জাহিদ ২০৪৫

পর্ব ৯৫ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

সকালে কলের পানি আসেনি।

জাহিদ রান্নাঘরে গিয়ে কল ঘুরাল, কিছু এলো না। আবার ঘুরাল। একটু গড়গড় শব্দ হলো, তারপর কয়েক ফোঁটা পানি পড়ল, তারপর বন্ধ। সে কলের নিচে ঝুঁকে দেখল। জয়েন্টের জায়গাটা ভেজা। চুইয়ে পানি পড়ছে, কিন্তু ওপর দিয়ে আসছে না।

রশিদা বলল, "আবার সেই কলটা?"

"হ্যাঁ।"

"গতমাসেও তো সারাইলা।"

"সারামু আবার।"

জাহিদ বাইরে গিয়ে টুলবক্সটা আনল। টুলবক্স বলতে একটা টিনের কৌটা, তার মধ্যে একটা প্লায়ার্স, দুটো স্ক্রু ড্রাইভার, কিছু পুরোনো ওয়াশার, একটুকরা টেফলন টেপ। বড় কোনো কাজের সরঞ্জাম না। ছোটখাটো মেরামতের জিনিস। জাহিদের এখন ছোটখাটো কাজই জোটে।

সে কলের নিচে বসল। হাঁটু ভাঁজ করতে কষ্ট হলো। বাম হাঁটুতে ব্যথা, সবসময়ই থাকে, কখনো বেশি কখনো কম। আজ মাঝামাঝি। বসা গেল, কিন্তু সহজে না।

প্লায়ার্স দিয়ে জয়েন্ট খুলল। ওয়াশারটা ক্ষয়ে গেছে। জাহিদ কৌটা থেকে একটা নতুন ওয়াশার বের করল, মাপ দেখল, লাগাল। টেফলন টেপ জড়াল। জয়েন্ট আবার বসাল। হাত দিয়ে টাইট করল, তারপর প্লায়ার্স দিয়ে আরেকটু।

কল ঘুরাল। পানি এলো। চুইয়ে পড়ছে না।

জাহিদ উঠে দাঁড়াল। উঠতে সময় লাগল। হাত টেবিলে রেখে ভর দিয়ে উঠল। একসময় সে নাকের জল ফেলত না মাটিতে, এমন শক্ত ছিল শরীর। দুবাইয়ের রোদে, মালয়েশিয়ার গরমে, ক্রেন চালিয়েছে, ভারী লোহা বহন করেছে, ষোলো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করেছে। এখন একটা কল সারাতে পাঁচ মিনিট লাগে, উঠতে আরো এক মিনিট।

"হইছে," সে রশিদাকে বলল।

রশিদা এসে কল ঘুরিয়ে দেখল। পানি আসছে। সে কিছু বলল না, রান্নার পাতিল ধরল কলের নিচে।

---

উঠানে আমগাছটা এখন অনেক বড়।

জাহিদ যখন প্রথম এই বাড়িতে এসেছিল, গাছটা তার কোমর সমান ছিল। এখন গাছের ছায়া পুরো উঠান ঢেকে দেয়। দুপুরে রোদ উঠলেও উঠানে আলো-ছায়ার খেলা, সোজা রোদ পড়ে না। গাছটা এত বড় হবে জাহিদ ভাবেনি। কিন্তু গাছ তো কারো ভাবনার অপেক্ষা করে না। সে নিজের মতো বাড়ে।

এবছর আম ভালো হয়েছে। গত কয়েক বছর কম হচ্ছিল, জাহিদ ভেবেছিল গাছ বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এবছর হঠাৎ অনেক আম। ছোট ছোট, সবুজ, এখনো পাকেনি। আষাঢ়ে পাকবে। রশিদা আচার করবে, কিছু পাড়া-প্রতিবেশীকে দেবে। ইমরানের জন্য কয়েকটা রেখে দেবে, যদি আসে।

জাহিদ সেই চেয়ারে বসল। নড়বড়ে চেয়ার, একপাশে একটু কাত হয়, সবসময় হয়। সে এই কাত হওয়াতে অভ্যস্ত। চেয়ারটা বদলানোর কথা কেউ বলে না, কারণ বদলানোর দরকার নেই। জাহিদ আর চেয়ার দুজনেই একে অপরের সাথে মানিয়ে নিয়েছে।

বেলা বাড়ছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছে উঠানে। মাটি শুকনো, একটু ধুলোমাখা। বর্ষা আসলে এই মাটি নরম হবে, ঘাস গজাবে। এখন শুকনো।

জাহিদ পকেট থেকে একমুঠো চাল বের করল। সকালে রশিদার কাছ থেকে নিয়ে রেখেছিল। চাল ছড়িয়ে দিল মাটিতে, চেয়ারের সামনে, গাছের ছায়ায়।

অপেক্ষা করল।

পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট। তারপর এলো।

একটা শালিক পাখি। গাছের ডাল থেকে নেমে এলো, ফুড়ুৎ করে। মাটিতে বসল, চাল খেতে লাগল। এই পাখিটা কি সেই পাখি? যেটা বছরের পর বছর আসত? জাহিদ জানে না। পাখি দেখতে একই রকম, শালিক তো শালিক। কিন্তু এত বছর পরে সেই একই পাখি বেঁচে থাকার কথা না। এটা হয়তো তার বাচ্চা। কিংবা তার বাচ্চার বাচ্চা। কে জানে। পাখি এসেছে, চাল খাচ্ছে, এটুকুই জাহিদের কাছে যথেষ্ট।

পাখিটা মাথা তুলে জাহিদের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর আবার চাল খেতে লাগল।

জাহিদ চুপচাপ দেখছে।

---

ইমরান ফিরে এসেছে সাত বছর হলো।

মালয়েশিয়ায় তেরো বছর ছিল। ভালো ছিল, খারাপ ছিল, মাঝামাঝি ছিল। শেষের দিকে ফ্যাক্টরিতে রোবট বেশি, মানুষ কম। কিন্তু কিছু কাজ মেশিন করতে পারে না। যেখানে পাইপ বাঁকানো, যেখানে তার জোড়া লাগানোর জায়গাটা চোখে দেখে বুঝতে হয়, যেখানে হাত দিয়ে অনুভব করতে হয় কোনটা ঠিক আছে আর কোনটা নেই। সেসব কাজ মানুষের। ইমরান সেসব কাজ করত।

তারপর একদিন সে ফোন করল। বলল, "বাবা, আমি আসতেছি।"

জাহিদ জিজ্ঞেস করেনি কেন। বলল, "আয়।"

ইমরান ফিরে এসে প্রথম কয়েক মাস কিছু করেনি। ঘরে বসে ছিল। রশিদা চিন্তা করেছে, জাহিদ করেনি। সে জানে বিদেশ থেকে ফিরলে একটু সময় লাগে। শরীর ফিরে আসে, মাথা ফিরতে সময় নেয়।

তারপর ইমরান শহরে একটা গ্যারেজে কাজ নিল। মোটরসাইকেল মেরামত। পুরোনো জাপানি মোটরসাইকেল, যেগুলো এখনো চলে, কিন্তু ইলেকট্রিকগুলোও সারায়। ইমরানের হাত ভালো। মালয়েশিয়ায় শিখেছে, হাত দিয়ে বোঝা যায় কোথায় সমস্যা। চোখ বন্ধ করলেও হাত দিয়ে বলতে পারে কোন বোল্ট ঢিলা, কোন বিয়ারিং শেষ হয়ে যাচ্ছে।

গ্যারেজের মালিক খুশি। ইমরানকে রাখতে চায়। ইমরান থাকবে, কিন্তু নিজের একটা গ্যারেজ দেওয়ার কথাও ভাবছে। রশিদা বলে, "আস্তে আস্তে। তাড়াহুড়ার দরকার নাই।" ইমরান মাথা নাড়ে। সে তাড়াহুড়া করবে না। তাড়াহুড়া করে সে আগে অনেক কিছু হারিয়েছে।

ইমরান প্রতি শুক্রবার আসে। মোটরসাইকেলে। আধা ঘণ্টার রাস্তা। এসে মায়ের রান্না খায়, বাবার সাথে উঠানে বসে। দুজনে বেশি কথা বলে না। জাহিদ জিজ্ঞেস করে, "কেমন চলতেছে?" ইমরান বলে, "ভালো।" এটুকুই। কখনো কখনো ইমরান ঘরের কোনো কিছু সারিয়ে দিয়ে যায়। জাহিদ যেটা পারে না, সেটা। ছাদের টিন ঠিক করা, ভারী কিছু ওঠানো।

গত শুক্রবার ইমরান একটা নতুন প্লায়ার্স এনেছিল। জাহিদের পুরোনোটা প্রায় শেষ। জাহিদ নতুনটা হাতে নিয়ে দেখল, ভালো জিনিস, ভারী, পাকড় শক্ত। বলল, "কত দিলি?" ইমরান বলল, "দাম জিজ্ঞেস করো না, বাবা।" জাহিদ আর জিজ্ঞেস করেনি।

---

দুপুরে রশিদা সেলাই করছে।

ঘরের এককোণে তার মেশিন। পুরোনো সিঙ্গার মেশিন, পায়ে চাপ দিয়ে চালাতে হয়। রশিদা এই মেশিনে বিশ বছর ধরে কাপড় সেলাই করছে। পাড়ার মেয়েরা আসে, ব্লাউজ, সালোয়ার, বাচ্চাদের জামা। এখন অনলাইনে অর্ডারও পায়। ইমরান একটা ফোন কিনে দিয়েছে, সেই ফোনে ছবি তুলে পোস্ট করে, অর্ডার আসে। রশিদা ডিজাইন বোঝে না, কিন্তু কাটিং বোঝে। মাপ নিলে হুবহু ফিট হয়। এটা মেশিন পারে না। মেশিন মাপ নিতে পারে, কিন্তু কাপড়ের পড়া বুঝতে পারে না। কোন কাপড় কোনদিকে টানলে ঝুলবে, কোনদিকে টানলে ভাঁজ পড়বে, এটা রশিদার হাতে আছে।

রশিদার এই কাজ দিয়েই সংসার চলে। জাহিদের অবদান ছোট। সে জানে। রশিদাও জানে। কিন্তু কেউ এটা নিয়ে কথা বলে না। জাহিদ ঘর সারায়, কল ঠিক করে, দরজার কবজা টাইট করে, চেয়ারের পা জোড়া লাগায়। ছোট কাজ। দরকারি কাজ। কেউ ধন্যবাদ দেয় না, কারণ ধন্যবাদ দেওয়ার মতো বড় কাজ না। কিন্তু কাজ না করলে টের পাওয়া যায়।

জাহিদ দুপুরে ভেতরের ঘরে শুয়ে থাকে। ঘুমায় না সবসময়, শুধু শুয়ে থাকে। ছাদের দিকে তাকায়। ছাদে একটা টিকটিকি চলাফেরা করে। জাহিদ টিকটিকি দেখে। টিকটিকি দেওয়ালে ওঠে, ছাদে যায়, আবার নামে। কোনো কারণ নেই, শুধু চলাফেরা।

---

বিকেলে জাহিদ দরজার কবজা ঠিক করল।

দরজাটা সামনের, ঘরে ঢোকার দরজা। কবজা ঢিলা হয়ে গেছে, দরজা খুললে একটু ঘষে, বন্ধ করতে জোরে ঠেলতে হয়। রশিদা তিনদিন আগে বলেছিল, "দরজাটা দেখো।" জাহিদ আজ দেখল।

স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে কবজার স্ক্রু টাইট করল। একটা স্ক্রু পুরো ঢিলা, আরেকটা অর্ধেক বের হয়ে গেছে। কাঠ নরম হয়ে গেছে, স্ক্রু ধরছে না ভালো করে। জাহিদ একটুকরা কাঠের টুকরা খুঁজে বের করল, ছোট করে কেটে গর্তে ঢুকাল, তারপর স্ক্রু বসাল। এবার ধরল। দরজা খুলল, বন্ধ করল। ঘষছে না। মসৃণ।

ছোট কাজ। পনেরো মিনিটের কাজ। কিন্তু জাহিদের সারাদিনের সবচেয়ে সন্তোষের কাজ।

---

বাড়ির চিলেকোঠায় একটা সুটকেস আছে।

কালো রেক্সিনের, পুরোনো, একপাশে তার দিয়ে বাঁধা। এই সুটকেস জাহিদ দুবাই নিয়ে গিয়েছিল, দুবাই থেকে ফিরে এসে ইমরানকে দিয়েছিল, ইমরান মালয়েশিয়া নিয়ে গিয়েছিল, মালয়েশিয়া থেকে ফিরিয়ে এনেছে। দুজনের যাত্রা একটা ব্যাগে। তারের বাঁধনটা জাহিদের দেওয়া, হ্যান্ডেলটা ভেঙে গিয়েছিল, তার দিয়ে জোড়া লাগিয়েছিল। সেই তার এখনো আছে। মরচে ধরেছে, কিন্তু আছে।

সুটকেসটা এখন কেউ ব্যবহার করে না। চিলেকোঠায় পড়ে আছে, অন্য জিনিসের পেছনে। রশিদার পুরোনো শাড়ির বান্ডিল, ভাঙা একটা ফ্যান, কিছু প্লাস্টিকের বোতল। এসবের পেছনে সুটকেস। কেউ খোঁজে না, কেউ নামায় না। কিন্তু ফেলে দেয়নি কেউ।

---

সন্ধ্যায় জাহিদ আবার উঠানে বসল।

চেয়ারে বসে, গাছের দিকে তাকিয়ে। আকাশের রঙ বদলাচ্ছে। নীল থেকে কমলা হচ্ছে, কমলা থেকে গোলাপি হবে, তারপর ধূসর, তারপর অন্ধকার। প্রতিদিন একই। প্রতিদিন একটু আলাদা।

রশিদা এলো, হাতে দুই কাপ চা। একটা জাহিদকে দিল, একটা নিজে ধরল। পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। চেয়ার একটাই, জাহিদ বসে, রশিদা দাঁড়ায়। জাহিদ বহুবার বলেছে আরেকটা চেয়ার আনতে। রশিদা বলে, "দাঁড়ায়ে খাইলে চা বেশি লাগে।" কী যুক্তি জাহিদ বোঝে না, কিন্তু আর বলে না।

চা খেতে খেতে জাহিদ বলল, "আমি কিছু বানাইনি।"

রশিদা চায়ে চুমুক দিল। কিছু বলল না।

জাহিদ আবার বলল, "সারাজীবন কাজ করলাম। দুবাই গেলাম, মালয়েশিয়া পাঠাইলাম ইমরানরে। কিন্তু কিছু তো বানাইনি। কোনো বাড়ি না, কোনো দোকান না, কিছু না।"

সে থামল। চায়ে চুমুক দিল।

"কিন্তু আমি আছি।"

রশিদা বলল, "এটাই যথেষ্ট।"

জাহিদ রশিদার দিকে তাকাল। রশিদা চা খাচ্ছে, উঠানের দিকে তাকিয়ে। তার মুখে কোনো বিশেষ ভাব নেই। সে বলেছে কথাটা, যেমন করে বলে "ভাত হইছে" বা "বাজারে যাও"। সাধারণভাবে। কারণ কথাটা সাধারণ। কিন্তু সাধারণ কথাই কখনো কখনো সবচেয়ে সত্যি কথা।

জাহিদ আর কিছু বলল না।

চা শেষ হলো। রশিদা কাপ নিয়ে ভেতরে গেল। জাহিদ বসে রইল।

খাতাটা ভেতরে আছে। ড্রয়ারে। সেই খাতা, যেখানে সে একসময় হিসাব রাখত। কত টাকা পাঠাল, কত খরচ হলো, কত বাকি। তারপর অন্য কিছু লেখা শুরু করেছিল, কী দেখল, কী শিখল, কী বুঝল। সেই খাতা বছরখানেক ধরে খোলেনি। ড্রয়ারে পড়ে আছে, একটা তোয়ালের নিচে। খুলবে কি না জানে না। হয়তো খুলবে না। হয়তো একদিন ইমরান খুলবে, হয়তো খুলবে না। কিছু যায় আসে না।

অন্ধকার হচ্ছে। আমগাছের পাতা এখন কালো ছায়া, আকাশের শেষ আলোর সামনে। একটা বাদুড় উড়ে গেল, গাছের ওপর দিয়ে, নিঃশব্দে।

শালিক পাখিটা নেই। সন্ধ্যায় শালিক আসে না। সকালে আসবে। কাল সকালে। জাহিদ চাল রাখবে।

সে উঠল। আস্তে আস্তে। চেয়ার ছেড়ে। ঘরের দিকে হাঁটল। দরজাটা খুলল, যেটা আজ ঠিক করেছে। দরজা মসৃণভাবে খুলল, কোনো শব্দ হলো না।

জাহিদ ভেতরে ঢুকল।

বাইরে উঠানে চেয়ার পড়ে আছে, নড়বড়ে, একদিকে সামান্য কাত। আমগাছের পাতায় রাতের বাতাস লাগছে। মাটিতে কয়েকটা চালের দানা পড়ে আছে, যেগুলো পাখি খায়নি। আকাশে একটা তারা ফুটেছে, প্রথম তারা, পশ্চিম দিকে, গাছের মাথার ঠিক ওপরে।