রহিমা আর গুনতে পারে না
**সিরিজ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ | পর্ব ৭৫ | অধ্যায় ৮: দ্বিতীয় ঢেউ, ২০৩৮**
---
রহিমা বাথরুমের মেঝের টাইলস গুনছিল। বিশেষ কোনো কারণে না। অভ্যাস। পায়ের নিচে ঠান্ডা টাইলস, সকালবেলা, দাঁত মাজতে মাজতে চোখ নিচে পড়ল, গুনতে শুরু করল। এটা সে সবসময় করে। রান্নাঘরের চালের দানা, বাজারের মাছের আঁশ, সিঁড়ির ধাপ। গোনা তার স্বভাব। কেউ কেউ নখ কাটে অযথা, কেউ চুল পাকায় আঙুলে, রহিমা গোনে।
তেইশটা।
সে আবার গুনল। তেইশটা।
কিন্তু গতকালও সে গুনেছিল। চব্বিশটা ছিল। পরশুও চব্বিশ। তার আগেও চব্বিশ। মিতুর ফ্ল্যাটে আসার পর থেকে প্রতিদিন সকালে গুনেছে, প্রতিবারই চব্বিশ পেয়েছে। আজ তেইশ কেন?
রহিমা হাঁটু ভাঁজ করে বসতে চাইল, কিন্তু হাঁটু বাঁকাল না। হাঁটু আর বাঁকায় না। দুটো হাঁটুই শেষ। ডাক্তার বলেছে অপারেশন লাগবে, কিন্তু রহিমা অপারেশনে রাজি না। সে বলেছে, "হাঁটু ছাড়াই চলবে।" মিতু বলেছে, "আম্মু, হাঁটু ছাড়া কীভাবে চলবে?" রহিমা বলেছে, "চলবে।"
সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবার গুনল। এবার আঙুল দিয়ে দেখাতে দেখাতে। এক, দুই, তিন। সারি ধরে ধরে। ছয়টা সারি, প্রতি সারিতে চারটা করে। ছয় চার চব্বিশ। কিন্তু সে গুনতে গুনতে তেইশ পাচ্ছে। কোথায় যেন একটা হারিয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে কোথাও একটা টাইলস চোখ ফাঁকি দিচ্ছে, নাকি সে নিজেই একটা সংখ্যা লাফ দিয়ে পার করে যাচ্ছে।
রহিমা ব্রাশটা রেখে দিল। মুখ ধুল না। বেরিয়ে এলো।
---
রান্নাঘরে চালের কৌটা খুলল। ভাত হবে দুপুরে। মিতু বলে গেছে মাছ আছে ফ্রিজে, ভাত চড়াতে। রহিমা চালের কৌটা থেকে দুই কাপ চাল বের করল। তারপর হাতের তালুতে একমুঠো চাল নিয়ে গুনতে শুরু করল। এটাও অভ্যাস। আগে গিগ কাজ করত, ফোনে অ্যাপে ডেলিভারি দিত, প্রতিটা অর্ডারের আইটেম গুনে গুনে ব্যাগে ভরত। ম্যানেজার একবার বলেছিল, "রহিমা আপা, আপনার মতো নির্ভুল আর কেউ না। একটাও মিস হয় না।" রহিমা গর্ব করেনি। গর্ব করার মতো কিছু না এটা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা শক্ত জায়গা ছিল, একটা পাথরের মতো নিশ্চয়তা, যে সে ভুল করে না। সংখ্যায় সে ভুল করে না।
চালের দানা গুনতে গুনতে সে বায়ান্ন পেল। আবার গুনল। পঞ্চান্ন। আবার। তেপান্ন।
রহিমা চাল কৌটায় ফেলে দিল। হাত ধুল। চাল ধুয়ে হাঁড়িতে দিল। পানি দিল। চুলায় চড়াল।
চালের দানা গোনার কোনো দরকার ছিল না। কোনোদিন ছিল না। কিন্তু না পারাটা আলাদা জিনিস।
---
রহিমার বয়স পঞ্চাশ। পঞ্চাশ বছর বয়সে মানুষের কত কিছু থাকে। রহিমার কিছু নেই বলতে গেলে। স্বামী মারা গেছে বারো বছর আগে। ছেলে আছে একটা, সিলেটে থাকে, বছরে একবার ফোন করে ঈদে। মিতু আছে। মিতু ভালো মেয়ে। মিতু তাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছে, নিজের ফ্ল্যাটে রেখেছে। মিতু সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করে, ভালো মাইনে পায়। রহিমার কোনো অভাব নেই।
কিন্তু রহিমার একটা জিনিস ছিল। গোনার ক্ষমতা। সেটা তার নিজের। কেউ দেয়নি, কেউ শেখায়নি। ছোটবেলায় মাদ্রাসায় পড়ত, অঙ্ক ভালো লাগত। মাস্টার বলতেন, "রহিমা, তোর মাথায় ক্যালকুলেটর আছে।" তখন ক্যালকুলেটর কী জিনিস সেটাও জানত না ঠিকমতো। পরে জেনেছে। পরে আরও অনেক কিছু জেনেছে। জেনেছে যে ক্যালকুলেটর কিছু না, ফোনে অ্যাপ আছে, এখন আবার সেই অ্যাপেরও দরকার নেই, মুখে বললেই যন্ত্র হিসাব করে দেয়। কিন্তু রহিমার মাথায় যে হিসাবের যন্ত্র ছিল, সেটা আলাদা। সেটা তার নিজের হাতে তৈরি। বছরের পর বছর ঘষে ঘষে ধারালো করা।
সেই যন্ত্রে এখন মরচে পড়ছে।
---
বিকেলে রহিমা বারান্দায় বসল। মিতুর ফ্ল্যাটটা চারতলায়। সামনে একটা পুরোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। ফ্যাক্টরিটা বন্ধ হয়ে গেছে বছর দুয়েক আগে। যন্ত্র এখন সব কাজ করে, মানুষের দরকার পড়ে না। বিল্ডিংটা দাঁড়িয়ে আছে, জানালাগুলো বন্ধ, কোনো কোনো কাচ ভাঙা। দেয়ালে সবুজ শ্যাওলা ধরেছে নিচের দিকে।
রহিমা ফ্যাক্টরির জানালা গুনতে শুরু করল।
প্রথম তলায় বারোটা। দ্বিতীয় তলায় বারোটা। তৃতীয় তলায়... কতটা? সে আবার তৃতীয় তলা থেকে শুরু করল। এক, দুই, তিন... এগারো, বারো। ঠিক আছে, বারোটা। চতুর্থ তলা। এক, দুই... সাত, আট... কত হলো? চোখ সরে গেছে। কোন জানালায় ছিল? ভাঙা কাচওয়ালা জানালাটা কি গুনেছে? নাকি ওটা জানালা না, ওটা দেয়ালের ফাটল?
সে আবার শুরু করল। একদম নিচ থেকে।
প্রথম তলা, বারো। দ্বিতীয় তলা, বারো। চব্বিশ। তৃতীয় তলা, বারো। ছত্রিশ। চতুর্থ তলা... এক, দুই, তিন, চার... চোদ্দ, পনেরো... না, চতুর্থ তলায় বারোটার বেশি জানালা থাকতে পারে না। সে কোথায় ভুল করছে? সে কি তৃতীয় তলার শেষের দিকের জানালাগুলো আবার গুনছে? চোখ কি ওপরে উঠতে গিয়ে আগের সারিতে আটকে যাচ্ছে?
রহিমা চল্লিশ পর্যন্ত গুনতে পারল। তারপর হারিয়ে গেল। সংখ্যাটা হাত থেকে পড়ে গেল, যেভাবে ভেজা হাত থেকে সাবান পড়ে যায়।
সে আবার শুরু করল।
আবার হারিয়ে গেল। এবার আরও আগে। পঁয়ত্রিশে।
---
রহিমা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে রইল। বারান্দায় রোদ নেই, ছায়া পড়েছে। বাতাস একটু আছে, কিন্তু গরম বাতাস। মার্চ মাস, গরম পড়তে শুরু করেছে। রহিমার গায়ে পাতলা সুতির শাড়ি, নীল রঙের, সাদা পাড়। শাড়িটা পুরোনো, তিন জায়গায় সেলাই করা। রহিমা নতুন শাড়ি কেনে না। মিতু কিনে আনলে পরে, নিজে কেনে না।
বারান্দার কোণে একটা মরিচের গাছ ছিল। মিতু কবে যেন লাগিয়েছিল, টবে। গাছটা মরমর করছিল মাসখানেক আগেও। পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছিল। রহিমা রোজ পানি দিত, কিন্তু আশা ছিল না। গাছটা আজ ফল দিয়েছে। তিনটা ছোট্ট সবুজ মরিচ। কাঁচা, ছোট, আঙুলের আগার মতো। রহিমা মরিচ তিনটা দেখল। গুনল। তিনটা। ঠিক তিনটা। এটা সে ঠিক গুনতে পারল। তিন তো অল্প সংখ্যা। তিন গুনতে ভুল হয় না।
রহিমা মরিচের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আবার ফ্যাক্টরির দিকে তাকাল।
---
গিগ কাজ ছেড়ে দিয়েছে দুই বছর। হাঁটু শেষ হয়ে গেছে বলে। সিঁড়ি নামতে পারে না, রাস্তায় হাঁটতে পারে না বেশিক্ষণ। অ্যাপটাও বদলে গেছে অনেক। আগে অর্ডার আসত, নিজে গিয়ে দোকান থেকে জিনিস তুলে কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দিত। এখন সব যন্ত্র করে। ড্রোন আসে, ছোট ছোট চাকার গাড়ি আসে। মানুষের দরকার কমে গেছে। রহিমা ছাড়া আরও অনেকে বাদ পড়েছে।
বাদ পড়াটা রহিমার কাছে বড় ব্যাপার ছিল না। সে কখনো কাজটাকে নিজের জীবন মনে করেনি। কাজ তো কাজ। টাকা আসত, মিতুকে পড়িয়েছে, নিজে চলেছে। কিন্তু গোনার ক্ষমতাটা, সেটা কাজের সাথে আসেনি। সেটা তার ভেতরের জিনিস। সেটা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। যন্ত্র অনেক কিছু নিয়ে গেছে, কিন্তু রহিমার মাথার ভেতরের হিসাবটা তো যন্ত্র নেয়নি।
নেয়নি। কিন্তু বয়স নিচ্ছে।
যন্ত্রের কাছে হারেনি রহিমা। বয়সের কাছে হারছে। এটা আরও খারাপ। যন্ত্রকে অন্তত গালি দেওয়া যায়। বয়সকে কী বলবে?
---
রহিমা পার্সটা বের করল। পার্সে টাকা আছে কিছু। মিতু প্রতি সপ্তাহে দুই হাজার টাকা দেয়, বাজার আর নিজের খরচের জন্য। রহিমা খরচ করে কম, জমিয়ে রাখে। কেন জমায় জানে না। জমানোর অভ্যাস। গোনার অভ্যাসের মতোই।
সে টাকা গুনল। পাঁচশো টাকার তিনটা নোট। দুইশো টাকার দুইটা। একশো টাকার... কয়টা? সে গুনল। তিনটা। আবার গুনল। চারটা। আবার। তিনটা।
রহিমা নোটগুলো টেবিলে সারি করে রাখল। একটা একটা করে আঙুল দিয়ে ছোঁয়া দিয়ে গুনল। তিনটা। তাহলে তিনটাই ঠিক। কিন্তু মাঝখানে একবার চারটা পেয়েছিল। সে কোন নোটটা দুইবার ছুঁয়েছিল?
রহিমা টাকা পার্সে রেখে দিল। পার্সটা বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করল।
---
সন্ধ্যা হলো। আকাশটা গাঢ় কমলা থেকে ধূসর হয়ে এলো। ফ্যাক্টরি বিল্ডিংটা অন্ধকারে একটা কালো চৌকো আকার হয়ে গেল। জানালাগুলো আর আলাদা আলাদা দেখা যায় না। সব একসাথে মিশে গেছে। এখন চাইলেও গোনা যাবে না।
রহিমা তবু তাকিয়ে রইল। চেয়ার থেকে উঠল না। পেটে একটু খিদে আছে, কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করছে না। ভাত হয়ে গেছে, ঠান্ডা হচ্ছে। মাছ ভাজতে হবে। পেঁয়াজ কাটতে হবে। কিন্তু রহিমা বসে আছে।
সে মনে করার চেষ্টা করল, মিতুর ফ্ল্যাটে সিঁড়ির ধাপ কতটা। নিচ থেকে চারতলা পর্যন্ত। সে প্রতিদিন ওঠে না, লিফটে যায়, কিন্তু প্রথম যেদিন এসেছিল সেদিন গুনেছিল। কত পেয়েছিল? ষাট? বাষট্টি? চৌষট্টি? সে মনে করতে পারছে না। আগে পারত। আগে সব মনে থাকত। কোন দোকানে কতটা আইটেম দিয়েছে, কোন কাস্টমারের বিল কত ছিল, কোন রাস্তায় কতটা স্পিড ব্রেকার। সব মনে থাকত।
এখন কিছু মনে থাকে না। সংখ্যাগুলো ভেজা বালির মতো, হাতে নিলে গলে পড়ে যায়।
---
দরজা খোলার শব্দ হলো। মিতু ফিরেছে। ব্যাগ রাখার শব্দ, জুতো খোলার শব্দ। "আম্মু?"
"বারান্দায়।"
মিতু বারান্দায় এলো। তার হাতে ফোন, কানে এয়ারবাড ছিল, খুলে পকেটে রাখল। সে রহিমার পাশে দাঁড়াল। অন্ধকার বারান্দায় রহিমা বসে আছে, সামনে বন্ধ ফ্যাক্টরি, কোনো আলো নেই।
"আম্মু, অন্ধকারে বসে আছো কেন? লাইট জ্বালাওনি?"
"দরকার নেই।"
"ভাত খেয়েছো?"
"না।"
মিতু কিছু বলল না। সে বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার মা'র দিকে তাকাল। রহিমার মুখ দেখা যাচ্ছে না ভালো করে, কিন্তু চোখ দুটো ফ্যাক্টরির দিকে স্থির।
"আম্মু, কী দেখছো?"
রহিমা একটু চুপ করে থাকল। তারপর বলল, "গুনছি।"
মিতু কিছু জিজ্ঞেস করল না। কী গুনছ, কেন গুনছ, কতটা হলো, কিছু না। সে পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল। মায়ের পাশে।
রহিমা বলল, "জানালা গুনছিলাম। বিকেলে। এখন আর দেখা যায় না।"
"হুম।"
"চল্লিশ পর্যন্ত পেরেছিলাম। তারপর হারিয়ে গেল।"
মিতু কিছু বলল না। সে তার মায়ের হাতটা ধরল। রহিমার হাত শুকনো, রুক্ষ, আঙুলের গিঁটে চামড়া পুরু হয়ে গেছে বছরের পর বছর কাজ করে। মিতুর হাত নরম, অফিসের কীবোর্ড ছাড়া কিছু ছোঁয়া লাগে না ওই হাতে।
"কাল আবার গুনবে। সকালবেলা। রোদ থাকলে ভালো দেখা যায়।"
রহিমা কিছু বলল না।
দুজন বসে রইল। সামনে ফ্যাক্টরি। কোনো আলো নেই ফ্যাক্টরিতে, কোনো শব্দ নেই। এক সময় এই ফ্যাক্টরিতে রাত দশটা পর্যন্ত আলো জ্বলত, যন্ত্রের শব্দ হতো, মেয়েরা বের হতো রাতের শিফট শেষে। এখন কিছু নেই। বিল্ডিংটা শুধু দাঁড়িয়ে আছে, তার গুনতি না পারা জানালাগুলো নিয়ে।
মিতু জানে তার মা কী গুনছে। কেন গুনছে। মিতু জানে গোনাটাই তার মায়ের শেষ জিনিস ছিল যেটা শুধু তার নিজের। হাঁটু গেছে, কাজ গেছে, গ্রামের বাড়ি গেছে, স্বামী গেছে। গোনাটা ছিল। সেটাও যাচ্ছে।
মিতু কিছু বলল না। সে তার মায়ের হাত ধরে বসে রইল। সে জানে এটা আর ঠিক হবে না। সে জানে কাল সকালে তার মা আবার বাথরুমের টাইলস গুনবে। আবার তেইশ পাবে। সে জানে এটাই হবে এখন থেকে।
কিন্তু সে তার মাকে গুনতে দেবে। যতদিন চায়, যতবার চায়। ভুল হোক, ঠিক হোক। গোনাটা তো তার মায়ের। সেটা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারো নেই।
বারান্দার কোণে মরিচ গাছটায় তিনটা সবুজ মরিচ ঝুলে আছে, অন্ধকারেও সবুজ, অন্ধকারেও তিনটা।