ঢাকার চেহারা বদলে গেলো

পর্ব ৭৭ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

ঢাকা শহর ঘুমায় না। এটা সবাই জানে। কিন্তু ২০৩৮ সালের ঢাকা আর আগের ঢাকা এক নয়। পার্থক্যটা চোখে পড়ে, কিন্তু ঠিক কোথায় পড়ে সেটা বলা কঠিন। যেমন কারো চেহারা বদলে যায়, কিন্তু নাক-চোখ-মুখ একই থাকে, তবু মানুষটাকে চেনা যায় না।

ফার্মগেট সিগন্যালের কথাই ধরা যাক।

এক সময় এই মোড়ে দাঁড়ালে মনে হতো জীবন থেমে গেছে। গাড়ি দাঁড়িয়ে, বাস দাঁড়িয়ে, রিকশা দাঁড়িয়ে, মানুষ দাঁড়িয়ে। ট্রাফিক পুলিশ বাঁশি বাজাচ্ছে, কেউ শুনছে না। ড্রাইভাররা একে অপরকে গালি দিচ্ছে। পানের পিক ফেলছে রাস্তায়। সব মিলিয়ে এক ধরনের উৎসব, যেটাকে কেউ উৎসব বলবে না, কিন্তু সেটাই ছিল।

এখন ফার্মগেটে এআই ট্রাফিক লাইট বসেছে। সিগন্যাল নিজে থেকে বদলায়। কোন দিক থেকে কতগুলো গাড়ি আসছে, কোন দিকে যানজট বেশি, সব হিসাব করে নিজেই সময় ঠিক করে দেয়। ট্রাফিক পুলিশ এখনো আছে, কিন্তু তাদের কাজ কমে গেছে। বেশিরভাগ সময় তারা দাঁড়িয়ে থাকে, ফোন দেখে। একজন পুলিশ বলেছিল, "আগে আমার দরকার ছিল। এখন আমি দাঁড়িয়ে থাকি, লাইট দাঁড়িয়ে থাকে। লাইট কাজ করে, আমি দাঁড়িয়ে থাকি।"

ট্রাফিক কমেছে, এটা সত্যি। রাস্তায় গাড়ি আগের চেয়ে দ্রুত চলে। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস হয়েছে, রিকশাওয়ালারা তাদের পুরনো রুট হারিয়ে ফেলেছে। এআই সিস্টেম কিছু রাস্তা রিকশামুক্ত ঘোষণা করেছে। সেই রাস্তায় রিকশা ঢুকলে সেন্সর বেজে ওঠে। জরিমানা হয়। রিকশাওয়ালাদের কেউ কেউ অন্য রুট খুঁজে নিয়েছে, কেউ কেউ রিকশা ছেড়ে দিয়েছে।

মিরপুর থেকে আসা করিম মিয়া পঁচিশ বছর ধরে রিকশা চালাতো। ধানমন্ডি থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট থেকে শাহবাগ, শাহবাগ থেকে মতিঝিল। চোখ বন্ধ করে পথ চিনতো। এখন তার তিনটা রুটের দুটো বন্ধ। সে বলে, "রাস্তা তো আছে। আমি নাই। রাস্তা আমারে চিনতো, এখন চেনে না।"

করিম মিয়া এখন গুলশানে একটা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের গেটে বসে থাকে। মাঝে মাঝে কেউ ডাকে, ছোটখাটো জিনিস আনতে বলে। বেশিরভাগ সময় বসে থাকে।

---

মহাখালীর টোলপ্লাজায় আগে বারোজন মানুষ কাজ করতো। তিন শিফটে। এখন একটা অটোমেটেড গেট, গাড়ির নম্বর প্লেট পড়ে নিজেই টোল কেটে নেয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে, না হলে মোবাইল ব্যাংকিং থেকে। বারোজনের জায়গায় একজন সুপারভাইজার বসে থাকে, সিস্টেমে কোনো সমস্যা হলে দেখে। বেশিরভাগ দিন কোনো সমস্যা হয় না।

সেই বারোজনের একজন, সাত্তার, এখন একটা কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করে। সে বলে, "টোলপ্লাজায় আমি মানুষের সাথে কথা বলতাম। ড্রাইভাররা চিনতো। কেউ কেউ চা খাওয়াতো। এখন আমি সারাদিন প্যাকেট বহন করি। কেউ আমার দিকে তাকায় না।" একটু চুপ করে থেকে বলে, "প্যাকেটও তাকায় না।"

---

গুলশানের রাস্তায় এখন ড্রোন উড়ে। আবর্জনা সংগ্রহের ড্রোন। ছোট ছোট, সাদা রঙের, ভোর চারটায় বের হয়। ডাস্টবিন থেকে আবর্জনা তুলে নিয়ে যায়। রাস্তা পরিষ্কার থাকে। গুলশানের বাসিন্দারা খুশি। তারা বলে, "এটাই তো চাই। পরিষ্কার রাস্তা, দুর্গন্ধ নেই।"

পুরান ঢাকায় ড্রোন নেই। সেখানে আগের মতোই মানুষ আবর্জনা তোলে। ভোরবেলা, খালি পায়ে, মাথায় ঝুড়ি। লালবাগ, চকবাজার, সদরঘাট, সব জায়গায় একই দৃশ্য। কেউ জিজ্ঞেস করলে সিটি কর্পোরেশন বলে, "পুরান ঢাকার গলিগুলো সরু, ড্রোন চলতে পারে না।" কথাটা সত্যি হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। কেউ যাচাই করে দেখেনি।

পুরান ঢাকার আবর্জনা সংগ্রহকারী রহিমা বিবি বলে, "ড্রোন কী জিনিস জানি না। আমার কাজ আমি করি। কাজ না থাকলে খাবো কী?"

---

মতিঝিলে আব্দুল হামিদের চায়ের দোকান। তিরিশ বছরের পুরনো। একটা টিনের চালা, দুটো বেঞ্চ, একটা স্টোভ। এই দোকান থেকে আব্দুল হামিদ তার তিন ছেলেমেয়েকে বড় করেছে। বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছেলে একটা গার্মেন্টসে কাজ করে। ছোট মেয়ে স্কুলে।

আগে সকাল আটটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত দোকানে ভিড় লেগে থাকতো। অফিসের লোকজন আসতো, চা খেতো, সিগারেট টানতো, পত্রিকা পড়তো, গল্প করতো। মতিঝিল মানেই অফিসপাড়া, আর অফিসপাড়া মানেই চায়ের দোকান।

এখন ভিড় কমে গেছে। অনেক অফিস রিমোট হয়ে গেছে। যারা অফিসে আসে, তাদের অনেকের কাজ অটোমেটেড হয়ে গেছে, তাই লোকসংখ্যা কম। যারা আসে, তারা তাড়াহুড়োয় থাকে। চায়ের কাপ হাতে বসে গল্প করার সময় নেই।

কিন্তু নতুন একটা দল এসেছে। ডেলিভারি রাইডাররা। সারাদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়ায়, মাঝে মাঝে থামে চা খেতে। তারা বেশি কথা বলে না। ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। অ্যাপ থেকে নতুন অর্ডার আসছে কি না দেখে। চা শেষ হলে উঠে যায়।

আব্দুল হামিদ বলে, "আগের খদ্দেররা নাম ধরে ডাকতো। হামিদ ভাই, এক কাপ দাও। এখনকার খদ্দেররা বলে, চা কত? টাকা দিয়ে চলে যায়।" সে একটু থামে। "চা তো একই আছে। পানি একই, চিনি একই, দুধ একই। কিন্তু কী যেন বদলে গেছে।"

আব্দুল হামিদের চায়ের দোকানের পাশে একটা পুরনো পানের দোকান ছিল। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে গত বছর। এখন সেখানে একটা মোবাইল রিচার্জের দোকান, সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। মোবাইল রিচার্জ এখন সব অনলাইনে হয়। খালি দোকানের শাটারে কেউ চক দিয়ে লিখেছে, "ভাড়া হবে।" লেখাটা ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টিতে, কেউ নতুন করে লেখেনি।

---

নীলক্ষেতের কথা আলাদা করে বলতে হয়।

নীলক্ষেত মানেই বই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে, সেই যে বইয়ের দোকানের সারি, পুরনো বই, নতুন বই, ফটোকপি, নোট, সব পাওয়া যায়। এক সময় কবিতার বই বিক্রি হতো বেশি। উপন্যাস বিক্রি হতো। ছাত্ররা এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই উল্টাতো, পড়তো, কিনতো, না কিনলেও দোকানদার কিছু বলতো না।

এখন নীলক্ষেতের দোকানগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এআই টেক্সটবুক। মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা সায়েন্স। ইংরেজি বই, বাংলায় অনুবাদ, নোট, গাইড। তাকে তাকে সাজানো।

কবিতার বই এখনো আছে। এক কোণায়। ধুলো জমে আছে।

আজিজ নামে একজন দোকানদার আছে, বছর পঁয়তাল্লিশের মতো হবে। সে বলে, "আগে একটা ছেলে এসে জীবনানন্দ দাশের বই খুঁজতো, আমি খুশি হতাম। এখন কেউ এসে পাইথন প্রোগ্রামিংয়ের বই খোঁজে। আমি সেটাও দিই। ব্যবসা তো ব্যবসা।" কিন্তু তার চোখে একটা কিছু আছে, যেটা সে বলে না।

আজিজের দোকানের একটা তাকে এখনো কিছু কবিতার বই রাখা আছে। সেগুলো সে বিক্রি করে না। কেউ চাইলে দেয়। দাম নেয় না। বলে, "এগুলো বিক্রির জিনিস না।"

---

রমনা পার্কে একটা বটগাছ আছে। কত পুরনো কেউ জানে না। কেউ বলে একশো বছর, কেউ বলে দেড়শো। ঢাকার যত মাস্টার প্ল্যান হয়েছে, যত সড়ক পরিকল্পনা হয়েছে, যত উন্নয়ন প্রকল্প এসেছে, এই গাছটা টিকে আছে। কেউ কাটেনি। কেটে ফেলার কথাও ওঠেনি কখনো। গাছটার ডালপালা চারদিকে ছড়ানো, ছায়া পড়ে অনেকখানি জায়গায়। বিকেলে মানুষ এসে বসে। বৃদ্ধরা আসে, বাচ্চারা আসে, প্রেমিক-প্রেমিকারা আসে। গাছটার কোনো কিছু নিয়ে কোনো মতামত নেই। এআই কী জিনিস, গাছটা জানে না। জানার দরকারও নেই। সে শুধু দাঁড়িয়ে আছে, যেমন দাঁড়িয়ে ছিল, তেমন দাঁড়িয়ে থাকবে।

---

সদরঘাটের কথা বলা বাকি।

সদরঘাট মানেই লঞ্চ। বুড়িগঙ্গার ঘাট। মানুষের ভিড়। কুলি, যাত্রী, হকার, ভিখারি, সব মিলিয়ে একটা জগৎ। এই জগৎটা খুব বেশি বদলায়নি। লঞ্চ এখনো ছাড়ে, মানুষ এখনো ওঠে, কুলি এখনো মাথায় বোঝা নিয়ে হাঁটে। এখানে এআই এখনো আসেনি, বা এলেও চোখে পড়ে না।

কিন্তু সদরঘাটের একটা দেয়ালে কেউ লিখেছে। লাল রঙে, বড় বড় অক্ষরে:

"মানুষ কোথায়?"

কে লিখেছে কেউ জানে না। কবে লিখেছে কেউ জানে না। লেখাটা বেশ কয়েক মাস ধরে আছে। সিটি কর্পোরেশনের লোকজন সেই দেয়ালের পাশ দিয়ে যায়। পুলিশ যায়। সাধারণ মানুষ যায়। কেউ মুছে দেয়নি। কেউ মোছার কথাও বলেনি।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো, লেখাটা কিন্তু কোনো প্রতিবাদ না। কোনো স্লোগান না। কোনো দলের নাম নেই, কোনো দাবি নেই। শুধু একটা প্রশ্ন। মানুষ কোথায়?

প্রশ্নটার উত্তর কেউ দেয়নি।

---

ঢাকা শহর দ্রুত হয়েছে, এটা সত্যি। কিছু জায়গায় পরিষ্কার হয়েছে, এটাও সত্যি। যানজট কমেছে, টোল সংগ্রহ দ্রুত হয়েছে, আবর্জনা ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়েছে, অন্তত গুলশানে। এগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিন্তু শহরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। রাস্তায় মানুষ আছে, গাড়ি আছে, কিন্তু আগে যে একটা গুঞ্জন ছিল, সেটা কমে গেছে। চায়ের দোকানে আড্ডা কমেছে। বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে বই পড়ার মানুষ কমেছে। রিকশায় বসে ধীরে ধীরে শহর দেখার মানুষ কমেছে। সবাই তাড়াহুড়োয় আছে, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে অনেকে বলতে পারে না।

আব্দুল হামিদের কথা মনে আছে? চায়ের দোকানের আব্দুল হামিদ? সে একটা কথা বলেছিল, যেটা মনে থাকে। বলেছিল, "শহর ভালো হইছে শুনি। কিন্তু আমার কাস্টমারে আমার নাম জানে না। আমিও তাদের চিনি না। এইটা ভালো না খারাপ আমি জানি না। কিন্তু আগে যেমন ছিল, তেমন নাই।"

রাত হলে মতিঝিলের অফিস বিল্ডিংগুলোতে বাতি জ্বলে। আগেও জ্বলতো। কিন্তু আগে জানালা দিয়ে মানুষের ছায়া দেখা যেতো, কেউ কাজ করছে, কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন বাতি জ্বলে, কিন্তু ছায়া কম। সার্ভার রুমের বাতি সারারাত জ্বলে। সার্ভারের কোনো ছায়া হয় না।

সদরঘাটের সেই দেয়ালে লেখাটা এখনো আছে। লাল রঙ একটু ফিকে হয়েছে, কিন্তু পড়া যায়। বৃষ্টি হলে রঙ একটু ধুয়ে যায়, রোদ হলে শুকিয়ে যায়। লেখাটা থাকে।

মানুষ কোথায়?