যে বাংলাদেশ হতে পারতো

পর্ব ৯৭ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

আমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্ন বললে ঠিক হয় না, স্বপ্নের মধ্যে একটা জোর থাকে, একটা দাবি থাকে। এটা ছিল বরং একটা আবছা কল্পনা। যেমন বিকেলের দিকে জানালার পাশে বসে চা খেতে খেতে মানুষ ভাবে, যদি সেদিন অন্য ট্রেনটা ধরতাম তাহলে কী হতো। সেরকম।

আমি ২০৪৫ সালের ঢাকায় হাঁটছি। কিন্তু এই ঢাকা আমার চেনা ঢাকা না। এই ঢাকায় রাস্তায় ধুলো আছে, গাড়ির হর্ন আছে, রিকশার ঘণ্টি আছে। কিন্তু কিছু একটা আলাদা। পার্থক্যটা বোঝা যায় না প্রথমে। পরে বুঝলাম, এই ঢাকায় মানুষগুলোর চোখে একটা ভিন্ন রকমের শান্তি আছে। ভয়ের অনুপস্থিতি না। ভয় সব জায়গায় থাকে। বরং বলা যায়, এই শহরের মানুষ জানে আগামীকাল তারা কোথায় দাঁড়াবে।

মিরপুরের দিকে একটা পুরনো গার্মেন্টস কারখানা। বাইরে থেকে দেখতে অন্য যেকোনো কারখানার মতো। ইট, সিমেন্ট, টিনের ছাদ। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, তিন তলায় একটা পুরো ফ্লোর খালি। সেখানে আর সেলাই মেশিন নেই। আছে কম্পিউটার, আছে প্রজেক্টর, আছে সাদা বোর্ড। রাহিমা নামের একজন নারী এই কারখানার মালিক। রাহিমা ২০৩৮ সালে যখন প্রথম অটোমেশন আনার কথা ভাবলেন, তখন তিনি একটা কাজ করেছিলেন যেটা আমার চেনা বাংলাদেশে কেউ করে না। তিনি আঠারো মাস আগে থেকে তাঁর শ্রমিকদের জানিয়েছিলেন।

আঠারো মাস। সময়টা ভাবুন। আমাদের দেশে চাকরি যায় সকাল বেলা। লোকটা অফিসে গিয়ে দেখে তার ডেস্ক আর নেই। রাহিমা সেটা করেননি। তিনি বলেছিলেন, দেখো, মেশিন আসবে। তোমাদের কাজ বদলাবে। কিন্তু তোমরাও বদলাবে। আমি সেই বদলানোর ব্যবস্থা করবো।

এবং তিনি করেছিলেন। তিন তলার সেই ফ্লোরটাই হলো প্রমাণ। সেখানে শ্রমিকরা শিখেছিল কীভাবে অটোমেশন সিস্টেম চালাতে হয়, কীভাবে কোয়ালিটি কন্ট্রোল করতে হয় মেশিনের আউটপুটের। যারা পারেনি, তাদের অন্য কাজে সাহায্য করা হয়েছিল। কেউ রান্নার ব্যবসা খুলেছে, কেউ মোবাইল মেরামতের দোকান। রাহিমা প্রত্যেককে ছয় মাসের বেতন দিয়েছিলেন আলাদা করে।

আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, রাহিমা কেন এটা করলেন? উত্তরটা সোজা। কারণ সরকার তাঁকে বলেছিল, অটোমেশন করতে হলে শ্রমিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে অটোমেশনের অনুমতি মিলবে না। এটা আইন ছিল। ২০৩৬ সালের শ্রমিক রূপান্তর আইন।

আইনটা কে করেছিল? একটা সরকার। যে সরকার বুঝেছিল যে প্রযুক্তি থামানো যায় না, কিন্তু প্রযুক্তি কীভাবে আসবে সেটা ঠিক করে দেওয়া যায়।

এই বাংলাদেশে আমি আরো কিছু দেখলাম। মতিঝিলের কাছে একটা অফিস। সেখানে ডেটা লেবেলিং হয়। আমাদের চেনা বাংলাদেশে ডেটা লেবেলাররা ঘণ্টায় দশ পনেরো টাকা পায়। এই বাংলাদেশে তাদের ন্যূনতম মজুরি আছে। প্রতিটি ডেটা পয়েন্টের জন্য একটা নির্দিষ্ট দাম আছে। বিদেশি কোম্পানি যদি বাংলাদেশি শ্রমিক দিয়ে ডেটা লেবেল করাতে চায়, তাহলে সেই দাম মানতে হবে।

এটা কীভাবে সম্ভব হলো? কারণ এই বাংলাদেশে এআই কোম্পানিগুলোর উপর একটা ট্যাক্স আছে। তারা যে মুনাফা করে বাংলাদেশি ডেটা ব্যবহার করে, তার একটা অংশ ফেরত আসে। সেই টাকা দিয়ে একটা তহবিল চলে। তহবিলের নাম 'ডিজিটাল শ্রমিক কল্যাণ তহবিল'। এই তহবিল থেকে ডেটা লেবেলারদের স্বাস্থ্যবিমা হয়, তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ যায়।

আমি ভূতের মতো হেঁটে বেড়াচ্ছি এই শহরে। কেউ আমাকে দেখতে পায় না। আমি এমন একটা বাড়ির ভেতর দিয়ে হাঁটছি যেটা কখনো তৈরি হয়নি।

করিমের কথা মনে পড়ে। করিম একটা অ্যাপ বানিয়েছিল। কৃষকদের জন্য। মাটির স্বাস্থ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ফসলের রোগ শনাক্তকরণ। সুন্দর একটা অ্যাপ। বাংলায়। বিনামূল্যে। আমার চেনা বাংলাদেশে করিমের অ্যাপটা তিন বছর পর ইংরেজি হয়ে গিয়েছিল। দাম লাগানো হয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা বলেছিল, গ্লোবাল মার্কেটে যেতে হলে ইংরেজি লাগবে। বাংলাদেশের কৃষকরা আর সেটা ব্যবহার করতে পারেনি।

কিন্তু এই বাংলাদেশে করিমের অ্যাপ বাংলায়ই আছে। বিনামূল্যে আছে। কীভাবে? কারণ সরকার একটা 'বাংলা ডিজিটাল কমন্স' নীতি করেছিল। যে প্রযুক্তি জনগণের মৌলিক প্রয়োজন মেটায়, সেটা বাংলায় থাকবে এবং বিনামূল্যে থাকবে। সরকার সেসব প্রকল্পে ভর্তুকি দেয়। করিম মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পায় সরকারের কাছ থেকে। তার অ্যাপ চালু আছে। কৃষকরা ব্যবহার করছে। করিমও ভালো আছে।

এটা এত জটিল কিছু না। এটা শুধু একটা সিদ্ধান্ত। কেউ একজন কোনো এক সকালে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আমরা আমাদের মানুষের ভাষায় তাদের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দেবো।

আমি হাঁটতে হাঁটতে উত্তরায় একটা রিট্রেনিং সেন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ভবনটা চার তলা। সাধারণ দেখতে। সামনে একটা বড় পোস্টার। পোস্টারে লেখা, "আপনি পারবেন!" লেখাটার 'আ' অক্ষরটা ঝকঝকে। খোসা ওঠেনি। রঙ ম্লান হয়নি। কেউ যত্ন করে রাখে এই পোস্টারটা। হয়তো প্রতি তিন মাসে বদলায়। হয়তো বদলায়ই না, হয়তো এমনিতেই টিকে আছে। আমি পোস্টারটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। ভাবলাম, আমাদের দেশে সরকারি পোস্টারের অক্ষর কতদিনে খোসা ওঠে? ছয় মাস? তিন মাস? এই একটা 'আ' যে খোসা ওঠেনি, এটাই তো পার্থক্য। কেউ খেয়াল রাখছে। ছোট জিনিসগুলোর দিকে কেউ নজর দিচ্ছে।

ভেতরে ঢুকলাম। একটা ক্লাসরুমে বিশ জন মানুষ বসে আছে। বিভিন্ন বয়সের। একজন মাঝবয়সী মহিলা কম্পিউটারে কিছু একটা করছেন। পাশে বসা একজন তরুণী তাঁকে সাহায্য করছে। কোনো তাড়া নেই। কারো মুখে বিরক্তি নেই। মহিলা ভুল করছেন, আবার চেষ্টা করছেন। তরুণী হাসছে, আবার দেখাচ্ছে।

এই রিট্রেনিং সেন্টারে ছয় মাসের কোর্স আছে। কোর্স শেষে চাকরির নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু একটা নেটওয়ার্ক আছে। যারা আগে এখান থেকে বের হয়েছে, তারা নতুনদের সাহায্য করে। সরকার এই নেটওয়ার্কটাকে পোষে। কারণ সরকার বুঝেছে, শুধু দক্ষতা দিলে হয় না, সংযোগও দিতে হয়।

সেলিনার কথা ভাবলাম। আমার চেনা বাংলাদেশে সেলিনা একজন সাংবাদিক। সেলিনার ফোনে একটা নজরদারি সফটওয়্যার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে জানতেও পারেনি। সেলিনা একটা প্রতিবেদন লিখেছিল সরকারি দুর্নীতি নিয়ে। তারপর একদিন তার বাসায় পুলিশ এসেছিল। তারা জানত সেলিনা কার সঙ্গে কথা বলেছে, কোন ক্যাফেতে বসেছে, কোন ফাইল ডাউনলোড করেছে।

এই বাংলাদেশে সেলিনার ফোনে কোনো নজরদারি সফটওয়্যার নেই। কারণ এই বাংলাদেশে একটা আইন আছে। এআই দিয়ে নাগরিক নজরদারি করতে হলে আদালতের অনুমতি লাগে। এবং সেই অনুমতি পেতে নির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে হয়। সাংবাদিকতা, মানবাধিকার কাজ, রাজনৈতিক মত প্রকাশ, এগুলো নজরদারির কারণ হতে পারে না। আইনে স্পষ্ট লেখা আছে।

সেলিনা তার প্রতিবেদন লিখেছে। প্রকাশিত হয়েছে। কেউ তার বাসায় আসেনি। সেলিনা রাতে ঘুমায়।

আমি জানি, এটা শুনতে রূপকথার মতো লাগে। কিন্তু এটা রূপকথা না। এটা শুধু কিছু সিদ্ধান্তের ফলাফল। যে সিদ্ধান্তগুলো কেউ নেয়নি।

জাহিদের কথাও মনে পড়ে। জাহিদ নির্মাণ শ্রমিক। দুবাইতে কাজ করতো। আমার চেনা বাংলাদেশে জাহিদকে একদিন বলা হলো, তোমার কাজ শেষ। রোবট এসেছে। কাল বিমানবন্দরে যাও। জাহিদের হাতে কিছু ছিল না। ফেরার টিকেটও কোম্পানি দেয়নি। জাহিদ দুই মাস আটকে ছিল। শেষে দূতাবাস তাকে ফেরত এনেছিল। খালি হাতে।

এই বাংলাদেশে জাহিদের কোম্পানি তাকে ছয় মাস আগে জানিয়েছিল। কারণ বাংলাদেশ সরকার শ্রমচুক্তিতে একটা ধারা যোগ করেছিল। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করতে হলে ন্যূনতম ছয় মাসের নোটিশ দিতে হবে এবং ফেরার টিকেট দিতে হবে। যে কোম্পানি এটা মানবে না, তারা বাংলাদেশ থেকে আর শ্রমিক নিতে পারবে না।

এটাও রূপকথা না। এটা শুধু একটু সাহস। কেউ একজন বলেছিল, আমাদের মানুষ পণ্য না। তাদের ফেলে দেওয়া যায় না ভাঙা জুতোর মতো।

আমি এই বাংলাদেশে আরো কিছুক্ষণ থাকতে চাই। এখানে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমন না। ট্রাফিক জ্যাম আছে। দুর্নীতি পুরোপুরি শেষ হয়নি। লোডশেডিং মাঝে মাঝে হয়। রাজনীতিবিদরা মাঝে মাঝে বোকা কথা বলেন। এটা ইউটোপিয়া না। এটা শুধু একটু ভালো একটা জায়গা। যেখানে কেউ যখন বলে "আমরা উন্নয়ন করবো", তখন "আমরা" শব্দটার মধ্যে সবাই থাকে। শুধু যারা ইতিমধ্যে ভালো আছে তারা না।

আমি একটা চা-এর দোকানে বসলাম। দোকানদার আমাকে দেখতে পায় না, কারণ আমি এই জগতের কেউ না। আমি সেই বাংলাদেশ থেকে এসেছি যেখানে এসব হয়নি। যেখানে রাহিমা শ্রমিকদের না জানিয়ে মেশিন এনেছিলেন। যেখানে করিমের অ্যাপ ইংরেজি হয়ে গেছে। যেখানে সেলিনা এখনো ভয়ে ঘুমায়। যেখানে জাহিদ খালি হাতে ফিরেছিল।

আমি চা-এর ভাপের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, পার্থক্যটা কোথায়? প্রযুক্তি একই। এআই একই। অ্যালগরিদম একই। পার্থক্যটা প্রযুক্তিতে না। পার্থক্যটা সিদ্ধান্তে। কে কার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। কে কার কথা ভাবে। কে কাকে মানুষ মনে করে।

এটাই সবচেয়ে কষ্টের জায়গা। এই বাংলাদেশটা অসম্ভব কিছু না। এটা মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপন না। এটা টাইম ট্রাভেল না। এটা শুধু কিছু মানুষের কিছু সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়নি।

আমার স্বপ্ন ভাঙতে শুরু করলো। এই বাংলাদেশ মিলিয়ে যাচ্ছে। রাহিমার কারখানা, করিমের অ্যাপ, সেলিনার নিরাপদ ঘুম, জাহিদের ফেরার টিকেট, উত্তরার রিট্রেনিং সেন্টারের সেই পোস্টার, সব ধীরে ধীরে অদৃশ্য হচ্ছে। আমি ফিরে যাচ্ছি আমার বাংলাদেশে। যেখানে সবকিছু যেমন ছিল তেমনই আছে।

কিন্তু ফেরার আগে শেষবারের মতো পেছনে তাকালাম।

রিট্রেনিং সেন্টারের জানালায় সন্ধ্যার আলো পড়েছে। ভেতরে সেই মাঝবয়সী মহিলা এখনো কম্পিউটারের সামনে বসে আছেন। তাঁর পাশের চেয়ারটা খালি, তরুণীটি চলে গেছে। কিন্তু মহিলা যাননি। তিনি একা একা চেষ্টা করছেন। স্ক্রিনের আলো তাঁর মুখে পড়ছে। তিনি কিছু একটা টাইপ করলেন, ভুল হলো, মুছলেন, আবার টাইপ করলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠলো। সেই হাসিটা দেখতে দেখতে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলো।