করিম মাটির কথা বলে
বেলালের ঘরে জানালাটা পূর্বদিকে। সকালে রোদ আসে। করিম সেই রোদের মধ্যে বসে থাকেন, চেয়ারে। হাঁটু দুটো আর আগের মতো কাজ করে না। সিঁড়ি ভাঙতে গেলে শরীর বলে, না। ছাদে ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে দুই বছর। একতলা থেকে দোতলা, এটুকুই। তাও বেলাল ধরে ধরে নিয়ে যায়।
আটষট্টি বছর বয়স। সংখ্যাটা করিমের কাছে অদ্ভুত লাগে। কবে এত বছর হয়ে গেল? মনে হয় সেদিনই তো রংপুরের মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ধানের গন্ধ নাকে। সেদিনই তো ফোনে প্রথমবার বাংলায় কথা শুনেছিলেন। সেদিনই তো হালিমা বলেছিল, এই ফোনের কথা শুনিস না, নিজের মাথা খাটা।
হালিমা নেই। গত বছর চলে গেছে। হার্ট। হঠাৎ। এক রাতে বুকে ব্যথা হলো, বেলাল হাসপাতালে নিয়ে গেল, সকালে ডাক্তার বলল, আর নেই। করিম সেদিন কাঁদেননি। পরের দিনও না। তিন মাস পরে একদিন ভাত খেতে বসে হঠাৎ কেঁদে ফেললেন। কারণ ভাতের মধ্যে লবণ কম ছিল। হালিমা সবসময় বলত, তোর ভাতে লবণ বেশি দিতে হয়, তুই লবণ ছাড়া খাস না। বেলালের বউ রান্না করে ভালো, কিন্তু সে তো আর জানে না করিমের ভাতে লবণ কতটুকু লাগে।
ঢাকায় করিমের দিন একরকম কাটে। সকালে উঠে রোদে বসেন। বেলালের মেয়ে স্কুলে যায়, তার আগে এসে দাদুকে সালাম করে। বেলাল অফিসে যায়। বেলালের বউ রান্নাঘরে থাকে। করিম জানালার পাশে বসে থাকেন। ঢাকার রাস্তা দেখেন। গাড়ি দেখেন। মানুষ দেখেন। কিন্তু মাটি দেখেন না। ঢাকায় মাটি নেই। সব কংক্রিট। পিচ। ইট। টাইলস। মাটির গন্ধ নেই এই শহরে। বৃষ্টি হলে পানি জমে, কিন্তু সেই পানিতে মাটির গন্ধ থাকে না। নর্দমার গন্ধ থাকে।
একদিন বেলাল অফিস থেকে ফিরে বলল, আব্বা, রংপুর যাবেন?
করিম বেলালের দিকে তাকালেন। কিছু বললেন না।
বেলাল বলল, আমি ছুটি নিয়েছি। তিন দিন। যাই একবার।
করিম বললেন, মাঠ তো নেই।
বেলাল বলল, জানি। গুদামঘর হয়ে গেছে। কিন্তু নদীর ধারটা তো আছে।
করিম আবার জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে একটা কাক ডাকছিল। ঢাকার কাক। এরা সবসময় ডাকে। রংপুরের কাকও ডাকত, কিন্তু সেই ডাক অন্যরকম ছিল। খোলা আকাশে সেই ডাক ছড়িয়ে যেত। এখানে দালানে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।
হ্যাঁ, যাব, করিম বললেন।
বাসে উঠলেন দুজনে। রাতের বাস। বেলাল জানালার ধারের সিট নিল করিমের জন্য। করিম জানালা দিয়ে বাইরে দেখলেন। ঢাকা ছাড়াতে ছাড়াতে রাত হয়ে গেল। তারপর অন্ধকার। মাঝে মাঝে ছোট ছোট বাজারের আলো। একটা পেট্রোল পাম্পের আলো। একটা চায়ের দোকানের আলো। তারপর আবার অন্ধকার।
করিম ঘুমালেন না। বেলাল ঘুমিয়ে পড়ল। করিম জেগে রইলেন। জানালা দিয়ে বাতাস আসছিল। সেই বাতাসে, ঢাকা থেকে যত দূরে যাচ্ছিলেন, মাটির গন্ধ আসতে লাগল। অল্প অল্প। তারপর আরেকটু বেশি। তারপর আরও বেশি। ভোরের দিকে যখন বাস রংপুর জেলায় ঢুকল, করিম চোখ বন্ধ করলেন। নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নিলেন। এই গন্ধ। এই মাটি। এই বাতাস। বিশ বছর আগে এই গন্ধের মধ্যেই থাকতেন। প্রতিদিন। প্রতি রাতে।
রংপুর শহরে নামলেন। সেখান থেকে অটোতে গ্রামের দিকে। গ্রামটা আর আগের মতো নেই। রাস্তা পাকা হয়ে গেছে। অনেক নতুন বাড়ি উঠেছে। পুরনো বটগাছটা আছে, কিন্তু তার নিচে আর চায়ের দোকান নেই। একটা মোবাইল ফোনের দোকান হয়েছে। সাইনবোর্ডে লেখা, এআই সার্ভিস সেন্টার। করিম সাইনবোর্ডটা দেখলেন। কিছু বললেন না।
মাঠটা সত্যিই নেই। বড় একটা গুদামঘর। টিনের ছাদ। ইটের দেয়াল। ভেতরে কী আছে জানা নেই। হয়তো চাল। হয়তো সার। হয়তো অন্য কিছু। মাঠটা ছিল, এখন নেই। করিম গুদামঘরের দিকে তাকালেন। কোনো অভিযোগ নেই তাঁর চোখে। কোনো রাগ নেই। শুধু দেখলেন। যেভাবে মানুষ পুরনো ছবি দেখে।
বেলাল বলল, আব্বা, নদীর ধারে যাই।
নদীর ধার পাঁচ মিনিটের হাঁটা। বেলাল করিমের হাত ধরল। আস্তে আস্তে হাঁটলেন দুজনে। রাস্তাটা মাটির। পাকা হয়নি এখনও। করিমের পায়ের নিচে মাটি। নরম মাটি। জুতার ভেতর দিয়ে সেই নরমটা টের পাওয়া যায়।
নদীর ধারে এসে করিম দাঁড়ালেন। নদী আগের চেয়ে সরু হয়ে গেছে। কিন্তু পানি আছে। স্রোত আছে। ধারে কিছু ঘাস। কিছু কলমি শাক। একটা শালিক বসে আছে একটা মাটির ঢিবির ওপরে।
করিম বসলেন। মাটির ওপরে। পা ছড়িয়ে দিলেন। তারপর ডান হাতটা সমতল করে মাটির ওপর রাখলেন। আঙুলগুলো ছড়ানো। হাতের তালু মাটি ছুঁয়ে আছে।
বেলাল কিছু বললেন না। দশ পা পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটা গাছের ছায়ায়। দেখতে লাগলেন।
করিম কথা বলতে শুরু করলেন। আস্তে। মাটির সঙ্গে।
শোন, করিম বললেন। তুই তো চেনিস আমাকে। এই মাটিতে আমি হাঁটছি ছোটবেলা থেকে। তোর ওপরে ধান ফলিয়েছি। তোর ওপরে ঘুমিয়েছি দুপুরে, মাঠের আলের ধারে, গামছা বিছিয়ে। তোর গন্ধ আমার নাকে, রক্তে।
করিম থামলেন। নদীর দিকে তাকালেন। পানি বয়ে যাচ্ছে। শব্দ হচ্ছে অল্প।
তোকে একটা কথা বলি, করিম আবার বললেন। বিশ বছর আগে একটা ফোন এসেছিল। ছোট ফোন। সেই ফোন বাংলায় কথা বলত। আমি অবাক হয়ে গেছিলাম। একটা যন্ত্র, বাংলায় বলছে, আজ বৃষ্টি হবে, ধান কাটো। আমি তো ধানের সঙ্গে কথা বলতাম, তুই জানিস। ধানের সঙ্গে কথা বলা কি পাগলামি? মানুষ বলত পাগলামি। কিন্তু ধান তো শুনত। ধান তো বাড়ত।
করিম একটু হাসলেন। হাসিটা খুব ছোট। ঠোঁটের কোণায়।
তারপর সেই ফোন আরও বড় হলো। অ্যাপ এলো। সবকিছু অ্যাপে। মাটি পরীক্ষা অ্যাপে। সার অ্যাপে। বাজারদর অ্যাপে। আমি ব্যবহার করেছি। ভালোও লেগেছে। কিন্তু একটা জিনিস হলো, তুই জানিস কী হলো? অ্যাপ সব জানত, কিন্তু বলত না। মানে, বলত, কিন্তু নিজের শর্তে। টাকা দিলে বলবে। না দিলে বলবে না। আমার বাপ-দাদা তোর ওপরে চাষ করেছে, কোনো অ্যাপ ছাড়া। আমিও করেছি। তারপর অ্যাপ এলো, বলল, আমাকে ছাড়া পারবে না। হয়তো সত্যি। হয়তো পারতাম না। কিন্তু কথাটা বলার ধরনটা ভালো লাগেনি।
করিম মাটিতে আঙুল চালালেন। একটা ছোট দাগ কাটলেন।
শহরে গেলাম। ঢাকায়। বেলালের কাছে। ছেলে ভালো। ছেলের বউ ভালো। নাতনি ভালো। কিন্তু শহরে মাটি নেই। তুই বুঝবি না, কারণ তুই তো মাটি। তুই সবখানে আছিস ভাবিস। কিন্তু নেই। ঢাকায় তুই নেই। ঢাকায় সিমেন্ট আছে, তোর ওপরে। তোকে চাপা দিয়ে রেখেছে। তুই শ্বাস নিতে পারিস না ওখানে। আমিও পারি না।
করিম চুপ করলেন। বেশ কিছুক্ষণ। বাতাস বইছিল। নদী থেকে আসছিল ভেজা বাতাস। করিমের চুল পাতলা হয়ে গেছে, সাদা, সেই চুলে বাতাস লাগছিল।
হালিমা চলে গেছে, করিম বললেন। গত বছর। তুই তো তাকে চিনতিস। সে তো তোর ওপরে হেঁটেছে আমার পাশে পাশে। সে তো তোর ওপরে শুকনো মরিচ ছড়িয়ে দিত রোদে। সে তো তোর ওপরে বসে আমার জন্য ভাত নিয়ে আসত মাঝদুপুরে, গামলায়। তারপর আমরা দুজনে বসে খেতাম, তোর ওপরে। লবণ বেশি দিত আমার ভাতে। আমি লবণ ছাড়া খাই না।
করিমের গলা ভাঙল। কিন্তু কাঁদলেন না। চোখ মুছলেন হাতের পিঠ দিয়ে।
তোকে বলতে চাইছিলাম, বিশ বছরে কী কী হলো। বলে ফেললাম। বেশি কিছু হয়নি আসলে। ফোন এসেছে, গেছে। অ্যাপ এসেছে, গেছে। মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধি বলে, কত বড় বড় কথা। কিন্তু তুই তো আসল বুদ্ধি। তুই ধান ফলাস। তুই মানুষ খাওয়াস। তোর কোনো অ্যাপ লাগে না। তোর কোনো আপডেট লাগে না। তুই আছিস। এটুকুই যথেষ্ট।
করিম হাতটা মাটির ওপর থেকে তুললেন। হাতের তালুতে মাটি লেগে আছে। ভেজা মাটি। লালচে-বাদামি। করিম সেই মাটি ঝাড়লেন না। হাতটা কোলে রাখলেন। মাটি লেগেই রইল।
বেলাল এগিয়ে এলেন। আব্বা, উঠবেন?
করিম বললেন, আর একটু।
বেলাল আবার পেছনে গেলেন।
করিম নদীর দিকে তাকালেন। পানি বয়ে যাচ্ছে। অনেক দূরে একটা নৌকা দেখা যাচ্ছে। নৌকায় কেউ আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না। শুধু নৌকাটা আছে, পানির ওপরে, আলোর মধ্যে।
করিম উঠলেন। বেলাল ধরল।
দুজনে হাঁটতে শুরু করলেন। পেছনে নদী। পেছনে মাটি। পেছনে গুদামঘর, যেটা একসময় মাঠ ছিল।
বেলাল কিছু করেছিল যেটা করিমকে বলেনি। ব্যাগের মধ্যে দাওটা এনেছিল। সেই দাও। যেটা দিয়ে করিম আগাছা কাটতেন, বাঁশ ছাঁটতেন, মাছের আঁশ পরিষ্কার করতেন। ঢাকায় দাও রেখে কী হবে? বেলাল নদীর ধারে যখন দাঁড়িয়ে ছিল, ব্যাগ থেকে বের করে ঘাসের মধ্যে রেখে দিয়েছিল। আস্তে। শব্দ না করে। দাওটা মাটির ওপরে শুয়ে আছে। ঘাসের মধ্যে। এখানেই থাকবে। দাও শহরের জিনিস না। দাও মাটির জিনিস।
ফেরার বাসে উঠলেন দুজনে। আবার রাতের বাস। আবার জানালার ধারে করিম। বাস ছাড়ল। রংপুর পেছনে পড়ল। অন্ধকার এলো।
করিম ঘুমিয়ে পড়লেন।
বেলাল তাকালেন। আব্বা ঘুমাচ্ছেন। মুখটা শান্ত। শ্বাস সমান। গভীর ঘুম। বেলাল আব্বার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। গত এক বছরে আব্বা এভাবে ঘুমাননি। রাতে উঠে বসে থাকেন। জানালার পাশে দাঁড়ান। কখনো কখনো হালিমার নাম বলেন, আস্তে, নিজে নিজে। ঘুম আসে না তাঁর। অনেক রাত জেগে থাকেন।
কিন্তু এখন ঘুমাচ্ছেন। বাসের ঝাঁকুনিতেও ঘুম ভাঙছে না। জানালা দিয়ে বাতাস আসছে। সেই বাতাসে এখনো মাটির গন্ধ আছে, অল্প।
করিমের হাতের তালুতে এখনো মাটি লেগে আছে। শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আছে।
বাস চলছে। রাত গভীর হচ্ছে। করিম ঘুমাচ্ছেন। অনেক বছর পরে, এতটা গভীর।