তানিয়া ২০৪৫

পর্ব ৯৩ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

বইটা প্রকাশিত হলো একটা মঙ্গলবারে। তানিয়া মনে করতে পারছিলেন না কেন মঙ্গলবার, কিন্তু প্রকাশক বলেছিলেন মঙ্গলবার ভালো দিন বই বের করার জন্য। তানিয়া জিজ্ঞেস করেননি কেন। কিছু কিছু জিনিস জিজ্ঞেস না করাই ভালো।

"বাংলায় AI: একটি ব্যক্তিগত ইতিহাস।"

প্রচ্ছদে তানিয়ার নাম। নিচে ছোট করে লেখা, "তানিয়া হোসেন।" না ডক্টর, না প্রফেসর। শুধু নাম। প্রকাশক চেয়েছিলেন "ড. তানিয়া হোসেন, বিভাগীয় প্রধান, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং" লিখতে। তানিয়া বলেছিলেন, না। শুধু নাম। প্রকাশক একটু অবাক হয়েছিলেন, কিন্তু তানিয়া যখন "না" বলেন, সেটা "না"ই থাকে। এটা যারা তানিয়াকে চেনেন তারা জানেন।

প্রচ্ছদের রঙ ছিল গাঢ় সবুজ। কোনো ছবি নেই, কোনো গ্রাফিক্স নেই। শুধু সাদা অক্ষরে বইয়ের নাম আর লেখকের নাম। তানিয়া চেয়েছিলেন এরকমই। একটা বই যেটা দেখতে বইয়ের মতো, বিজ্ঞাপনের মতো নয়।

---

বইটা লিখতে তানিয়ার সময় লেগেছিল তিন বছর। তিন বছর মানে তিন বছর নয়, আসলে বিশ বছর। কারণ এই বইয়ের প্রতিটা অধ্যায় তানিয়ার জীবনের একটা অংশ। ২০২৫ সালে যখন একটা ছোট স্টার্টআপে কাজ শুরু করেছিলেন, তখন থেকে। সেই সময়টা এখন স্বপ্নের মতো লাগে, কিন্তু স্বপ্ন নয়। প্রতিটা মুহূর্ত সত্যি ছিল।

বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের নাম ছিল "ডেটা লেবেলাররা।"

তানিয়া লিখেছিলেন সেই মানুষগুলোর কথা যাদের কেউ মনে রাখেনি। মিরপুরের একটা ছোট অফিসে বিশজন ছেলেমেয়ে বসে ছবিতে গাড়ি চিহ্নিত করত, রাস্তা চিহ্নিত করত, মানুষের মুখ চিহ্নিত করত। ঘণ্টায় ষাট টাকা। কেউ কেউ সারাদিন বসে থাকত। তাদের কাজের উপরে তৈরি হয়েছিল মডেল, সেই মডেলের উপরে তৈরি হয়েছিল প্রোডাক্ট, সেই প্রোডাক্ট বিক্রি হয়েছিল কোটি কোটি টাকায়। কিন্তু সেই বিশজনের নাম কেউ জানে না। তানিয়া তাদের নাম লিখেছিলেন। যতজনকে খুঁজে পেয়েছিলেন, ততজনের।

দ্বিতীয় অধ্যায়: "পিচ ডেক।"

সেই উন্মাদ সময়টা। ২০২৭, ২০২৮, ২০২৯। প্রতিটা ছেলে যার একটা ল্যাপটপ আছে, সে একটা AI কোম্পানি খুলছে। পিচ ডেকগুলো সব একরকম দেখতে। প্রথম স্লাইডে বাংলাদেশের মানচিত্র, দ্বিতীয় স্লাইডে "১৭০ মিলিয়ন মানুষের বাজার," তৃতীয় স্লাইডে হকি স্টিকের মতো দেখতে একটা গ্রাফ যেটা উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। তানিয়া এরকম পঞ্চাশটা পিচ ডেক দেখেছিলেন। বেশিরভাগ কোম্পানি দুই বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই শক্তিটা, সেই বিশ্বাসটা, সেটা সত্যি ছিল। তানিয়া সেটাও লিখেছিলেন। শুধু ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতার আগের আশাটাও।

তৃতীয় অধ্যায়: "মরা গাছ।"

এটা ছিল তানিয়ার নিজের গল্প। অফিসে একটা গাছ ছিল, মানি প্ল্যান্ট। কেউ জল দিত না। তানিয়া একদিন দেখলেন গাছটা প্রায় মরে গেছে। সেদিন তানিয়ার কোম্পানিও প্রায় মরে যাচ্ছিল। ফান্ডিং শেষ, টিম ভেঙে যাচ্ছে, ইনভেস্টররা ফোন ধরছে না। তানিয়া সেদিন গাছটায় জল দিয়েছিলেন। কেন দিয়েছিলেন জানেন না। হয়তো একটা জিনিসকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, যেটা বাঁচানো তাঁর হাতে ছিল।

চতুর্থ অধ্যায়: "হিন্দি।"

এই অধ্যায়টা তানিয়ার সবচেয়ে কঠিন ছিল লিখতে। ২০৩০ সালে একটা বড় ইন্ডিয়ান কোম্পানি অফার করেছিল তানিয়ার প্ল্যাটফর্মকে হিন্দিতে সম্প্রসারণ করতে। অনেক টাকা। অনেক অনেক টাকা। তানিয়া "না" বলেছিলেন। কারণ? কারণ তানিয়ার প্ল্যাটফর্ম ছিল বাংলায়। বাংলার জন্য। সেটাকে হিন্দিতে নিয়ে গেলে সেটা আর বাংলার থাকত না, সেটা হয়ে যেত একটা "সাউথ এশিয়ান প্ল্যাটফর্ম" যেখানে বাংলা একটা ড্রপডাউন মেনুর অপশন। তানিয়া সেটা চাননি।

"না" বলার পরে তানিয়ার কো-ফাউন্ডার রেগে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, "তুমি ইমোশনাল ডিসিশন নিচ্ছ।" তানিয়া বলেছিলেন, "হ্যাঁ, নিচ্ছি।" এরপরে কো-ফাউন্ডার চলে গিয়েছিলেন। তানিয়া একা হয়ে গিয়েছিলেন।

বইয়ে তানিয়া লিখেছিলেন, "কিছু কিছু 'না' বলার জন্য আপনাকে একা হতে হয়। একা হওয়াটা মূল্য নয়, একা হওয়াটা ফলাফল।"

---

বই প্রকাশের দুই মাস পরে হিসাব এলো। তিন হাজার কপি বিক্রি হয়েছে।

তানিয়া সংখ্যাটা দেখলেন। তিন হাজার। বেস্টসেলার হতে গেলে অন্তত বিশ হাজার লাগে। তানিয়া বেস্টসেলার হতে চাননি। তিন হাজার মানুষ তাঁর বই পড়েছে। তিন হাজার মানুষ জানে ডেটা লেবেলারদের কথা, পিচ ডেকের কথা, মরা গাছের কথা, হিন্দির কথা। সেটাই যথেষ্ট।

তানিয়া এখন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী। চুলে কয়েকটা পাক ধরেছে। চশমাটা বদলেছেন, আগেরটা ভেঙে গিয়েছিল। নতুন চশমাটা একটু বড়, কিন্তু তানিয়া অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে। প্রফেসর তানিয়া হোসেন। ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে একটু ভয় পায়, কারণ তানিয়া খুব কম কথা বলেন এবং যেটুকু বলেন সেটুকু সরাসরি বলেন।

তানিয়ার অফিসে একটা চেয়ার আছে। চেয়ারের একটা চাকা কিড়মিড় করে। তানিয়া মনে করলেন, আগেও একটা চেয়ারের চাকা কিড়মিড় করত। সেটা ছিল পুরোনো অফিসে, স্টার্টআপের সময়ে। সেই চাকাটা ২০৩২ সালে ঠিক করা হয়েছিল। এখন এটা অন্য একটা চেয়ার, অন্য একটা অফিসে, কিন্তু একই শব্দ। কিছু কিছু জিনিস ফিরে আসে। ঠিক আগের মতো না, কিন্তু যথেষ্ট কাছাকাছি যে মনে হয় আগেও এটা হয়েছিল।

---

একদিন সকালে তানিয়া ইমেইল খুললেন। বেশিরভাগ ইমেইল একাডেমিক, কনফারেন্সের আমন্ত্রণ, জার্নালের রিভিউ রিকোয়েস্ট। এগুলোর মধ্যে একটা ইমেইল ছিল একটা ছাত্রীর কাছ থেকে। নাম মেহজাবিন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তানিয়ার ছাত্রী নয়, তানিয়াকে চেনেন না, কখনো দেখেননি।

ইমেইলটা ছোট ছিল।

"তানিয়া আপা, আপনার বই পড়লাম। পুরোটা পড়তে তিন দিন লেগেছে। হিন্দি অধ্যায়টা পড়ে আমি অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। আমাকেও একটা কোম্পানি বলেছে আমার প্রজেক্টটা ইংরেজিতে করতে, তাহলে তারা ফান্ড দেবে। আমি ভাবছিলাম করব কি না। আপনার বই পড়ে আমি মনে করলাম, আমিও 'না' বলতে পারি। বলব কি না জানি না। কিন্তু জানলাম যে পারি। সেটাই অনেক।"

তানিয়া ইমেইলটা পড়লেন। আবার পড়লেন। তৃতীয়বার পড়লেন।

তানিয়া উত্তর দিলেন না। কী উত্তর দেবেন? "ভালো করেছ"? "সাহসী হও"? এসব কথা বলার মানুষ তানিয়া নন। তানিয়া জানেন, কিছু কিছু কথার উত্তর দেওয়ার দরকার হয় না। কথাটা পৌঁছেছে, সেটাই যথেষ্ট।

কিন্তু তানিয়া ইমেইলটা সেভ করলেন। একটা আলাদা ফোল্ডারে। ফোল্ডারের নাম ছিল "রাখা দরকার।" এই ফোল্ডারে আরো কয়েকটা ইমেইল আছে। খুব বেশি নয়। সাত কি আটটা। বিশ বছরে সাত কি আটটা ইমেইল যেগুলো তানিয়া মনে করেন রাখা দরকার। মেহজাবিনেরটা নবম।

---

বিকেলে তানিয়া অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন। বাসা ধানমন্ডিতে। ছোট একটা ফ্ল্যাট। তানিয়া একা থাকেন। বিয়ে করেননি। করবেন কি না জানেন না। এই নিয়ে তানিয়ার কোনো দুঃখ নেই, কোনো আনন্দও নেই। এটা তাঁর জীবন, এভাবেই আছে।

বাসায় ঢুকে তানিয়া প্রথমে গাছটার দিকে তাকালেন।

গাছটা এখনো আছে। সেই মানি প্ল্যান্ট। বিশ বছর আগে যেটা প্রায় মরে গিয়েছিল। এখন গাছটা বিশাল। পুরো বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে গেছে। লতাগুলো রেলিং বেয়ে উঠেছে, ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গাছটা দেখলে বোঝা যায় না এটা একসময় মরে যাচ্ছিল। গাছের এটাই ভালো, গাছ অতীত মনে রাখে না।

তানিয়া জল দিলেন। একটা পুরোনো প্লাস্টিকের মগ দিয়ে। মগটাও বিশ বছরের পুরোনো। মগের গায়ে একটা কার্টুন ছিল, এখন আর বোঝা যায় না কী ছিল। রঙ উঠে গেছে। কিন্তু মগটা কাজ করে, জল ধরে, তানিয়ার আর কিছু লাগে না।

জল দিতে দিতে ফোন বেজে উঠল। মেসেজ। শিহাব।

শিহাব এখন সিঙ্গাপুরে। একটা বড় টেক কোম্পানিতে কাজ করেন। তানিয়া আর শিহাব একসাথে কাজ করতেন, অনেক আগে। শিহাব ছিলেন তানিয়ার প্রথম ইঞ্জিনিয়ার। যখন কোম্পানিতে শুধু তানিয়া আর শিহাব ছিলেন, আর একটা মরা গাছ। শিহাব চলে গিয়েছিলেন ২০৩৩ সালে। রাগ করে নয়, ক্লান্ত হয়ে। তানিয়া বুঝেছিলেন। কিছু বলেননি।

শিহাবের মেসেজটা একটা লাইন।

"বইটা পড়লাম। সত্য।"

এক শব্দের রিভিউ। সত্য। শিহাব এরকমই। কম কথা বলেন। তানিয়াও কম কথা বলেন। দুজন মানুষ যারা কম কথা বলেন, তাদের মধ্যে একটা শব্দই যথেষ্ট।

তানিয়া হাসলেন। খুব ছোট একটা হাসি। ঠোঁটের কোণে। কেউ দেখলে বুঝতে পারত না তানিয়া হাসছেন। কিন্তু তানিয়া জানেন।

তানিয়া মেসেজের উত্তর দিলেন না। শিহাবও উত্তর আশা করেন না। কিছু কিছু কথোপকথন এক লাইনেই শেষ হয়। এটা সেরকম।

---

রাতে তানিয়া বারান্দায় বসলেন। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু তানিয়া তারা দেখতে বসেননি। তানিয়া চা খেতে বসেছেন। চায়ে চিনি নেই। দুধ আছে, অল্প। তানিয়া এভাবেই চা খান।

বিশ বছর আগে তানিয়া ভেবেছিলেন বাংলাদেশে AI নিয়ে কাজ করলে পৃথিবী বদলে যাবে। পৃথিবী বদলায়নি। বাংলাদেশও খুব বেশি বদলায়নি। AI আছে, মানুষ ব্যবহার করে, কিন্তু তানিয়া যেভাবে ভেবেছিলেন সেভাবে নয়। তানিয়া কি হতাশ? না। তানিয়া বুঝেছেন যে পৃথিবী বদলানো একজনের কাজ নয়। একজন যেটুকু পারেন সেটুকু করেন। তানিয়া একটা বই লিখেছেন। তিন হাজার মানুষ পড়েছে। একটা মেয়ে রাজশাহীতে বসে ভেবেছে যে সেও "না" বলতে পারে।

সেটাই যথেষ্ট। সেটাই সব।

তানিয়া চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলেন। গাছটার দিকে তাকালেন। গাছটা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না পুরোটা, শুধু রেলিংয়ের কাছের পাতাগুলো রাস্তার আলোয় একটু দেখা যাচ্ছে। পাতাগুলো নড়ছে। হালকা বাতাস। মার্চের রাত, একটু গরম, একটু ভ্যাপসা। ঢাকার মার্চ এরকমই।

গাছটা নড়ছে। তানিয়া বসে আছেন। এটুকুই।