যে বাংলাদেশ হয়ে গেলো

পর্ব ৯৮ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

গত পর্বে আমি একটা বাংলাদেশের কথা বলেছিলাম যেটা হতে পারত। সেই বাংলাদেশে সবকিছু ঠিকমতো হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, বাস্তবায়ন ছিল, ইচ্ছা ছিল, সুযোগ ছিল। সেই বাংলাদেশ সুন্দর ছিল। সুন্দর কারণ সেটা একটা স্বপ্ন ছিল, আর স্বপ্নে কোনো দাগ থাকে না।

এবার আমি যে বাংলাদেশের কথা বলব, সেটা স্বপ্ন না। সেটা যা হয়েছে। যা সত্যিই ঘটেছে। ২০৪৫ সাল।

আমি সেই একই রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। একই পথ, একই শহর, একই দেশ। কিন্তু এবার চোখ বন্ধ করে না, খোলা রেখে।

---

প্রথমে মিতুর কথা বলি।

মিতু ভালো আছে। সত্যিই ভালো আছে। সে এখন একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করে। ঢাকার গুলশানে অফিস, কাচের বিল্ডিং, লবিতে ঠান্ডা বাতাস, লিফটে আয়না। মিতু প্রতিদিন সকালে সেই লিফটে ওঠে, আয়নায় নিজেকে দেখে, চুল ঠিক করে, তেরো তলায় নামে। তার একটা ডেস্ক আছে, ডেস্কে দুটো মনিটর, একটা কফির মগ যেটায় লেখা "Keep Calm and Code On"। কেউ একদিন উপহার দিয়েছিল, কে দিয়েছিল মিতু মনে করতে পারে না।

মিতু মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার। বাংলায় বললে, যন্ত্রকে শেখানোর কাজ। ভালো বেতন। মায়ের চিকিৎসার খরচ দেয়, ছোট বোনের পড়ালেখার খরচ দেয়, নিজে বনানীতে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। একা থাকে। বিয়ে করেনি। করবে কি না জানে না। এখন এসব ভাবে না।

মিতু সাফল্যের গল্প। সে গাজীপুরের মেয়ে, মা গার্মেন্টসে কাজ করত, বাবা ছিল না। মিতু পড়েছে, শিখেছে, কোডিং শিখেছে, উঠে এসেছে। এটা সেই গল্প যেটা পত্রিকায় ছাপা হয়, সেমিনারে বলা হয়, "যদি ইচ্ছা থাকে তাহলে পথ আছে।"

কিন্তু মিতু একটা কথা কাউকে বলে না। সে জানে তার মতো আরো হাজার মেয়ে ছিল। মিতুর চেয়ে বুদ্ধিমান, মিতুর চেয়ে পরিশ্রমী। তারা পারেনি। কেন পারেনি? কারণ তাদের বাড়িতে ইন্টারনেট ছিল না, বা ছিল কিন্তু ফোন কেনার টাকা ছিল না, বা ফোন ছিল কিন্তু সময় ছিল না, বা সময় ছিল কিন্তু কেউ বলেনি যে এরকম একটা পথ আছে। মিতু জানে তার সাফল্য তার যোগ্যতার ফল, কিন্তু শুধু যোগ্যতার ফল না। কিছু একটা ভাগ্যও ছিল। এই কথাটা মিতু কাউকে বলে না, কারণ বললে মানুষ ভাবে বিনয় দেখাচ্ছে।

---

এবার রহিমার কথা।

রহিমা এখনো আছে। গাজীপুরেই। সেই ফ্ল্যাটে। বারান্দায় এখনো দুটো টবে মরিচগাছ। পুরোনোটা মরে গেছে গত বছর। নতুন একটা লাগিয়েছে। মরিচগাছ মরে, আবার লাগায়। এটা রহিমার ধরন।

রহিমার হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে শেষপর্যন্ত। মিতু জোর করেছিল। টাকাও মিতুই দিয়েছে। রহিমা এখন হাঁটতে পারে আগের চেয়ে ভালো, কিন্তু সিঁড়ি ভয় পায়। লিফট নেই বিল্ডিংয়ে। তিন তলায় থাকে। দিনে দুইবার ওঠানামা করে। বেশি না।

রহিমা টিকে আছে। ভালো আছে বললে বেশি বলা হয়, খারাপ আছে বললে কম বলা হয়। সে আছে। মিতুর টাকায় চলে, নাতনি রূপাকে দেখে, বারান্দায় মরিচগাছে পানি দেয়। জীবন এটুকুতে ছোট হয়ে গেছে। আগে বড় ছিল, ফ্যাক্টরি ছিল, কাজ ছিল, মানুষ ছিল। এখন ছোট। কিন্তু ছোট মানে খারাপ না। ছোট মানে শুধু ছোট।

---

যোসনার কথা বলতে গেলে আমার গলায় কিছু একটা আটকায়।

যোসনা এখনো লেবেলিং করে।

বিশ বছর হয়ে গেছে। একই কাজ। ছবি আসে, ট্যাগ দেয়। বাক্য আসে, ট্যাগ দেয়। ভিডিও আসে, ট্যাগ দেয়। প্ল্যাটফর্মের নাম বদলেছে তিনবার। ইন্টারফেস বদলেছে পাঁচবার। পেমেন্ট সিস্টেম বদলেছে। কিন্তু কাজ বদলায়নি। তিন টাকা এখন সাড়ে তিন টাকা হয়েছে। বিশ বছরে দেড় টাকা বেড়েছে।

যোসনার বয়স এখন পঁয়ত্রিশ। চোখে সমস্যা হচ্ছে। ঝাপসা দেখে। ডাক্তার বলেছে স্ক্রিনে বেশি তাকানো। যোসনা বলেছে, স্ক্রিন ছাড়া তো কাজ নেই। ডাক্তার চশমা দিয়েছে। চশমা পরে কাজ করে এখন।

যোসনা কোনো সেমিনারে যায়নি। কোনো ট্রেনিংয়ে নাম লেখায়নি। পাশের বিল্ডিংয়ে একটা সাইনবোর্ড আছে, "রিট্রেনিং সেন্টার, আধুনিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ।" সাইনবোর্ডের "আ" অক্ষরটা খুলে গেছে। বৃষ্টিতে আঠা নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ সারায়নি। সাইনবোর্ডটা এখন পড়া যায় "ধুনিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ।" কেউ খেয়ালও করে না।

যোসনা খেয়াল করেছে। প্রতিদিন সেই সাইনবোর্ডের পাশ দিয়ে যায়। প্রতিদিন ভাবে, যাবে কি না। প্রতিদিন যায় না। যাওয়ার সময় নেই, বা সময় আছে কিন্তু ভেতরে কিছু একটা বলে, এত বছর পর গিয়ে কী হবে? এই প্রশ্নটা যোসনার নিজের না। এটা বিশ বছরের ক্লান্তি জমে জমে যে ওজন তৈরি হয়, সেটা। ক্লান্তি শরীরে না, মনে।

---

করিমের জমি আর নেই।

মানে, জমি আছে। জমি তো মাটি, মাটি কোথাও যায় না। কিন্তু সেই মাটিতে এখন একটা কোল্ড স্টোরেজ। বড়, টিনের ছাদ, কনক্রিটের দেয়াল, ভেতরে ঠান্ডা বাতাসের গুনগুন শব্দ। চাল রাখা হয় এখানে। টন টন চাল। যন্ত্র দিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যন্ত্র দিয়ে আর্দ্রতা মাপা হয়, যন্ত্র দিয়ে পোকার উপদ্রব পর্যবেক্ষণ করা হয়। সবকিছু স্মার্ট। সবকিছু AI চালিত।

আর করিম?

করিম রংপুরে ভাইয়ের বাড়িতে থাকে। একটা ঘর পেয়েছে। ছোট। খাট, আলমারি, একটা চেয়ার। জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির দেয়াল দেখা যায়। আগে জানালা দিয়ে ধানক্ষেত দেখা যেত, নদী দেখা যেত। সেই দিন আর নেই।

জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল করিম। ঠিক বাধ্য না, কেউ জোর করেনি। কিন্তু চারদিক থেকে চাপ আসছিল। পাশের জমি বিক্রি হয়ে গেছে, তার আগের জমিও, তার আগেরটাও। একটা কোম্পানি পুরো এলাকাটা কিনছিল কোল্ড স্টোরেজের জন্য। ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল ভালোই। বেলাল বলেছিল, "বাবা, নাও। এই টাকায় শহরে একটা ফ্ল্যাট কিনো।" করিম ফ্ল্যাট কেনেনি। টাকাটা ব্যাংকে রেখেছে। সুদ খায়।

কিন্তু করিমের কাছে জমি মানে শুধু মাটি ছিল না। জমি মানে ছিল সকালে উঠে মাঠে যাওয়া, পায়ের নিচে ভেজা ঘাস, ধানের গন্ধ, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। জমি মানে ছিল হালিমার সাথে বসে চা খাওয়া উঠানে, আমগাছের ছায়ায়। সেই আমগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কোল্ড স্টোরেজের জায়গা লেগেছিল।

করিম এখন কিছু করে না। সকালে ওঠে, চা খায়, বসে থাকে। বেলাল ফোন করে মাঝে মাঝে। "বাবা, কেমন আছো?" "আছি।" এটুকুই। করিম কাউকে দোষ দেয় না। কোম্পানিকে না, সরকারকে না, যন্ত্রকে না। সে শুধু মাঝে মাঝে ভাবে, মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা আর মাটি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, এই দুটোর মধ্যে একটা ফারাক আছে যেটা টাকা দিয়ে মেটানো যায় না।

---

জাহিদের ছেলে ইমরান মালয়েশিয়া থেকে ফিরে এসেছিল। দোকান দিয়েছিল রংপুর শহরে। মোবাইল সারাই। ভালো চলছিল কিছুদিন।

তারপর জাহিদের নাতি ইমরানের ছেলে, নাম তানভীর, সে বড় হলো। তানভীর পড়াশোনায় ভালো। স্কুলে ট্যাবলেট পেয়েছিল, গেম খেলত, তারপর কোডিং শিখল, তারপর কী একটা কোর্স করল অনলাইনে। এখন তানভীর ঢাকায়। একটা কোম্পানিতে কাজ করে। জুনিয়র ডেভেলপার। বেতন বেশি না, কিন্তু ইমরানের দোকানের আয়ের চেয়ে বেশি।

ইমরানের দোকান আর চলে না ভালো। মোবাইল সারাইয়ের কাজ কমে গেছে। এখন ফোন সস্তা, নষ্ট হলে নতুন কেনে মানুষ, সারায় না। ইমরান দোকানটা রেখেছে, কিন্তু দিনে দুই-তিনজন আসে। বাকি সময় বসে থাকে।

একটা চক্র। জাহিদ মাটি থেকে উপড়ে গেছে। ইমরান বিদেশ থেকে ফিরে দোকান দিয়েছে। দোকান শেষ হয়ে যাচ্ছে। তানভীর ঢাকায় গেছে। তানভীরের ছেলে কোথায় যাবে? এই চক্রটা বাংলাদেশের পুরোনো। AI-এর আগেও ছিল। AI-এর পরেও আছে। শুধু গতি বেড়েছে।

জাহিদ এখনো বেঁচে আছে। উঠানে বসে থাকে। আমগাছটা এবারও আম দেয়নি। চেয়ারটা এখনো একদিকে কাত হয়। রশিদা চা দেয়। জাহিদ চা খায়। কেউ কারো সাথে বেশি কথা বলে না। বলার কিছু নেই। সব বলা হয়ে গেছে।

---

আমি হাঁটছি। একই পথে। গত পর্বের সেই পথ, কিন্তু এবার চোখে অন্য জিনিস দেখছি।

একটা রিকশা দেখলাম। পুরোনো, রঙিন, ঘণ্টা বাজানো রিকশা। চলছে না। একটা জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রদর্শনীর অংশ। পাশে একটা ফলক: "ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রিকশা, বিশ শতক।" মানুষ ফোন দিয়ে ছবি তুলছে। একটা বাচ্চা জিজ্ঞেস করল, "এটায় কি চড়া যায়?" মা বলল, "না, এটা দেখার জন্য।"

একটা দেয়ালে গ্রাফিতি। কেউ স্প্রে পেইন্ট দিয়ে লিখেছে: "মানুষ কোথায়?"

প্রশ্নটা পড়ে আমি থামলাম। কে লিখেছে জানি না। কেন লিখেছে জানি না। কিন্তু প্রশ্নটা দেয়ালে আছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়নি এখনো। কেউ মুছে দেয়নি।

মানুষ কোথায়?

মানুষ তো এখানেই আছে। রাস্তায় মানুষ, দোকানে মানুষ, অফিসে মানুষ। কিন্তু প্রশ্নটা সেটা জিজ্ঞেস করছে না। প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করছে, সেই মানুষ কোথায় যে আগে ছিল? সেই রিকশাওয়ালা, সেই কৃষক, সেই দোকানদার, সেই কারখানার শ্রমিক? তারা কি অদৃশ্য হয়ে গেছে? না। তারা আছে। কিন্তু তাদের দেখা যায় না। তারা সংখ্যায় আছে, কিন্তু দৃশ্যে নেই।

---

সদরঘাটে একটা ছেলে লেবুর শরবত বিক্রি করছে।

ছেলেটার বয়স বারো-তেরো হবে। একটা ছোট্ট টেবিল, তাতে একটা কাচের জার, ভেতরে লেবুর রস, বরফ, চিনি মেশানো পানি। পাশে কয়েকটা গ্লাস। সে গ্লাসে শরবত ঢেলে দিচ্ছে, মানুষ নিচ্ছে, টাকা দিচ্ছে। দশ টাকা গ্লাস।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কত বছর ধরে এখানে?"

ছেলেটা বলল, "আমি তিন বছর ধরে। তার আগে আমার বাবা। বাবা বিশ বছরের বেশি।"

একই কোণা। একই ব্যবসা। বিশ বছর। সদরঘাটে ফেরি আসে, মানুষ নামে, গরম লাগে, লেবুর শরবত কেনে। এটা বদলায়নি। AI এটাকে ছোঁয়নি। ছোঁবেও না সম্ভবত। কিছু কিছু জিনিস আছে যেগুলো এত ছোট, এত সাধারণ, এত মানুষের যে কোনো যন্ত্রের পক্ষে সেগুলোকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব না। সদরঘাটের লেবু-শরবতওয়ালা সেরকম একটা জিনিস।

---

আমি সেই রিট্রেনিং সেন্টারের সামনে গেলাম। খোলা পাতার "আ" এখনো ঝুলছে। ভেতরে কয়েকজন বসে আছে। কম্পিউটারের সামনে। একজন শেখাচ্ছে। ছাত্ররা মধ্যবয়সী। কেউ কেউ বয়স্ক। তাদের চোখে সেই চেনা ভাব, যেটা আমি আগেও দেখেছি অনেকের চোখে। একটু ভয়, একটু আশা, একটু সন্দেহ। এটা শিখে কী হবে? হয়তো কিছু হবে। হয়তো কিছু হবে না। কিন্তু এসেছে। বসেছে। চেষ্টা করছে।

সেন্টারের বাইরে দেয়ালে একটা পোস্টার। "নতুন দক্ষতা, নতুন সুযোগ।" পোস্টারটা পুরোনো। রঙ উড়ে গেছে। কিন্তু আছে।

আমি ভাবলাম, এই পোস্টারটা সত্য না মিথ্যা? দুটোই। কারো জন্য সত্য, কারো জন্য মিথ্যা। মিতুর জন্য সত্য হয়েছিল। যোসনার জন্য এখনো হয়নি। হবে কি না কেউ জানে না।

---

AI বাংলাদেশকে ধ্বংস করেনি।

এটা বলা দরকার, কারণ অনেকে ভেবেছিল ধ্বংস করবে। সর্বনাশ হবে, কাজ চলে যাবে, মানুষ না খেয়ে মরবে, সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে। সেরকম কিছু হয়নি।

AI বাংলাদেশকে বাঁচায়ওনি।

এটাও বলা দরকার, কারণ অনেকে ভেবেছিল বাঁচাবে। সবাই শিখে ফেলবে, সবাই উন্নতি করবে, দারিদ্র্য দূর হবে, সমস্যা মিটে যাবে। সেরকমও কিছু হয়নি।

AI এসেছে বর্ষার বৃষ্টির মতো। দরকার ছিল, এটা সত্য। বৃষ্টি না হলে ফসল হয় না, নদীতে পানি থাকে না, মাটি শুকিয়ে যায়। AI ছাড়া কিছু কিছু কাজ হতো না যেগুলো হয়েছে। সুমন রবীন্দ্রনাথ শুনতে পেত না। কাদের মিয়ার ছাগল বাঁচত না। ফাতেমার বাচ্চা হয়তো বাঁচত না।

কিন্তু বর্ষার বৃষ্টি সবার জন্য সমান না। কারো ক্ষেতে পানি ঠিকমতো আসে, ফসল ভালো হয়। কারো ঘর ডোবায়, সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। একই বৃষ্টি। একই পানি। কিন্তু কার ক্ষেতে আর কার ঘরে পড়ছে, সেটা ঠিক করে ভূমি, ভূগোল, অবস্থান। AI-এর বেলায় সেটা ঠিক করেছে শিক্ষা, সুযোগ, পরিবার, ভাগ্য, আর সবচেয়ে বেশি, টাকা।

যার টাকা ছিল, সে শিখেছে। যার সুযোগ ছিল, সে এগিয়েছে। যার কিছু ছিল না, সে যেখানে ছিল সেখানেই আছে।

এটা নতুন কোনো কথা না। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো কথা। AI এটা বদলায়নি। শুধু আরেকটা স্তর যোগ করেছে সেই পুরোনো অসমতার ওপর।

---

আমি হাঁটছি। সন্ধ্যা নামছে। ঢাকার আকাশে সেই চেনা ধূসর-কমলা রঙ।

আমি কী দেখছি? একটা দেশ যেটা পুরোপুরি বদলায়নি, পুরোপুরি একই থাকেনিও। কিছু জায়গায় চকচক করছে, কিছু জায়গায় মরচে ধরেছে। কিছু মানুষ ওপরে উঠেছে, কিছু মানুষ নিচে নেমেছে, বেশিরভাগ মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই আছে। এটাই বাস্তব। এটাই সত্য। এটা সুন্দর না কুৎসিত, সেটা বলার অধিকার আমার নেই। সুন্দর-কুৎসিত বলাটা বাইরের লোকের কাজ। ভেতরে যারা আছে, তারা শুধু দিন কাটায়।

এই বাংলাদেশও সুন্দর। কারণ এখানে মানুষ আছে। যন্ত্রের পরেও মানুষ আছে।

রহিমা বারান্দায় পানি দিচ্ছে মরিচগাছে। যোসনা চশমা চোখে দিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। করিম জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির দেয়াল দেখছে। মিতু লিফটে আয়নায় চুল ঠিক করছে। জাহিদ চায়ের কাপে ফুঁ দিচ্ছে। সদরঘাটে একটা ছেলে লেবুর শরবত ঢালছে গ্লাসে।

কেউ কাউকে চেনে না। কেউ কারো খবর রাখে না। কিন্তু সবাই একই দেশে, একই সন্ধ্যায়, একই আকাশের নিচে। এটুকুই তাদের মধ্যে মিল। এটুকুই যথেষ্ট।

---

রাত নামছে। সদরঘাটের ছেলেটা টেবিল গুটিয়ে নিচ্ছে। শেষ গ্লাসটুকু শরবত সে নিজে খেলো। গ্লাসটা ধুয়ে রাখল। কাল আবার আসবে। একই কোণায়। একই টেবিল। একই লেবু, একই বরফ, একই চিনি।

ফেরিঘাটে শেষ ফেরিটা ছাড়ল। পানিতে আলো পড়ছে। পুরোনো, হলুদ, কাঁপা কাঁপা আলো। ফেরি দূরে যাচ্ছে। পানির শব্দ কমে আসছে।

ছেলেটা টেবিলটা মাথায় তুলে হাঁটতে শুরু করল। ছোট্ট শরীর, মাথায় কাঠের টেবিল, পায়ে স্যান্ডেল। সে অন্ধকারের দিকে হাঁটছে, কিন্তু তার পিঠে ফেরিঘাটের আলো পড়ছে। সে জানে না কেউ তাকে দেখছে। কেউ দেখছে না। আমিও আর দেখছি না। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম, অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করলাম।

পেছনে সদরঘাট। সামনে ঢাকা। চারদিকে বাংলাদেশ।