সেলিনা ২০৪৫
সকালবেলা সেলিনা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে উঠোনে বসে ছিল। চায়ে চিনি একটু বেশি হয়ে গেছে। সে একটু মুখ কুঁচকে প্রথম চুমুক দিল, তারপর ভাবল, থাক, এমনিই খাই। পঞ্চাশ বছর বয়সে মানুষ এরকম কিছু জিনিস মেনে নিতে শেখে। চায়ে চিনি বেশি হলে ফেলে দেওয়ার দরকার নেই। খেয়ে নিলেই হলো।
উঠোনের আমগাছটা এখন বিশাল হয়ে গেছে। কুড়ি বছর আগে যখন সে এই চরে প্রথম এসেছিল, গাছটা তখন ছোট ছিল। এখন সেই গাছে এত আম ধরে যে পাড়ার ছেলেমেয়েরা এসে কুড়িয়ে নিয়ে যায়। সেলিনা কিছু বলে না। আম তো গাছে ধরে মানুষের খাওয়ার জন্যই।
ফোন বাজল। সোহেল।
"আম্মু, কেমন আছো?"
"ভালো। তুই কেমন?"
"আম্মু, একটা কথা বলব।"
সেলিনা চায়ে আরেকটা চুমুক দিল। সোহেলের "একটা কথা বলব" মানে সাধারণত ঢাকায় চলে আসার অনুরোধ। ছেলেটা ডাক্তার হয়েছে, ঢাকায় ক্লিনিক খুলেছে, ভালো প্র্যাকটিস। কিন্তু মায়ের জন্য তার চিন্তা কমে না। চরের মানুষ চরেই থাকবে, এটা সে বুঝতে চায় না।
"বল।"
"আম্মু, তোমার নাম জানো কোথায় পড়ানো হচ্ছে?"
"কোথায়?"
"মেডিকেল কলেজে। ঢাকা মেডিকেল, চট্টগ্রাম মেডিকেল, রাজশাহী মেডিকেল। কমিউনিটি মেডিসিনের সিলেবাসে তোমার হাইব্রিড মডেল ঢুকেছে। সেলিনা মডেল বলে পড়ানো হচ্ছে।"
সেলিনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
"কী মডেল?"
"তুমি যেভাবে কাজ করতে, আম্মু। ট্যাবলেটের ডেটা আর নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এআই যা বলছে সেটা শুধু মানা না, নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে যাচাই করা। তোমার কেসগুলো এখন উদাহরণ হিসেবে পড়ানো হয়। প্রথম বর্ষের ছাত্রদের বলা হয়, দেখো, একজন স্বাস্থ্যকর্মী কীভাবে প্রযুক্তি আর মানবিক বুদ্ধি একসাথে ব্যবহার করেছেন।"
সেলিনা আমগাছের দিকে তাকাল। একটা শালিক বসে আছে ডালে।
"আম্মু? শুনছো?"
"শুনছি। ভালো কথা। তোর পাথরের বয়াম কেমন আছে?"
সোহেল একটু হেসে ফেলল। সেলিনা সবসময় এরকম। বড় কথা শুনলে বিষয় পাল্টায়।
"আছে। ক্লিনিকের ডেস্কে রাখা আছে।"
"রোগীরা কিছু বলে?"
"জিজ্ঞেস করে এটা কী। আমি বলি আম্মু। আর কিছু বলি না।"
পাথরের বয়ামটা সোহেলের ছোটবেলার। চরের নদীর পাড় থেকে সে নুড়ি পাথর কুড়িয়ে আনত। গোল, মসৃণ, নদীর জলে ঘষে ঘষে পালিশ হওয়া পাথর। একটা পুরোনো আচারের বয়ামে জমা করত। সেলিনা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, এত পাথর দিয়ে কী করবি? সোহেল বলেছিল, রাখব। শুধু রাখব। ঢাকায় যাওয়ার সময় বয়ামটা সে নিয়ে গেছে। এখন তার ক্লিনিকের ডেস্কে, প্রেসক্রিপশন প্যাডের পাশে, একটা কাচের বয়ামে নদীর পাথর সাজানো। রোগীরা মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখে। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে। সোহেল বলে "আম্মু" আর তারপর চুপ করে যায়। রোগীরা আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। কিছু উত্তর এমনিতেই সম্পূর্ণ।
"আম্মু, তুমি ঢাকায় চলে এসো। আমার সাথে থাকো।"
"না।"
"কেন?"
"এখানে আমার কাজ আছে।"
"আম্মু, তোমার বয়স পঞ্চাশ। কুড়ি বছর ধরে এই চরে আছো। এখন বিশ্রাম নাও।"
"বিশ্রাম নেওয়ার বয়স হয়নি।"
সোহেল জানে, মায়ের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। সেলিনা যা ঠিক করে, তাই করে। কুড়ি বছর আগে যখন চরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখনো কেউ ঠেকাতে পারেনি।
"আচ্ছা, আম্মু। তবে একটা খবর আছে।"
"আরেকটা?"
"মন্ত্রণালয় থেকে একজন নতুন স্বাস্থ্যকর্মী পাঠাচ্ছে। তোমার রিপ্লেসমেন্ট।"
সেলিনা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
"কবে আসবে?"
"আজকেই। বিকেলের লঞ্চে।"
---
বিকেলে সেলিনা ঘাটে গেল। লঞ্চ ভিড়ল। যাত্রীরা নামল। একজন মেয়ে ব্যাগ হাতে নামল। বছর পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। পরনে সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে একটা ব্যাকপ্যাক। চোখে একটু ভয়, একটু কৌতূহল।
"আপনি সেলিনা আপা?"
"হ্যাঁ।"
"আমি ফারজানা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এসেছি। আপনার সাথে কাজ শিখব।"
সেলিনা মেয়েটাকে দেখল। তরুণ, উৎসাহী। হাতে একটা নতুন ট্যাবলেট, সেলিনারটার চেয়ে অনেক ভালো। পাতলা, বড় স্ক্রিন। সেলিনার পুরোনো ট্যাবলেটটা এখন ধীর হয়ে গেছে, স্ক্রিনের একটা কোণা ফাটা।
"চলো।"
সেলিনা মেয়েটাকে নিয়ে হাঁটতে লাগল। চরের মাটির রাস্তা। দুপাশে ধানখেত, কিছু পুকুর। দূরে কয়েকটা টিনের ঘর।
"আপনি কুড়ি বছর ধরে এখানে আছেন?" ফারজানা জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ।"
"একা?"
"একা। ছেলে ঢাকায়। ডাক্তার।"
ফারজানা কিছু বলল না। সে ভাবছিল, কী করে একজন মানুষ কুড়ি বছর একটা চরে একা থাকতে পারে। চারদিকে নদী, বর্ষায় পানি ওঠে, শীতে কুয়াশা, গ্রীষ্মে তাপ। কোনো সিনেমা হল নেই, কোনো শপিং মল নেই, কোনো রেস্তোরাঁ নেই। শুধু মানুষ আছে, অসুস্থ মানুষ, আর নদী।
সেলিনার ঘরে ঢুকল তারা। ছোট ঘর। একটা খাট, একটা টেবিল, একটা চেয়ার। দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার। টেবিলে পুরোনো ট্যাবলেট, কিছু ওষুধের প্যাকেট, আর একটা মোটা খাতা।
"বসো।"
ফারজানা বসল। সেলিনা চা বানাতে গেল। ফারজানা ঘরটা দেখল। দেয়ালে কোনো সার্টিফিকেট নেই, কোনো পুরস্কার নেই। শুধু একটা পুরোনো ছবি। সেলিনা অনেক কম বয়সে, কোলে একটা ছোট ছেলে। সোহেল হবে।
সেলিনা চা নিয়ে এল।
"তোমার ট্রেনিং কোথায় হয়েছে?"
"ঢাকায়। ছয় মাসের কোর্স। এআই-ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রাম।"
"কী শিখেছো?"
ফারজানা তার ট্যাবলেটটা বের করল। স্ক্রিনে একটা অ্যাপ খুলল। রঙিন ইন্টারফেস, ড্যাশবোর্ড, গ্রাফ, অ্যালার্ট।
"এই সিস্টেমে রোগীর ডেটা ইনপুট দিলে এআই নিজেই ডায়াগনোসিস সাজেস্ট করে। রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করে। কোন রোগীকে আগে দেখতে হবে, কাকে রেফার করতে হবে, সব বলে দেয়।"
সেলিনা চায়ে চুমুক দিল।
"ভালো।"
"আপনার সিস্টেমও তো এরকম ছিল, তাই না? আপনার মডেল থেকেই তো এটা ডেভেলপ করা হয়েছে। কোর্সে আমাদের বলা হয়েছে।"
"আমি জানি না কী ডেভেলপ হয়েছে কী হয়নি। আমি শুধু কাজ করেছি।"
ফারজানা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, "আপনার কাছ থেকে কী শেখার আছে, আপা?"
সেলিনা টেবিল থেকে মোটা খাতাটা তুলে নিল। খাতাটা পুরোনো। মলাট ময়লা হয়ে গেছে। পাতাগুলো হলদে। কিছু পাতায় পানির দাগ, বর্ষার সময় একবার ভিজে গিয়েছিল। সেলিনা শুকিয়ে রেখেছিল।
"এটা রাখো।"
ফারজানা খাতাটা হাতে নিল। ভারী।
"এটা কী?"
"আমার নোটবই। কুড়ি বছরের। প্রতিটা রোগী, প্রতিটা কেস, প্রতিটা সিদ্ধান্ত। কোনটা ঠিক ছিল, কোনটা ভুল ছিল। ট্যাবলেট কী বলেছে, আমি কী করেছি, কেন করেছি।"
ফারজানা খাতাটা খুলল।
প্রথম পাতায় তারিখ, ২০২৫ সালের মার্চ। সেলিনার হাতের লেখা, ছোট ছোট অক্ষর, ঘন করে লেখা। প্রতিটা এন্ট্রিতে রোগীর নাম, বয়স, উপসর্গ, ট্যাবলেটের সাজেশন, আর তার নিজের মন্তব্য। কখনো লেখা আছে "ট্যাবলেট ঠিক বলেছে।" কখনো লেখা আছে "ট্যাবলেট বলেছে জ্বর, কিন্তু আমার মনে হয়েছে অন্য কিছু। পরে দেখা গেছে ডেঙ্গু।" কখনো লেখা আছে "আমি ভুল করেছিলাম। ট্যাবলেট ঠিক বলেছিল। পরেরবার মনে রাখব।"
ফারজানা পড়তে লাগল।
সেলিনা চুপ করে বসে রইল। মেয়েটাকে পড়তে দেখল। মেয়েটার চোখ পাতার ওপর দিয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে। কখনো থামছে, ভ্রু কুঁচকাচ্ছে, আবার পড়ছে। সেলিনা বুঝতে পারল মেয়েটা বুঝছে। শুধু পড়ছে না, বুঝছে।
"আপা, এখানে লেখা আছে, 'হালিমার মেয়ের কাশি তিন সপ্তাহ ধরে। ট্যাবলেট বলেছে সর্দি। কিন্তু হালিমার ঘরে নতুন চুলা বসেছে। ধোঁয়া বের হয় না। আমি ভাবলাম ধোঁয়ার সমস্যা।' এটা কি ঠিক ছিল?"
"ঠিক ছিল। চুলা বদলানোর পর কাশি সেরে গেছে।"
"এটা তো ট্যাবলেটে আসবে না।"
"না। এটা ট্যাবলেটে আসবে না। এটা জানতে হলে হালিমার ঘরে যেতে হবে। হালিমার সাথে কথা বলতে হবে। হালিমার রান্নাঘর দেখতে হবে।"
ফারজানা খাতাটা বন্ধ করল না। আরও পড়তে লাগল।
সেলিনা উঠে দাঁড়াল।
"তুমি পড়ো। আমি একটু বাইরে যাই।"
"কোথায় যাচ্ছেন?"
"নদীর ধারে।"
---
সেলিনা হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে এল। বিকেলের রোদ নরম হয়ে এসেছে। নদীর জল ঘোলা, বরাবরই ঘোলা। পদ্মার শাখানদী, পলি বয়ে আনে। জলের রঙ কখনো নীল হয় না এখানে। সবসময় বাদামি, মাটির রঙ।
পাড়ে একটা পুরোনো নৌকা বাঁধা। মাঝি নেই। নৌকাটা জলের তালে তালে দুলছে।
সেলিনা পাড়ের ঘাসে বসল।
কুড়ি বছর আগে সে এই একই জায়গায় বসেছিল। তখন তার বয়স তিরিশ। সোহেল দশ। ট্যাবলেটটা তখন নতুন ছিল, সবকিছু নতুন ছিল। চরের মানুষগুলোকে চিনত না, তারাও তাকে চিনত না। প্রথম দিন এই নদীর পাড়ে বসে সে ভেবেছিল, এখানে কী করব? তারপর পরের দিন কাজ শুরু করেছিল। আর থেমে যায়নি।
এখন তার ট্যাবলেটের কাজ অন্য কেউ করবে। ফারজানা। তরুণ, শিক্ষিত, ভালো যন্ত্র হাতে। সেলিনার চেয়ে ভালো করবে হয়তো। করুক। সেলিনার কোনো আপত্তি নেই।
কিন্তু সেলিনা চর ছেড়ে যাবে না।
সোহেল বলে, আম্মু, তোমার বয়স হয়েছে, বিশ্রাম নাও। সেলিনা ভাবে, বিশ্রাম কী জিনিস? কাজ না করলে কী করবে? সারাদিন বসে বসে টেলিভিশন দেখবে? ঢাকার ফ্ল্যাটে জানালা দিয়ে ইটের দেয়াল দেখবে? না। সে এখানেই থাকবে। হয়তো অন্য কিছু করবে। বাচ্চাদের পড়াবে, বা বাগান করবে, বা শুধু নদীর পাড়ে বসে থাকবে। কিন্তু এখানেই।
তার নাম নাকি মেডিকেল কলেজে পড়ানো হচ্ছে। সেলিনা মডেল। সে একটু হাসল। মডেল। সে কোনো মডেল বানায়নি। সে শুধু কাজ করেছে। সামনে যে রোগী এসেছে, তাকে দেখেছে। ট্যাবলেট যা বলেছে শুনেছে। নিজের চোখ-কান-নাক যা বলেছে সেটাও শুনেছে। দুটো মিলিয়ে যেটা ঠিক মনে হয়েছে, সেটা করেছে। এটা কোনো মডেল না। এটা সাধারণ বুদ্ধি। যেকোনো মানুষ করতে পারে।
কিন্তু মেডিকেল কলেজের লোকেরা একটা নাম দিয়েছে। নাম দিলে জিনিসটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তাই দিয়েছে। সেলিনার কিছু যায় আসে না।
নদীতে একটা মাছ লাফ দিল। ছোট্ট একটা ছপাৎ শব্দ। তারপর আবার চুপ।
সেলিনা চোখ বন্ধ করল। নদীর আওয়াজ শুনল। জলের ওপর বাতাস, নৌকার দোলা, দূরে কোথাও একটা পাখির ডাক। এই আওয়াজগুলো কুড়ি বছরে বদলায়নি। মানুষ বদলেছে, ট্যাবলেট বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু নদীর আওয়াজ একই আছে। ঠিক একই। যেন কেউ একটা পুরোনো ক্যাসেট বাজিয়ে রেখেছে, বছরের পর বছর।
সে চোখ খুলল। সন্ধ্যা নামছে। আকাশের রঙ বদলাচ্ছে। কমলা, তারপর গোলাপি, তারপর ধীরে ধীরে বেগুনি।
পেছনে পায়ের আওয়াজ পেল। ফারজানা এসেছে।
"আপা, আপনার খাতা আমি আজ রাতে পড়ব। পুরোটা।"
সেলিনা ফারজানার দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে এখন আর ভয় নেই। কৌতূহল আছে, আর অন্য কিছু। শ্রদ্ধা হতে পারে, বা বোঝাপড়া। সেলিনা নিশ্চিত না।
"পড়ো।"
"আপনি আসবেন না?"
"আসব। একটু পরে।"
ফারজানা চলে গেল।
সেলিনা আবার নদীর দিকে তাকাল। জল বয়ে যাচ্ছে। কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে, কেউ জানে না। জল শুধু বয়ে যায়। তার কোনো মডেল নেই, কোনো সিলেবাস নেই, কোনো নাম নেই। জল শুধু জল।
সেলিনা উঠে দাঁড়াল। জুতোয় একটু বালি ঢুকেছে। সে জুতো ঝেড়ে বালি ফেলল।
তারপর ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। পেছনে নদী তার চিরকালের আওয়াজ করে যাচ্ছে। একই আওয়াজ। কুড়ি বছর আগেরও, কুড়ি বছর পরেরও।