রহিমা ২০৪৫

পর্ব ৯১ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

বারান্দায় দুটো চেয়ার। একটা প্লাস্টিকের, সাদা, পুরোনো। আরেকটা কাঠের, ছোট, নিলার জন্য।

নিলা তিন বছরের মেয়ে। মিতুর মেয়ে। রহিমার নাতনি। নিলা কাঠের চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে। পা মাটিতে পৌঁছায় না। পা দোলানো তার কাজ। যখন কিছু করার নেই, পা দোলায়। যখন কিছু করার আছে, তখনও দোলায়।

রহিমার বয়স সাতান্ন। ২০৪৫ সাল। এই সংখ্যাগুলো সে মনে রাখে না বিশেষ। বয়স জিজ্ঞেস করলে কখনো ছাপান্ন বলে, কখনো আটান্ন। আলম ঠিক করে দেয়। আলম সংখ্যার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে। রহিমা না।

সন্ধ্যা হচ্ছে। আকাশ কমলা থেকে বেগুনি হচ্ছে। রহিমা জানে না আকাশের রঙের নাম, কিন্তু দেখে। প্রতিদিন দেখে। ফ্যাক্টরিতে থাকতে দেখার সময় পেত না। এখন সময়। অনেক সময়।

ফ্যাক্টরি আর নেই।

সেই জায়গায় এখন একটা পার্ক। ঘাস আছে, বেঞ্চ আছে, একটা ছোট পুকুর আছে যেটায় কেউ কখনো মাছ ধরে না। পুকুরটা সাজানো পুকুর। আসল পুকুর না। রহিমা একবার গিয়েছিল, বসে ছিল বেঞ্চে। অদ্ভুত লেগেছিল। যেখানে তিরিশ বছর সেলাই মেশিনের আওয়াজ ছিল, সেখানে পাখির ডাক। যেখানে তিনতলা ভবন ছিল, সেখানে খোলা আকাশ। যে গেটে সে প্রতিদিন ঢুকত, সেই গেট নেই। একটা ফুলের বাগান আছে সেখানে। গাঁদা ফুল। রহিমা গাঁদা ফুল পছন্দ করে না, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই।

রহিমা আর যায়নি।

"নানু।"

"হুম।"

"তারা কই?"

রহিমা ওপরে তাকাল। আকাশ এখনো হালকা। তারা আসেনি।

"আসবে। একটু অন্ধকার হলে আসবে।"

নিলা মাথা নাড়ল। সে অপেক্ষা করতে পারে। তিন বছরের মেয়েরা সাধারণত অপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু নিলা পারে। এটা তার বিশেষত্ব। মিতু বলে, "এটা তোমার থেকে পেয়েছে, আম্মু। তুমিও চুপচাপ অপেক্ষা করতে পারো।" রহিমা বলে, "আমি অপেক্ষা করি না, আমি ভুলে যাই। ভুলে যাওয়া আর অপেক্ষা করা এক জিনিস না।"

পাশের বাসার বিড়ালটা এসে দরজার কাছে শুয়ে পড়ল। ধূসর বিড়াল, একটু মোটা, ডান কানে একটা কাটা দাগ। বিড়ালটার মা ছিল সাদা, সেই সাদা বিড়ালটা যেটা বছর কুড়ি আগে পাশের বাসায় জন্মেছিল। রহিমা মনে করতে পারে, সাদা বিড়ালটা পাতা নিয়ে খেলত। এখন সাদা বিড়াল নেই, তার বংশধর এই ধূসরটা। প্রতি রাতে এসে রহিমার দরজার সামনে ঘুমায়। রহিমা কিছু দেয় না। দুধ না, মাছ না, কিছু না। তবু আসে। বিড়ালের নিজস্ব হিসাব আছে, মানুষ সেটা বোঝে না।

নিলা বিড়ালটার দিকে তাকাল। "ঘুমাচ্ছে?"

"হ্যাঁ।"

"কেন?"

"ক্লান্ত।"

"কী করে ক্লান্ত হয়?"

রহিমা ভাবল। বিড়াল কী করে ক্লান্ত হয়? ঘুরে বেড়ায়, ছাদে ওঠে, পাড়ায় অন্য বিড়ালের সাথে ঝগড়া করে। কিংবা কিছুই করে না, তবু ক্লান্ত হয়। মানুষও তো তাই। কিছু না করেও ক্লান্ত হয়। রহিমা এটা জানে।

"এমনি।"

নিলা সন্তুষ্ট হলো। তিন বছরের মেয়েরা "এমনি" শুনলে মেনে নেয়। বড়রা নেয় না।

নিলা পা দোলানো শুরু করল আবার।

মিতু কোম্পানি চালায়। কী কোম্পানি রহিমা ঠিক বোঝে না। মিতু বোঝায়, রহিমা শোনে, মাথা নাড়ে। কিছু একটা বোঝে, বাকিটা হারিয়ে যায়। মিতু বলে "সফটওয়্যার", "ক্লায়েন্ট", "প্রজেক্ট"। রহিমা এই শব্দগুলো চেনে, কিন্তু ভেতরটা চেনে না। একটা সোয়েটার ধরলে বোঝা যায় ভালো না খারাপ। কিন্তু সফটওয়্যার ধরা যায় না। দেখাও যায় না। শুধু মিতু বলে, "ভালো চলছে, আম্মু।" রহিমা বলে, "আলহামদুলিল্লাহ।"

মিতুর সেই সেকেন্ড হ্যান্ড ল্যাপটপ থেকে শুরু। গাজীপুর চৌরাস্তার দোকান থেকে কেনা, বারো হাজার টাকায়। ধূসর রঙ, কোণায় আঁচড়। সেই ল্যাপটপে মিতু কী করত রহিমা জানে না। কিন্তু সেটাই শুরু। সেখান থেকে কোচিং, পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি, তারপর নিজের কোম্পানি।

রহিমা একবার মিতুকে জিজ্ঞেস করেছিল, "তোর কোম্পানিতে কতজন কাজ করে?"

"বত্রিশজন, আম্মু।"

বত্রিশ। রহিমার ফ্যাক্টরির একটা লাইনে বত্রিশজন ছিল। একটা লাইন। পুরো ফ্যাক্টরিতে ছয়শো।

মিতুর বত্রিশজন কাপড় ছোঁয় না, সুতা ধরে না, সেলাই মেশিনে বসে না। তারা স্ক্রিনের সামনে বসে কিছু করে। রহিমা জানে না কী। জানার দরকারও নেই। মেয়ে ভালো আছে, কোম্পানি চলছে, নাতনি সুস্থ। এটুকু জানাই যথেষ্ট।

আলম অবসর নিয়েছে।

আলমের অবসর মানে আলম এখন সকালে চা বানায়, দুপুরে ভাত রান্না করে, বিকেলে ছাদে যায়। ছাদে একটা চেয়ার নিয়ে বসে। কী করে কেউ জানে না। রহিমা একবার জিজ্ঞেস করেছিল।

"ছাদে কী করো?"

"বসি।"

"শুধু বসো?"

"হ্যাঁ।"

আলম সবসময়ই কম কথা বলত। অবসরের পরেও বদলায়নি। বরং আরো কমেছে। কিন্তু চা বানানো বাড়েছে। দিনে চার কাপ। রহিমার জন্য দুই, নিজের জন্য দুই। চায়ে আদা দেয়, একটু বেশি। রহিমা বলেছে, "আদা কম দাও।" আলম মাথা নেড়েছে। পরের দিনও একই পরিমাণ আদা। কিছু কিছু ব্যাপারে আলম শোনে না। শোনে, কিন্তু মানে না। রহিমা এটা জানে। তিরিশ বছরের বেশি হলো জানে।

রাজু ঢাকায় থাকে। মাসে একবার আসে। কখনো দুই মাসে একবার। ফোন করে সপ্তাহে একবার। রহিমা বলে, "খাচ্ছ তো ঠিকমতো?" রাজু বলে, "খাচ্ছি, আম্মু।" ব্যস। আর কী বলবে। ছেলেরা এরকমই। মেয়েরা বলে, কান্না করে, জড়িয়ে ধরে। ছেলেরা বলে, "ভালো আছি।" দুই শব্দে সব শেষ।

রহিমা মাঝে মাঝে ভাবে, রাজু কি ভালো আছে সত্যি? নাকি বলে? বলা আর থাকা তো এক না। কিন্তু ফোনে এটা বোঝা যায় না। ফোনে গলা শোনা যায়, মুখ দেখা যায় না। মিতু বলে ভিডিও কল করতে, রহিমা করে না। ফোনই যথেষ্ট। গলা শুনলেই বোঝা যায়। রাজুর গলা ঠিক আছে। সুতরাং রাজু ঠিক আছে।

অন্ধকার হচ্ছে। নিলা চেয়ার থেকে উঠে রহিমার কোলে এসে বসল।

"নানু, তারা।"

রহিমা ওপরে তাকাল। হ্যাঁ, একটা দুটো তারা দেখা যাচ্ছে। গাজীপুরে তারা কম দেখা যায়। আলো বেশি, ধোঁয়া বেশি। আগে আরো কম দেখা যেত। ফ্যাক্টরিগুলো চলত রাতভর, আলো জ্বলত। এখন অনেক ফ্যাক্টরি নেই। যেগুলো আছে, সেগুলো অন্যরকম। আলো কম, শব্দ কম, মানুষ কম।

"গোনো।"

নিলা আঙুল তুলল আকাশের দিকে। ছোট আঙুল, নখে লাল কালি লাগানো। মিতু এঁকে দিয়েছে।

"এক।"

রহিমা হাসল। "হ্যাঁ, এক। তারপর?"

"দুই।"

"আরেকটা খোঁজো।"

নিলা খুঁজল। আকাশে তাকিয়ে রইল। তারপর আরেকটা পেল।

"তিন।"

"তিন, হ্যাঁ। চার কই?"

নিলা খুঁজল। পেল না। রহিমা দেখাল, পূর্ব দিকে একটা, একটু ম্লান।

"ওইটা?"

"হ্যাঁ।"

"চার।"

রহিমা নিলার চুলে হাত বুলাল। এলোমেলো চুল। মিতুর মতো। রহিমার মতো। রহিমার মায়ের মতো। চার প্রজন্মের এলোমেলো চুল।

রহিমা কখনো AI ব্যবহার করেনি।

এই কথাটা সে ভাবে না। ভাবার কারণ নেই। AI কী সেটা সে জানে, মোটামুটি। মিতু বলেছে, জাহিদ বলেছে, টিভিতে দেখেছে। কিন্তু নিজে কখনো ব্যবহার করেনি। ফোনে কিছু একটা আছে, মিতু বলেছে "এটা AI", রহিমা বলেছে "ওটা বন্ধ করে দে।" মিতু বন্ধ করে দিয়েছে।

কিন্তু AI রহিমার জীবনের প্রতিটা বাঁকে ছিল।

ফ্যাক্টরিতে ক্যামেরা বসল, রহিমা সুপারভাইজার হলো। সুপারভাইজার হলো বলে বেতন বাড়ল। বেতন বাড়ল বলে মিতুকে ল্যাপটপ কিনে দিতে পারল। ল্যাপটপ পেল বলে মিতু শিখল, পড়ল, বড় হলো। ফ্যাক্টরি বন্ধ হলো, কিন্তু তার আগেই রহিমা অবসরের টাকা পেল। মিতু তখন নিজে দাঁড়িয়ে গেছে। সব জড়ানো, একটার সাথে আরেকটা, চেইনের মতো। প্রতিটা গিঁটে AI ছিল, কিন্তু রহিমা গিঁটগুলো দেখে না। সে চেইনটাই দেখে না। সে দেখে, জীবনটা চলেছে। কখনো ভালো, কখনো মন্দ, বেশিরভাগ সময় মাঝামাঝি। যেরকম সবার জীবন চলে। চলেছে।

এই দেশটাও চলেছে। গাজীপুর বদলেছে। ঢাকা বদলেছে। রাস্তায় গাড়ি বদলেছে, দোকানে জিনিস বদলেছে, মানুষের কথা বলার ধরন বদলেছে। রহিমার পাড়ায় আগে দশটা ফ্যাক্টরি ছিল, এখন তিনটা। বাকি সাতটার জায়গায় অফিস, পার্ক, একটা হাসপাতাল। রহিমা এই বদলগুলো দেখেছে, কিন্তু বদলের নাম জানে না। সে জানে না এটাকে কী বলে। সে জানে শুধু, আগে একরকম ছিল, এখন আরেকরকম।

রহিমা এসব নিয়ে ভাবে না।

সে ভাবে মরিচগাছের কথা। বারান্দায় দুটো টব। পুরোনোটায় এবার মরিচ কম হচ্ছে। গাছটা বুড়ো হয়ে গেছে। নতুন একটা লাগাতে হবে। কোথায় পাবে চারা? বাজারে সেই নার্সারিটা আছে তো এখনো?

সে ভাবে বৃষ্টির কথা। কাল কি বৃষ্টি হবে? আকাশটা একটু ভারী লাগছে। বৃষ্টি হলে কাপড় শুকাবে না। কাপড় ভেতরে এনে রাখতে হবে।

সে ভাবে নিলার কথা। নিলা কি খেয়েছে? মিতু ফোন করেছিল, বলল রাতে দেরি হবে, নিলাকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। রহিমা খাইয়ে দেবে। ভাতে একটু ঘি আর নুন, নিলা এটা খায়। অন্যকিছু খায় না সহজে। জেদি মেয়ে।

এই ভাবনাগুলো ছোট। কোনো ভাবনায় AI নেই, প্রযুক্তি নেই, ভবিষ্যৎ নেই। শুধু মরিচ, বৃষ্টি, নাতনি। রহিমার দুনিয়া এই তিনটা জিনিস দিয়ে তৈরি। আর আলমের চা। আর দরজার কাছে বিড়ালের ঘুম।

রহিমা সন্তুষ্ট।

সুখী বলা যাবে না ঠিক। সুখ একটা বড় শব্দ। সুখী মানুষেরা হাসে, গান গায়, নাচে। রহিমা এসব করে না। কিন্তু সে অসন্তুষ্টও না। জীবনটা যেরকম হওয়া উচিত ছিল, সেরকম না হলেও, যেরকম হয়েছে তাতে অভিযোগ নেই। এই বারান্দা তার। এই চেয়ার তার। এই মরিচগাছ তার। তিরিশ বছরের কাজ দিয়ে সে এগুলো অর্জন করেছে। হাত দিয়ে, চোখ দিয়ে, ধৈর্য দিয়ে।

"নানু, পাঁচ।"

রহিমা তাকাল। নিলা আরেকটা তারা পেয়েছে।

"কোনটা?"

নিলা দেখাল। রহিমা দেখল। হ্যাঁ, একটা তারা। একটু উত্তরে।

"ছয়?"

নিলা খুঁজল। "ওইটা?"

"ওটা তারা না, ওটা প্লেন।"

"প্লেন কী?"

"যেটা উড়ে যায়। তারা উড়ে যায় না।"

নিলা প্লেনটা দেখল। আলো জ্বলছে, নিভছে, এগিয়ে যাচ্ছে। তারা এরকম করে না। তারা থাকে। চুপচাপ থাকে।

"ছয়।" নিলা আরেকটা পেল।

রহিমা গুনতে শুরু করল নিজেও। সাত, আট, নয়। আকাশে তারা বাড়ছে, যত অন্ধকার ঘনাচ্ছে। দশ, এগারো। নিলা হারিয়ে গেছে, সাত পর্যন্ত গুনে থেমে গেছে। তারপর আবার শুরু করেছে।

"এক।"

রহিমা হাসল। নিলা আবার এক থেকে শুরু করছে। সাত পর্যন্ত যায়, ভুলে যায়, আবার এক। এটাও একটা পদ্ধতি। খারাপ না। গোনা শুরু করা, হারিয়ে ফেলা, আবার শুরু করা।

রহিমাও হারিয়ে ফেলেছে। সে কোথায় ছিল? বারো? তেরো? মনে নেই। আকাশে অনেক তারা এখন, গোনা কঠিন। কোনটা গুনেছে, কোনটা গোনেনি, মনে রাখা যায় না।

"নানু, তুমিও গোনো।"

রহিমা ভাবল। তারপর বলল, "এক।"

দুজনে গুনছে। নানি আর নাতনি। একই আকাশ, একই তারা। নিলা আঙুল তুলে তুলে দেখাচ্ছে, রহিমা মাথা নাড়ছে। দুই, তিন, চার। নিলা পাঁচে গিয়ে থামল, একটু ভাবল, তারপর বলল, "পাঁচ।" রহিমা বলল, "হ্যাঁ, পাঁচ।"

দরজার কাছে ধূসর বিড়ালটা নড়ল। এপাশ থেকে ওপাশে গড়িয়ে গেল। তারপর আবার চোখ বন্ধ করল।

ভেতর থেকে আলমের গলা শোনা গেল। "চা খাবে?"

রহিমা বলল, "রাখো। পরে খাই।"

এখন চায়ের সময় না। এখন গোনার সময়।

নিলা বলল, "নানু, কয়টা হলো?"

রহিমা মনে করতে পারল না। সে হেসে ফেলল। নিলাও হাসল। দুজনের কেউ জানে না কয়টা হলো। কেউ মনে রাখেনি। গোনাটাই আসল ছিল, সংখ্যাটা না।

বারান্দায় বাতাস আসছে। একটু ভেজা। কাল বৃষ্টি হতে পারে।

নিলা বলল, "এক।"

রহিমা কিছু বলল না। শুধু ওপরে তাকিয়ে রইল। তারাগুলো জ্বলছে। চুপচাপ, স্থির, নিজের জায়গায়। কোথাও যাচ্ছে না। কোথাও যাওয়ার দরকার নেই।