শেষ রাতের আড্ডা

পর্ব ৯৯ · ১৩ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

তানিয়ার পুরোনো অফিসটা এখন কমিউনিটি স্পেস। বনানীর সেই বিল্ডিং, তিনতলা, যেখানে একসময় চারটা ডেস্ক ছিল, দুটো হোয়াইটবোর্ড ছিল, আর রাত দুটোয় সাকিবের সাথে ঠান্ডা কফি খেয়ে তানিয়া ভাবত হাতুড়ি কার হাতে। সেই অফিস। দেয়ালের একটা দাগ এখনো আছে, হোয়াইটবোর্ডের স্ক্রু খুলে ফেলার পর যে ফুটো হয়েছিল, কেউ ভরেনি। তানিয়া প্রতিবার আসলে ফুটোটার দিকে তাকায়। কিছু বলে না।

এখন এই ঘরে ছয়টা চেয়ার। একটা টেবিল। টেবিলে একটা থার্মোফ্লাস্ক, ছয়টা কাপ, একটা বিস্কুটের প্যাকেট। বিস্কুটের প্যাকেটটা টাইগার, কমলা রঙের মোড়ক। মিতু আনিয়েছে।

সন্ধ্যা সাতটা বাজে। ২০৪৫ সালের নভেম্বরের একটা শনিবার।

---

মিতু এই অনুষ্ঠানের নাম দিয়েছিল "AI ও বাংলাদেশ: বিশ বছর পর।" ছোট একটা আলোচনা, পাঁচজন মানুষ, চা আর বিস্কুট। কোনো মাইক নেই, কোনো প্রজেক্টর নেই, কোনো ব্যানার নেই। মিতু চেয়েছিল এই পাঁচজনকে একটা ঘরে বসাতে। কেন চেয়েছিল সেটা সে নিজেও ঠিক বলতে পারবে না। হয়তো কারণ এই পাঁচজন আলাদা আলাদাভাবে তার জীবনের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে, কিন্তু কেউ কাউকে দেখেনি কোনোদিন।

রহিমা তার মা। তানিয়া তার গুরু, যে তাকে শিখিয়েছিল কোড শুধু কোড না, কোডের পেছনে মানুষ আছে। সেলিনার কাজ মিতু একটা কনফারেন্সে দেখেছিল, সুনামগঞ্জের চরের স্বাস্থ্যকর্মী যে খাতায় লিখে রাখে যা সিস্টেমে থাকে না। জাহিদের চিঠি মিতু পড়েছিল একটা অনলাইন আর্কাইভে, কেউ একজন টাইপ করে আপলোড করেছিল, জাহিদ জানে না। করিমের কথা মিতু শুনেছিল তানিয়ার কাছে, যে একবার রংপুরে গিয়েছিল ফিল্ড রিসার্চে, ফিরে এসে বলেছিল, "একজন কৃষক আমাকে বলল সে ধানের সাথে কথা বলে।"

মিতু সবাইকে আলাদা আলাদা করে ফোন করেছিল। দাওয়াত দিয়েছিল। কেউ না বলেনি।

---

প্রথমে এসেছিল রহিমা। সকালের ট্রেনে গাজীপুর থেকে। রহিমার বয়স এখন বাষট্টি। হাঁটু ব্যথা করে। ডাক্তার বলেছে অপারেশন, রহিমা বলেছে না। সে ট্রেন থেকে নেমে রিকশায় বনানী পর্যন্ত এসেছে। ব্যাগে একটা পলিথিনের প্যাকেট, ভেতরে রসগোল্লা। কোথা থেকে এনেছে জিজ্ঞেস করলে বলবে, স্টেশনের পাশে একটা দোকান, ভালো রসগোল্লা করে। ভালো কি না কে জানে, কিন্তু রহিমা কোথাও গেলে খালি হাতে যায় না।

তানিয়া আগে থেকেই ছিল। সে এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়, কিন্তু এই বিল্ডিংয়ের চাবি এখনো তার কাছে। কমিউনিটি স্পেসের দায়িত্ব সে নিজে নেয়নি, অন্যরা চালায়, কিন্তু চাবি রেখে দিয়েছে। মাঝে মাঝে আসে। বসে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। কিছু করে না। তারপর চলে যায়।

সেলিনা এসেছিল বিকেলে। সুনামগঞ্জ থেকে। চর থেকে বের হওয়া তার জন্য সহজ না। শেষ কবে ঢাকায় এসেছিল মনে করতে পারে না। পাঁচ বছর? সাত? সোহেল বলেছিল, "আম্মু, যাও না। একটু বাইরে ঘুরে এসো।" সেলিনা বলেছিল, "বাইরে ঘুরতে গেলে রোগী কে দেখবে?" সোহেল বলেছিল, "একদিনের জন্য।" সেলিনা এক রাতের জন্য এসেছে। কালকে সকালে ফিরবে।

জাহিদ এসেছিল সবার শেষে। বেলাল নিয়ে এসেছে। বেলাল এখন ঢাকায় থাকে, একটা টেক কোম্পানিতে কাজ করে। জাহিদকে সিলেট থেকে আনতে গিয়েছিল গতকাল। জাহিদ আসতে চায়নি। রশিদা বলেছিল, "যাও। কতদিন ঘরে বসে আছো।" জাহিদ বলেছিল, "ঘরে বসে থাকতে খারাপ লাগে না।" রশিদা বলেছিল, "তোমার খারাপ না লাগলেও আমার লাগে।" জাহিদ গিয়েছিল।

জাহিদের বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। শরীর ভাঙা। কোমরে ব্যথা, আঙুলের জোড়ায় ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখে। হাঁটতে ধীর। বেলাল তাকে সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় তুলেছে, এক হাতে বাবার হাত ধরে, অন্য হাতে বাবার ব্যাগ। ব্যাগে বিশেষ কিছু নেই। একটা লুঙ্গি, একটা গামছা, দাঁতের মাজন। আর একটা খাতা।

করিম এসেছিল একটু আগে। রংপুর থেকে। করিমের বয়স এখন পঁচাত্তরের কাছে, কিন্তু সে হাঁটতে পারে। ধীরে, কিন্তু পারে। বেলাল তাকেও ডেকে এনেছে, মিতুর কথায়। করিম বেলালকে চেনে, বেলাল একবার রংপুরে গিয়েছিল বাবার সাথে, সেই থেকে যোগাযোগ আছে। করিম জিজ্ঞেস করেছিল, "কী করতে হবে?" বেলাল বলেছিল, "কিছু না। শুধু যেতে হবে।" করিম রাজি হয়েছিল। যাওয়ার জন্য কারণ লাগে না, কেউ ডাকলেই যায়।

---

ঘরে এখন পাঁচজন বসে আছে। মিতু ষষ্ঠ, কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে, চা ঢালছে। থার্মোফ্লাস্ক থেকে কাপে চা পড়ছে, ধোঁয়া উঠছে। ঘরটায় টিউবলাইটের সাদা আলো। জানালা খোলা, বাইরে বনানীর সন্ধ্যা, গাড়ির হর্ন, দূরে আজানের শব্দ।

কেউ কিছু বলছে না।

মিতু চা দিল সবাইকে। রহিমা কাপটা দুই হাতে ধরল। করিম কাপটা হাঁটুর ওপর রাখল। তানিয়া একটু ফুঁ দিল। জাহিদ কাপটা টেবিলে রাখল, এখনো ধরেনি। সেলিনা এক চুমুক খেল।

"চা ভালো হয়েছে," সেলিনা বলল।

মিতু একটু হাসল। "চা বানাতে পারি। আম্মুর কাছে শিখেছি।"

রহিমা কিছু বলল না। চায়ে চুমুক দিল।

বিস্কুটের প্যাকেট খোলা হলো। করিম একটা নিল। জাহিদ নিল না। তানিয়া নিল একটা, ভাঙল দুই টুকরো, এক টুকরো খেল। সেলিনা নিল না।

রহিমা রসগোল্লার প্যাকেটটা টেবিলে রাখল। "এটা আনছি। খান।"

মিতু প্লেট খুঁজল। প্লেট নেই। একটা পুরোনো সিরামিকের বাটি পেল শেলফে, সেটায় রসগোল্লা ঢালল। পাঁচটা রসগোল্লা, সাদা, গোল, চিনির রসে ভেজা।

করিম একটা তুলে মুখে দিল। চিবাতে চিবাতে বলল, "মিষ্টি বেশি।"

রহিমা বলল, "হ্যাঁ, একটু বেশিই হয়েছে।"

জাহিদ একটা নিল। খেল। কিছু বলল না।

তানিয়া একটা নিল। খেল। মুখ কুঁচকাল। মিষ্টি সত্যিই বেশি। বলল না।

সেলিনা শেষ রসগোল্লাটা নিল। একটু কামড় দিল। বেশি মিষ্টি, কিন্তু খেল। চরে রসগোল্লা পাওয়া যায় না। পেলে খেতে হয়।

বাটিটা খালি হয়ে গেল। রস পড়ে আছে তলায়।

---

মিতু বলল, "আমি চেয়েছিলাম আপনারা একটু নিজেদের কথা বলুন। AI নিয়ে না, জীবন নিয়ে। গত বিশ বছরে কী হলো।"

চুপ।

করিম চায়ে চুমুক দিল। জাহিদ জানালার দিকে তাকাল। রহিমা কাপটা ঘোরাচ্ছে হাতে। তানিয়া চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। সেলিনা হাঁটুতে হাত রেখে সোজা হয়ে বসে আছে, যেভাবে রোগী দেখার সময় বসে।

রহিমা প্রথম কথা বলল।

"আমি সারাজীবন গুনেছি।" সে করিমের দিকে তাকাল। "বোতাম গুনেছি, টাইলস গুনেছি, সিঁড়ি গুনেছি। ফ্যাক্টরিতে বোতাম গুনতাম, কতটা সেলাই হলো। ডেলিভারিতে সিঁড়ি গুনতাম, কয়তলা উঠতে হবে। এখন নাতনির চুলের ক্লিপ গুনি। রূপা বলে, নানু, কেন গুনো? আমি বলি, গুনলে হারায় না।"

করিম মাথা নাড়ল। ধীরে।

"আমিও একটা জিনিস করি," করিম বলল। গলাটা ভাঙা, বয়সের ভার আছে। "ধানের সাথে কথা বলি। মাটির সাথে কথা বলি। মানুষ পাগল ভাবে। কিন্তু মাটি শোনে। ধান শোনে। অ্যাপ শোনে না। অ্যাপ বলে, কিন্তু শোনে না।"

সেলিনা তাকাল করিমের দিকে। "আপনি ধানের সাথে কথা বলেন?"

"হ্যাঁ।"

"কী বলেন?"

করিম একটু ভাবল। "বলি, ভালো থাকো। বৃষ্টি আসবে, ভয় নেই। এইটুকুই।"

সেলিনা কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখে একটা কিছু বদলাল, যেন সে চিনতে পারল এই মানুষটাকে। কথা না বলেও কিছু মানুষকে চেনা যায়।

---

জাহিদ ব্যাগ থেকে খাতাটা বের করল।

পুরোনো। নীল মলাট, কোণা ক্ষয়ে গেছে। রাবার ব্যান্ড নেই, সেটা অনেক আগে ছিঁড়ে গেছে। খাতাটা হাতে নিয়ে একটু বসে রইল।

"এটা আমার খাতা," জাহিদ বলল। কারো দিকে তাকাল না। টেবিলের দিকে তাকাল। "বারো বছর দুবাইতে ছিলাম। কত টাকা পাঠিয়েছি, কবে পাঠিয়েছি, সব লেখা আছে। শেষের দিকে কিছু পাতা খালি ছিল। সেখানে একটা চিঠি লিখেছি। কাউকে না। নিজেকে।"

সে খাতাটা টেবিলে রাখল। খোলেনি।

সেলিনা তাকাল খাতাটার দিকে। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের করল। কালো মলাট। পুরু। পাতায় পাতায় হাতের লেখা।

"আমারও একটা খাতা আছে," সেলিনা বলল। "রোগীর নাম, তারিখ, কী হয়েছিল, কী করেছি। সিস্টেম কী বলেছে, আমি কী দেখেছি। কুড়ি বছর ধরে লিখছি। কেউ পড়েনি।"

সে খাতাটা জাহিদের খাতার পাশে রাখল। দুটো খাতা পাশাপাশি। একটা নীল, একটা কালো। একটায় টাকার হিসাব আর একটা চিঠি। আরেকটায় রোগীর হিসাব আর একটা মানুষের পুরো জীবনের পর্যবেক্ষণ। দুটোই কেউ পড়েনি।

জাহিদ সেলিনার খাতার দিকে তাকাল। সেলিনা জাহিদের খাতার দিকে। দুজনে একটু মাথা নাড়ল। এটুকুই। আর কিছু বলার দরকার নেই।

---

বাইরে অন্ধকার হয়ে আসছে। জানালা দিয়ে রাস্তার আলো ঢুকছে। বনানীর রাত আগের চেয়ে শান্ত। গাড়ি কম, ইলেকট্রিক বাস বেশি, শব্দ কম।

মিতু আবার চা ঢালল। দ্বিতীয় রাউন্ড। এবার চা একটু হালকা, থার্মোফ্লাস্কের শেষের দিকের।

করিম জাহিদকে জিজ্ঞেস করল, "ক্রেন চালাতেন?"

"হ্যাঁ।"

"কেমন লাগত? উপরে?"

জাহিদ একটু ভাবল। "প্রথম দিকে ভয় লাগত। পরে লাগত না। পরে ভালো লাগত। উপরে গেলে সব ছোট দেখায়। মানুষ, গাড়ি, বিল্ডিং। সব ছোট। কিন্তু আকাশ বড় হয়ে যায়।"

করিম মাথা নাড়ল। "মাঠেও তাই। মাঠে দাঁড়ালে আকাশ বড় লাগে।"

"আপনি এখনো মাঠে যান?"

"যাই। মাঠ আমার না, কিন্তু যাই। হাঁটি। মাটি দেখি। শুধু দেখি।"

রহিমা শুনছিল। বলল, "আমিও ফ্যাক্টরি দেখি। বারান্দা থেকে দেখা যায়। রাতে আলো জ্বলে। আগে সব তলায় জ্বলত। এখন অর্ধেক জ্বলে।"

তিনজন চুপ করে গেল। তিনজনই কোনো কিছু দেখে যেটা আগে তাদের ছিল, এখন নেই। কিন্তু দেখা বন্ধ করেনি।

---

তানিয়া এতক্ষণ কিছু বলেনি।

সে চা খাচ্ছিল। শুনছিল। জানালার দিকে তাকাচ্ছিল, তারপর মানুষগুলোর দিকে। রহিমার মুখে বয়সের দাগ, কিন্তু চোখ তীক্ষ্ণ, সবকিছু গোনে। করিমের মুখে নদীর ধারে বসে থাকা মানুষের ধৈর্য। জাহিদের হাত, যে হাত দিয়ে ক্রেনের লিভার ধরত, এখন কাঁপে। সেলিনা, যে বিশ বছর ধরে চরে বসে একটা সিস্টেমের সাথে কাজ করেছে, আর পাশাপাশি নিজের খাতায় সেই সিস্টেমকে যাচাই করেছে।

তানিয়া কাপটা টেবিলে রাখল।

"আমরা সবাই একটা পরীক্ষায় ছিলাম। কেউ জানত না।"

ঘর চুপ।

কেউ জিজ্ঞেস করল না কোন পরীক্ষা। কেউ বলল না কার পরীক্ষা। কেউ বলল না পাস করেছে কি ফেল করেছে। কথাটা ঘরের বাতাসে ঝুলে রইল, যেভাবে ধোঁয়া ঝুলে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর মিশে যায়।

রহিমা চায়ে চুমুক দিল। করিম বিস্কুটের শেষ টুকরো খেল। জাহিদ খাতাটার ওপর হাত রাখল, যেভাবে কেউ ঘুমন্ত বাচ্চার মাথায় হাত রাখে। সেলিনা জানালার দিকে তাকাল।

মিতু দাঁড়িয়ে আছে। সে ভেবেছিল কেউ কিছু বলবে। কেউ বলল না।

---

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলো।

কথা কমে এলো। যা বলার ছিল বলা হয়ে গেছে, বা বলা হয়নি, দুটোই এক। মানুষ কখনো কখনো একটা ঘরে বসে থাকে, চা খায়, বিস্কুট খায়, মাঝে মাঝে দুই-একটা কথা বলে, আর সেটাই যথেষ্ট। সেমিনার হয়নি। আলোচনা হয়নি। "AI ও বাংলাদেশ: বিশ বছর পর" এই শিরোনামে কেউ কোনো বক্তৃতা দেয়নি। পাঁচজন মানুষ একটা ঘরে বসে চা খেয়েছে, রসগোল্লা খেয়েছে যেটা বেশি মিষ্টি ছিল, বিস্কুট খেয়েছে, আর নিজেদের জীবনের দুই-একটা কথা বলেছে।

রহিমা বলেছে বোতাম গোনার কথা। করিম বলেছে ধানের সাথে কথা বলার কথা। জাহিদ খাতা দেখিয়েছে। সেলিনা খাতা দেখিয়েছে। তানিয়া একটা কথা বলেছে যেটার উত্তর কেউ দেয়নি।

জাহিদ সেলিনাকে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কুড়ি বছর ধরে লিখছেন। কখনো মনে হয়নি বন্ধ করবেন?"

সেলিনা একটু ভাবল। "একবার হয়েছিল। যেদিন সিস্টেম প্রথমবার একটা জিনিস ধরল যেটা আমি ধরতে পারিনি। ভেবেছিলাম, আমি লিখে কী হবে, সিস্টেম আমার চেয়ে ভালো দেখে। তারপর পরের সপ্তাহেই সিস্টেম একটা জিনিস মিস করল যেটা আমি ধরলাম। একটা মেয়ের পেটে চাপ দিলে কেঁদে উঠেছিল। সিস্টেম পেটে চাপ দেয় না।"

জাহিদ মাথা নাড়ল।

করিম বলল, "অ্যাপ বৃষ্টির কথা বলে। ব্যাঙও বৃষ্টির কথা বলে। দুজনেই ভুল করে। কিন্তু ব্যাঙ আমার পাশে থাকে। অ্যাপ কোথায় থাকে কে জানে।"

রহিমা হাসল। ছোট হাসি।

---

রাত নয়টার দিকে সবাই উঠতে শুরু করল।

করিম প্রথম উঠল। ধীরে। চেয়ার থেকে উঠতে একটু সময় লাগল। হাঁটু শক্ত হয়ে গেছে বসে বসে। সে মিতুর দিকে তাকাল। বলল, "চা ভালো ছিল।" এটুকুই।

জাহিদ খাতাটা ব্যাগে রাখল। সাবধানে। যেভাবে ভাঙা জিনিস রাখা হয়। বেলাল দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। জাহিদ বেলালের হাত ধরে সিঁড়ির দিকে গেল। সিঁড়িতে নামতে নামতে একবার ঘুরে তাকাল। ঘরের দিকে না, সেলিনার দিকে। সেলিনাও তাকাচ্ছিল। দুজনে একটু মাথা নাড়ল। সেই একই ভাষা, যেটা খাতার ভাষা।

সেলিনা তার খাতাটা ব্যাগে রাখল। রহিমাকে বলল, "আপনার মেয়ে ভালো চা বানায়।"

রহিমা বলল, "ওর বাবার মতো। বাবা ভালো চা বানাত।"

এটুকু বলেই রহিমা থামল। আর কিছু বলল না। সেলিনাও জিজ্ঞেস করল না।

তানিয়া দরজা বন্ধ করার আগে ঘরটার দিকে তাকাল। ছয়টা চেয়ার। টেবিলে খালি কাপ, বিস্কুটের খালি মোড়ক, রসগোল্লার রসে ভেজা বাটি। দেয়ালে সেই ফুটো। জানালা দিয়ে রাতের বাতাস আসছে।

মিতু তানিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে।

"তুমি বললে পরীক্ষার কথা," মিতু বলল। "কোন পরীক্ষা?"

তানিয়া দরজার চাবি ঘোরাল। "জানি না। কিন্তু আমরা সবাই ছিলাম। ওরাও ছিল। তুমিও ছিলে।"

মিতু কিছু বলল না।

তানিয়া সিঁড়ি দিয়ে নামল। মিতু একটু দাঁড়িয়ে রইল বন্ধ দরজার সামনে। তারপর সেও নামল।

---

এই পাঁচজন মানুষ আর কখনো একটা ঘরে বসবে না।

এটা কেউ জানে না। কেউ ঠিক করেনি। কোনো কারণ নেই, কোনো ঘটনা নেই, কোনো বিদায় নেই। শুধু জীবন এমনই। মানুষ একবার দেখা হয়, তারপর আর হয় না। কখনো কখনো সেটা শেষবার কি না বোঝা যায়, কিন্তু বেশিরভাগ সময় বোঝা যায় না।

রহিমা গাজীপুরে ফিরবে। কাল সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রূপার চুলের ক্লিপ গুনবে। করিম রংপুরে ফিরবে। নদীর ধারে গিয়ে বসবে। জাহিদ সিলেটে ফিরবে। উঠানে বসে শালিকদের ভাত দেবে। সেলিনা চরে ফিরবে। নতুন খাতায় আজকের তারিখ লিখবে। তানিয়া চট্টগ্রামে ফিরবে। ট্রেনে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাবে।

পাঁচটা জীবন। পাঁচটা জায়গা। একটাই সন্ধ্যা ছিল যখন তারা একটা ঘরে বসেছিল।

বনানীর বিল্ডিংয়ের তিনতলায় ঘরটা অন্ধকার। টেবিলে কাপগুলো পড়ে আছে। বাটিতে রসগোল্লার রস শুকিয়ে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে রাতের বাতাস ঢুকছে, কাপের ধোঁয়া অনেকক্ষণ আগে শেষ হয়ে গেছে।

দেয়ালের ফুটোটা আছে। সেটা কেউ ভরবে না। সেটা থাকবে।