রহিমার হিসাব
রহিমা বারান্দায় বসে গোনে।
টাইলস গোনে না। টাইলস চব্বিশটা, সেটা সে জানে। প্রথম দিন গুনেছিল, যেদিন মিতু এই ফ্ল্যাটে তাকে নিয়ে এসেছিল। চব্বিশটা টাইলস, সাদা আর ধূসর, পালা করে সাজানো। সেদিন গুনেছিল, তারপর আর গোনার দরকার হয়নি। চব্বিশ সংখ্যাটা মনে থেকে গেছে।
আজ সে অন্য জিনিস গোনে। বছর গোনে।
আঠারো বছর কারখানায়। ছত্রিশ থেকে আটান্ন পর্যন্ত না, ষোলো থেকে চৌত্রিশ পর্যন্ত। সেই আঠারো বছরে সে কী করেছে? সেলাই করেছে। সকাল সাতটা থেকে রাত নয়টা, কখনো দশটা, কখনো এগারোটা। ওভারটাইম মানে অতিরিক্ত টাকা, অতিরিক্ত টাকা মানে মিতুর স্কুলের বেতন। হিসাবটা সোজা ছিল।
আঠারো বছরে তার হাতে কড়া পড়েছিল। আঙুলের ডগায়, তালুতে, বুড়ো আঙুলের গোড়ায়। কড়াগুলো এখন নেই। ষোলো বছর হলো সে সেলাই মেশিন ধরেনি। চামড়া নরম হয়ে গেছে। কখনো কখনো সে নিজের হাতের দিকে তাকায়, চেনা লাগে না। এগুলো কি সেই হাত যেগুলো দিনে তিনশো পিস জিপার লাগাতো? মনে হয় না। মনে হয় অন্য কারো হাত।
পলিয়েস্টারের গন্ধ। সেটাও চলে গেছে। কারখানায় ঢুকলে একটা গন্ধ লাগতো নাকে, তীব্র, রাসায়নিক, যেটা গোসল করলেও যেতো না। চুলে থাকতো, শাড়িতে থাকতো, নখের ভেতরে ঢুকে যেতো। মিতু ছোটবেলায় বলতো, "আম্মু, তোমার গায়ে কাপড়ের গন্ধ।" রহিমা হাসতো। কাপড়ের গন্ধ না, পলিয়েস্টারের গন্ধ। দুটো আলাদা জিনিস। কিন্তু মিতুকে সেটা বোঝানোর দরকার ছিল না।
এখন সে সেই গন্ধ ভুলে গেছে। মাঝে মাঝে চেষ্টা করে মনে করতে, পারে না। গন্ধ কি ভোলা যায়? দৃশ্য মনে থাকে, শব্দ মনে থাকে, কিন্তু গন্ধ? রহিমা জানে না। সে শুধু জানে পলিয়েস্টারের গন্ধ একসময় তার জীবনের সবচেয়ে পরিচিত জিনিস ছিল, আর এখন সেটা নেই।
---
চার বছর সাইকেলে।
কারখানা বন্ধ হওয়ার পর সে সাইকেলে করে কাপড় বিক্রি করতো। পাড়ায় পাড়ায়, বাড়ি বাড়ি। সাইকেলের পেছনে একটা বড় বস্তা বাঁধা থাকতো, ভেতরে শাড়ি, থ্রি-পিস, ওড়না। গরমে ঘামতো, বৃষ্টিতে ভিজতো, শীতে হাত জমে যেতো। চার বছর।
সেই চার বছরে সে ঢাকা শহরের গলি চিনেছে যেভাবে কেউ চেনে না। মিরপুরের ভেতরের রাস্তা, মোহাম্মদপুরের সরু গলি, শ্যামলীর পুরনো বাড়িগুলো। সাইকেল চালাতে চালাতে সে দেখতো মানুষ কীভাবে থাকে। একতলা বাড়িতে সাতটা পরিবার। ছাদে কাপড় শুকোচ্ছে, নিচে বাচ্চারা খেলছে, পাশের রুমে কেউ ঝগড়া করছে। রহিমা সাইকেল থামাতো, কাপড় দেখাতো, দাম বলতো, কখনো বিক্রি হতো, কখনো হতো না।
সাইকেলটা এখন নেই। কোথায় গেছে সে জানে না। হয়তো কাউকে দিয়ে দিয়েছে, হয়তো পুরনো জিনিসের দোকানে বেচে দিয়েছে। মনে নেই। কিছু কিছু জিনিস জীবন থেকে এমনভাবে চলে যায় যে তাদের যাওয়াটাও মনে থাকে না।
---
আট বছর এই ফ্ল্যাটে।
মিতু যখন প্রথম চাকরি পেল, তখন এই ফ্ল্যাটে নিয়ে এলো। দুই রুম, একটা রান্নাঘর, একটা বারান্দা। রহিমার জীবনে এটাই প্রথম ফ্ল্যাট যেখানে বাথরুমে টাইলস আছে। আগে সে যেখানে থাকতো, সেখানে বাথরুম মানে টিনের বেড়া আর একটা টিউবওয়েল। এখানে শাওয়ার আছে। প্রথম দিন শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রহিমা অনেকক্ষণ ছিল। পানি পড়ছিল মাথায়, সে দাঁড়িয়ে ছিল। কাঁদেনি। শুধু দাঁড়িয়ে ছিল।
আট বছরে এই ফ্ল্যাটটা তার হয়ে গেছে। প্রতিটা কোনা চেনা। কোন দেয়ালে রোদ আসে সকালে, কোন জানালা দিয়ে বাতাস ঢোকে বিকালে, কোন টাইলসটা একটু নড়ে। রান্নাঘরের দ্বিতীয় ড্রয়ারটা একটু জ্যাম করে, জোরে টানতে হয়। বারান্দার রেলিংয়ের বাঁ কোনায় একটু মরচে ধরেছে। এইসব ছোট ছোট বিষয় জানা মানে একটা জায়গাকে নিজের করে নেওয়া।
বারান্দায় একটা মরিচ গাছ আছে। রহিমা তিন বছর আগে লাগিয়েছিল। প্রথম বছর কিছুই হয়নি। দ্বিতীয় বছর পাতা হয়েছিল, ফুল হয়নি। এই বছর ফল ধরেছে। ছোট ছোট সবুজ মরিচ, একটু বাঁকা, ঝাঁঝালো। রহিমা প্রতিদিন গাছটার দিকে তাকায়। একটা গাছ ফল দিতে তিন বছর নিয়েছে। রহিমা তিন বছর অপেক্ষা করেছে। ধৈর্য তার নতুন কিছু না।
---
মেশিন এসেছিল যখন তার বয়স আটত্রিশ। সে তখন কারখানায়। একদিন সুপারভাইজার বললো নতুন মেশিন আসবে, কম লোক লাগবে। রহিমা বুঝেছিল, কিন্তু ভাবেনি তাকে যেতে হবে। সে ভালো কাজ করতো। দ্রুত করতো। ভুল কম করতো। কিন্তু মেশিন ভুল করে না, মেশিন ক্লান্ত হয় না, মেশিন বেতন চায় না। রহিমা বেতন চায়। রহিমা মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়। রহিমা কখনো কখনো ভুল করে। তাই রহিমা গেছে, মেশিন থেকেছে।
এখন তার বয়স চুয়ান্ন। ষোলো বছর হলো মেশিন তার জীবনে ঢুকেছে। ষোলো বছর হলো সে কারখানা ছেড়েছে। ষোলো বছরে সে কী হারিয়েছে? একটা চাকরি। কড়া পড়া হাত। পলিয়েস্টারের গন্ধ। প্রতিদিন সকাল সাতটায় ওঠার অভ্যাস। কারখানার গেটে লাইনে দাঁড়ানো। দুপুরে আধঘণ্টার বিরতিতে পান্তা খাওয়া। বিকালে পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া। রাতে পিঠে ব্যথা নিয়ে শোয়া।
ষোলো বছরে সে কী পেয়েছে? একটা মেয়ে যে জিনিস বানায়। মিতু কী বানায় রহিমা ঠিক বোঝে না। কম্পিউটারে কিছু একটা করে, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলে ইংরেজিতে। রহিমা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "তুই কী বানাস?" মিতু বলেছিল, "সিস্টেম।" রহিমা জিজ্ঞেস করেনি সিস্টেম কী। কিছু কিছু জিনিস না জেনেও মেনে নেওয়া যায়।
একটা ফ্ল্যাট পেয়েছে চব্বিশটা টাইলস দিয়ে। একটা মরিচ গাছ পেয়েছে যেটা অবশেষে ফল দিয়েছে। একটা বারান্দা পেয়েছে যেখানে বসে বিকালের বাতাস গায়ে লাগে।
হিসাবটা মেলে কি না রহিমা জানে না। সে হিসাবের মানুষ না। সে জানে যোগ আর বিয়োগ, কিন্তু জীবনের হিসাব যোগ-বিয়োগে হয় না। জীবনের হিসাব অন্যরকম। কিছু জিনিস হারায়, কিছু জিনিস আসে, কিন্তু হারানো জিনিস আর আসা জিনিস কি একই মাপের? একটা চাকরি হারানো আর একটা মরিচ গাছ পাওয়া কি সমান? না। কিন্তু রহিমা সেভাবে ভাবে না। সে ভাবে: আমি এখনো আছি।
আমি এখনো আছি।
এই একটা কথা। এটুকুই। ষোলো বছরে অনেক কিছু হয়েছে, অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু রহিমা আছে। বসে আছে তার বারান্দায়, তার মরিচ গাছের পাশে, তার চব্বিশটা টাইলসের ফ্ল্যাটে। সে আছে।
---
বারান্দা থেকে রহিমা দক্ষিণ দিকে তাকায়। আগে ওখানে একটা কারখানা দেখা যেতো। বড় একটা বিল্ডিং, ধূসর, জানালা ছোট ছোট, ছাদে পানির ট্যাংক। রহিমা সেই কারখানায় কাজ করেনি, কিন্তু দেখতো। প্রতিদিন দেখতো। সকালে দেখতো শ্রমিকরা ঢুকছে, বিকালে দেখতো বের হচ্ছে। রাতে আলো জ্বলতো, ওভারটাইম চলতো। সেই কারখানাটা গত মাসে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কেন ভেঙেছে রহিমা জানে না। কী হবে সেখানে সেটাও জানে না। এখন ওখানে শুধু একটা ফাঁকা জায়গা। আকাশের যে অংশটা আগে বিল্ডিংয়ের পেছনে লুকানো ছিল, সেটা এখন দেখা যায়। আকাশটা একটু বড় হয়ে গেছে।
রহিমা সেই ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। একটা জিনিস যখন সরে যায়, তখন একটা ফাঁক তৈরি হয়। সেই ফাঁকটা ভালো না মন্দ সেটা বলা কঠিন। শুধু ফাঁক। আছে।
---
সন্ধ্যার দিকে দরজায় চাবির শব্দ।
মিতু ঢোকে। ক্লান্ত। মুখ ফ্যাকাশে। পেটটা এখন বোঝা যায়, পাঁচ মাস চলছে। মিতু জুতো খুলে সোফায় বসে, তারপর উঠে বারান্দায় আসে। মায়ের পাশে বসে। দুজনে চুপ করে বসে থাকে।
রহিমা মেয়ের দিকে তাকায়। মিতুর চুল খোলা, একটু এলোমেলো। চোখের নিচে কালি। হাতের আঙুলে কোনো কড়া নেই। রহিমার আঙুলেও এখন কড়া নেই। মা-মেয়ের হাত একই রকম দেখায়, কিন্তু কারণ আলাদা। রহিমার কড়া গেছে কারণ সে আর সেলাই করে না। মিতুর কড়া নেই কারণ সে কখনো সেলাই করেনি।
মিতু মাথা হেলিয়ে দেয় মায়ের কাঁধে। রহিমা মেয়ের মাথায় হাত বোলায়। কিছুক্ষণ এভাবে থাকে।
তারপর মিতু বলে, "আম্মু।"
"হুম।"
"আমার বাচ্চাকে কী শেখাবো?"
রহিমা চুপ করে থাকে। প্রশ্নটা বড়। রহিমা বড় প্রশ্নের উত্তর তাড়াতাড়ি দেয় না। সে ভাবে। মরিচ গাছের দিকে তাকায়। সবুজ মরিচগুলো সন্ধ্যার আলোয় প্রায় কালো দেখাচ্ছে।
রহিমা কী জানে? সে জানে সেলাই করতে। সেটা আর দরকার নেই। সে জানে সাইকেল চালাতে। সেটাও আর দরকার নেই। সে জানে পলিয়েস্টারের গন্ধ চিনতে। সেই গন্ধও নেই। সে জানে অপেক্ষা করতে। সে জানে ধৈর্য ধরতে। সে জানে কম দিয়ে চলতে। সে জানে হারানোর পর উঠে দাঁড়াতে।
কিন্তু এগুলোর কোনোটাই তো শেখানোর মতো জিনিস না। কেউ তার বাচ্চাকে শেখাতে চায় না কীভাবে হারাতে হয়। কেউ শেখাতে চায় না কীভাবে কম দিয়ে চলতে হয়। মা হিসেবে তো চাওয়া উচিত বাচ্চা যেন কম দিয়ে চলতে না হয়, যেন হারাতে না হয়।
তাহলে কী শেখাবে?
রহিমা ভাবে। অনেকক্ষণ ভাবে। বাতাস বইছে, মরিচ গাছের পাতা নড়ছে, দূরে কোথাও আযানের শব্দ ভাসছে।
তারপর বলে, "গুনতে শেখাও।"
মিতু মাথা তোলে। "গুনতে?"
"হ্যাঁ। গুনতে।"
"কী গুনবে?"
রহিমা একটু হাসে। খুব অল্প একটু। "সব গুনবে। যা আছে তা গুনবে। যা নাই তা গুনবে। যা যাবে তা গুনবে। যা আসবে তা গুনবে।"
মিতু কিছু বলে না। সে মায়ের কথা বোঝে কি না বোঝে রহিমা জানে না। হয়তো এখন বোঝে না। হয়তো পরে বুঝবে। হয়তো কোনোদিন বুঝবে না। সেটাও ঠিক আছে। কিছু কিছু কথা বোঝার জন্য বলা হয় না। বলার জন্য বলা হয়।
মিতু উঠে ভেতরে যায়। রহিমা বসে থাকে।
---
রাত নামে। বারান্দায় অন্ধকার হয়। পাশের বাড়ির আলো এসে পড়ে টাইলসের ওপর, একটা তেরছা দাগ।
রহিমা বসে আছে।
মরিচ গাছে একটা সবুজ মরিচ ঝুলে আছে, রাতের বাতাসে একটু একটু দুলছে।