বাংলাদেশ কী হারালো

পর্ব ৮৭ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

--- title: "বাংলাদেশ কী হারালো" series: "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ" part: 87 date: "2026-03-18" ---

হিসাব

কিছু জিনিস হারায় শব্দ করে। ঘরবাড়ি ভাঙে, নদী ভাঙে, মানুষ চিৎকার করে। সেই হারানোর একটা আওয়াজ আছে, একটা ওজন আছে। কিন্তু কিছু জিনিস হারায় চুপচাপ। কেউ টেরও পায় না। একদিন হঠাৎ খেয়াল হয়, সেই জিনিসটা আর নেই। কবে গেছে মনে নেই। কীভাবে গেছে জানা নেই। শুধু নেই।

এটা সেই হিসাবের গল্প।

---

### ১. তাঁতি

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে আবদুল করিম তাঁতি। বাবার বাবার বাবা তাঁত বুনেছে। করিমও বুনেছে চল্লিশ বছর। জামদানির একটা শাড়ি বুনতে তার সময় লাগে তিন সপ্তাহ। প্রতিটা সুতো সে নিজের হাতে গোনে। চোখ বন্ধ করলেও বুনতে পারে, আঙুলে সুতোর স্পর্শই যথেষ্ট। করিমের বাবা বলতো, তাঁতের কাঠে ঘাম মিশলে কাপড়ে আত্মা আসে। করিম এই কথাটা বিশ্বাস করতো কি না জানা নেই, কিন্তু সে বুনতে বুনতে ঘামতো ঠিকই।

২০৩৯ সালে একটা কোম্পানি এলো। তরুণ ছেলেমেয়ে, ল্যাপটপ হাতে। তারা AI দিয়ে জামদানির প্যাটার্ন স্ক্যান করেছে। হাজার বছরের নকশা ডিজিটাল হয়ে গেছে দুই ঘণ্টায়। তারপর সেই প্যাটার্ন অটোমেটেড লুমে ঢুকিয়ে শাড়ি বানানো শুরু হলো। তিন সপ্তাহের জায়গায় তিন ঘণ্টা। দামও এক তৃতীয়াংশ। কোম্পানির ছেলেমেয়েরা খুশি ছিল। তারা বলেছিল এটা "হেরিটেজ প্রিজার্ভেশন"। করিম শব্দটা বোঝেনি।

করিম প্রথমে ভেবেছিল মানুষ বুঝবে। হাতের কাজ আর মেশিনের কাজ তো এক না। কিন্তু ক্রেতারা দেখলো দুটো শাড়ি পাশাপাশি রাখলে ফারাক বোঝা যায় না। তখন কেন তিন গুণ দাম দেবে? করিম বোঝানোর চেষ্টা করেছে। বলেছে, হাতের শাড়িতে ছোট ছোট অসমতা থাকে, সেটাই তার সৌন্দর্য। কিন্তু অসমতাকে সৌন্দর্য বলতে কেউ রাজি হয়নি। অসমতা মানে ত্রুটি, মেশিন ত্রুটি করে না।

করিম এখনো বেঁচে আছে। তাঁতটাও আছে। সুতোও আছে। শুধু কেউ আর অর্ডার দেয় না। সে সকালে উঠে তাঁতের সামনে বসে। অভ্যাসবশত। তাঁতে কিছু নেই, খালি ফ্রেম। সে বসে থাকে। বিকেলে উঠে যায়। মাঝে মাঝে শূন্য তাঁতে হাত বোলায়, যেভাবে মানুষ পুরোনো আসবাবে হাত রাখে।

তার ছেলে ঢাকায় রাইড-শেয়ারিং করে।

---

### ২. চিঠি লেখক

ঢাকা জিপিওর সামনে ছিল আলমগীর হোসেন। তিরিশ বছর ধরে সে মানুষের চিঠি লিখে দিতো। যারা লিখতে পারে না, যারা লিখতে জানে কিন্তু কী লিখবে বুঝতে পারে না, তারা আসতো আলমগীরের কাছে। একটা ভাঙা টেবিল, একটা কলম, একটা দোয়াত। এই তার সংসার।

আলমগীর শুধু চিঠি লিখতো না, সে মানুষের কথা শুনতো। একজন মা বলতো ছেলের কাছে কী লিখবে, কিন্তু কথার ফাঁকে কান্না চলে আসতো। আলমগীর চুপ করে বসে থাকতো। কান্না থামলে আবার লিখতো। সে জানতো কোন কথা চিঠিতে লিখতে হয় আর কোন কথা শুধু বলার জন্য, লেখার জন্য না। কখনো কখনো সে চিঠিতে এমন কথা যোগ করতো যা মানুষ বলেনি কিন্তু বলতে চেয়েছিল। "তোমার জন্য খুব কষ্ট পাই" টাইপ কিছু। মানুষ পড়ে বলতো, "হ্যাঁ, এটাই বলতে চেয়েছিলাম।" আলমগীর মাথা নাড়তো।

এখন সরকারি সেবা অনলাইন। দরখাস্ত লেখে চ্যাটবট। ফর্ম পূরণ করে অ্যাপ। যাদের স্মার্টফোন নেই তাদের জন্য ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে কিয়স্ক আছে, স্ক্রিনে বাংলায় কথা বললেই চিঠি তৈরি হয়ে যায়। ভুল হলে আবার বলো, ঠিক করে দেবে। চিঠির ভাষা পরিষ্কার, ব্যাকরণ নির্ভুল, কিন্তু সব চিঠি একরকম শোনায়। কান্না শুনলে বলে, "দুঃখিত, আমি বুঝতে পারিনি। আবার বলুন।"

আলমগীর এখনো জিপিওর সামনে বসে। টেবিলটা আছে। কলম আছে। কাগজ আছে। দোয়াতে কালি শুকিয়ে আসছে, নতুন কেনার দরকার পড়ে না তেমন। মাঝে মাঝে কেউ আসে, বেশিরভাগ বৃদ্ধ, যারা মেশিনে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করে। আলমগীর তাদের চিঠি লিখে দেয়। তারপর আবার অপেক্ষা করে। দুপুরে টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমায়। জিপিওর সামনে দিয়ে মানুষ যায়, কেউ তাকায় না।

---

### ৩. হকার

রাজু পেপার ফেলতো। সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে সাইকেলে করে পত্রিকা নিয়ে বের হতো। ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর। প্রতিটা বাড়ির গেটে গেটে পেপার ফেলতো। কোন বাড়িতে কোন পত্রিকা যায় সব তার মুখস্থ। ৩২ নম্বর বাড়িতে প্রথম আলো আর যুগান্তর। ৪৭ নম্বরে ডেইলি স্টার আর ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস। ৫১ নম্বরে শুধু ইত্তেফাক, কারণ বাড়ির বুড়ো মানুষটা সেটাই পড়ে আসছে পঞ্চাশ বছর ধরে।

রাজু জানতো কোন বাড়ির দারোয়ান কখন চা খায়, কোন বাড়ির কুকুর হাড্ডি পেলে চুপ থাকে, কোন গলির মাথায় ভোরবেলা পানি জমে তাই সাইকেল ঘুরিয়ে যেতে হয়। এই জ্ঞান কোনো বইতে নেই, কোনো ডেটাবেসে নেই। এটা শুধু রাজুর ছিল।

রাজুর সাইকেলের ক্যারিয়ারে একটা হলুদ রঙের টিনের বাক্স ছিল। সেই বাক্সে সে পত্রিকা রাখতো। বাক্সটা তার বাবারও ছিল। বাক্সের গায়ে একটা আঁচড় আছে, তার বাবা একবার পড়ে গিয়ে লেগেছিল।

পত্রিকা এখন আর ছাপা হয় না। দুই-তিনটা হয়তো এখনো হয়, কিন্তু সেগুলোও পাতলা, ভেতরে বিজ্ঞাপন বেশি খবর কম। বেশিরভাগ মানুষ সকালে উঠেই ফোনে নোটিফিকেশন দেখে। অ্যালগরিদম ঠিক করে দেয় কোন খবর আগে দেখাবে, কোনটা পরে। রাজুর দরকার নেই। কারো দরকার নেই। ৫১ নম্বরের বুড়ো মানুষটা মারা গেছে গত বছর। তার ছেলে ইত্তেফাকের সাবস্ক্রিপশন বাতিল করে দিয়েছে।

রাজু এখন চায়ের দোকানে কাজ করে। সকাল পাঁচটায় এখনো তার ঘুম ভাঙে। অভ্যাস। সে শুয়ে থাকে। বাইরে সাইকেলটা দাঁড়িয়ে আছে। হলুদ টিনের বাক্সটা এখনো ক্যারিয়ারে বাঁধা। ভেতরে কিছু নেই।

---

### ৪. কবিরাজ

পাবনার ঈশ্বরদীতে হরিপদ ঘোষ কবিরাজি করতো। তার বাবাও করতো, তার দাদাও। তিন পুরুষের জ্ঞান। কোন গাছের পাতা কোন রোগে কাজ করে, কোন শেকড় কখন তুলতে হয়, পূর্ণিমায় না অমাবস্যায়, এসব তার জানা। সে একটা পুরোনো খাতায় সব লিখে রাখতো। খাতাটা তার দাদার শুরু করা, বাবা যোগ করেছে, হরিপদ আরো যোগ করেছে। তিন প্রজন্মের হাতের লেখা একই খাতায়, কালির রঙ তিন রকম। গ্রামের মানুষ অসুখ হলে প্রথমে হরিপদের কাছে আসতো। হরিপদ পালস দেখতো, জিহ্বা দেখতো, চোখ দেখতো। তারপর পাতা বেটে ওষুধ দিতো।

হরিপদর সব ওষুধ কাজ করতো না। সে নিজেও জানতো। কিছু রোগ তার আয়ত্তের বাইরে। সেসব ক্ষেত্রে সে বলতো, "ডাক্তারের কাছে যান।" এই সততাটা তার ছিল।

এখন গ্রামে সবার হাতে ফোন। ফোনে স্বাস্থ্য অ্যাপ। জ্বর হলে অ্যাপে লক্ষণ লেখো, অ্যাপ বলে দেবে কী করতে হবে। টেলিমেডিসিন। AI ডায়াগনোসিস। গ্রামের মানুষ এখন হরিপদর কাছে আসে, হরিপদ ওষুধ দেয়, তারপর তারা বাড়ি গিয়ে অ্যাপে চেক করে। অ্যাপ যদি অন্য কথা বলে, তারা হরিপদর ওষুধ ফেলে দেয়। কেউ কেউ ফেরত এসে বলে, "অ্যাপ বলেছে এটা খাওয়া ঠিক হবে না।"

হরিপদ কিছু বলে না। সে জানে অ্যাপের কিছু কথা ঠিক, কিছু ভুল। কিন্তু অ্যাপের সাথে তর্ক করার উপায় নেই। অ্যাপের পেছনে কোনো মুখ নেই, কোনো চোখ নেই। শুধু একটা স্ক্রিন আর কিছু অক্ষর।

হরিপদ এখনো ওষুধ বানায়। উঠোনে তুলসী গাছ আছে, নিম আছে, থানকুনি আছে। সে পাতা ছেঁড়ে, বাটে, রোদে শুকায়। কেউ আসুক বা না আসুক।

---

### ৫. রিকশা

ঢাকার রিকশা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর যানবাহন ছিল। এটা আমার কথা না, বিদেশিরা বলতো। রিকশার পেছনে আঁকা ছবি, ঝলমলে রঙ, টিনের প্যানেলে তাজমহল আর ময়ূর আর সিনেমার নায়িকা। প্রতিটা রিকশা একটা চলমান চিত্রকর্ম। আর রিকশাওয়ালারা ছিল ঢাকার রক্তপ্রবাহ। তারাই এই শহরকে চলমান রাখতো, সরু গলি থেকে প্রশস্ত রাস্তা, সর্বত্র।

কালু মিয়া চল্লিশ বছর রিকশা চালিয়েছে। তার রিকশায় একটা ময়ূরের ছবি আঁকা ছিল, পেখম মেলা, রঙ সবুজ আর সোনালি। কালু মিয়া বলতো ময়ূরটা সে নিজে আঁকেনি, ওস্তাদ আলাউদ্দিন এঁকে দিয়েছিল। ওস্তাদ আলাউদ্দিন এখন নেই, কিন্তু ময়ূরটা আছে। ছিল।

২০৪০ সালে ঢাকা "স্মার্ট সিটি জোন" ঘোষণা করলো। গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা। এসব এলাকায় শুধু ইলেকট্রিক যানবাহন চলবে। হাতে টানা রিকশা নিষিদ্ধ। প্যাডেল রিকশাও না। শুধু ই-রিকশা, তাও লাইসেন্সড। ই-রিকশা সাদা, পরিষ্কার, একই রকম দেখতে। পেছনে কোনো ছবি নেই। ময়ূর নেই, তাজমহল নেই, নায়িকা নেই।

রিকশাওয়ালারা প্রথমে মিছিল করেছিল। তারপর থেমে গেছে। মিছিলে কিছু হয় না যখন সিদ্ধান্ত আগেই হয়ে গেছে। কালু মিয়া তার রিকশা বেচে দিয়েছে ভাঙারির কাছে। ময়ূরটাসহ।

একটা হাতে আঁকা রিকশা এখন জাতীয় জাদুঘরে আছে। কাচের বাক্সের ভেতরে। পাশে একটা ছোট প্ল্যাকার্ড, তাতে লেখা "ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রিকশা, বিংশ-একবিংশ শতাব্দী।" মানুষ কাচের ওপাশ থেকে তাকিয়ে দেখে। কেউ কেউ ফোনে ছবি তোলে। ছোট বাচ্চারা জিজ্ঞেস করে, "এটা কী?" বাবা-মা বলে, "রিকশা। আগে চলতো।" বাচ্চারা মাথা নাড়ে, বোঝে না কেন একটা গাড়ি কাচের ভেতরে রাখা। এই রিকশা একসময় মানুষ বহন করতো। এখন মানুষ একে দেখে। কাচের ওপাশ থেকে।

---

### ৬. সাইনবোর্ড

মতিঝিলে আজিজ ক্যালিগ্রাফার ত্রিশ বছর ধরে দোকানের সাইনবোর্ড লিখতো। তার হাতের লেখা ছিল শিল্প। প্রতিটা অক্ষরে একটা ছন্দ ছিল, যেন অক্ষরগুলো দাঁড়িয়ে না, নাচছে। "মেসার্স করিম অ্যান্ড সন্স" লিখলে মনে হতো দোকানটা শুধু নাম না, একটা পরিবারের গল্প। "নিউ ফ্যাশন টেইলার্স" লিখলে মনে হতো সত্যিই নতুন কিছু হচ্ছে। আজিজ প্রতিটা সাইনবোর্ডের আগে দোকানদারের সাথে কথা বলতো। জানতে চাইতো দোকানটা কবে থেকে, কী বিক্রি হয়, কারা আসে। তারপর সেই অনুযায়ী অক্ষরের ধরন ঠিক করতো। মিষ্টির দোকানের অক্ষর হতো গোল, নরম। হার্ডওয়্যারের দোকানের অক্ষর হতো সোজা, শক্ত।

আজিজ রঙ মেশাতো নিজে। নীল আর সাদা মিলিয়ে একটা বিশেষ রঙ বানাতো যেটা শুধু তার ছিল। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতো, "জিপিও আকাশের রঙ।" মানে বিকেলবেলা জিপিওর ওপরে যে আকাশ দেখা যায়, ঠিক সেই রঙ। আজিজ জানালার পাশে বসে সেই আকাশ দেখতো, তারপর রঙ মেশাতো, যতক্ষণ না মিলে যায়।

এখন সাইনবোর্ড বানায় AI। দোকানের নাম লেখো, অ্যাপে দাও, কয়েক সেকেন্ডে দশটা ডিজাইন বেরিয়ে আসে। ফন্ট, রঙ, লেআউট, সব অটোমেটিক। দাম কম, সময় কম, চেহারা মন্দ না। একটু একরকম দেখায় সবগুলো, কিন্তু কে খেয়াল করে? মতিঝিলের পুরো রাস্তা এখন একই ফন্টে লেখা। আগে প্রতিটা দোকানের সাইনবোর্ড আলাদা ছিল, রাস্তায় দাঁড়ালে মনে হতো প্রতিটা দোকান কথা বলছে। এখন সব চুপ।

আজিজের ব্রাশগুলো একটা টিনের কৌটায় রাখা আছে। রঙের কৌটাগুলো শুকিয়ে গেছে। সে এখন ছোটখাটো ঘরের রঙের কাজ করে। দেয়ালে রোলার চালায়। মাঝে মাঝে রোলারের বদলে ব্রাশ নিয়ে আসে। ভুলে যায়। ব্রাশটা হাতে ধরলে অন্য কিছু লিখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু দেয়ালে শুধু সাদা রঙ চাই, কোনো অক্ষর না।

---

### ৭. হিসাব

এরা কেউ মারা যায়নি। কারো বাড়ি ভাঙেনি। কারো ওপর কোনো অত্যাচার হয়নি। কোনো আইন তাদের বিরুদ্ধে যায়নি, শুধু সময় গেছে। সময় আর প্রযুক্তি। মিলে একটু একটু করে তাদের অপ্রয়োজনীয় করে দিয়েছে। প্রযুক্তির কোনো দোষও নেই। প্রযুক্তি তো ভালো জিনিস। সস্তা শাড়ি ভালো, অনলাইন সেবা ভালো, ডিজিটাল খবর ভালো, অ্যাপে স্বাস্থ্যসেবা ভালো, ইলেকট্রিক গাড়ি ভালো, সুন্দর ফন্ট ভালো। সব ভালো। শুধু কিছু মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে।

অপ্রয়োজনীয়। শব্দটা কঠিন। মৃত না। অসুস্থ না। অভুক্ত না। শুধু অপ্রয়োজনীয়। কারো কোনো কাজে লাগে না। পৃথিবী আগেও চলতো, এখনো চলে, তাদের ছাড়াও চলে। তারা আছে, কিন্তু থাকা আর না-থাকায় কোনো তফাত নেই। কেউ তাদের নিয়ে কাঁদে না, কারণ তারা তো মরেনি। কেউ তাদের নিয়ে লড়াই করে না, কারণ তাদের ওপর তো কোনো অবিচার হয়নি। তারা শুধু ফুরিয়ে গেছে। চাহিদা ফুরিয়ে গেছে, তাই তারাও।

এটাই সবচেয়ে খারাপ ধরনের হারিয়ে যাওয়া। যখন তুমি আছো, কিন্তু তোমার দরকার নেই। যখন তোমার হাতে সেই পুরোনো দক্ষতা আছে, কিন্তু সেই দক্ষতার কোনো বাজার নেই। তুমি অদৃশ্য হওনি, তোমাকে কেউ সরায়নি, তুমি শুধু ধীরে ধীরে অবান্তর হয়ে গেছো।

বাংলাদেশ কী হারালো? একটা তাঁত। একটা কলম। একটা সাইকেল। একটা গাছের শেকড়। একটা রিকশা। একটা ব্রাশ। ছোট ছোট জিনিস। কোনোটাই বড় না। কোনোটাই খবরের কাগজে আসেনি। কোনো প্রতিবাদ হয়নি। কোনো আন্দোলন হয়নি।

শুধু একদিন কেউ একজন তাকিয়ে দেখবে, জাদুঘরের কাচের ওপাশে একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। রঙিন। সুন্দর। স্থির। কেউ টানছে না। কেউ বসে নেই। কোথাও যাচ্ছে না।