সেলিনার দুই খাতা মিলিয়ে
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সোহেল ফোন করবে, এটা সেলিনা জানে। সাতটায়। সোহেল ডাক্তার হয়ে গেছে, ঢাকায় থাকে, কিন্তু বৃহস্পতিবার সাতটার নিয়ম ভাঙে না। সেলিনা এটাকে ভালোবাসা বলে না, অভ্যাস বলে। অভ্যাস ভালোবাসার চেয়ে নির্ভরযোগ্য।
ফোন আসতে এখনো দুই ঘণ্টা। সেলিনা ভাবলো আজ কাজটা করবে।
তাকের ওপর থেকে দুটো খাতা নামালো। একটা সরকারি, পাতলা, নীল মলাটের। ওপরে ছাপানো লেখা: "কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার ডেইলি রেকর্ড।" ভেতরে ফরম, ছাপানো ঘর, তারিখ-রোগী নম্বর-লক্ষণ-রেফারেল। অর্ধেকের বেশি পাতা খালি। সেলিনা এই খাতায় শুধু সেটুকুই লেখে যেটুকু সিস্টেমে আপলোড করতে হয়। বাকিটা লেখার জায়গা নেই, কারণ ঘরগুলো ছোট, আর ঘরে যা জিজ্ঞেস করা হয়েছে তার বাইরে কিছু লেখার উপায় নেই।
অন্য খাতাটা মোটা। বাদামি মলাটের, কোনার দিকে ভাঁজ পড়ে গেছে, অনেক পাতা কুঁচকানো। কিছু পাতায় চায়ের দাগ, কিছু পাতায় বৃষ্টির ছিটে শুকিয়ে একটা ঢেউ খেলানো ভাব তৈরি হয়েছে। এই খাতায় সেলিনা সব লেখে। রোগীর নাম, পরিবারের কথা, কে কী বললো, আসল সমস্যা কী, আর সেলিনা কী ভাবলো।
আজ সেলিনা দুটো খাতা পাশাপাশি রাখলো। একটা বাঁ দিকে, একটা ডান দিকে। মাঝখানে ডিভাইসটা, স্ক্রিন বন্ধ।
---
সরকারি খাতার প্রথম পাতা খুললো। তারিখ ১২ মার্চ ২০৪২।
"রোগী ৪৭। মহিলা। বয়স ৩৫। লক্ষণ: জ্বর, দুর্বলতা। ব্যবস্থা: রেফারড টু উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স।"
এইটুকু। একটা মানুষের জীবন এই কয়েকটা শব্দে। রোগী ৪৭। নম্বর। মহিলা। বয়স ৩৫। জ্বর। রেফারড।
সেলিনা মোটা খাতাটা খুললো। একই তারিখ খুঁজে পেলো। সেলিনার হাতের লেখা ছোট, ঘন, প্রতিটা লাইনে একটু বেশি তথ্য ঠেসে দেওয়া।
"রবিনা, ৩৫, তিন সন্তানের মা, স্বামী মাছ ধরে, জ্বর ছিল কিন্তু আসল সমস্যা হলো পানি। বাড়ির পাশের টিউবওয়েলের পানিতে লোহা বেশি, স্বাদ খারাপ, তাই পুকুরের পানি খায়। পুকুরের পানি এই মৌসুমে নোংরা। রবিনার ছোট মেয়েটারও পেট খারাপ হচ্ছে, কিন্তু রবিনা মেয়ের কথা বলেনি, আমি জিজ্ঞেস করায় বলেছে। স্বামী রাতে মাছ ধরতে যায়, সকালে ঘুমায়, রবিনা একা সব সামলায়। জ্বরটা পানিবাহিত হতে পারে। রেফার করেছি, কিন্তু রবিনা যাবে কি না সন্দেহ, কারণ উপজেলায় যেতে নৌকায় তিন ঘণ্টা, তিনটা বাচ্চা নিয়ে যাওয়া কঠিন, স্বামী ঘুমাচ্ছে।"
সেলিনা দুটো পাতার দিকে তাকালো। একটা খাতা বলছে "রোগী ৪৭, জ্বর, রেফারড।" আরেকটা খাতা বলছে একটা মানুষের গল্প, যে গল্পের মধ্যে জ্বরটা শুধু একটা অংশ, বরং ছোট অংশ।
সরকারি খাতা রবিনাকে চেনে না। চেনে একটা নম্বর। মোটা খাতা রবিনাকে চেনে, তার স্বামীকে চেনে, তার পুকুরটাকে চেনে, তার ছোট মেয়ের পেট খারাপটাকে চেনে।
সেলিনা পাতা উলটালো।
---
পরের এন্ট্রি। সরকারি খাতায়: "রোগী ৫১। পুরুষ। বয়স ৬২। লক্ষণ: বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট। ব্যবস্থা: ওরাল স্যালাইন, প্যারাসিটামল। ফলোআপ ৩ দিন।"
মোটা খাতায়: "করিম চাচা, ৬২, একা থাকেন। বউ মারা গেছে গত বছর। ছেলেরা ঢাকায়, একজন গাজীপুরে গার্মেন্টসে, আরেকজন কোথায় জানে না। করিম চাচার বুকে ব্যথা হয়, কিন্তু আমার মনে হয় শরীরের ব্যথা কম, মনের ব্যথা বেশি। একা মানুষ, কথা বলার কেউ নেই। আমি গেলে চা বানান, অনেকক্ষণ কথা বলেন। বুকের ব্যথার চেয়ে একাকীত্ব বড় রোগ। কিন্তু একাকীত্বের কোনো ফরম নেই।"
সেলিনা একটু থামলো। "একাকীত্বের কোনো ফরম নেই।" নিজেই লিখেছিলো, এখন পড়ে একটু অবাক হলো। কথাটা সত্য। সরকারি খাতায় একাকীত্ব লেখার ঘর নেই। ডিভাইসেও একাকীত্ব ইনপুট দেওয়ার অপশন নেই। AI জানে না একাকীত্ব কী। জানবে কীভাবে? একাকীত্ব মাপা যায় না, ছবি তোলা যায় না, রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে না।
পাতা উলটাতে উলটাতে সেলিনা দেখলো দুটো খাতার মধ্যে একটা ফারাক বাড়ছে। সরকারি খাতা যত এগোচ্ছে তত ছোট হচ্ছে। ফরমের ঘরগুলো একই, উত্তরগুলো একই রকম সংক্ষিপ্ত। জ্বর। ডায়রিয়া। রেফারড। ফলোআপ। এক পাতায় পাঁচটা রোগী, পাঁচটা লাইন, পাঁচটা নম্বর।
মোটা খাতায় প্রতিটা মানুষ আলাদা। প্রতিটা জ্বরের পেছনে একটা কারণ, প্রতিটা কারণের পেছনে একটা জীবন। সেলিনা লিখেছে কে কী খায়, কার বাড়িতে পায়খানা আছে কার নেই, কার স্বামী মারধর করে, কার শ্বাশুড়ি ওষুধ খেতে দেয় না, কার বাচ্চা স্কুলে যায় না কারণ স্কুলের রাস্তায় বর্ষায় হাঁটু পানি থাকে।
---
সেলিনা উঠে একগ্লাস পানি খেলো। জানালার পাশে দাঁড়ালো। বাইরে হাওরের পানি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, পানির রঙ ধূসর হচ্ছে। একটা বক এড়িয়ে উড়ে গেলো, ধীরে, যেন তাড়া নেই। চরে বকের তাড়া থাকে না। মাছ আছে, পানি আছে, বক আছে। এই সমীকরণ শত বছরের পুরোনো।
শেলফের ওপর কাচের বয়ামটা আছে। নদীর নুড়িপাথরে ভরা। সোহেল ছোটবেলায় জমিয়েছিলো, নদীর পাড় থেকে কুড়িয়ে এনে বয়ামে রাখতো। সতেরো বছর হলো। কিছু নুড়ির রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, যেগুলো আগে লাল ছিলো সেগুলো এখন বাদামি, যেগুলো সাদা ছিলো সেগুলো হলদে। সোহেল মাঝে মাঝে বলে, "মা, নতুন নুড়ি আনবো তোমার জন্য।" আনে না। আনবেও না। ঢাকার ডাক্তারের নদীর পাড়ে যাওয়ার সময় নেই। সেলিনার কিছু মনে হয় না। পুরোনো নুড়িগুলোই যথেষ্ট। রঙ ফ্যাকাশে হলেও নুড়ি নুড়িই থাকে।
সেলিনা আবার বসলো। খাতা দুটো আবার খুললো।
---
আরেকটা এন্ট্রি। সরকারি খাতায়: "রোগী ৮৩। মহিলা। বয়স ২৮। লক্ষণ: পেটে ব্যথা। ব্যবস্থা: মেটফরমিন রেফারেল। ডায়াবেটিস সন্দেহ।"
মোটা খাতায়: "ফাতেমা, ২৮, আমিনের বউ। পেটে ব্যথা বলেছে, কিন্তু কথা বলতে বলতে বেরিয়ে এলো আসল কথা। আমিন মারে। পেটে লাথি মেরেছে গত সপ্তাহে। ফাতেমা ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না কারণ ডাক্তার জিজ্ঞেস করবে কীভাবে হলো। বলতে পারবে না। আমাকে বলেছে কারণ আমি চরের মানুষ, আমি জানি আমিন কেমন। ডিভাইসে পেটে ব্যথা ইনপুট দিয়েছি, ডিভাইস বলেছে গ্যাস্ট্রিক বা ডায়াবেটিস হতে পারে। ডিভাইস জানে না পেটে লাথি পড়েছে। আমি জানি। কিন্তু সরকারি খাতায় লেখার উপায় নেই, ফরমে 'গৃহ সহিংসতা' বলে কোনো ঘর নেই। ফলোআপে যাবো, ফাতেমাকে আবার দেখবো।"
সেলিনা খাতা থেকে মুখ তুললো।
এই এন্ট্রিটা লেখার সময় সেলিনার হাত কাঁপেনি। সেলিনা কাঁপে না। বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চরে কাজ করেছে, অনেক কিছু দেখেছে। কাঁপার সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু ফাতেমার কথা লেখার পর কলমটা একটু জোরে ধরেছিলো, সেটা মনে আছে। কলম জোরে ধরলে হাতের লেখা একটু গভীর হয়, কাগজে দাগ বসে। এই পাতায় সেই দাগটা এখনো আছে। সেলিনা আঙুল বুলালো। কাগজের ওপর একটা খাঁজ, যেখানে কলমের চাপ পড়েছিলো।
ডিভাইস দেখেছে পেটে ব্যথা। পেটে ব্যথার হাজারটা কারণ থাকতে পারে, ডিভাইস সেগুলো জানে। কিন্তু ডিভাইস জানে না যে আমিন মদ খেয়ে বউকে মারে। এটা কোনো ডেটায় নেই। এটা ফাতেমার চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ফাতেমা যখন "পেটে ব্যথা" বলে তখন তার গলার স্বরটা একটু কাঁপে, সেই কাঁপুনিটা শুনলে বোঝা যায়। ক্যামেরা দিয়ে এটা ধরা যায় না। অ্যালগরিদম দিয়ে এটা বোঝা যায় না।
আরো কয়েকটা পাতা উলটালো। সরকারি খাতায় সব একই ছাঁদে। রোগী নম্বর, লক্ষণ, ব্যবস্থা। মোটা খাতায় প্রতিটা পাতা আলাদা। কোনো পাতায় দুই লাইন, কোনো পাতায় পুরো পৃষ্ঠা ভরা। যে মানুষটা বেশি কথা বলেছে তার জন্য বেশি জায়গা লেগেছে। সরকারি খাতা সবাইকে সমান জায়গা দেয়, যেটা শুনতে ন্যায্য মনে হয়, কিন্তু আসলে ন্যায্য না। কারণ কারো সমস্যা দুই লাইনে বলা যায়, কারো সমস্যা বলতে গেলে পুরো জীবনটা বলতে হয়।
সেলিনা ভাবলো, AI কি কোনোদিন এই ফারাকটা বুঝবে? রোগীর নম্বর আর রোগীর নামের মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা? জ্বরের পেছনে পানি, পেটে ব্যথার পেছনে লাথি, বুকে ব্যথার পেছনে একাকীত্ব। এগুলো কি কোনোদিন কোনো সিস্টেমে ঢুকবে?
হয়তো ঢুকবে। সেলিনা জানে প্রযুক্তি এগোয়। পনেরো বছর আগে যে ট্যাবলেট এসেছিলো সেটা শুধু লক্ষণ পড়তে পারতো। এখনকার ডিভাইস ছবি দেখে রোগ চেনে। আরো পনেরো বছর পর হয়তো কণ্ঠস্বরের কাঁপুনি শুনে বুঝবে রোগী মিথ্যা বলছে কি না। হয়তো।
কিন্তু রবিনার পুকুরের পানিটা? আমিনের মদ খাওয়াটা? করিম চাচার একাকীত্বটা? এগুলো বোঝার জন্য চরে থাকতে হয়। মানুষের বাড়িতে যেতে হয়। চা খেতে হয়। বসতে হয়। শুনতে হয়। যন্ত্র শোনে না। যন্ত্র গোনে।
---
ঘড়িতে সাতটা বাজলো। ফোন বাজলো। সোহেল।
"আম্মু।"
"বলো।"
"কেমন আছো?"
"আছি। তুই কেমন?"
"ভালো। মা, তোমার ওষুধগুলো পাঠিয়েছি কুরিয়ারে। থাইরয়েডেরটা আর ক্যালসিয়ামটা। শনিবারের মধ্যে পাবে।"
"পাবো।"
সোহেল এখন ঢাকায় একটা হাসপাতালে কাজ করে। ইন্টার্নি শেষ করে জুনিয়র কনসালট্যান্ট। চরে এই ওষুধ পাওয়া যায় না। উপজেলায় পাওয়া যায়, কিন্তু যেতে অর্ধেক দিন লাগে, আর থাইরয়েডের ওষুধটা প্রায়ই স্টকে থাকে না। তাই সোহেল পাঠায়। প্রতি মাসে। সেলিনা জিজ্ঞেস করে না দাম কতো। সোহেলও বলে না। মায়ের জন্য ওষুধ কেনা একটা খরচ না, একটা ঋণ পরিশোধ। সোহেল এটা জানে, সেলিনাও জানে, দুজনের কেউ কথাটা বলে না।
"মা, আজ কী করলে?"
সেলিনা বললো, "দুটো খাতা মিলিয়ে দেখলাম।"
"কোন দুটো?"
"সরকারি খাতা আর আমার আসল খাতা। পাশাপাশি রেখে পড়লাম।"
সোহেল একটু চুপ। তারপর বললো, "কী দেখলে?"
"একটা খাতায় মানুষ নম্বর। আরেকটা খাতায় মানুষ মানুষ। একটা খাতায় লেখা রোগী ৪৭, জ্বর, রেফারড। আরেকটা খাতায় লেখা রবিনা, তিন সন্তানের মা, পুকুরের পানি খায়, স্বামী মাছ ধরে, জ্বর আছে কিন্তু আসল সমস্যা পানি।"
সোহেল বললো, "আম্মু, তুমি দুটোই রেখো।"
"কেন?"
"কারণ সরকারি খাতা না থাকলে সিস্টেম চলে না। আর তোমার খাতা না থাকলে সত্য থাকে না।"
সেলিনা একটু ভাবলো। ছেলে ডাক্তার হয়ে গেছে, কথাও ডাক্তারের মতো বলে। পরিষ্কার, গোছানো। কিন্তু কথাটা ঠিক।
"রাখবো," সেলিনা বললো। "কারণ সত্য কখনো একটা খাতায় ধরে না।"
সোহেল কিছু বললো না। শুধু একটা শব্দ করলো, "হুম।" সেই "হুম" টা সোহেলের বাবার মতো, এটা সেলিনা ছাড়া আর কেউ জানে না। আমির অনেক কিছু ভুল করেছে, কিন্তু "হুম" বলার ভঙ্গিটা সোহেলের মধ্যে রেখে গেছে। সেলিনা কখনো বলেনি, তোর বাবার মতো "হুম" বলিস। কিছু কিছু কথা না বলাই ভালো। বললে সোহেল হয়তো "হুম" বলা বন্ধ করে দেবে, আর সেলিনা সেটা চায় না।
"মা, আজ হাসপাতালে একটা মিটিং ছিলো। ন্যাশনাল হেলথ ডেটা নিয়ে। ঢাকা থেকে সব জেলার ডেটা দেখে। তোমাদের চরের ডেটাও আসে।"
"কী দেখে?"
"রোগের ধরন, রেফারেলের সংখ্যা, ফলোআপ। সব নম্বরে।"
সেলিনা বললো, "নম্বরে।"
"হ্যাঁ।"
"তোরা কি কখনো ভাবিস যে নম্বরের পেছনে কী আছে?"
সোহেল একটু চুপ। তারপর বললো, "ভাবি, মা। কিন্তু নম্বর ছাড়া পলিসি হয় না। নম্বর লাগে।"
"লাগে। কিন্তু শুধু নম্বর দিয়ে সত্য হয় না।"
সোহেল কিছু বললো না। হয়তো ভাবছে। হয়তো হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে, পাশ দিয়ে নার্স যাচ্ছে, কেউ ডাকছে। সোহেলের জীবন এখন ব্যস্ত, সেলিনার জীবনের চেয়ে আলাদা ব্যস্ত। ঢাকার ব্যস্ততা আর চরের ব্যস্ততা এক জিনিস না।
"মা, নুড়িপাথরের বয়ামটা আছে?"
"আছে।"
"নতুন নুড়ি আনবো তোমার জন্য।"
সেলিনা হাসলো। "আনো।"
দুজনেই জানে আনা হবে না। কিন্তু কথাটা বলাটাই একটা নুড়ি, সেটা বয়ামে রাখার দরকার নেই।
ফোন রাখলো সোহেল।
---
সেলিনা খাতা দুটো বন্ধ করলো। পাশাপাশি রাখলো তাকে। পাতলাটা বাঁয়ে, মোটাটা ডানে। মাঝখানে ডিভাইস। তিনটা মিলে একটা সেলিনা। কোনো একটা বাদ দিলে হিসাবটা মেলে না।
সেলিনা ভাবলো, একদিন হয়তো কেউ এসে বলবে এই মোটা খাতাটা দিন, আমরা স্ক্যান করে সিস্টেমে ঢুকাবো। তখন কী হবে? রবিনার পুকুরের পানি কি একটা ডেটাপয়েন্ট হয়ে যাবে? আমিনের মদ খাওয়া কি একটা ভেরিয়েবল? করিম চাচার একাকীত্ব কি একটা স্কোর?
হতে পারে। কিন্তু তখনও কিছু একটা বাদ যাবে। ফাতেমার গলার কাঁপুনিটা বাদ যাবে। রবিনা যে মেয়ের কথা নিজে থেকে বলেনি, সেটা বাদ যাবে। করিম চাচা যে চা বানাতে বানাতে চোখ মুছলেন, সেটা বাদ যাবে। এগুলো কোনো স্ক্যানে ধরা পড়ে না। এগুলো ধরা পড়ে যখন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সামনে বসে।
সেলিনা বিছানায় গেলো। শুয়ে পড়লো। ক্লান্ত। সারাদিন চরে ঘুরেছে, পাঁচটা বাড়ি, পাঁচটা পরিবার। প্রতিটা বাড়িতে ডিভাইস দিয়ে ছবি তুলেছে, স্টেথোস্কোপ দিয়ে শুনেছে, খাতায় লিখেছে। তিনটা কাজ, তিনটা যন্ত্র, তিনটা ভাষা। ডিভাইসের ভাষা সংখ্যা। স্টেথোস্কোপের ভাষা শব্দ। খাতার ভাষা গল্প। তিনটা মিলে একটা সত্য তৈরি হয়, কিন্তু সত্যটা তিনটার কোনোটাতেই পুরোপুরি নেই।
বাইরে অন্ধকার। হাওরের পানিতে কোনো আলো নেই আজ, চাঁদ নেই, তারাও মেঘে ঢাকা। শুধু কোথাও একটা তক্তা ভেজা কাঠের ওপর ঠকঠক করছে, নৌকার গায়ে পানি লাগছে। একঘেয়ে, একটানা, কোনো অর্থ নেই এই শব্দের, কিন্তু চরের রাতে এই শব্দ না থাকলে ঘুম আসে না।