করিম ২০৪৫
ঘরটা ছোট। বেলালের ঘর। মিরপুরের সেই পুরোনো বিল্ডিং না, অন্য জায়গায়। মোহাম্মদপুরে। দুই রুমের একটা ভাড়া ফ্ল্যাট। বেলাল একা থাকে। বিয়ে হয়নি। হবে কি না, কেউ জানে না। বেলাল এসব নিয়ে কথা বলে না। করিমও জিজ্ঞেস করে না।
করিমকে আনা হয়েছে তিন মাস আগে। রংপুর থেকে। শেষবার রংপুরে গিয়ে বেলাল দেখেছে, বাবা একা থাকতে পারছে না আর। রান্না করে না। খায় না ঠিকমতো। চাচাতো ভাই সোবহান মাঝে মাঝে দেখে, কিন্তু সোবহানেরও নিজের সংসার। বেলাল বলল, "বাবা, চলো।" করিম কিছু বলল না। শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উঠল।
সাথে কিছু আনেনি। একটা লুঙ্গি, দুটো গেঞ্জি, একটা গামছা। ব্যস। আর কী আনবে? হালিমার জিনিসপত্র সোবহানের বউকে দিয়ে দিয়েছে আগেই। ঘরের তালা সোবহানকে দিয়ে এসেছে। দাওটা নদীর ধারে মাটিতে পড়ে আছে, সেটা আনেনি। সেটা সেখানেই থাকবে।
বেলালের ঘরে প্রথম রাতে করিম ঘুমাতে পারেনি। শব্দ অন্যরকম। রংপুরে রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছিল, এখানে এয়ার কন্ডিশনারের গুনগুন। বেলাল এসি চালায় করিমের জন্য, গরম লাগবে বলে। করিম গরমে অভ্যস্ত, কিন্তু বলে না। চুপ করে শুয়ে থাকে। এসির ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগে, করিম কম্বল টেনে নেয়।
---
একাত্তর বছর বয়স। হতে পারে বাহাত্তর। সঠিক হিসাব নেই। হালিমা জানত, হালিমা নেই।
শরীর শেষ হয়ে আসছে। নাটকীয়ভাবে না। কোনো বড় রোগ ধরা পড়েনি। ক্যান্সার না, হার্ট অ্যাটাক না, স্ট্রোক না। শুধু শরীরটা আর চলছে না। যেভাবে একটা পুরোনো সাইকেল চলতে চলতে একদিন থেমে যায়, চেইন পড়ে না, টায়ার ফাটে না, শুধু প্যাডেল আর ঘোরে না। তেমন।
খাওয়া কমে গেছে। আগে একটু খেত, এখন আরও কম। বেলাল ভাত বানায়, ডাল বানায়, মাছ কিনে আনে বাজার থেকে। করিম দুই লোকমা খায়, বলে, "হয়েছে।" বেলাল জোর করে না। জোর করলে করিম রাগ করে না, শুধু চুপ করে থাকে। সেই চুপ থাকাটা জোর করার চেয়ে কঠিন।
বেলাল সকালে কাজে যায়। একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। মেইনটেন্যান্স। মেশিন ঠিক করে। আগে মানুষে ভরা ছিল ফ্লোর, এখন মেশিন বেশি, মানুষ কম। বেলাল মেশিন ঠিক করে, ঘরে ফেরে, বাবাকে দেখে। এটাই জীবন।
দুপুরে পাশের ফ্ল্যাটের ফাতেমা আপা এসে দেখে যায়। দরজায় এসে জিজ্ঞেস করে, "চাচা, কিছু লাগবে?" করিম বলে, "না।" ফাতেমা আপা একটু দাঁড়ায়, তারপর চলে যায়। করিম জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনো কখনো সারাটা দুপুর চুপ করে থাকে। কোনো শব্দ করে না। টেলিভিশন আছে বেলালের ঘরে, করিম দেখে না। ফোন আছে, কাউকে করে না। সোবহান কখনো ফোন দেয়, করিম দুই মিনিট কথা বলে, রাখে। কী কথা বলে? "কেমন আছো?" "আছি।" "খাওয়াদাওয়া করো।" "করি।" ব্যস। শব্দ বাঁচিয়ে চলে করিম। যেন শব্দেরও একটা মজুদ আছে, ফুরিয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না।
জানালাটা উত্তর দিকে। উত্তর দিকে রংপুর। করিম এটা ভুলে যায়নি। শরীর ভুলে যাচ্ছে অনেক কিছু, কিন্তু কম্পাসটা এখনো কাজ করে। ভেতরের সেই সুই এখনো উত্তরে টানে।
---
আজ সকালে বেলাল কাজে যায়নি।
গতরাতে করিম একবার কাশছিল। কাশি না ঠিক, একটা শব্দ বুকের ভেতর থেকে উঠছিল, যেন কিছু একটা নড়ছে ভেতরে, জায়গা খুঁজছে। বেলাল উঠে দেখল, বাবা শুয়ে আছে, চোখ খোলা, সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। জিজ্ঞেস করল, "বাবা, ঠিক আছো?" করিম বলল, "হ্যাঁ।" কিন্তু গলার স্বরটা পাতলা ছিল, যেন দূর থেকে আসছে।
সকালে বেলাল ফ্যাক্টরিতে ফোন করল। বলল আজ আসতে পারব না। সুপারভাইজার কিছু বলল না, বলল ঠিক আছে।
বেলাল রান্নাঘরে ভাত বসাল। চাল ধুয়ে হাঁড়িতে দিল, পানি দিল, চুলায় বসাল। করিমের জন্য নরম ভাত। অনেক পানি দিয়ে। প্রায় জাউয়ের মতো। করিম শক্ত ভাত খেতে পারে না আর। দাঁত নেই, যেগুলো আছে সেগুলো নড়ে।
ভাত ফুটছে। হাঁড়ির ঢাকনা নড়ছে। বাষ্প বের হচ্ছে। রান্নাঘর ছোট, তাই গন্ধটা সারা ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ভাতের গন্ধ। সেদ্ধ চালের গন্ধ।
বেলাল বাবার ঘরে এল। করিম শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। ঘুমাচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। বেলাল পাশে বসল। খাটের ধারে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার, হাতল ভাঙা, সেটায় বসল। চেয়ারটা মিরপুরের পুরোনো ফ্ল্যাট থেকে আনা। কেন এনেছে বেলাল নিজেও জানে না। ফেলে দিতে পারত। আনেনি কেন?
করিম চোখ খুলল।
"বেলাল।"
"জি বাবা।"
"কাজে যাওনি?"
"আজ ছুটি।"
করিম কিছু বলল না। জানালার দিকে তাকাল। জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়, একটুখানি। দুটো বিল্ডিংয়ের মাঝখানের ফাঁক দিয়ে একটুখানি আকাশ। ধূসর আকাশ। মার্চের আকাশ। গরম পড়তে শুরু করেছে।
করিম বলল, "গন্ধ পাচ্ছ?"
বেলাল শুঁকল। ভাতের গন্ধ পাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে আসছে।
"ভাতের গন্ধ? হ্যাঁ, বাবা। ভাত হচ্ছে।"
করিম মাথা নাড়ল। "না। শুধু ভাত না। মাটির গন্ধ।"
বেলাল চুপ করে রইল।
করিম বলল, "বৃষ্টির পরে মাটি থেকে যে গন্ধ ওঠে, সেই গন্ধ। ধানক্ষেতের মাটি। ভেজা মাটি।"
বেলাল বলল, "বাবা, ওটা রান্নাঘরের ভাত।"
করিম চোখ বন্ধ করল। আবার খুলল। বেলালের দিকে তাকাল। চোখে কোনো কষ্ট নেই, কোনো ভয় নেই। শুধু একটা পরিষ্কার দৃষ্টি, যেটা করিমের ছিল যখন সে মাঠে দাঁড়িয়ে ধান দেখত, কোন ধান পেকেছে, কোনটা আরও সময় নেবে, সেই বিচার করত।
"না।" করিম বলল। "ওটা মাটির গন্ধ।"
---
জানালার কার্নিশে একটা পায়রা এসে বসল।
ধূসর পায়রা। গলায় একটু সবুজ ঝিলিক। ঠোঁট দিয়ে পাখনা গোছাচ্ছে, তারপর চুপ করে বসে রইল। জানালার বাইরে, কার্নিশের ধারে।
মিরপুরের সেই ছাদে করিম পায়রাদের চাল দিত। এক মুঠো চাল। হালিমাকে বলত, একটু চাল রাখো আলাদা করে। হালিমা রাখত। প্রশ্ন করত না। করিম ছাদে যেত, চাল ছড়িয়ে দিত, পায়রা আসত, খেত। এটুকুই। একটা সম্পর্ক ছিল, যেটার কোনো নাম নেই। পোষা বলা যায় না, বন্ধুত্ব বলা যায় না। শুধু একজন চাল দেয়, আরেকজন খায়। এটুকু।
সেই পায়রা এটা না। সেই কার্নিশও এটা না। দশ বছর পেরিয়ে গেছে, পায়রা কতদিন বাঁচে? কিন্তু একটা পায়রা এসে বসেছে। এই কার্নিশে। এই জানালায়। করিমের ঘরের জানালায়।
করিম পায়রাটাকে দেখল কি না, বোঝা গেল না। চোখ জানালার দিকে ছিল, কিন্তু চোখ দিয়ে দেখা আর আসলে দেখা, দুটো আলাদা জিনিস।
পায়রাটা বসে রইল। কিছুক্ষণ। তারপর উড়ে গেল।
---
দুপুরে বেলাল ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করল। একটা বাটিতে নরম ভাত, একটু ডাল, একটু লবণ। চামচে করে মুখের কাছে ধরল।
করিম এক চামচ খেল। দুই চামচ। তিন চামচের সময় মাথা নাড়ল। হয়েছে।
বেলাল বাটি রাখল। কিছু বলল না।
করিম বলল, "বেলাল।"
"জি।"
"আমাদের জমিতে ধান কত লম্বা হতো, জানো?"
বেলাল জানে না। বেলাল ছোটবেলায় জমি দেখেছে, কিন্তু ধানের উচ্চতা মনে রাখেনি। ছেলেরা এসব মনে রাখে না। ছেলেরা মনে রাখে কোন গাছে আম পাকেছে, কোন পুকুরে মাছ আছে, কোন ছেলে মারামারি করেছে। ধানের উচ্চতা বাবাদের জিনিস।
"এত লম্বা হতো," করিম হাত তুলল। হাতটা কাঁপছে। আঙুলগুলো চিকন, হাড় দেখা যাচ্ছে। হাতটা মাথার ওপরে তুলতে পারল না, কাঁধ পর্যন্ত তুলল। "এত। আমার চেয়ে লম্বা।"
বেলাল বলল, "হ্যাঁ বাবা।"
"ধানের ভেতর দিয়ে হাঁটলে দুই পাশে ধান। মাথার ওপরে ধানের শীষ ঝুলে আছে। বাতাস দিলে ঢেউ খেলত। সমুদ্র দেখিনি কোনোদিন, কিন্তু মানুষ বলে সমুদ্রে ঢেউ হয়, আমার মনে হয় ধানক্ষেতের ঢেউ সেরকমই।"
করিম থামল। চোখ বন্ধ করল।
বেলাল বসে রইল। বাবার শ্বাসের শব্দ শুনছে। ধীরে ধীরে শ্বাস পড়ছে। বুক উঠছে, নামছে। আস্তে।
---
বিকালে করিম জেগে উঠল। কিন্তু জাগাটা অন্যরকম। চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি ঘরে নেই। দৃষ্টি অন্য কোথাও।
বেলাল ডাকল, "বাবা।"
করিম শুনল। মাথা একটু ঘোরাল। বেলালের দিকে তাকাল। তারপর বলল, কিন্তু গলার স্বর এত নিচু যে বেলালকে কান পেতে শুনতে হলো।
"আমি মাঠে দাঁড়ায়ে আছি।"
বেলাল কিছু বলল না। বাবার হাত ধরল। হাতটা ঠান্ডা।
"ধান আছে চারদিকে। আমার চেয়ে লম্বা। শীষ ভারী হয়ে ঝুলে আছে। পাকতে শুরু করেছে। সোনালি হচ্ছে আস্তে আস্তে।"
করিম থামল। একটু পরে আবার বলল।
"ফোন নেই এখানে। কোল্ড স্টোরেজ নেই। কেউ নেই। শুধু আমি, আর ধান, আর মাটি, আর আকাশ।"
বেলাল বাবার হাত ধরে বসে আছে।
"পায়ে মাটি লাগছে। ভেজা মাটি। বৃষ্টি হয়ে গেছে একটু আগে। মাটি নরম। পায়ের পাতা ডুবে যাচ্ছে একটু একটু।"
করিমের ঠোঁটে একটা হাসি এল। ছোট। চোখ বন্ধ হয়ে গেছে কখন, বেলাল খেয়াল করেনি। কিন্তু হাসিটা আছে। ঠোঁটের কোণে। খুব হালকা, যেন কেউ আঙুল দিয়ে একটু টেনে দিয়েছে।
বেলাল বসে আছে।
ঘরে আর কোনো শব্দ নেই। রান্নাঘরে ভাতের হাঁড়ি ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। জানালা দিয়ে বিকালের আলো আসছে, তির্যক, সোনালি। দেয়ালে একটা আলোর চৌকো পড়েছে। আলোটা আস্তে আস্তে সরছে, যেভাবে বিকালের আলো সরে।
বেলাল বাবার হাত ধরে আছে। হাতটা আর ঠান্ডা লাগছে না। অভ্যাস হয়ে গেছে।
করিম শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। মুখে সেই হাসি। ঘুমাচ্ছে।
করিমের মাথার ভেতরে কোনো ঘর নেই, কোনো শহর নেই, কোনো বিল্ডিং নেই। একটা মাঠ আছে। মাঠের ধানগুলো তার চেয়ে লম্বা। সে হাঁটছে ধানের ভেতর দিয়ে। দুই হাতে ধানের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে হাঁটছে। ধানের শীষ ভেজা, হাতে পানি লাগছে। পায়ের নিচে মাটি নরম। মাটির গন্ধ উঠছে। সেই গন্ধ। যেটা শহরে নেই, যেটা কংক্রিটে নেই, যেটা শুধু ভেজা মাটিতে আছে, শুধু ধানক্ষেতে আছে, শুধু রংপুরে আছে।
করিম ধানের সাথে কথা বলছে। কী বলছে সেটা কেউ শুনতে পাচ্ছে না। ধান শুনছে কি না, কে জানে। কিন্তু করিম বলছে। যেভাবে আগে মাটির সাথে কথা বলত, ধানের সাথেও বলছে। ধান মাটি থেকে ওঠে, মাটির সাথে কথা বলা আর ধানের সাথে কথা বলা, একই কথা।
আকাশে মেঘ নেই। রোদ আছে। বাতাস আছে। ধান দুলছে। করিম দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মাঝখানে। চারদিকে সোনালি ধান। উপরে নীল আকাশ। নিচে কালো মাটি।
এটুকুই। আর কিছু নেই। আর কিছু দরকার নেই।
---
বেলাল বসে আছে।
বাবার বুক ওঠানামা করছে। আস্তে। খুব আস্তে। কিন্তু করছে।
মুখে হাসি।
বেলাল ভাবছে, বাবা কী দেখছে ঘুমের মধ্যে যে এভাবে হাসছে। বেলাল জানে না। কোনোদিন জানবে না। কিছু কিছু জিনিস ছেলেরা জানে না। বাবারা বলে না, ছেলেরা জিজ্ঞেস করে না। এটাই নিয়ম। এটাই সবসময় ছিল।
বাইরে শহর চলছে। গাড়ি যাচ্ছে। হর্ন বাজছে। কোথাও একটা মাইক বাজছে। মোহাম্মদপুরের বিকাল। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজের নিজের কাজ করছে। কেউ জানে না এই ফ্ল্যাটের এই ঘরে একটা মানুষ শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, মুখে হাসি, আর তার মাথার ভেতরে একটা ধানক্ষেত আছে যেটা কোনো মানচিত্রে নেই।
বেলাল বাবার হাত ধরে বসে আছে।
জানালা দিয়ে আলো কমে আসছে। বিকাল শেষ হচ্ছে। সন্ধ্যা আসছে।
করিম ঘুমাচ্ছে। করিমের ঘুমের ভেতরে একটা মাঠ আছে। মাঠের ভেতরে ধান আছে। ধানের ভেতরে করিম দাঁড়িয়ে আছে।
বেলাল বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসিটা এখনো আছে।