তানিয়া কী বানালো

পর্ব ৮৩ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

ইমেইলটা এলো বিকেল চারটায়। তানিয়া তখন পরীক্ষার খাতা দেখছিল। তৃতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা "এথিক্যাল এআই ডিজাইন" কোর্সের মিডটার্ম দিয়েছে। বেশিরভাগ খাতায় একই উত্তর। কপি-পেস্ট না, কিন্তু একই ধরনের চিন্তা। তানিয়া কলম রেখে দিলো।

ল্যাপটপের স্ক্রিনে নোটিফিকেশন জ্বলছে। পাঠানো হয়েছে সৌদি আরব থেকে। প্রেরক: রাকিব হাসান। নামটা চেনা লাগলো, কিন্তু মুখটা মনে এলো না। তানিয়া ইমেইল খুললো।

"তানিয়া ম্যাম, আপনি আমাকে চিনবেন না হয়তো। আমি ২০৩৫ ব্যাচ, আপনার ক্লাসে ছিলাম। সেই যে আপনি বলেছিলেন, টেকনোলজি বানানোর আগে জিজ্ঞেস করো কার জন্য বানাচ্ছো। সেই কথাটা আমার মাথায় ছিল।"

তানিয়া একটু সোজা হয়ে বসলো।

"আমি একটা অ্যাপ বানিয়েছি। নাম 'কথা'। বাংলাদেশ থেকে যারা সৌদি আরবে কাজ করতে আসে, গৃহকর্মী, ড্রাইভার, রাজমিস্ত্রি, তারা আরবি পারে না। মালিকের সাথে কথা বলতে পারে না। অভিযোগ জানাতে পারে না। কষ্ট হলে চুপ করে থাকে। 'কথা' তাদের বাংলায় বলা কথা আরবিতে অনুবাদ করে, রিয়েল টাইমে। এআই ট্রান্সলেশন, কিন্তু শুধু ট্রান্সলেশন না। আমরা কনটেক্সট বোঝার চেষ্টা করেছি। একজন গৃহকর্মী যখন বলে 'আমার শরীর খারাপ', সে হয়তো আসলে বলতে চাইছে 'আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান'। সেই গভীরতাটুকু ধরার চেষ্টা করেছি।"

তানিয়া ইমেইলটা পড়লো। তারপর আবার পড়লো। তারপর তৃতীয়বার।

রাকিব হাসান। ২০৩৫ ব্যাচ। তানিয়া চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলো। সাত বছর আগের ক্লাস। পঞ্চাশ জন ছাত্রছাত্রী। কে কোথায় বসতো, কে কী প্রশ্ন করতো, কিছুই মনে নেই। কিন্তু তানিয়া যা পড়াতো, সেটা এই ছেলের মাথায় ছিল। সাত বছর।

জানালা দিয়ে বিকেলের আলো আসছে। তানিয়ার টেবিলে একটা গাছ আছে। ছোট্ট টবে। পাতাগুলো সবুজ, ঘন। গত বছর ফুল ধরেছিল। সাদা, ছোট ছোট ফুল। তানিয়া অবাক হয়েছিল। গাছটা তো মরেই গিয়েছিল একবার।

গাছটার গল্প পুরনো।

২০৩০ সালে তানিয়া একটা স্টার্টআপ খুলেছিল। "ধ্বনি"। বাংলা টেক্সট-টু-স্পিচ। সেই সময় বাংলায় ভালো টিটিএস ছিল না। যেগুলো ছিল, রোবটের মতো শোনাতো। তানিয়া চেয়েছিল এমন একটা সিস্টেম যেটা বাংলা বলবে মানুষের মতো। আঞ্চলিক উচ্চারণ বুঝবে। বরিশালের বাংলা আর রংপুরের বাংলা আলাদাভাবে বলতে পারবে।

শিহাব ছিল কো-ফাউন্ডার। তানিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। ব্রিলিয়ান্ট প্রোগ্রামার। দুজনে মিলে ধানমন্ডিতে একটা ছোট অফিস ভাড়া নিয়েছিল। দুই রুম। একটায় কোডিং হতো, আরেকটায় রেকর্ডিং। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এনে তাদের কণ্ঠ রেকর্ড করা হতো। ডেটা সংগ্রহ।

সেই অফিসে একটা গাছ ছিল। কে এনেছিল কেউ জানে না। হয়তো আগের ভাড়াটিয়ার। জানালার পাশে একটা টবে। তানিয়া মাঝে মাঝে পানি দিতো, মাঝে মাঝে ভুলে যেতো।

"ধ্বনি" তিন বছর চললো। ভালোই চললো একসময়। পঞ্চাশ হাজার মানুষ ব্যবহার করতো তাদের টিটিএস টুল। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য স্ক্রিন রিডার, অডিওবুক, সরকারি ঘোষণার অটোমেটেড ভয়েস। তানিয়া গর্বিত ছিল।

কিন্তু টাকা আসেনি। ইনভেস্টররা বলেছে, বাজার ছোট। বাংলা ভাষার মার্কেট কত বড়? গুগল নিজেই বাংলা টিটিএস বের করবে, তখন তোমরা কোথায় যাবে? তানিয়া বলেছে, আমরা লোকাল কনটেক্সট বুঝি, গুগল বুঝবে না। ইনভেস্টররা হেসেছে। ভদ্রভাবে।

শিহাব একদিন বললো, "তানিয়া, আমি গুগল সিঙ্গাপুরে অফার পেয়েছি।"

তানিয়া বললো, "যাও।"

এর বেশি কিছু বলেনি। বলার কিছু ছিল না। শিহাবের পরিবার আছে, বাচ্চা আছে। গুগলের স্যালারি "ধ্বনি" থেকে দশগুণ। তানিয়া হিসাব করতে জানে। কিছু হিসাব মেলানোর দরকার হয় না, এমনিতেই পরিষ্কার।

শিহাব চলে গেল। ছয় মাস পর "ধ্বনি" বন্ধ হলো। তানিয়া অফিস ছেড়ে দিলো। জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে দেখলো গাছটা প্রায় মরে গেছে। পাতা নেই, ডাল শুকনো। তানিয়া টবটা তুলে নিলো। কেন নিলো জানে না। হয়তো ফেলে দিতে খারাপ লেগেছে। হয়তো অফিসের শেষ জিনিসটাও ফেলে দিলে সত্যিই সব শেষ হয়ে যায়, সেই ভয়।

গাছটা বাসায় নিয়ে এলো। জানালার পাশে রাখলো। পানি দিলো। কিছু হলো না। দুই মাস কিছু হলো না। তানিয়া ভাবলো ফেলে দেবে। তারপর একদিন দেখলো একটা ছোট্ট সবুজ কুঁড়ি বের হয়েছে। ডালের একদম শেষ মাথায়। এত ছোট যে না খুঁজলে চোখে পড়ে না।

গাছটা বেঁচে গেল।

তানিয়া ইউনিভার্সিটিতে ফিরে গেল। পুরোদস্তুর শিক্ষক। স্টার্টআপের ব্যর্থতা নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। একাডেমিয়ায় এসব নিয়ে কথা হয় না। তানিয়া পড়াতে শুরু করলো। প্রথমে প্রোগ্রামিং, ডেটা স্ট্রাকচার, সাধারণ কোর্স। তারপর ধীরে ধীরে নিজের কোর্স ডিজাইন করলো। "এথিক্যাল এআই ডিজাইন।" ইউনিভার্সিটি প্রথমে আগ্রহ দেখায়নি। এথিক্স পড়িয়ে কী হবে? ছেলেমেয়েদের কোডিং শেখাও, জব পাবে। তানিয়া বললো, কোডিং তো সবাই শেখাচ্ছে। কিন্তু কোড দিয়ে কী বানাবে, কার জন্য বানাবে, সেটা কে শেখাবে?

কোর্সটা চালু হলো। প্রথম বছর পনেরো জন ছাত্রছাত্রী। দ্বিতীয় বছর ত্রিশ। এখন পঞ্চাশ। সিট বাড়াতে হয়েছে।

তানিয়া চা খায়। দিনে দুই কাপ। একসময় কফি খেতো। স্টার্টআপের দিনগুলোতে কফি ছাড়া চলতো না। কত কাপ খেতো গুনে রাখতো। চার কাপ, পাঁচ কাপ, কোনো কোনোদিন ছয়। সেই গোনা বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। এখন চা। দুই কাপ। কোনো হিসাব নেই।

রাকিবের ইমেইলের বাকি অংশ তানিয়া পড়লো।

"ম্যাম, 'কথা' এখন সৌদি আরবে ছয়টা লেবার ক্যাম্পে চলছে। আমরা ফ্রি দিচ্ছি। কোনো চার্জ নেই। একজন গৃহকর্মী গত মাসে এই অ্যাপ দিয়ে তার মালিককে বলেছে যে সে অসুস্থ। মালিক তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে। এর আগে সে তিন সপ্তাহ চুপ করে ছিল কারণ সে আরবিতে 'অসুস্থ' বলতে পারতো না।

আপনার ক্লাসে আপনি একটা কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, সবচেয়ে ভালো টেকনোলজি সেটা যেটা কাউকে কথা বলতে দেয় যে আগে বলতে পারতো না। আমি সেটা মনে রেখেছি।"

তানিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করলো।

বিকেলের আলো কমে আসছে। অফিসে আর কেউ নেই সম্ভবত। পাশের রুম থেকে কোনো শব্দ আসছে না। তানিয়া চেয়ারে হেলান দিলো।

শিহাবের কথা মনে হলো। গত বছর শিহাব মেসেজ করেছিল। সিঙ্গাপুরে ভালো আছে। প্রমোশন হয়েছে। বাচ্চারা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ে। শিহাব লিখেছিল, "তানিয়া, তুই কেমন আছিস?" তানিয়া লিখেছিল, "ভালো।" এর বেশি লেখেনি।

শিহাব ভালো আছে। শিহাবের ক্যারিয়ার উজ্জ্বল। শিহাব গুগলের ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল টিমে কাজ করছে। শিহাবের কাজ কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করে। তানিয়ার কাজ? পঞ্চাশ হাজার মানুষ "ধ্বনি" ব্যবহার করেছিল, তারপর সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন তানিয়া পঞ্চাশ জন ছাত্রছাত্রীকে পড়ায়। বছরে পঞ্চাশ।

হিসাবটা কীভাবে করবে তানিয়া?

রাকিব নামের একটা ছেলে, যার মুখ তানিয়ার মনে নেই, সে একটা অ্যাপ বানিয়েছে। সেই অ্যাপ দিয়ে একজন গৃহকর্মী তিন সপ্তাহের নীরবতা ভেঙে বলতে পেরেছে, আমি অসুস্থ। এটা তানিয়ার কৃতিত্ব? না রাকিবের? না সেই গৃহকর্মীর, যে তিন সপ্তাহ চুপ থেকেও হাল ছাড়েনি?

তানিয়া জানে না।

তানিয়া যা বানাতে চেয়েছিল, সেটা বানাতে পারেনি। "ধ্বনি" তার স্বপ্ন ছিল। বাংলা ভাষাকে মেশিনের মুখে মানুষের মতো শোনানো। সেই স্বপ্ন অন্য কেউ পূরণ করেছে, বড় কোম্পানি, বড় বাজেট, বড় ডেটাসেট। তানিয়ার ছোট্ট "ধ্বনি" ইতিহাসের পাদটীকাও হবে না।

কিন্তু তানিয়া অন্য কিছু বানিয়েছে। সে জানতো না যে সেটা বানাচ্ছে। ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে যখন বলতো, "কোড লেখার আগে ভাবো কে ব্যবহার করবে, কোড লেখার আগে ভাবো কার ক্ষতি হতে পারে," তখন সে ভাবেনি যে এই কথাগুলো কারো মাথায় সাত বছর থাকবে। সে শুধু পড়াচ্ছিল। যেটুকু জানে, যেটুকু বিশ্বাস করে, সেটুকু বলছিল।

রাকিব সেটা নিয়ে গেছে। সৌদি আরবে। লেবার ক্যাম্পে। একজন নীরব মানুষের কাছে।

এটা কি যথেষ্ট?

তানিয়া জানে না। সত্যি বলতে, সে কোনোদিন জানবে না। "যথেষ্ট" জিনিসটা মাপার কোনো স্কেল নেই। শিহাবের স্যালারি মাপা যায়, গুগলের ইউজার সংখ্যা মাপা যায়, "ধ্বনি"-র ব্যর্থতা মাপা যায়। কিন্তু একটা ক্লাসরুমে বলা একটা কথা, সাত বছর পর, একটা অচেনা দেশে, একজন মানুষকে কথা বলতে দিলো। এটা কোন স্কেলে মাপবে?

তানিয়া উঠে দাঁড়ালো।

টেবিলের কোণে গাছটা আছে। সেই গাছ। ধানমন্ডির অফিস থেকে আনা। মরে গিয়েছিল, বেঁচে উঠেছে। গত বছর ফুল দিয়েছে। এ বছর এখনো ফুল আসেনি, কিন্তু পাতাগুলো ঘন, গাঢ় সবুজ। তানিয়া ড্রয়ার থেকে পানির বোতল বের করলো। বোতলের অর্ধেক পানি টবে ঢেললো। মাটি পানি টেনে নিলো।

তানিয়া গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলো।

সে যা বানাতে চেয়েছিল, সেটা বানাতে পারেনি। সে অন্য কিছু বানিয়েছে। সেটা কী, সে নিজেও ঠিক বলতে পারবে না। হয়তো কিছুই না। হয়তো অনেক কিছু। হিসাব মেলে না। হিসাব হয়তো মেলানোর জিনিস না।

বাইরে সন্ধ্যা নামছে। ইউনিভার্সিটির করিডোরে কারো পায়ের শব্দ। দূরে কোথাও আযানের সুর।

গাছটা তার টবে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। পাতাগুলোতে বিকেলের শেষ আলো।