সুন্দরবনের প্রহরী AI
**সিরিজ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ | পর্ব ৭৯ | অধ্যায় ৮: দ্বিতীয় ঢেউ, ২০৩৮**
---
মনিরের নৌকার নাম "সুখী"। মেয়ের নামে রেখেছে। সুখী এখন ঢাকায় থাকে, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মনির নৌকার গায়ে নামটা নিজে লিখেছিল, সাদা রঙে, বড় বড় হরফে। রঙ উঠে গেছে অনেকটা। লবণ পানি আর রোদে কিছু টেকে না সুন্দরবনে। কিন্তু নামটা এখনো পড়া যায়, কাছে গেলে। মনির বছরে একবার রঙ দেয়। নতুন রঙ পুরোনো রঙের ওপর বসে, পুরোনোটা নিচে থেকে যায়। বিশ বছরের বিশটা স্তর।
নৌকার ছইয়ের নিচে একটা ল্যাপটপ রাখা। ল্যাপটপটা পুরোনো, সরকারি জোগান, কিন্তু কাজ চলে। তার পাশে একটা ছোট সোলার প্যানেল, ছইয়ের ওপর বসানো। বনবিভাগ দিয়েছে দুই বছর আগে। মনির প্রথমে ভেবেছিল ঝামেলা, আরেকটা জিনিস সামলাতে হবে। কিন্তু এখন ছাড়া চলে না।
ল্যাপটপের পর্দায় সুন্দরবনের মানচিত্র। সবুজ, নীল, হলুদ দাগ। প্রতিটা দাগ একটা ক্যামেরা ট্র্যাপের অবস্থান। সুন্দরবনের ভেতরে, গাছের গুঁড়িতে, পানির ধারে, হরিণের পথে, বাঘের চলাচলের রাস্তায় তিনশোর বেশি ক্যামেরা বসানো। মনির নিজে একশোটার বেশি বসিয়েছে, নিজের হাতে, নিজের পিঠে বয়ে নিয়ে গেছে বনের ভেতরে। ক্যামেরাগুলো ছোট, হাতের মুঠোয় আঁটে, কিন্তু ভারী হয় যখন পঞ্চাশটা একসাথে ব্যাগে থাকে, আর পাঁচ ঘণ্টা হাঁটতে হয় কাদা আর শ্বাসমূলের ভেতর দিয়ে।
ক্যামেরাগুলো সাধারণ না। এগুলো দেখে, শোনে, গন্ধ মাপে না অবশ্য, কিন্তু তাপ বোঝে। কোনো প্রাণী সামনে দিয়ে গেলে ক্যামেরা ছবি তোলে, ভিডিও করে, আর সেটা পাঠিয়ে দেয় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। ছবি যায় ঢাকায়, একটা সার্ভারে, সেখানে AI বসে আছে।
AI ছবি দেখে বলে দেয় কোন প্রাণী। হরিণ, শূকর, বানর, কুমির, সাপ, পাখি। আর বাঘ।
বাঘ চিনতে AI এর কোনো কষ্ট হয় না। ডোরাকাটা দাগের ধরন দেখে বলে দেয় কোন বাঘ। প্রতিটা বাঘের ডোরা আলাদা, মানুষের আঙুলের ছাপের মতো। AI প্রতিটা বাঘের একটা নাম্বার দিয়েছে। মনির নাম্বার পছন্দ করে না, সে নিজে নাম দিয়েছে কয়েকটাকে। একটার নাম কালু, কারণ তার ডোরাগুলো অনেক গাঢ়। একটার নাম লম্বা, কারণ সে সত্যিই লম্বা, অন্য বাঘদের চেয়ে মাথা একটু উঁচুতে থাকে সবসময়।
---
সকালবেলা। মনির চা খাচ্ছিল, স্টেশনের বারান্দায় বসে। বনের ভেতর থেকে পাখির ডাক আসছে, বুলবুলি, টিয়া, মাছরাঙা। পানিতে একটা গুইসাপ ভেসে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে, কাঠের টুকরোর মতো। মনির গুইসাপটার দিকে তাকিয়ে চা খাচ্ছিল। চা পাতলা, দুধ কম, চিনি বেশি। বিশ বছর ধরে এই চা খায়, বদলায়নি।
ল্যাপটপে একটা সংকেত এলো। একটা ক্যামেরা নতুন ছবি পাঠিয়েছে। মনির চায়ের কাপ রেখে পর্দায় তাকাল।
ছবিটা ঝাপসা নয়। পরিষ্কার। সবুজ ঘাসের মধ্যে একটা বাঘিনী। তার পেছনে দুটো বাচ্চা। বাচ্চাগুলো ছোট, হয়তো দুই মাসের, তিন মাসের হবে। একটা মায়ের পায়ের কাছে বসে আছে, আরেকটা ঘাসের মধ্যে কিছু একটা শুঁকছে।
মনির ছবিটা বড় করে দেখল।
ক্যামেরা নম্বর ১৪৭। জোন সি-৬।
মনির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জোন সি-৬ খালি। গত তিন বছর ধরে খালি। ওখানে আগে দুটো বাঘ ছিল, একটা পুরুষ আর একটা মেয়ে। পুরুষটা মারা গেছে, শিকারিরা মেরেছে। মেয়েটা চলে গেছে অন্য জোনে। তারপর থেকে ওই এলাকায় কোনো বাঘ দেখা যায়নি। সবাই ধরে নিয়েছিল ওই জোনটা শেষ। বাঘের জন্য আর কাজের না।
কিন্তু এই বাঘিনী কোথা থেকে এলো? বাচ্চাসহ?
মনির AI এর রিপোর্ট খুলল। AI ইতিমধ্যে বাঘিনীর ডোরা বিশ্লেষণ করেছে। পরিচিত কোনো বাঘ না। ডাটাবেসে নেই। নতুন। AI তাকে একটা নম্বর দিয়েছে: BT-389।
মনির মনে মনে বলল, নম্বর পরে দেব। আগে দেখি কোথায় আছে।
---
মনির "সুখী" নিয়ে বের হলো। পানি শান্ত, জোয়ার আসছে ধীরে ধীরে। নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ পানিতে ছড়িয়ে যাচ্ছে। মনির জানে এই শব্দে বাঘ পালাবে না। বাঘ নৌকার শব্দে অভ্যস্ত। বিশ বছর ধরে নৌকা চলছে এই খালে, বাঘেরা জানে এটা বিপদ না।
ল্যাপটপ খোলা, ছইয়ের নিচে। মানচিত্রে একটা লাল বিন্দু জ্বলছে, সি-৬ জোনে। AI স্যাটেলাইটের ছবি থেকে গত এক সপ্তাহের চলাচলের ধরন তৈরি করেছে। বাঘিনী সকালে পূর্ব দিক থেকে আসে, বিকেলে পশ্চিমে যায়। পানির ধারে আসে দুপুরের দিকে। বাচ্চাদের নিয়ে আসে, একা আসে না।
মনির মানচিত্রটা দেখল। AI যে রাস্তা দেখাচ্ছে, সেটা বোঝা যায়। পূর্ব দিকে ঘন বন, গেওয়া আর সুন্দরীর বন, ওখানে থাকে। পানির ধারে আসে কারণ হরিণ আসে পানি খেতে। শিকারের জায়গা।
কিন্তু মনির আরেকটা জিনিস দেখছে যেটা AI দেখছে না। পানির রঙ। গত কয়েকদিন ধরে এই খালের পানি একটু ঘোলা হয়ে আসছে। উজান থেকে বৃষ্টি হয়েছে, পলি আসছে। পলি এলে মাছ আসে। মাছ এলে মাছরাঙা আসে, উদবিড়াল আসে। শব্দ বাড়ে। হরিণ পানিতে নামতে চায় না শব্দ বেশি হলে। হরিণ না এলে বাঘ পানির ধারে আসবে না, অন্য পথে যাবে।
AI এটা জানে না। AI স্যাটেলাইট দেখে, ক্যামেরা দেখে, ডোরা মেলায়, পথ আঁকে। কিন্তু পানির রঙ বদলালে কী হয়, সেটা মনির জানে। বিশ বছরে শিখেছে। কেউ শেখায়নি, নিজে দেখেছে, বারবার দেখেছে।
---
মনির নৌকা থামাল। সি-৬ জোনের কাছে, কিন্তু ভেতরে ঢুকল না। বাচ্চাসহ বাঘিনীর কাছে যাওয়া বোকামি। দূর থেকে দেখবে। সে দূরবীন বের করল। পুরোনো দূরবীন, বাবার কাছ থেকে পাওয়া। বাবাও বনরক্ষী ছিল। দূরবীনের একটা লেন্সে আঁচড় পড়ে গেছে, দেখতে একটু অসুবিধা হয়, কিন্তু মনির অভ্যস্ত। আঁচড়টা বাঁ দিকে, সে ডান চোখ দিয়ে দেখে।
দূরবীনে কিছু দেখা গেল না। ঘন বন। গেওয়ার পাতা, সুন্দরীর ডাল, ঝোপঝাড়। বাঘ দেখা যায় না এভাবে। বাঘ দেখা যায় যখন সে দেখা দিতে চায়। মনির এটা জানে।
সে দূরবীন নামিয়ে রাখল। কান পাতল। বনের শব্দ শুনল। পাখির ডাক, পাতার শব্দ, পানির শব্দ। স্বাভাবিক শব্দ। কিন্তু মনির একটা জিনিস খুঁজছে: হরিণের ডাক। হরিণ যখন বাঘ দেখে, একটা বিশেষ ডাক দেয়। খাটো, তীক্ষ্ণ, বারবার। সেই ডাক শুনলে মনির বুঝবে বাঘ কাছে আছে। কোন দিক থেকে ডাক আসছে, তার থেকে বুঝবে বাঘ কোন দিকে।
AI ক্যামেরায় ছবি দেখে বাঘ চেনে। মনির হরিণের ডাক শুনে বাঘ বোঝে। দুটো আলাদা পথে একই জায়গায় পৌঁছায়।
আজ হরিণের ডাক নেই। বাঘিনী হয়তো ঘুমাচ্ছে, বাচ্চাদের নিয়ে, ঝোপের ভেতরে। দুপুর হলে বেরোবে।
---
মনির অপেক্ষা করল। "সুখী" বাঁধা রইল একটা গাছের শিকড়ে। সে ছইয়ের নিচে শুয়ে পড়ল, ল্যাপটপ বুকের ওপর। AI এর রিপোর্ট পড়তে লাগল।
বাঘিনী BT-389। প্রথম দেখা গেছে পাঁচ দিন আগে। ক্যামেরা ১৪৭ আর ১৫২, দুটো ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। দুটো বাচ্চা, দুটোই মেয়ে বলে AI অনুমান করেছে, তবে নিশ্চিত হতে আরও ছবি লাগবে। বাঘিনীর বয়স AI অনুমান করেছে চার থেকে পাঁচ বছর। শরীরের আকার, ডোরার তীক্ষ্ণতা, পায়ের ছাপের মাপ থেকে।
মনির ভাবল, চার-পাঁচ বছর। তাহলে সে যখন এই জোনে শেষ বাঘটা হারিয়েছিল, তখন এই বাঘিনী জন্মায়নি। অন্য কোথাও জন্মেছে, বড় হয়েছে, নিজের এলাকা খুঁজতে খুঁজতে এই খালি জোনে এসে পড়েছে। খালি জোন মানে প্রতিযোগিতা নেই। অন্য বাঘ নেই। নিরাপদ জায়গা বাচ্চা বড় করার জন্য।
বুদ্ধিমান বাঘিনী।
AI এটা বলেনি। AI বলেছে "movement pattern consistent with territory establishment"। মনির পড়ে হাসল। একই কথা। কিন্তু মনির যেভাবে বলে, সেটা আলাদা।
---
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। মনির দূরবীন দিয়ে আবার দেখল। এবারও কিছু দেখা গেল না। কিন্তু একটা শব্দ পেল। হরিণের ডাক না। অন্য কিছু। পানিতে ছপছপ শব্দ, ছোট ছোট পায়ের। তারপর একটা মৃদু গর্জন, খুবই নিচু স্বরে, প্রায় গুনগুনানির মতো। মা বাঘিনী বাচ্চাদের ডাকছে। মনির এই শব্দ চেনে। আগেও শুনেছে, দুবার, বিশ বছরে মাত্র দুবার।
সে নড়ল না। শ্বাস ধরে রইল। নৌকা একটু দুলল, পানিতে একটা ঢেউ এসেছে। ঢেউটা চলে গেল। আবার শান্ত।
তারপর দেখল।
বনের ধার দিয়ে, পানির কাছে, একটা কমলা-কালো ছায়া নড়ে গেল। তার পেছনে দুটো ছোট ছায়া। মুহূর্তের জন্য দেখা গেল, তারপর ঘাসের মধ্যে মিলিয়ে গেল। মনিরের হাত কাঁপছিল। দূরবীনে যা দেখল, সেটা ক্যামেরার ছবির চেয়ে আলাদা। ছবিতে বাঘ থেমে থাকে, স্থির থাকে। কিন্তু চোখের সামনে বাঘ চলে, বাঘ বাঁচে।
মনির দূরবীন নামিয়ে রাখল। হাত কাঁপা বন্ধ হলো না অনেকক্ষণ।
---
সন্ধ্যায় ফিরে এসে মনির রিপোর্ট লিখল। ল্যাপটপে টাইপ করে। আগে হাতে লিখত, ডায়েরিতে। এখন ডায়েরি আর ল্যাপটপ দুটোতেই লেখে। ডায়েরিতে নিজের জন্য, ল্যাপটপে সরকারের জন্য।
ডায়েরিতে লিখল: "সি-৬ তে মা আর দুই বাচ্চা। চোখে দেখলাম। বিকেলে, পানির ধারে। বাচ্চারা সুস্থ মনে হলো। মা সাবধানী, ভালো মা।"
ল্যাপটপে লিখল: "BT-389 visually confirmed in Zone C-6 at 16:22. Two cubs observed. All appear healthy. Recommend maintaining camera density and restricting patrol boat traffic in C-6 corridor for next 90 days."
দুটো রিপোর্ট, একই ঘটনা, দুটো ভাষায়, দুটো জগতের জন্য।
---
পরের সপ্তাহে একজন গবেষক এলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের। নাম ড. ফারহানা। তিনি সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে গবেষণা করেন, AI ক্যামেরা সিস্টেমটাও তাঁর প্রকল্পের অংশ। তিনি এসেছেন BT-389 এর খবর পেয়ে।
ড. ফারহানা তাঁর নিজের ল্যাপটপে ডেটা দেখালেন মনিরকে। স্যাটেলাইটের তাপমাত্রা মানচিত্র, গাছের ঘনত্বের হিসাব, পানির স্তর, জোয়ার-ভাটার সময়সূচি। সব মিলিয়ে AI একটা মডেল তৈরি করেছে, যেটা বলছে সি-৬ জোনে বাঘের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে এসেছে। গাছ বেড়েছে, হরিণের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের চলাচল কমেছে। বাঘিনী এটা বুঝেছে, AI ও বুঝেছে।
"আপনি কতদিন ধরে এই বনে আছেন, মনির ভাই?" ড. ফারহানা জিজ্ঞেস করলেন।
"বিশ বছর।"
"বিশ বছরে বন কেমন বদলেছে?"
মনির একটু ভাবল। "বন বদলায় না। মানুষ বদলায়। আগে শিকারি আসত বেশি। এখন কম আসে। কারণ ক্যামেরা আছে, ধরা পড়ে। আগে গাছ কাটত। এখন কম কাটে। কারণ স্যাটেলাইট দেখে। বন তো বনই আছে। বন থাকতে চায়। মানুষ থাকতে দিলেই বন থাকে।"
ড. ফারহানা মাথা নাড়লেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, "AI সিস্টেমটা আপনার কাজে কতটা সাহায্য করে?"
মনির একটু হাসল। "আগে আমি একা ছিলাম। দূরবীন ছিল, পা ছিল, কান ছিল। বনের একটা ছোট অংশ দেখতে পারতাম। এখন তিনশো ক্যামেরা দেখছে, স্যাটেলাইট দেখছে। আমি একা যা দেখতাম, এখন সেটা হাজার গুণ বেশি দেখা হচ্ছে।"
"তাহলে আপনার দরকার কমে গেছে?"
মনির মাথা নাড়ল। "না। যন্ত্র চোখ দেয়। আমি কান দিই।"
ড. ফারহানা বুঝলেন না পুরোটা। মনির বুঝিয়ে বলল।
"ক্যামেরা দেখে বাঘ কোথায় আছে। কিন্তু হরিণের ডাক শুনে আমি বুঝি বাঘ কোথায় যাচ্ছে। স্যাটেলাইট দেখে গাছ কতটা ঘন। কিন্তু পানির স্বাদ থেকে আমি বুঝি এই বছর কেওড়ার ফল কেমন হবে। যন্ত্র জানে গতকাল কী হয়েছে। আমি জানি আজকের বাতাসে কাল কী হবে।"
তিনি একটু থামলেন। তারপর বললেন, "দুটো মিলিয়ে ভালো।"
মনির বলল, "হ্যাঁ। আমি একা যা পারি, তার চেয়ে বেশি পারি যন্ত্র নিয়ে। যন্ত্র একা যা পারে, তার চেয়ে বেশি পারে আমাকে নিয়ে। আলাদা আলাদা আমরা অর্ধেক। একসাথে পুরো।"
---
রাতে মনির স্টেশনের বারান্দায় বসে রইল। ল্যাপটপ বন্ধ। দূরবীন রাখা পাশে। চারদিকে অন্ধকার, শুধু আকাশে তারা আর বনের ভেতর থেকে জোনাকির আলো।
সে ভাবল বাঘিনীর কথা। বাচ্চা দুটোর কথা। ওরা এখন ঘুমাচ্ছে হয়তো, ঝোপের ভেতরে, মায়ের পেটের কাছে গুটিশুটি মেরে। ওরা জানে না কেউ তাদের দেখছে। ক্যামেরা দেখছে, স্যাটেলাইট দেখছে, AI বিশ্লেষণ করছে, মনির দূরবীন ধরে বসে আছে, ঢাকায় গবেষক ডেটা পড়ছেন। এত মানুষ, এত যন্ত্র, এত প্রযুক্তি, শুধু তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
বাঘেরা এসব জানে না। বাঘেরা শুধু বাঁচে। শিকার করে, পানি খায়, বাচ্চা বড় করে, এলাকা পাহারা দেয়। তাদের কাছে AI বলে কিছু নেই, ক্যামেরা বলে কিছু নেই, মনির বলে কিছু নেই। তাদের কাছে শুধু বন আছে, পানি আছে, শিকার আছে। আর বাচ্চা আছে, যাদের খাওয়াতে হবে, বাঁচাতে হবে, শেখাতে হবে কীভাবে বনে টিকে থাকতে হয়।
মনির উঠে দাঁড়াল। স্টেশনের ভেতরে ঢুকল। শুতে হবে, কাল ভোরে আবার বেরোতে হবে। সি-৬ জোনের পশ্চিম দিকে আরও দুটো ক্যামেরা বসাতে হবে, AI বলেছে ওই দিকে বাঘিনী যাচ্ছে বিকেলে, কিন্তু ওখানে কোনো ক্যামেরা নেই। মনির জানে ওই দিকে একটা পুরোনো কেওড়া গাছ আছে, গাছের গুঁড়ি মোটা, ক্যামেরা বসানোর জন্য ভালো জায়গা।
যন্ত্র বলেছে কোথায় লাগবে। মনির জানে কোথায় বসাবে। দুজনে মিলে কাজ হবে।
---
"সুখী" নদীর ধারে বাঁধা। জোয়ারের পানি উঠছে আস্তে আস্তে। নৌকাটা একটু একটু করে ওপরে উঠছে, দড়ি টানটান হচ্ছে, আবার ঢিলা হচ্ছে। নৌকার গায়ে সাদা অক্ষরে নাম, অন্ধকারে প্রায় দেখা যায় না। ঢেউ এসে নৌকার গায়ে লাগছে, ছোট ছোট ঢেউ, কোনো শব্দ নেই প্রায়। বনের ভেতর থেকে একটা নিশাচর পাখি ডাকল, একবার, দুবার, তারপর চুপ। পানিতে তারার ছায়া ভাঙছে আর জুড়ছে, ভাঙছে আর জুড়ছে।