জাহিদের ছেলেও ফিরলো
উঠানের আমগাছটা এবার এত আম দিয়েছে যে জাহিদ পাড়ার সবাইকে দিয়েও শেষ করতে পারেনি। সকালে উঠে দেখে মাটিতে পড়ে আছে। বিকেলে পাড়ার ছেলেরা এসে নিয়ে যায়। জাহিদ দিতে পারলে খুশি হয়। এটা তার স্বভাব। কোনো কারণ নেই, শুধু দিতে ভালো লাগে। গত বছর রশিদা বলেছিল, "এত আম দিয়ে দাও, নিজেদের জন্য কিছু রাখো না?" জাহিদ বলেছিল, "গাছ তো আর আমাদের কথা ভেবে আম দেয় না। যত দেয়, তত ভাগ করে দেওয়াই ভালো।" রশিদা আর কিছু বলেনি।
সেদিন বিকেলে জাহিদ উঠানে বসে ছিল। চেয়ারটা একটু নড়বড়ে, কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো খারাপ হয়নি। এরকম জিনিস জাহিদ ফেলতে পারে না। যা কিছু এখনো কাজ চালায়, সেটা রেখে দেয়। চেয়ারের একটা পা একটু ছোট, তাই বসলে একদিকে একটু কাত হয়ে যায়। জাহিদ সেই কাত হওয়াটাতে অভ্যস্ত।
ফোনটা বেজেছিল দুপুরে। ইমরানের ফোন। ছেলে বলেছে, "বাবা, আসতেছি।"
জাহিদ জিজ্ঞেস করেনি কেন আসতেছে। কবে আসবে জিজ্ঞেস করেছে। ইমরান বলেছে, "আজকে রাতের ফ্লাইট। কাল সকালে ঢাকা। দুপুরের বাসে।"
এটুকুই। ফোন রেখে জাহিদ কিছুক্ষণ বসে ছিল। তারপর রশিদাকে বলেছে, "ইমরান আসতেছে।"
রশিদা হাতের কাজ থামায়নি। চাল ধুচ্ছিল। বলেছে, "কবে?"
"কাল দুপুরে।"
রশিদা মাথা নেড়েছে। আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। জাহিদ ভেবেছিল রশিদা জিজ্ঞেস করবে কেন আসতেছে, কদিনের জন্য আসতেছে। কিন্তু রশিদা এসব জিজ্ঞেস করে না। সে জানে। জাহিদ যেভাবে জানে, রশিদাও সেভাবে জানে। কিছু কিছু জিনিস বলার আগেই বোঝা যায়।
ছয় বছর আগে ইমরান মালয়েশিয়া গিয়েছিল। জাহিদ নিজে তাকে পাঠাতে চায়নি। কিন্তু ইমরান বলেছিল, "বাবা, তুমি তো সৌদি গিয়েছিলে।" জাহিদ কিছু বলতে পারেনি। সে নিজে গিয়েছিল, সেটা সত্য। ২০২৮ সালে সৌদি থেকে ফিরে এসেছে। তখন ইমরানের বয়স বাইশ। ছেলে বাবাকে দেখেছে খালি হাতে ফিরতে। তারপরও নিজে যেতে চেয়েছে। জাহিদ এটা বুঝতে পারে। যে না গেছে, সে বোঝে না কেন মানুষ যায়। যে গেছে, সে বোঝে কেন মানুষ আবারও যায়। দেশে যা আছে, তা দিয়ে হয় না। এটা কোনো যুক্তি দিয়ে খণ্ডানো যায় না।
জাহিদ যখন সৌদি গিয়েছিল, তখন সেখানে নির্মাণের কাজ ছিল। রিয়াদে বড় বড় প্রজেক্ট। জাহিদ রড বাঁধত। ভালো কাজ জানত। ফোরম্যান তাকে পছন্দ করত। তারপর মেশিন এলো। রড বাঁধার মেশিন। জাহিদ যা করত, মেশিন তা করতে লাগলো। প্রথমে কিছু লোককে রাখলো মেশিন চালানোর জন্য। জাহিদকেও রাখলো। কিন্তু মেশিন চালানোর জন্য যত লোক লাগে, তা রড বাঁধার জন্য যত লোক লাগত তার ভগ্নাংশ। আস্তে আস্তে লোক কমলো। জাহিদও একদিন তালিকা থেকে বাদ পড়লো।
ফেরার দিন জাহিদের কাছে একটা সুটকেস ছিল। সস্তা, বাজারের সাধারণ সুটকেস। জিপারটা একবার ভেঙে গিয়েছিল, তার দিয়ে জোড়া দিয়েছিল। সেই তার এখনো আছে। সুটকেসটাও আছে।
ইমরান সেই সুটকেসটাই নিয়ে গিয়েছিল মালয়েশিয়া।
জাহিদ বলেছিল, "নতুন একটা কিনে নে।" ইমরান বলেছিল, "এটাতে কোনো সমস্যা নেই, বাবা। জিপারও ঠিক আছে।" তারের জোড়াটা ধরে টান দিয়ে দেখিয়েছিল। সত্যিই ঠিক ছিল। জাহিদ আর কিছু বলেনি।
মালয়েশিয়ায় ইমরান পাম অয়েলের বাগানে কাজ করত। ফল কাটা, বহন করা, ট্রাকে তোলা। কঠিন কাজ। রোদে পুড়ে শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল। ইমরান কখনো অভিযোগ করেনি। প্রতি মাসে টাকা পাঠাত। বেশি না, কিন্তু নিয়মিত। রশিদা সেই টাকায় সংসার চালাত। জাহিদ বাড়িতে যা পারত করত, কিন্তু তার আয় সামান্য। পাড়ায় এটাসেটা কাজ করে যা পায়, তা দিয়ে চায়ের খরচ ওঠে।
ইমরান মাঝে মাঝে ভিডিও কল করত। বাগানের ছবি দেখাত। সারি সারি পাম গাছ। শেষ দেখা যায় না। ইমরান একবার বলেছিল, "বাবা, এখানে গাছ ছাড়া কিছু নেই।" জাহিদ হেসেছিল। সৌদিতে বালু ছাড়া কিছু ছিল না। এখানে গাছ ছাড়া কিছু নেই। দুটোই এক। যেখানে বাংলাদেশি শ্রমিক যায়, সেখানে একটা জিনিস বেশি থাকে আর বাকি সব কম থাকে।
গত বছর থেকে ইমরানের ফোন একটু বদলে গিয়েছিল। আগে সে বলত, "ভালো আছি, বাবা।" গত বছর থেকে বলত, "আছি, বাবা।" "ভালো" শব্দটা চলে গিয়েছিল। জাহিদ লক্ষ করেছিল। কিছু বলেনি।
তিন মাস আগে ইমরান একদিন বলেছিল, "বাবা, বাগানে মেশিন আসছে।" জাহিদের বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠেছিল। সে চুপ করে শুনেছিল। ইমরান বলেছিল, "ফল কাটার মেশিন। একটা মেশিন দশজনের কাজ করে। চালায় দুইজন। বাকি আটজন...।" কথা শেষ করেনি। জাহিদও শেষ করেনি। দুজনেই জানে আটজনের কী হয়।
জাহিদ সেই রাতে ঘুমাতে পারেনি। রশিদা ঘুমিয়ে ছিল পাশে। জাহিদ ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। টিনের ছাদ। বৃষ্টি হলে শব্দ হয়। সেই রাতে বৃষ্টি ছিল না, কিন্তু জাহিদের মনে হচ্ছিল শব্দ হচ্ছে।
দশ বছর আগে জাহিদ যখন সৌদি থেকে ফিরেছিল, সে বাসা থেকে নেমে হেঁটে এসেছিল। রাস্তাটা মনে আছে। পাকা রাস্তা থেকে মাটির রাস্তায় ঢুকলে বাঁদিকে তাদের বাড়ি। সেদিন সুটকেসটা হালকা ছিল। যাওয়ার সময়ও হালকা ছিল, ফেরার সময়ও হালকা। মাঝখানে কিছু জমেনি। জাহিদ ধীরে ধীরে হেঁটেছিল। তাড়াহুড়ো ছিল না। যে খালি হাতে ফেরে, তার তাড়া কিসের?
এখন বিকেলে জাহিদ উঠানে বসে আছে। চেয়ারটা একটু কাত। আমগাছের ছায়া পড়েছে উঠানে। দূরে কোথাও আজান হচ্ছে। জাহিদ রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
রশিদা ঘরে আছে। কিছু একটা রান্না করছে। জাহিদ জিজ্ঞেস করেনি কী রান্না করছে। রশিদা নিজে থেকে বলেওনি।
বাসটা সাড়ে তিনটায় আসার কথা। এখন তিনটা বিশ। জাহিদ ঘড়ি দেখে না। সে জানে বাস কখন আসে। এত বছর এখানে থাকলে ঘড়ি ছাড়াই সময় বোঝা যায়। রোদের কোণ দেখে বোঝা যায়। ছায়ার দৈর্ঘ্য দেখে বোঝা যায়।
পাড়ার রাস্তায় একটা রিকশা এসে থামলো। জাহিদ উঠে দাঁড়ালো না। বসে রইল। রিকশা থেকে একজন নামলো। লম্বা, রোদে পোড়া, একটু ক্লান্ত। হাতে সেই সুটকেস। জাহিদ সুটকেসটা আগে দেখলো। তারপর ছেলেকে দেখলো।
ইমরান হাঁটছে। ধীরে ধীরে। তাড়াহুড়ো নেই। সুটকেসটা হালকা, কিন্তু ইমরানের হাঁটা ভারী। জাহিদ সেই হাঁটা চেনে। এটা তার নিজের হাঁটা। দশ বছর আগে সে এই রাস্তা দিয়ে এভাবেই হেঁটে এসেছিল। একই গতি। একই কাঁধের ভঙ্গি। একটু ঝুঁকে, কিন্তু ভাঙা না। যে হেরে ফিরেছে কিন্তু শেষ হয়নি, তার হাঁটা এরকম হয়।
ইমরান উঠানে ঢুকলো। সুটকেস নামিয়ে রাখলো। জাহিদ দেখলো তারের জোড়াটা এখনো আছে। ছয় বছর ধরে সেই তার জিপারটাকে ধরে রেখেছে।
"বাবা।"
"আয়।"
ইমরান কাছে এলো। জাহিদ ছেলের মুখের দিকে তাকালো। চোখের নিচে কালি। গাল একটু বসে গেছে। কিন্তু চোখে লজ্জা আছে। জাহিদ সেই লজ্জা চেনে। এটা ব্যর্থতার লজ্জা না। এটা খালি হাতে ফেরার লজ্জা। যে পরিবারের জন্য গিয়েছিল, তাদের সামনে খালি হাতে দাঁড়ানোর লজ্জা।
জাহিদ বললো, "বস।"
ইমরান পাশের চেয়ারে বসলো। দুজন পাশাপাশি বসে আছে। উঠানে আমগাছের ছায়া। কিছুক্ষণ কেউ কথা বললো না।
তারপর ইমরান বললো, "বাবা, ওখানেও মেশিন।"
জাহিদ মাথা নাড়লো। সে জানত। তিন মাস আগে থেকে জানত। হয়তো তার আগে থেকেও জানত। হয়তো ইমরান যেদিন মালয়েশিয়া গিয়েছিল, সেদিন থেকেই জানত। মেশিন আসবে। মেশিন সব জায়গায় আসবে। যেখানে বাংলাদেশি শ্রমিক যায়, সেখানে মেশিন যাবে। কারণ বাংলাদেশি শ্রমিক যেখানে যায়, সেখানে সস্তা শ্রমের কাজ থাকে। আর সস্তা শ্রমের কাজ মেশিন সবার আগে নেয়।
জাহিদ বললো, "জানি।"
দুটো শব্দ। এর বেশি বলার কিছু নেই। ইমরান বুঝলো বাবা জানে। শুধু জানে না, বোঝে। নিজের শরীরে বুঝেছে।
রশিদা বাইরে এলো। হাতে তিনটা কাপ। চা। একটা ট্রেতে তিনটা কাপ। জাহিদ দেখলো, তিনটা কাপ। আগে দুটো থাকত। এখন তিনটা। রশিদা কিছু বললো না। চা রেখে ভেতরে চলে গেলো।
ইমরান চায়ে চুমুক দিলো। জাহিদও দিলো। দুজন চুপচাপ চা খাচ্ছে।
জাহিদ ভাবছে। দশ বছর আগে সে যখন ফিরেছিল, রশিদা তখনও চা দিয়েছিল। দুটো কাপ। জাহিদ আর রশিদা। ইমরান তখন বাইরে ছিল, কোথায় যেন গিয়েছিল। সেদিনও রশিদা কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কেন ফিরেছো, কী হয়েছে, এখন কী হবে। কিছু না। শুধু চা দিয়েছিল। রশিদা জানে কিছু কিছু সময় কথা বলার দরকার নেই। চা দেওয়াই যথেষ্ট।
ইমরান বললো, "বাবা, সুটকেসটা ফেরত দিলাম।"
জাহিদ একটু হাসলো। হাসিটা মুখে ধরে রাখলো না, চলে গেলো। বললো, "তারটা এখনো আছে দেখি।"
"আছে। তার টেকসই জিনিস।"
জাহিদ কিছু বললো না। সে ভাবলো, তার টেকসই, মানুষও টেকসই। কিন্তু মেশিনের সামনে টেকসই হওয়ার কোনো মানে নেই। মেশিন ক্লান্ত হয় না, অসুস্থ হয় না, ছুটি চায় না, বেতন বাড়াতে বলে না। মানুষ এসব করে। তাই মানুষ হারে।
সন্ধ্যা হচ্ছে। আমগাছের ছায়া লম্বা হয়ে উঠানের ওপাশে চলে গেছে। আজানের শব্দ আবার ভেসে আসছে। মাগরিবের আজান।
জাহিদ উঠলো। ইমরানও উঠলো।
জাহিদ বললো, "ভেতরে চল।"
ইমরান সুটকেসটা তুললো। জাহিদ দেখলো ছেলে সুটকেসটা যেভাবে ধরেছে, সেভাবেই সে ধরত। ডান হাতে, একটু কাত করে, যাতে পা-তে না লাগে। এটা কেউ শেখায়নি। এটা শরীরে আছে।
ঘরে ঢুকে ইমরান সুটকেসটা কোণায় রাখলো। সেই কোণে। জাহিদ যেখানে রেখেছিল দশ বছর আগে, ঠিক সেখানে। ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ। দেয়ালে একটা পেরেক আছে, তার নিচে।
রশিদা ভাত বাড়ছে। তিনটা প্লেট। জাহিদ দেখলো তিনটা প্লেটে সমান ভাত। রশিদা কাউকে বেশি দেয়নি, কাউকে কম দেয়নি। এটাও রশিদার স্বভাব। সে সবকিছু সমান করে।
খাওয়ার সময় কেউ কথা বললো না। তিনজন চুপচাপ খেলো। জাহিদ মাঝে মাঝে ইমরানের দিকে তাকালো। ছেলে ভাত খাচ্ছে। ছয় বছর পর মায়ের রান্না খাচ্ছে। ইমরানের চোখ একটু ভেজা, কিন্তু সে কাঁদছে না। চোখ ভেজা আর কান্না এক জিনিস না।
রাতে ইমরান তার পুরোনো ঘরে শুয়েছে। জাহিদ আর রশিদা তাদের ঘরে। জাহিদ শুয়ে আছে, ঘুম আসছে না।
রশিদা বললো, "ঘুমাও।"
জাহিদ বললো, "ঘুম আসছে না।"
রশিদা বললো, "আসবে।"
জাহিদ ভাবলো, রশিদা ঠিকই বলে। ঘুম আসবে। সব আসবে। ইমরান কিছু একটা করবে। এখানে, এই দেশে। কী করবে জানা নেই। কিন্তু করবে। জাহিদও করেছিল। ফিরে এসে কিছু একটা করেছিল। বড় কিছু না, কিন্তু করেছিল। মানুষ করে। মেশিন যতই আসুক, মানুষ কিছু একটা করে।
কিন্তু জাহিদ এটাও জানে, পাশের ঘরে তার ছেলে শুয়ে আছে, এবং তার ছেলের ছেলেও একদিন কোথাও যাবে। এবং সেখানেও মেশিন আসবে। এবং সেও ফিরবে। এবং সেই সুটকেসটা হয়তো তখনও থাকবে। তারের জোড়া ধরে।
রশিদা ওই প্যাটার্নটা নিয়ে কিছু বললো না। সে কখনো বলে না। সে শুধু কাপের সংখ্যা বাড়ায়।
বাইরে আমগাছটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। পাতায় বাতাস লাগছে। একটা পাকা আম মাটিতে পড়লো। নরম শব্দ হলো। কেউ শুনলো না।