সেলিনা বনাম অ্যালগরিদম
নতুন যন্ত্রটা এলো বর্ষার আগে।
পুরোনো ট্যাবলেটটা সেলিনা দশ বছর ধরে ব্যবহার করেছে। স্ক্রিনের একটা কোণা ফেটে গিয়েছিলো, সেলিনা টেপ দিয়ে আটকে রেখেছিলো। ব্যাটারি আর আগের মতো থাকতো না, সকালে পূর্ণ চার্জ দিলে বিকেলের মধ্যে শেষ। তবু চলতো। সেলিনা আর ট্যাবলেটের মধ্যে একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিলো। ট্যাবলেট বলতো রোগটা কী হতে পারে, সেলিনা বলতো এই চরে সেই রোগের বিরুদ্ধে কী করা যায়। দুজনে মিলে একটা কাজ চালাতো।
এখন সরকার বলেছে পুরোনো ট্যাবলেট ফেরত দিতে হবে। নতুন যন্ত্র আসছে। উপজেলা হেলথ অফিস থেকে ফোন এসেছিলো, "সেলিনা আপা, পরশু ট্রেনিং। নতুন সিস্টেম।"
সেলিনা ফোন রেখে বারান্দায় বসলো। সামনে হাওরের পানি। বিশ বছর আগে যখন এই চরে এসেছিলো, তখন পানি দেখলে ভয় লাগতো। এখন পানি দেখলে কিছু লাগে না। পানি আছে, সবসময় ছিলো, থাকবে।
সোহেল ফোন করলো সন্ধ্যায়। ঢাকা থেকে। ঢাকা মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষ। সোহেলের গলা এখন ভারী, কিন্তু মায়ের সাথে কথা বলার সময় একটু পাতলা হয়ে যায়। সেলিনা এটা লক্ষ্য করেছে, কিছু বলেনি।
"মা, নতুন সিস্টেমের কথা শুনলাম। এটা অনেক ভালো। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে রোগ ধরতে পারে। চোখের ছবি, জিভের ছবি, ত্বকের ছবি।"
"তুই কোথায় শুনলি?"
"আমাদের ফরেনসিক মেডিসিনের স্যার বললেন। পুরো দেশে চালু হচ্ছে। WHO-র সাথে মিলে বানানো।"
সেলিনা বললো, "হুম।"
"মা, তোমার জন্য একটা জিনিস পাঠাচ্ছি কুরিয়ারে।"
"কী?"
"পেলে দেখবে।"
---
ট্রেনিংয়ে গেলো সেলিনা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আগের মতোই চা আর বিস্কুট, এবার "লিটল স্টার।" রুবিনা এখনো আছে, বাকিরা বদলি হয়ে গেছে বা অবসরে গেছে। জোহরা আপা গত বছর রিটায়ার করেছেন। তাঁর জায়গায় এসেছে নতুন একটা মেয়ে, লিপি, বাইশ বছর, চট্টগ্রামের মেয়ে।
ঢাকা থেকে এবারও দুইজন এসেছে। কিন্তু তারা ডাক্তার না, ইঞ্জিনিয়ার না। তারা "ট্রেইনার।" কোম্পানির লোক। নতুন ডিভাইসটা দেখালো।
ডিভাইসটা ট্যাবলেটের চেয়ে ছোট, ফোনের চেয়ে বড়। মাঝামাঝি। পেছনে তিনটা ক্যামেরা। স্ক্রিনে বাংলায় সব লেখা। আগের ট্যাবলেটে লক্ষণ টাইপ করতে হতো। এটাতে ছবি তুললেই হয়। রোগীর চোখের ছবি তুলো, জিভের ছবি তুলো, ত্বকের যেখানে সমস্যা সেখানে ক্যামেরা ধরো। বাকিটা সিস্টেম করবে।
ট্রেইনার বললো, "এটা হাজার হাজার কেস দেখে শিখেছে। চোখের সাদা অংশ হলুদ হলে জন্ডিস ধরতে পারে। জিভে সাদা আবরণ থাকলে ফাঙ্গাল ইনফেকশন বুঝতে পারে। ত্বকে র্যাশের ধরন দেখে ডেঙ্গু আর ম্যালেরিয়া আলাদা করতে পারে।"
সেলিনা হাত তুললো। "ভুল করলে?"
ট্রেইনার একটু থামলো। "অ্যাকিউরেসি অনেক বেশি। কিন্তু এটা চূড়ান্ত রোগনির্ণয় না। এটা সাজেশন দেবে। আপনারা সেটা রিভিউ করবেন।"
"মানে আমরা বলবো ঠিক না ভুল?"
"হ্যাঁ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিস্টেম সঠিক হবে।"
সেলিনা আর কিছু বললো না। বিস্কুট খেলো। চা খেলো।
নতুন ডিভাইস হাতে নিয়ে দেখলো। পুরোনো ট্যাবলেটটা ফেরত দিতে হলো। সেলিনা ফেরত দেওয়ার আগে স্ক্রিনে হাত রাখলো একবার। তারপর দিয়ে দিলো। এতে অতিরিক্ত আবেগ দেখানোর কিছু নেই, সেলিনা ভাবলো। যন্ত্র যন্ত্রই।
---
কুরিয়ারটা এলো তিন দিন পর। ভেতরে একটা স্টেথোস্কোপ। কালো রঙের, ভালো ব্র্যান্ডের। সাথে সোহেলের হাতের লেখায় একটা চিরকুট: "মা, এটা আমার প্র্যাক্টিক্যালের জন্য কিনেছিলাম, আরেকটা কিনে নিয়েছি। তোমার কাজে লাগবে।"
সেলিনা স্টেথোস্কোপটা কানে লাগালো। নিজের বুকে ধরলো। ধক ধক ধক। নিজের হৃদপিণ্ডের আওয়াজ। বিশ বছর ধরে মানুষের বুকে কান পেতে শব্দ শুনেছে, কিন্তু স্টেথোস্কোপ ছিলো না। এটা ছিলো তার একটা অভাব যেটা সে কাউকে বলেনি।
এখন সেলিনার ব্যাগে তিনটা জিনিস: নতুন ডিভাইস, পুরোনো খাতা, সোহেলের স্টেথোস্কোপ। তিনটা তিন যুগের। সেলিনা তিনটাই ব্যবহার করে। ডিভাইস দিয়ে ছবি তোলে, স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুকের আওয়াজ শোনে, খাতায় লিখে রাখে। কে বলেছে একটাই যথেষ্ট?
---
শুক্রবার বিকেলে মজিদ এলো। মজিদ মাঝবয়সী, পঞ্চাশের কাছে, চরের পুরোনো মানুষ। জেলে। গত তিনদিন ধরে জ্বর, শরীরে ব্যথা, কাঁপুনি।
সেলিনা মজিদকে খাটিয়ায় বসালো। জ্বর মাপলো। একশো দুই। শরীর গরম। চোখ একটু লাল। মজিদের হাত কাঁপছে, কিন্তু মজিদ কাঁপুনির কথা বলতে চায় না। চরের পুরুষ মানুষ কাঁপুনির কথা সহজে বলে না। সেলিনা দেখেই বুঝলো।
সেলিনা ডিভাইসটা বের করলো। মজিদের চোখের ছবি তুললো। জিভের ছবি তুললো। হাতের তালুর ছবি তুললো।
স্ক্রিনে নীল বৃত্তটা ঘুরলো। আগের ট্যাবলেটেও এই বৃত্ত ঘুরতো, কিন্তু এটা দ্রুত। পাঁচ সেকেন্ড।
স্ক্রিনে ফলাফল এলো:
**ম্যালেরিয়া (Plasmodium vivax) সনাক্ত হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা। রক্ত পরীক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। ক্লোরোকুইন থেরাপি বিবেচনা করুন।**
সেলিনা স্ক্রিনের দিকে তাকালো। তারপর মজিদের দিকে তাকালো।
"মজিদ ভাই, আপনি কি গত কয়েকদিন কিছু খেয়েছেন? মানে ওষুধ, গাছগাছড়া, কিছু?"
মজিদ একটু ভাবলো। "হ্যাঁ, আপা। পেটে গ্যাস হইছিলো। বউ নিমপাতা আর চিরতার পানি বানাইছে। তিনদিন খাইছি।"
সেলিনা মাথা নাড়লো। সে জানতো। মজিদের বউ জরিনা গাছগাছড়ায় বিশ্বাস করে। নিমপাতা আর চিরতা বেশি খেলে কী হয় সেলিনা জানে। কারণ খাতায় লেখা আছে। ছয় বছর আগে হালিমের মেয়ের একই রকম হয়েছিলো। চিরতা বেশি খাওয়ায় জ্বর, গায়ে ব্যথা, কাঁপুনি। ম্যালেরিয়ার মতো দেখায়। কিন্তু ম্যালেরিয়া না।
সেলিনা খাতা খুললো। পুরোনো পাতা উলটালো। খুঁজে পেলো। হালিমের মেয়ে, ২০৩২, চিরতার রিঅ্যাকশন। জ্বর, কাঁপুনি, পেশীতে ব্যথা, চোখ লাল। দুইদিন চিরতা বন্ধ রাখার পর সব ঠিক হয়ে গিয়েছিলো।
সেলিনা স্টেথোস্কোপ দিয়ে মজিদের বুকের আওয়াজ শুনলো। পরিষ্কার। ফুসফুস ঠিক। প্লীহা চেপে দেখলো, ফোলা নেই। ম্যালেরিয়া হলে প্লীহা ফুলতো, সবসময় না, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।
সেলিনা ডিভাইসের স্ক্রিনে আবার তাকালো। ম্যালেরিয়া। উচ্চ সম্ভাবনা।
সেলিনা "দ্বিমত" বাটনে চাপলো।
স্ক্রিনে একটা বক্স এলো: "আপনার মতামত লিখুন।"
সেলিনা লিখলো: "স্থানীয় ভেষজ (চিরতা + নিমপাতা) এর প্রতিক্রিয়া। ম্যালেরিয়া নয়। চিরতা বন্ধ করে পর্যবেক্ষণ।"
সেলিনা "সাবমিট" চাপলো।
স্ক্রিনে একটা হলুদ সতর্কতা এলো: "সতর্কতা: আপনি AI রোগনির্ণয়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এই তথ্য রেকর্ড করা হবে।"
সেলিনা পড়লো। "রেকর্ড করা হবে।" ঠিক আছে। করুক।
---
মজিদকে বললো, "ভাই, চিরতা-নিম বন্ধ। দুইদিন। শুধু স্যালাইন খান আর বিশ্রাম নেন। জ্বর কমবে। না কমলে আবার আসবেন।"
মজিদ বললো, "আপা, ম্যালেরিয়া না তো?"
"না।"
"যন্ত্র কী কইলো?"
সেলিনা একটু থামলো। "যন্ত্র বলেছে ম্যালেরিয়া। আমি বলছি না। আমি আপনাকে চিনি, আপনার বউকে চিনি, আপনাদের ঘরে কী খাওয়া হয় জানি। যন্ত্র জানে না।"
মজিদ উঠলো। চলে গেলো।
সেলিনা ডিভাইসটা ব্যাগে রাখলো। খাতাটা বের করলো। লিখলো:
"মজিদ, ৫০। জ্বর ১০২, কাঁপুনি, গা-ব্যথা। চিরতা+নিম তিনদিন। সিস্টেম বলেছে ম্যালেরিয়া। আমি বলেছি চিরতার রিঅ্যাকশন। চিরতা বন্ধ করতে বলেছি। দুইদিন পর দেখবো।"
---
দুইদিন পর মজিদ এলো। জ্বর নেই। শরীরে ব্যথা নেই। মুখে হাসি।
"আপা, ঠিক হইছি। চিরতা বন্ধ করার পরদিনই জ্বর কমছে।"
সেলিনা বললো, "ভালো।" খাতায় লিখলো: "মজিদ, ফলোআপ। জ্বর নেই। রিঅ্যাকশন ছিলো। সিস্টেম ভুল ছিলো।"
সেই বিকেলেই ফোন এলো।
নম্বরটা চেনা না। ঢাকার নম্বর। সেলিনা ধরলো।
"আসসালামু আলাইকুম। সেলিনা বেগম?"
"জি।"
"আমি ডক্টর ফারুক, সেন্ট্রাল হেলথ মনিটরিং ইউনিট থেকে বলছি। আপনার একটা কেস রিভিউতে এসেছে। কেস আইডি ৩৮-এসজি-২১৭৪। আপনি AI ডায়াগনোসিসের সাথে দ্বিমত করেছেন।"
সেলিনা বললো, "হ্যাঁ।"
"কেন?"
"কারণ AI ভুল ছিলো।"
লাইনের ওপাশে একটু নীরবতা। তারপর ডক্টর ফারুক বললেন, "আপনি কীসের ভিত্তিতে বলছেন?"
"রোগী চিরতা খেয়েছিলো তিনদিন। চিরতার রিঅ্যাকশনে এই লক্ষণ হয়। আমি আগেও দেখেছি। চিরতা বন্ধ করার পর জ্বর চলে গেছে। রোগী সুস্থ।"
"সেটা জানি। রিপোর্ট দেখেছি। কিন্তু সেলিনা আপা, সিস্টেম ম্যালেরিয়া বলেছিলো। আপনি রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই বাতিল করেছেন। রক্ত পরীক্ষা করলে নিশ্চিত হওয়া যেতো।"
"চরে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। আপনি জানেন।"
"তাহলে রেফার করতে পারতেন।"
"উপজেলায় যেতে নৌকায় তিন ঘণ্টা। ফেরত তিন ঘণ্টা। মজিদ জেলে, দিনে মাছ না ধরলে সন্ধ্যায় খাবে কী? রেফার করলে তার একটা কাজের দিন শেষ। তার পরিবারের একটা বেলার খাবার শেষ। আমি জানতাম সমস্যাটা কী। তাই রেফার করিনি।"
ডক্টর ফারুক আবার চুপ। তারপর বললেন, "আপা, আমি আপনার অভিজ্ঞতাকে সম্মান করি। কিন্তু নিয়ম হলো, AI ডায়াগনোসিসের সাথে দ্বিমত করলে একটা জাস্টিফিকেশন ফর্ম পূরণ করতে হয়। আর সেই ফর্ম রিভিউ হয়। এবার আপনি ঠিক ছিলেন। কিন্তু পরেরবার সিস্টেম ফলো করবেন। কমপক্ষে রেফারেলটা দেবেন।"
সেলিনা বললো, "পরেরবার আমি যেটা ঠিক মনে করবো সেটাই করবো।"
ডক্টর ফারুক কিছু বললেন না। একটু পর বললেন, "আপনার কেস ক্লোজ করছি। কিন্তু রেকর্ডে থাকবে।"
"থাকুক।"
ফোন কাটলো।
---
সেলিনা ফোনটা রেখে বারান্দায় গেলো। সন্ধ্যা নামছে। হাওরের পানিতে আকাশের রঙ পড়েছে। কমলা, একটু বেগুনি। রহমত চাচা আর বেঁচে নেই, তাঁর ছেলে এখন নৌকা চালায়। ছেলের নামও রহমত। চরের মানুষ নাম পাল্টায় না।
সেলিনা ভাবলো। সিস্টেম ম্যালেরিয়া বলেছিলো কারণ সিস্টেম চিরতা চেনে না। সিস্টেম হাজার হাজার কেস দেখেছে, কিন্তু সেই হাজার হাজার কেসের মধ্যে সুনামগঞ্জের চরের একটা জেলের বউ যে পেটে গ্যাস হলে চিরতা-নিমের পানি বানায়, এটা নেই। এটা কোনো ডেটাসেটে নেই। এটা সেলিনার খাতায় আছে।
আর সেলিনার খাতা কেউ পড়ে না। কেউ স্ক্যান করে সিস্টেমে ঢোকায় না। কেউ জিজ্ঞেসও করে না, সেলিনা আপা, আপনার খাতায় কী আছে?
সেলিনা ঘরে ঢুকলো। খাতা বের করলো। নতুন পাতায় লিখলো:
"ডক্টর ফারুক ফোন করেছিলো ঢাকা থেকে। কেন AI-এর সাথে দ্বিমত করলাম জানতে চাইলো। বললাম, কারণ আমি ঠিক ছিলাম। উনি বললেন পরেরবার সিস্টেম ফলো করতে। আমি বললাম, পরেরবার আমি যেটা ঠিক মনে করবো সেটাই করবো।"
একটু থামলো। কলমটা ঘোরালো আঙুলে।
তারপর লিখলো:
"সিস্টেম ভুল ছিলো কারণ চিরতা জানে না। আমি ঠিক ছিলাম কারণ মজিদকে চিনি। প্রশ্ন হলো, পরেরবার যদি সিস্টেম ঠিক থাকে আর আমি ভুল করি? তখন কী হবে? জানি না। কিন্তু আজকে আমি ভুল করিনি।"
খাতা বন্ধ করলো।
---
রাতে সোহেল ফোন করলো।
"মা, স্টেথোস্কোপ পেয়েছো?"
"পেয়েছি।"
"কাজে লাগছে?"
"লাগছে।"
সোহেল একটু চুপ। তারপর বললো, "মা, আমাদের ক্লাসে একটা লেকচার হলো। AI ডায়াগনোসিস নিয়ে। স্যার বললেন, AI শুধু প্যাটার্ন দেখে। কনটেক্সট বোঝে না। কনটেক্সট বুঝতে গেলে ডাক্তার লাগে।"
"বা স্বাস্থ্য সহকারী।"
সোহেল হাসলো। "হ্যাঁ, মা। বা স্বাস্থ্য সহকারী।"
সেলিনা ফোন রাখলো।
সে জানে সোহেল একদিন ডাক্তার হবে। ভালো ডাক্তার হবে, কারণ সোহেল চরের মানুষ দেখে বড় হয়েছে। সে জানে রোগ শুধু শরীরে থাকে না, রোগ জীবনেও থাকে। দারিদ্র্য একটা রোগ, দূরত্ব একটা রোগ, অপেক্ষা একটা রোগ। ট্যাবলেটও বোঝে না, ডিভাইসও বোঝে না। সোহেল হয়তো বুঝবে।
বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকালো। চরে এখন বিদ্যুৎ আছে, সোলার প্যানেল থেকে আসে, কিন্তু রাতে কম থাকে। একটা এলইডি বাল্ব জ্বলছে, হালকা। সোহেলের পাঠানো স্টেথোস্কোপটা টেবিলে রাখা, পাশে নতুন ডিভাইস, পাশে খাতা।
খাটের পাশের শেলফে একটা কাচের বয়াম। নদীর নুড়িপাথরে ভরা। সোহেল ছোটবেলায় জমাতো। বয়ামটা এখনো আছে। সোহেল নিয়ে যায়নি ঢাকায়। সেলিনা রেখে দিয়েছে। কেন রেখে দিয়েছে জিজ্ঞেস করলে বলবে, এমনি।
সেলিনার চোখ বন্ধ হচ্ছে। ঘুম আসছে। কাল সকালে ফজলুর বউকে দেখতে যেতে হবে, ডেলিভারি কাছে। নতুন ডিভাইস দিয়ে ব্লাড প্রেশার চেক করবে, স্টেথোস্কোপ দিয়ে বাচ্চার হার্টবিট শুনবে, খাতায় লিখবে।
ডক্টর ফারুকের কথা মনে পড়লো। "রেকর্ডে থাকবে।"
থাকুক।
বাইরে হাওরের পানিতে জ্যোৎস্না পড়েছে। একটা মাছরাঙা ডাকছে, রাতে, যেটা অস্বাভাবিক, মাছরাঙা সাধারণত দিনের পাখি। কিন্তু চরের মাছরাঙা নিয়মের ধার ধারে না। ডাকছে, একটানা, যেন কাউকে খবর দিচ্ছে যে জানালাটা খোলা আছে।