোনো দুষ্টুমি নেই, কোনো ব্যঙ্গ নেই। সত্যি জিজ্ঞেস করছে। ফারজানা তানিয়ার ছাত্রী, তানিয়ার কাজকে সম্মান করে, কিন্তু সত্যটাও দেখতে পায়।

"হ্যাঁ," তানিয়া বলল।

"হ্যাঁ" বলাটা সহজ ছিল না। কিন্তু তানিয়া বলল। কারণ তানিয়া মিথ্যা বলে না। অন্তত এই ব্যাপারে না।

ফারজানা একটু অস্বস্তিতে পড়ল। সে হয়তো আশা করেছিল তানিয়া বলবে "না, পদ্মার অনেক ফিচার আছে যেটা ওদের নেই" অথবা "ওটা বাংলাদেশের কনটেক্সট বোঝে না" অথবা অন্য কিছু। একটা ডিফেন্স। কিন্তু তানিয়া ডিফেন্স দিল না।

"হ্যাঁ, ওটা ভালো," তানিয়া আবার বলল। "ওদের কাছে আমাদের চেয়ে বেশি ডেটা আছে, বেশি কম্পিউট আছে, বেশি ইঞ্জিনিয়ার আছে। ভালো হবে এটাই স্বাভাবিক।"

ফারজানা কিছু বলতে গিয়ে থামল। তারপর বলল, "আপু, কিন্তু আপনি তো প্রথম ছিলেন। বাংলায় এই কাজ প্রথম আপনিই করেছেন।"

তানিয়া হাসল। হাসিটা আসল ছিল, কিন্তু ছোট ছিল। "প্রথম হওয়া আর সেরা হওয়া এক জিনিস না, ফারজানা।"

ফারজানা আর কিছু বলল না। তানিয়াও বলল না।

---

সন্ধ্যায় তানিয়া বাসায় ফিরল। মিরপুরের ছোট ফ্ল্যাট। দুই রুম, একটা রান্নাঘর। একা থাকে। বিয়ে করেনি, করবে কিনা জানে না, এই নিয়ে মায়ের সাথে মাসে একবার ফোনে ঝগড়া হয়, বাকি সময় মা অন্য বিষয়ে কথা বলেন।

তানিয়া জুতো খুলে ঘরে ঢুকল। ব্যাগ রাখল। ল্যাপটপ বের করল। টেবিলে রাখল। খুলল।

স্ক্রিনে শব্দবীজের গিট রিপোজিটরি। পদ্মার কোডবেস। দশ বছরের কাজ। প্রতিটা কমিট তানিয়ার জানা। প্রতিটা ফাংশন তানিয়ার লেখা, অথবা তানিয়ার তত্ত্বাবধানে লেখা। এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছে, রাত তিনটায় একটা বাগ ফিক্স করেছে, সকালে উঠে দেখেছে মডেলের accuracy এক শতাংশ বেড়েছে আর আনন্দে লাফিয়ে উঠেছে। এক শতাংশ। বাইরের মানুষের কাছে এক শতাংশ কিছু না। তানিয়ার কাছে এক শতাংশ ছিল তিন মাসের কাজ।

তানিয়া কোডবেসের দিকে তাকিয়ে রইল। ফাইলগুলো সাজানো আছে ঝকঝকে, প্রতিটা ফোল্ডারের নাম বাংলায়: "উপাত্ত," "প্রশিক্ষণ," "মূল্যায়ন," "সরঞ্জাম।" তানিয়া জেদ করে বাংলায় রেখেছিল। নাহিদ বলেছিল ইংরেজিতে রাখা ভালো, কিন্তু তানিয়া শোনেনি।

দশ বছর।

তানিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করল। আলতো করে, যেমন ঘুমন্ত বাচ্চার গায়ে কম্বল দেওয়া হয়।

রান্নাঘরে গেল। চুলা জ্বালালো। দুধ গরম করল। আদা কুচি কুচি করে কাটল। এলাচ ভাঙল একটা। চা পাতা ছাড়ল। তানিয়া কফি খায় না। সবাই ভাবে প্রোগ্রামার মানেই কফি, কিন্তু তানিয়া চা খায়। সবসময় চা। দুধ চা, আদা দিয়ে, একটু এলাচ দিয়ে। মা এভাবে বানাতেন। তানিয়া মায়ের কাছ থেকে দুইটা জিনিস শিখেছে: চা বানানো আর কান্না না করে চুপ করে থাকা। দুইটাই কাজে লাগে।

চা বানাতে বানাতে তানিয়া ভাবল, কাল কী হবে? কাল কী করবে? পদ্মা কি বন্ধ করবে? শব্দবীজ কি বন্ধ করবে? শিউলি, নাহিদ, রুমান, ওদের কী হবে? ওদের বেতন কোত্থেকে আসবে? সরকারি ক্লায়েন্টরা তো ফ্রি মডেল পেলে পদ্মার জন্য টাকা দেবে না। ব্যাংকগুলো দেবে না। পত্রিকা দেবে না। কেউ দেবে না।

চা ফুটে উঠল। তানিয়া ছেঁকে কাপে ঢালল।

ভাবল, কাল ভাবব। আজ না। আজ শুধু চা।

বারান্দায় গেল। চেয়ার টেনে বসল। কাপটা দুই হাতে ধরল। মিরপুরের সন্ধ্যা। নিচে রাস্তায় রিকশার ঘণ্টা, দূরে আজানের শব্দ, পাশের বাসা থেকে টিভির আওয়াজ। তানিয়া চায়ে চুমুক দিল। গরম, তিতকুটে, একটু মিষ্টি। ঠিক আছে।

কাল কী হবে তানিয়া জানে না। হয়তো পদ্মাকে অন্যভাবে কাজে লাগাবে, হয়তো Axiom যা করেনি সেই ফাঁকগুলো খুঁজবে, হয়তো সম্পূর্ণ নতুন কিছু শুরু করবে, হয়তো শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে। হয়তো কিছুই করবে না কিছুদিন। জানে না।

কিন্তু আজ চা।

---

অফিসের জানালার ধারে মরে যাওয়া গাছটায় সাদা ফুল ফুটে আছে। ছোট, সাদা, নিরীহ। কেউ পানি দেয়নি, কেউ সার দেয়নি, কেউ যত্ন করেনি। তবু ফুটেছে।