জাহিদের চিঠি
**সিরিজ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ | পর্ব ৮৫ | অধ্যায় ৯: হিসাব, ২০৪২**
---
জানালার ধারে প্রতিদিন সকালে একটা শালিক আসে। কখন থেকে শুরু হয়েছে জাহিদ মনে করতে পারে না। হয়তো মাস দুয়েক আগে। হয়তো তিন। সময়ের হিসাব তার আর ঠিক থাকে না। কিন্তু শালিকটা আসে। জানালার লোহার গ্রিলে বসে, মাথা কাত করে ঘরের দিকে তাকায়, যেন কিছু বলতে চায় কিন্তু ভাষা জানে না।
জাহিদ প্রথম দিকে খেয়াল করেনি। তারপর একদিন ভাত খেতে খেতে দেখল, পাখিটা গ্রিলে বসে আছে। একটু ভাত ছুড়ে দিল। শালিক উড়ে গেল। পরদিন আবার এলো। আবার ভাত ছুড়ল। এবার উড়ে গেল না, কিন্তু কাছেও এলো না। ভাত পড়ে রইল গ্রিলের ওপর। জাহিদ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে শালিক ভাত খেয়ে নিল।
এভাবে দিনে দিনে দূরত্ব কমেছে। এখন শালিক তার হাত থেকে ভাত নেয়। জাহিদ হাত বাড়ায়, আঙুলের ডগায় দুটো ভাতের দানা, শালিক গ্রিলের ওপর থেকে ঝুঁকে ঠোঁট দিয়ে তুলে নেয়। জাহিদের আঙুলে ঠোঁটের ছোঁয়া লাগে। হালকা, শুকনো, খসখসে। পাখিটা তার দিকে তাকায়। জাহিদও তাকায়। দুজনের মধ্যে কোনো কথা হয় না। কোনো চুক্তি নেই। শুধু একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছে, যেটা দুজনেই মানছে।
---
আজ সকালে শালিক এসেছে। ভাত দিয়েছে। শালিক চলে গেছে। জাহিদ চায়ের কাপ নিয়ে বসে আছে। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু সে খেয়াল করেনি। সে অন্য জিনিস নিয়ে ভাবছে।
টেবিলের ওপর একটা খাতা। শক্ত মলাটের, নীল রঙের। কোণাগুলো ক্ষয়ে গেছে, মলাট ভাঁজ হয়ে উঠেছে, মাঝখানে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। এই খাতায় জাহিদ বারো বছর ধরে হিসাব লিখেছে। কত টাকা পাঠিয়েছে, কবে পাঠিয়েছে, কোন এজেন্সি দিয়ে পাঠিয়েছে, কত কমিশন কেটেছে। প্রতিটা লাইনে তারিখ, পরিমাণ, প্রাপক। কলাম টানা, সোজা লাইন, পরিষ্কার হাতের লেখা। জাহিদ স্কুলে ভালো ছাত্র ছিল না, কিন্তু তার হাতের লেখা সুন্দর ছিল। মাস্টারসাহেব বলতেন, "জাহিদ, তোর মাথায় কিছু না থাকলেও হাতে আছে।"
খাতার শেষের দিকে কয়েকটা পাতা খালি আছে। লাইন টানা শেষ হয়ে গেছে, কলামের দাগ নেই, শুধু সাদা কাগজ। এই পাতাগুলো বারো বছর ধরে খালি ছিল। জাহিদ ভেবেছিল আরো পাঠাবে, আরো হিসাব লিখবে, কলামগুলো শেষ পাতা পর্যন্ত ভরে যাবে। সেটা হয়নি।
জাহিদ খাতাটা খুলল। রাবার ব্যান্ড খুলতে একটু কষ্ট হলো। ডান হাতের আঙুলগুলো আর আগের মতো কাজ করে না। ক্রেনের দড়ি ধরে ধরে আঙুলের জোড়াগুলো শক্ত হয়ে গেছে। সকালবেলা বিশেষ করে, আঙুল বাঁকাতেই কষ্ট হয়।
সে শেষের দিকের খালি পাতায় গেল। ডান পাতাটা সাদা। বাঁ পাতায় শেষ হিসাবের এন্ট্রি, তারিখ ২০৩৪, আটই মার্চ। পঁচিশ হাজার টাকা, দুবাই এক্সচেঞ্জ, রশিদা বেগম। এটাই শেষ। এর পরে আর কোনো এন্ট্রি নেই। কারণ এর পরে জাহিদ ফিরে এসেছে। ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে।
জাহিদ সাদা পাতায় কলম রাখল। একটা বলপেন, কালো কালি, সস্তা, তিন টাকায় কেনা। সে একটু ভাবল। তারপর লিখতে শুরু করল।
---
সে কখনো চিঠি লেখেনি। রশিদাকে ফোন করত। মাসে একবার, পরে দুই মাসে একবার, পরে ঈদে আর পহেলা বৈশাখে। ফোনে বলার কিছু থাকত না। "কেমন আছ?" "আছি।" "ছেলেমেয়ে?" "ভালো।" "টাকা পেয়েছ?" "হ্যাঁ।" ব্যস। দুজনের মধ্যে কথা ফুরিয়ে গেছিল বহু আগে। যে কথাগুলো বলা দরকার ছিল সেগুলো কেউ বলেনি, আর যেগুলো বলত সেগুলোর কোনো মানে ছিল না।
চিঠিও কাউকে লেখা না। ঠিকানা নেই। প্রাপকের নাম নেই। জাহিদ শুধু লিখছে।
"আমি বত্রিশ বছর বয়সে দেশ ছেড়েছিলাম। ইমরানের বয়স তখন চার। সাবিনা দুই। রশিদার বয়স কত ছিল সেটা আমি কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি। বিয়ের সময় শুনেছিলাম আঠারো, কিন্তু পরে রশিদা বলেছিল ষোলো ছিল। আমি কিছু বলিনি। কী বলব? আমার নিজের বয়সই তো ঠিক ছিল না কাগজে।"
জাহিদ থামল। কলমের ডগা কাগজে রেখে বসে রইল। ঘরে অন্য কোনো শব্দ নেই। পাশের ঘরে রশিদা নামাজ পড়ছে, মাঝে মাঝে তার ফিসফিস আওয়াজ আসে। জাহিদ আবার লিখল।
"দুবাইয়ে প্রথম দুই বছর কনস্ট্রাকশনে কাজ করেছি। ইট বহন, সিমেন্ট মেশানো, রড বাঁকানো। তারপর ক্রেন অপারেটরের হেলপার হলাম। তারপর নিজেই ক্রেন চালাতে শিখলাম। কেউ শেখায়নি। দেখে দেখে শিখেছি। ক্রেন চালানো কঠিন কাজ না, ধৈর্যের কাজ। ওপরে বসে থাকতে হয়, নিচের লোক সিগন্যাল দেয়, তুমি লিভার টানো। পঞ্চাশ ফুট, আশি ফুট, একশো ফুট। উপরে যত উঠবে, মানুষগুলো তত ছোট হবে। একসময় ওরা পিঁপড়ার মতো লাগে। তুমি পিঁপড়াদের জন্য ইট তুলছ, রড তুলছ, কংক্রিটের বালতি তুলছ।"
"ক্রেনটা চালাত একটা সফটওয়্যার। আমি শুধু বসে থাকতাম। যন্ত্র নিজে বুঝে নিত কোথায় যেতে হবে, কতটুকু ভার নিতে পারবে, কত স্পিডে ঘুরবে। আমাকে শুধু ইমার্জেন্সি বাটনের কাছে বসে থাকতে হতো। বছরে একবারও চাপতে হয়নি। তারপর একদিন সুপারভাইজার বলল, ইমার্জেন্সি বাটনও এখন অটো। তুমি আর লাগবে না।"
"আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে আমি কী করব? সুপারভাইজার বলল, দেশে যাও।"
---
জাহিদ কলম রেখে উঠে দাঁড়াল। কোমরে ব্যথা। চুয়ান্ন বছর বয়সে এই ব্যথা শুরু হয়েছে, তারপর থেকে কমেনি। সে ধীরে ধীরে রান্নাঘরে গেল, পানি খেল, আবার ফিরে এলো। বসল। খাতাটা যেমন ছিল তেমনই আছে, কলম পাশে। সে আবার কলম তুলল।
"দেশে ফিরে বাড়ি চিনতে পারিনি। বাড়ি বলতে আগে যেটা ছিল, টিনের চাল, মাটির দেয়াল, সেটা আর নেই। রশিদা দোতলা করেছে। আমার পাঠানো টাকায় না, নিজের রোজগারে। সে সেলাই শিখেছে, তারপর মেশিন কিনেছে, তারপর আরো মেশিন কিনেছে। এখন গ্রামের বেশিরভাগ মেয়ে তার কাছে কাজ শেখে। কেউ কেউ তার কাছে কাজ করে। রশিদা বলেছে, 'তোমার টাকা দিয়ে সংসার চালাতে পারতাম, কিন্তু তোমার টাকার ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে তুমি ফেরত আসলে আমি কী করতাম?' আমি বুঝতে পারিনি সে কী বলতে চাইছে। পরে বুঝেছি। সে আমার ফেরত আসার জন্য তৈরি হচ্ছিল। সে জানত, একদিন না একদিন আমাকে ফেরত পাঠাবে।"
"কে ফেরত পাঠাবে সেটা সে জানত না। আমিও জানতাম না। একটা যন্ত্র। একটা সফটওয়্যার। একটা প্রোগ্রাম যেটা ক্রেন চালানো শিখে গেছে আমার চেয়ে ভালো। যন্ত্রটা ক্লান্ত হয় না, ঘুমায় না, পানি খায় না, বাড়িতে ফোন করে না, ঈদে ছুটি চায় না। যন্ত্রটা শুধু কাজ করে। আমি বারো বছর যা করেছি, সেটা যন্ত্র একদিনে শিখে গেছে। বারো বছরের অভিজ্ঞতা, পঞ্চাশ ফুট উচ্চতায় বসে থাকার ভয় জয় করা, বাতাসে দুলে যাওয়া ক্রেনকে স্থির রাখা, এসব কিছুর দাম একদিনে শূন্য হয়ে গেছে।"
জাহিদ আবার থামল। বাইরে একটা রিকশার ঘণ্টি বাজল। কোথাও একটা মোরগ ডাকল। সকাল হয়ে যাচ্ছে, রোদ উঠছে, ঘরে আলো ঢুকছে।
"ফিরে এসে চায়ের দোকান দিলাম। ছোট একটা দোকান, রাস্তার ধারে, তিনটা বেঞ্চ। চা বানাতে পারি, এটুকুই জানি। দুবাইয়ে ক্যাম্পে নিজেদের চা বানাতে হতো, সেখানে শিখেছি। দোকানে লোক আসত। চা খেত। গল্প করত। আমি চুপচাপ চা বানাতাম। কিন্তু তিন বছরও টেকেনি। পাশে একটা মেশিন বসল। মেশিনে চা হয়। দুধ চা, আদা চা, লেবু চা, সব। কুড়ি সেকেন্ডে। আমার চায়ের স্বাদ ভালো ছিল, কিন্তু কুড়ি সেকেন্ডের সাথে তো পারব না।"
"দোকান বন্ধ করে দিলাম। এখন যা পাই তাই করি। কারো বাড়ির দেয়ালে রং, কারো ছাদে চুন, কারো বাগানে মাটি কাটা। শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না, কিন্তু না করে তো পারি না। রশিদার রোজগারে সংসার চলে, কিন্তু রশিদার টাকায় বসে খেতে গেলে নিজেকে কী বলব?"
---
রশিদা নামাজ শেষ করে বেরিয়ে এলো। জাহিদকে খাতা নিয়ে বসে থাকতে দেখে কিছু বলল না। রশিদা বোঝে। সব বোঝে। সে কখনো জিজ্ঞেস করে না জাহিদ কী করছে, কেন করছে। শুধু দেখে। মাঝে মাঝে চা এনে রেখে যায়, মাঝে মাঝে খাবার। আজ সে রুটি আর ডিম ভাজি এনে টেবিলের এক কোণায় রেখে গেল। জাহিদ তাকাল না।
"ইমরান গত বছর সিঙ্গাপুর গেছে। আমি বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, থাক, এখানে কিছু একটা করবি। ইমরান বলল, এখানে কী করব? আমি বললাম, তোর মায়ের কাজে সাহায্য কর। ইমরান বলল, মায়ের কাজে আমার দরকার নেই, মায়ের কাছে মেশিন আছে, প্রোগ্রাম আছে, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট আছে। আমি বললাম, অন্য কিছু কর। ইমরান বলল, অন্য কী? আমি কিছু বলতে পারলাম না। কারণ সত্যিই আমি জানি না অন্য কী করবে। আমি নিজেই তো জানি না আমি কী করব।"
"ইমরান সিঙ্গাপুরে একটা ওয়্যারহাউসে কাজ করে। সে বলে ওয়্যারহাউসে এখনো মানুষ লাগে, রোবট সব কাজ করতে পারে না। আমি বলি, এখনো। ইমরান চুপ করে যায়।"
"আমি বত্রিশে দেশ ছেড়েছিলাম, ইমরান গেছে তেইশে। আমি বারো বছর ছিলাম, ইমরান কত বছর থাকবে জানি না। আমাকে ফেরত পাঠিয়েছে একটা যন্ত্র। ইমরানকেও একদিন ফেরত পাঠাবে। হয়তো আরো তাড়াতাড়ি। কারণ যন্ত্র প্রতিদিন আরো একটু বেশি শিখছে। যন্ত্রের কোনো ক্লান্তি নেই।"
জাহিদ একটু থামল। রুটি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সে এক টুকরো ছিঁড়ে মুখে দিল। চিবাতে চিবাতে আবার লিখল।
"সাবিনা ঢাকায় থাকে। সে ভালো পড়াশোনা করেছে, ভালো চাকরি করে। সে মাঝে মাঝে টাকা পাঠায়। আমি নিই না। রশিদা নেয়। রশিদা বলে, মেয়ের টাকা নিতে লজ্জা কীসের? আমি বলি, লজ্জা না, অভ্যাস। আমি টাকা পাঠানোর মানুষ, টাকা নেওয়ার না।"
"কিন্তু এখন আমি কোনোটাই না।"
---
জাহিদ কলম রেখে হাত দিয়ে চোখ মুছল। চোখে পানি এসেছে কি না বোঝা গেল না। হয়তো এসেছে, হয়তো আসেনি। আলো চোখে লাগছিল হয়তো।
সে আবার কলম তুলল। ধীরে ধীরে, যেন প্রতিটা শব্দ মাটি খুঁড়ে বের করছে।
"আমি বারো বছর দেশের বাইরে ছিলাম। একটা যন্ত্র আমাকে ফেরত পাঠিয়েছে। সেই যন্ত্র আমাকে চেনে না। আমার দেশও আমাকে চেনে না। শুধু রশিদা চেনে।"
"রশিদা জানে আমি সকালে কোন পাশে ফিরে ঘুমাই। জানে আমার হাঁটুতে ব্যথা করলে আমি কেমন করে পা সোজা করি। জানে আমি চায়ে চিনি কম দিই কিন্তু মিষ্টি জিনিস পছন্দ করি। জানে আমি রাতে ঘুমের মধ্যে কথা বলি, আর বেশিরভাগ সময় ক্রেনের কথা বলি, যে ক্রেন আর নেই, যে উচ্চতা আর নেই। রশিদা এসব জানে কারণ রশিদা বারো বছর অপেক্ষা করেছে। অপেক্ষা করতে করতে সে আমাকে চিনে গেছে, যেভাবে কেউ একটা পুরনো গান চেনে, না শুনেও, শুধু মনে রেখে।"
"আমি এই চিঠি কাউকে পাঠাব না। এটা কারো কাছে না। এটা শুধু একটা হিসাব। শেষ হিসাব। এই খাতায় আমি যত টাকা পাঠিয়েছি তার হিসাব আছে। কিন্তু যা হারিয়েছি তার হিসাব কোথায়? ইমরানের প্রথম স্কুলে যাওয়া, সাবিনার প্রথম কথা বলা, রশিদার চুলে প্রথম পাক ধরা, এগুলোর কলাম কোথায়? এগুলো কোন খাতায় লেখা আছে?"
"কোনো খাতায় না। কোথাও না।"
---
জাহিদ কলম রাখল। রুটির বাকিটুকু খেল। চা ঠান্ডা, সেটাও খেল। তারপর খাতাটা বন্ধ করল। যে পাতায় লিখেছে সেটা ভাঁজ করল একবার, দুবার। ভাঁজ করা কাগজটা খাতার ভেতরে রাখল, ঠিক শেষ হিসাবের পাতার পরে। তারপর রাবার ব্যান্ড দিয়ে খাতাটা বাঁধল।
এবার চিরকালের মতো।
সে খাতাটা তুলে আলমারির ওপরের তাকে রাখল। যেখানে পুরনো জিনিসপত্র থাকে, যেখানে কেউ হাত দেয় না। খাতাটা সেখানে থাকবে। কেউ পড়বে না। কেউ জানবে না। হিসাব শেষ।
জাহিদ জানালার কাছে গেল। শালিক চলে গেছে। গ্রিলের ওপর একটা ভাতের দানা পড়ে আছে, শালিক খায়নি। কাল সকালে আবার আসবে। জাহিদ জানে। শালিকও জানে।
বাইরে রোদ উঠেছে। রাস্তায় একটা সাইকেল যাচ্ছে, চেইনের শব্দ হচ্ছে। জাহিদ দাঁড়িয়ে আছে জানালার কাছে, হাত দুটো গ্রিলের ওপর, মুখে সকালের আলো।