চাকরি নেই, জিডিপি বাড়ছে

পর্ব ৭৮ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

--- title: "চাকরি নেই, জিডিপি বাড়ছে" series: "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ" part: 78 date: "2026-03-18" ---

রহিমার ফোনে নোটিফিকেশন আসলো সকাল সাতটায়। নতুন রাইড রিকোয়েস্ট। মিরপুর থেকে ফার্মগেট। ভাড়া আটাশ টাকা।

আটাশ টাকা।

রহিমা স্কুটিতে বসে হিসাব করলো। পেট্রোল লাগবে বারো টাকার মতো। প্ল্যাটফর্মের কমিশন ছয় টাকা। বাকি থাকে দশ টাকা। মিরপুর থেকে ফার্মগেট, ট্রাফিক ধরে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। দশ টাকার জন্য পঁয়তাল্লিশ মিনিট।

সে রাইডটা নিলো। না নিলে আরেকজন নেবে। রহিমা জানে এই শহরে এখন রাইডার বেশি, যাত্রী কম। তিন বছর আগে যখন সে শুরু করেছিলো তখন দিনে বিশটা রাইড পেতো। এখন আটটা পেলে ভালো। প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম ঠিক করে কে রাইড পাবে, কে পাবে না। রহিমার রেটিং ৪.৬। আগে ৪.৮ ছিলো। একদিন রাস্তায় জ্যাম লেগে দেরি হয়েছিলো, যাত্রী এক স্টার দিয়েছিলো। সেই থেকে রেটিং কমেছে। রেটিং কমলে রাইড কমে। রাইড কমলে আয় কমে। আয় কমলে রেটিং আরো কমে, কারণ তখন দূরের রাইড নেওয়ার সামর্থ্য থাকে না, কাছের ছোট রাইড নিতে হয়, ছোট রাইডে যাত্রী বেশি খুশি থাকে না।

রহিমা এই চক্র বোঝে। কিন্তু চক্র থেকে বের হওয়ার রাস্তা জানে না।

ফার্মগেটে যাত্রী নামিয়ে সে রাস্তার ধারে দাঁড়ালো। পরের রাইডের জন্য অপেক্ষা। ফোনের স্ক্রিনে একটা খবর ভেসে উঠলো। "বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এ বছর সাত শতাংশ।" রহিমা খবরটা পড়লো না। সে পরের রাইড খুঁজছে।

---

করিম রাতের প্রহরী।

গুলশানের একটা গুদামে তার ডিউটি। গুদামে আগে পঞ্চাশজন শ্রমিক কাজ করতো, প্যাকেজিং আর সর্টিংয়ে। এখন আটজন আছে। বাকি বিয়াল্লিশ জনের কাজ মেশিন করে। রোবটিক আর্ম। কনভেয়র বেল্ট। সেন্সর। ক্যামেরা। সব অটোমেটিক।

করিমের কাজ রাতে এই মেশিনগুলো পাহারা দেওয়া।

সে বোঝে না মেশিনগুলো কী করে। জানার দরকারও নেই। তার কাজ হলো রাত দশটা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত গুদামের ভেতরে হাঁটা, দরজা চেক করা, আর যদি কিছু অস্বাভাবিক দেখে তাহলে ম্যানেজারকে ফোন করা। এই তিন বছরে কিছু অস্বাভাবিক হয়নি। একবার একটা ইঁদুর ঢুকেছিলো। সেটাই সবচেয়ে বড় ঘটনা।

করিমের বেতন বারো হাজার টাকা। তিন বছর আগেও বারো হাজার ছিলো। মালিক বলেছে বাড়ানোর সুযোগ নেই। করিম বলেনি যে চালের দাম তিন বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। বলে লাভ নেই। রাতের প্রহরী অনেক আছে। করিম চলে গেলে আরেকজন আসবে। হয়তো দশ হাজারেই রাজি হবে।

রাতে গুদামের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে করিম মেশিনগুলোর দিকে তাকায়। অন্ধকারে মেশিনগুলো ঘুমিয়ে আছে। সকালে এগুলো জেগে উঠবে। কাজ করবে। ক্লান্ত হবে না। অসুস্থ হবে না। বেতন চাইবে না। ছুটি চাইবে না।

করিম ভাবে, এই মেশিনগুলোরও কি একজন প্রহরী দরকার? নাকি একদিন ক্যামেরা আর সেন্সরই প্রহরীর কাজটাও করে ফেলবে?

সে এই প্রশ্নটা কাউকে করে না। কারণ উত্তর সে জানে।

---

তানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। চার বছর হলো এই পদে আছে।

বিভাগে গত দুই বছরে কোনো নতুন নিয়োগ হয়নি। তিনজন শিক্ষক অবসরে গেছেন। তাঁদের পদগুলো শূন্য পড়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছে, বাজেট সংকট। নিয়োগ স্থগিত।

কিন্তু ছাত্র কমেনি। বরং বেড়েছে। প্রতি সেকশনে এখন একশো বিশ জন ছাত্র। তানিয়া একাই তিনটা কোর্স পড়ায়। খাতা দেখে। থিসিস সুপারভাইজ করে। কমিটিতে বসে। আর গবেষণা? সেটার জন্য সময় কোথায়?

তানিয়ার এক বন্ধু অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেছে গত বছর। আরেকজন সিঙ্গাপুরে। তারা বলে, "তুইও আয়।" তানিয়া ভাবে। কিন্তু যায় না। যাওয়ার কথা ভাবলে তার মনে হয় এই একশো বিশ জন ছাত্রের কথা। এদের কে পড়াবে? এদের মধ্যে কেউ কেউ সত্যিই ভালো। তাদের ছেড়ে যেতে পারে না।

তানিয়া জানে বিশ্ববিদ্যালয়ে AI নিয়ে একটা কোর্স খোলা দরকার। অটোমেশন, শ্রমবাজার, ডেটা ইকোনমিক্স। কিন্তু নতুন কোর্স খুলতে গেলে সিলেবাস কমিটি, একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট। দুই বছর লাগে। তত দিনে AI আরো দুই প্রজন্ম এগিয়ে যাবে।

গতকাল একটা ছাত্র এসেছিলো তানিয়ার অফিসে। থিসিসের বিষয় ঠিক করতে চায়। ছেলেটা বললো, "ম্যাম, আমি অটোমেশন আর কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করতে চাই।" তানিয়া বললো, "ভালো টপিক। তবে ডেটা পাবে না। বাংলাদেশে এই বিষয়ে ভালো ডেটা নেই।" ছেলেটা বললো, "তাহলে কী নিয়ে লিখবো?" তানিয়া চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো, "যেটা নিয়ে ডেটা আছে।"

এই উত্তরটা দিতে গিয়ে তানিয়ার খারাপ লেগেছিলো। কিন্তু সে জানে বাস্তব। থিসিস জমা দিতে হবে সময়মতো। ডেটা ছাড়া গবেষণা হয় না। আর যে প্রশ্নগুলোর উত্তর সবচেয়ে বেশি দরকার, সেগুলোর ডেটাই সবচেয়ে কম।

তানিয়া অফিসে বসে একটা রিসার্চ পেপার পড়ছে। "Jobless Growth in South Asia: The Automation Paradox." পেপারটা পড়তে পড়তে সে ভাবছে, এই পেপারে যা লেখা আছে সেটা তো তার চারপাশেই ঘটছে। জিডিপি বাড়ছে। চাকরি বাড়ছে না। এটা কোনো থিওরি না। এটা রহিমার জীবন। করিমের জীবন। তার নিজের বিভাগের শূন্য পদগুলো।

---

জাহিদের চায়ের দোকান ছিলো মিরপুরের একটা বাজারে। ছোট দোকান। দুটো বেঞ্চ, একটা চুলা, একটা কেটলি। পনেরো বছর ধরে এই দোকান চালাতো জাহিদ।

বাজারটা মরে গেছে।

এটা হঠাৎ হয়নি। আস্তে আস্তে হয়েছে। প্রথমে কাপড়ের দোকানগুলো বন্ধ হলো। অনলাইনে কাপড় কেনে এখন সবাই। তারপর ইলেকট্রনিক্সের দোকান। তারপর মুদি দোকান, কারণ কুইক কমার্সের অ্যাপে অর্ডার দিলে দশ মিনিটে বাসায় চলে আসে। মানুষ বাজারে আসা কমিয়ে দিলো। মানুষ কমলে চায়ের দোকানে খদ্দের কমে। খদ্দের কমলে ভাড়া দেওয়া যায় না। ভাড়া দিতে না পারলে দোকান বন্ধ।

জাহিদ এখন রিকশা চালায়। বয়স বিয়াল্লিশ। পিঠে ব্যথা আছে। হাঁটুতে সমস্যা। কিন্তু রিকশা চালানো ছাড়া আর কী করবে? তার শিক্ষা ক্লাস সেভেন পর্যন্ত। কম্পিউটার চালাতে পারে না। স্মার্টফোন আছে, কিন্তু ফেসবুক আর ইউটিউব ছাড়া আর কিছু করে না সেটা দিয়ে।

জাহিদের স্ত্রী বলে, "অন্য কিছু করো।" জাহিদ বলে, "কী করবো?" স্ত্রী বলে, "ট্রেনিং নাও।" কিসের ট্রেনিং? কম্পিউটার? জাহিদের বয়স বিয়াল্লিশ। সে সারাজীবন চা বানিয়েছে। তার হাত চায়ের কেটলি চেনে, কিবোর্ড না।

একবার সরকারি একটা ট্রেনিং সেন্টারে গিয়েছিলো। "ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি।" সেখানে একজন তরুণ ট্রেইনার মাইক্রোসফট এক্সেল শেখাচ্ছিলো। জাহিদ দুই ঘণ্টা বসে ছিলো। কিছু বোঝেনি। পাশের চেয়ারে বসা ছেলেটার বয়স বিশ। সে মিনিটে মিনিটে কিছু একটা করে ফেলছে। জাহিদ চুপচাপ উঠে চলে এসেছিলো।

জাহিদ মাঝে মাঝে পুরনো বাজারের সামনে দিয়ে যায়। দোকানগুলোর শাটার বন্ধ। কয়েকটায় ভাড়া দেওয়ার সাইনবোর্ড ঝুলছে। তার নিজের দোকানের জায়গায় এখন একটা ডেলিভারি হাব হয়েছে। কুইক কমার্স কোম্পানির। সারারাত মোটরসাইকেল আসে, প্যাকেট নেয়, চলে যায়।

জাহিদ সেই ডেলিভারি হাবের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভেতরে তাকায়। সে দেখে তরুণ ছেলেরা প্যাকেট গোছাচ্ছে। দ্রুত। যান্ত্রিকভাবে। কারো সাথে কারো কথা নেই।

জাহিদের দোকানে মানুষ কথা বলতো। চা খেতে খেতে রাজনীতি, ক্রিকেট, সংসার। পনেরো বছরে সে এই বাজারের সব মানুষকে চিনতো। কে কখন চা খায়, কে চিনি কম খায়, কে রং চা পছন্দ করে। এগুলো কোনো কাজের জ্ঞান না। কিন্তু এগুলোই ছিলো জাহিদের দুনিয়া।

সেই দুনিয়াটা আর নেই।

---

মিতু সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বনানীর একটা টেক কোম্পানিতে কাজ করে। বেতন ভালো। প্রতি বছর বাড়ে। অফিসে ফ্রি লাঞ্চ, জিম, গেমিং রুম। মিতু জানে সে ভাগ্যবান। এই শহরে, এই সময়ে, তার মতো অবস্থানে খুব কম মানুষ আছে।

দুপুরে অফিস থেকে বের হয়ে মিতু রাস্তার ধারে পরাটা কিনলো। এই কোণায় একজন বুড়ো লোক তিরিশ বছর ধরে পরাটা ভাজে। মিতু যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়তো তখনও এখান থেকে পরাটা কিনতো। লোকটার নাম আজিজ। তার পরাটা বদলায়নি। একই তেল, একই মাপ, একই ভাঁজ। চারপাশের সব কিছু বদলে গেছে। রাস্তা চওড়া হয়েছে। পাশের বিল্ডিং ভেঙে টাওয়ার উঠেছে। দোকানগুলোর সাইনবোর্ড ইংরেজি থেকে বাংলায়, বাংলা থেকে আবার ইংরেজিতে গেছে। কিন্তু আজিজের পরাটা একই আছে। একই হাতের টান। একই আঁচ।

মিতু পরাটা খেতে খেতে ফোনে নিউজ ফিড স্ক্রল করলো। "বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ: অর্থমন্ত্রীর তৃপ্তি।"

সে খবরটা পড়লো। পুরোটা পড়লো।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, রপ্তানি বেড়েছে। শিল্প উৎপাদন বেড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতি বেড়েছে। সব বেড়েছে।

মিতু ফোন রেখে দিলো।

সে ভাবছে তার মায়ের কথা। মিতুর মা গ্রামে থাকেন। নরসিংদীতে। মা সারাজীবন একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়িয়েছেন। এখন অবসরে। পেনশন পান। পেনশন দিয়ে চলে না। মিতু প্রতি মাসে টাকা পাঠায়।

মিতুর মায়ের একটা অভ্যাস আছে। উনি বাড়ির মেঝের টাইলস গোনেন। কেন গোনেন কেউ জানে না। হয়তো সময় কাটানোর জন্য। হয়তো অন্য কোনো কারণে। মিতু একবার জিজ্ঞেস করেছিলো, "মা, টাইলস গুনছো কেন?" মা বলেছিলেন, "গুনলে মনে হয় কিছু একটা করছি।"

মিতু এই কথাটা ভুলতে পারে না।

গুনলে মনে হয় কিছু একটা করছি।

জিডিপিও তো একটা গোনা। দেশ কতটুকু উৎপাদন করলো সেটার হিসাব। কিন্তু এই হিসাবে কে উৎপাদন করলো সেটা নেই। কে হারালো সেটা নেই। কে রাতে ঘুমাতে পারে না সেটা নেই। কে সকালে উঠে আটাশ টাকার রাইড নেয় সেটা নেই। কে বারো হাজার টাকায় মেশিন পাহারা দেয় সেটা নেই। কে পনেরো বছরের চায়ের দোকান বন্ধ করে রিকশা চালায় সেটা নেই।

জিডিপি একটা সংখ্যা। সংখ্যা মানুষ চেনে না।

মিতু করিমের কথা ভাবলো। মিতু করিমকে চেনে না। কিন্তু করিমের মতো মানুষকে চেনে। তার মামা রাতের প্রহরী ছিলো। বছরের পর বছর একই বেতন। শেষে অসুস্থ হয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলো। কেউ খোঁজ নেয়নি।

মিতু রহিমার কথা ভাবলো। মিতু রহিমাকেও চেনে না। কিন্তু গতকাল একটা রাইড নিয়েছিলো, ড্রাইভার ছিলো একজন মেয়ে। মিতু জিজ্ঞেস করেছিলো, "কেমন চলছে?" মেয়েটা বলেছিলো, "চলছে।" আর কিছু বলেনি। মিতুও আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

মিতু জাহিদের কথা ভাবলো। মিতু জাহিদকে চেনে না। কিন্তু মিরপুরে তার নানাবাড়ির কাছে একটা বাজার ছিলো। সেই বাজারে একটা চায়ের দোকান ছিলো। মিতু ছোটবেলায় সেখানে চা খেতো। সেই বাজার এখন নেই।

মিতু তানিয়ার কথা ভাবলো। মিতু তানিয়াকে চেনে, অনলাইনে। তানিয়া মাঝে মাঝে ফেসবুকে পোস্ট দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হতাশার কথা। শিক্ষক নেই। ফান্ড নেই। গবেষণার সুযোগ নেই। ছাত্র বাড়ছে, সম্পদ কমছে।

মিতু পরাটার শেষ টুকরো খেলো। আজিজকে বিশ টাকা দিলো। আজিজ খুশি হলো না, রাগও করলো না। সে পরের খদ্দেরের জন্য আটা মাখতে শুরু করলো। তিরিশ বছর ধরে একই কাজ।

মিতু অফিসে ফিরে গেলো। লিফটে উঠলো। সতেরোতলায় তার ডেস্ক। জানালা দিয়ে ঢাকা দেখা যায়। ছাদের পর ছাদ। ক্রেন। নির্মাণাধীন টাওয়ার। ধোঁয়া। গাড়ি। মানুষ। সব চলছে। সব বাড়ছে। জিডিপি বাড়ছে।

মিতু ল্যাপটপ খুললো। কোড লিখতে শুরু করলো। সে একটা অটোমেশন টুল বানাচ্ছে। এই টুলটা বানানো হলে কোম্পানির কাস্টমার সার্ভিস টিমের পাঁচজনের কাজ আর লাগবে না।

মিতু এটা জানে।

সে কোড লিখতে থাকলো।

---

সন্ধ্যায় রহিমা বাসায় ফিরলো। সারাদিনে বারোটা রাইড হয়েছে। হিসাব করে দেখলো, পেট্রোল আর কমিশন বাদ দিলে হাতে এসেছে একশো আটাশি টাকা। দশ ঘণ্টার কাজ।

করিম রাতের ডিউটিতে যাওয়ার আগে ভাত খেলো। ডাল আর আলু ভাজি। মাছ কেনা হয়নি এই সপ্তাহে। তার মেয়ে বললো, "আব্বু, আমার জন্য একটা ব্যাগ লাগবে, স্কুলের ব্যাগটা ছিঁড়ে গেছে।" করিম বললো, "পরের মাসে।" মেয়ে আর কিছু বললো না।

তানিয়া অফিস থেকে বাসায় ফিরে খাতা দেখতে বসলো। একশো বিশটা মিডটার্মের খাতা। প্রতিটা পড়তে দশ মিনিট করে লাগলে বিশ ঘণ্টা। তানিয়া প্রথম খাতাটা খুললো। ছাত্রটি লিখেছে, "বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই কারণ রপ্তানি খাত শক্তিশালী।" তানিয়া কলম তুলে নিলো। তারপর রাখলো। কী লিখবে মার্জিনে? ছেলেটা ভুল বলেনি। অসম্পূর্ণ বলেছে। কিন্তু অসম্পূর্ণতা কিভাবে নম্বর দিয়ে ধরা যায়?

জাহিদ রিকশা গ্যারেজে রেখে হেঁটে বাসায় ফিরলো। তার ছেলে মোবাইলে গেম খেলছে। জাহিদ ছেলেকে কিছু বললো না। কী বলবে? পড়ালেখা করো? কোথায় পড়াবে? পড়ে কী হবে?

মিতু রাতে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আজকের কোডটা ভালো হয়েছে। টেস্ট পাশ করেছে। প্রোডাকশনে গেলে কাস্টমার সার্ভিসের ফাইভ পারসেন্ট কস্ট কমবে। কোম্পানি খুশি হবে। মিতুর বোনাস হবে। আর পাঁচজন মানুষ চাকরি হারাবে।

জিডিপি বাড়বে।

বাইরে ঢাকা শহর জেগে আছে। কোথাও একটা হর্ন বাজছে। কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। কোথাও একটা ফ্যাক্টরিতে রাতের শিফট চলছে, আলো জ্বলছে, মেশিন ঘুরছে, কিন্তু ভেতরে মানুষ কম।

আজিজের পরাটার গাড়ি রাস্তার কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। আজিজ চলে গেছে। তাওয়া ঠান্ডা হচ্ছে। তেলের গন্ধ এখনো বাতাসে আছে।