কৃষক

যে মাটি তার ছিল, সেই মাটিতে সে এখন ভাড়াটে

পর্ব ১ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আলমের হাত দেখলে বোঝা যায় সে কী করে।

নখের ভেতরে মাটি। আঙুলের জোড়ায় জোড়ায় ফাটা চামড়া। তালুতে এত পুরু ক্যালাস যে সুই ফুটলেও রক্ত বের হবে না। এই হাত দিয়ে সে তিন বিঘা জমি চাষ করে। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায়। বাবার জমি। বাবার বাবার জমি। তার আগে কার জমি ছিল সেটা কেউ মনে রাখেনি, কিন্তু জমি ছিল।

তিন বিঘা। শহরের লোকে শুনলে হাসবে। তিন বিঘায় কী হয়? আলমের পরিবারের পাঁচটা প্রাণ বাঁচে। বউ ফাতেমা। মেয়ে নাজমা, বয়স সতেরো। ছেলে রনি, বয়স বারো। আর আলমের মা, যার বয়স কেউ জানে না, যিনি এখন সারাদিন বিছানায় শুয়ে কাশেন আর আল্লাহর নাম নেন।

বোরো মৌসুম। ডিসেম্বরে চারা লাগিয়েছে। এখন ফেব্রুয়ারি। ধান এখনো সবুজ। পাকতে দেড় মাস বাকি। কিন্তু সার দিতে হবে এখনই। ইউরিয়া। পটাশ। দেরি করলে ফলন কমবে।

গত বছর এক বস্তা ইউরিয়া ছিল আটশো টাকা। এ বছর ষোলোশো।

দ্বিগুণ।

আলম ডিলারের দোকানে দাঁড়িয়ে দামটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলল, "সরকারি দাম তো আটশো।"

ডিলার হাসল। হাসিটা দয়ার না। হাসিটা এমন, যেন একটা বাচ্চা বোকা কথা বলেছে। "সরকারি দামে পাবেন? যান কৃষি অফিসে লাইন দেন। দুই সপ্তাহ পর হয়তো পাবেন। তত দিনে ধান মরবে।"

আলম জানে এটা সত্য। সে ডিলারের কাছে ষোলোশো টাকা দিয়ে এক বস্তা কিনতে পারে। কিন্তু তার কাছে ষোলোশো টাকা নেই। তিন বস্তা লাগবে। মোট আটচল্লিশশো। আলমের সঞ্চয় শূন্য।

নাজমার বিয়ের কথা উঠেছে।

পাড়ার মফিজ মিয়া এসেছিল গত শুক্রবার। তার ভাগ্নে ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করে। মাসে পনেরো হাজার টাকা পায়। ছেলেটা নাজমাকে দেখেছে। পছন্দ হয়েছে।

যৌতুক চায় পঞ্চাশ হাজার।

ফাতেমা রাতে আলমকে বলল, "ছেলে ভালো। চাকরি আছে। নাজমা আর কত অপেক্ষা করবে?"

আলম হিসাব করল। পঞ্চাশ হাজার টাকা। সে বছরে কামায় কত? বোরো ধান বিক্রি করলে লাখ-সোয়া লাখ আসে, যদি দাম ঠিক থাকে। তার থেকে সারের খরচ, বীজের খরচ, সেচের খরচ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি বাদ দিলে হাতে থাকে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার। সেটা দিয়ে সারা বছর চলে। সঞ্চয় হয় না।

পঞ্চাশ হাজার কোথা থেকে আসবে?

আলম জানে কোথা থেকে আসবে। সে এটাও জানে যে সেখান থেকে নিলে কী হয়। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকালে অন্য কোনো পথ দেখে না।

মহাজনের নাম আজিজ মিয়া।

বাজারে তার আড়তের দোকান। চাল কেনাবেচা করেন। সাথে সুদে টাকা খাটান। সুদের হার তিরিশ শতাংশ। বছরে না, ছয় মাসে। ফসল তোলার সময় শোধ দিতে হবে। না দিলে জমি।

এই নিয়মে গফরগাঁওয়ের অর্ধেক চাষি চলে। বাকি অর্ধেক ব্যাংকের দুয়ারে যায়, কিন্তু ব্যাংকে কাগজপত্র লাগে, জামানত লাগে, সময় লাগে। আজিজ মিয়ার কাছে কিছু লাগে না। শুধু জমির দলিল দেখাতে হয়।

আলম গেল।

"কত লাগবে?"

"এক লাখ।"

আজিজ মিয়া তাকালেন। চশমার ওপর দিয়ে, যেভাবে ডাক্তার রোগী দেখেন। হিসাব করলেন। তিন বিঘা জমি, বর্তমান বাজারদরে বিঘা প্রতি দুই লাখ। মোট ছয় লাখের জমি। এক লাখ ঋণ। নিরাপদ।

"ছয় মাসে এক লাখ ত্রিশ হাজার। ফসল তোলার পর শোধ। না পারলে জমি বন্ধক।"

আলম সই করল। তার হাতের মাটি কাগজে লেগে গেল।

সার কিনল। পটাশ কিনল। নাজমার বিয়ের জন্য পঞ্চাশ হাজার আলাদা রাখল। বাকি কুড়ি হাজার দিয়ে সেচের বিল আর কীটনাশক।

মার্চ গেল। এপ্রিল এল। ধান পাকতে শুরু করল। আলম মাঠে দাঁড়িয়ে সোনালি ধান দেখে বুকে একটু শান্তি পেল। ফলন ভালো হয়েছে। বিঘা প্রতি আঠারো-কুড়ি মণ হবে। তিন বিঘায় পঞ্চান্ন-ষাট মণ।

গত বছর ধানের দাম ছিল মণ প্রতি এক হাজার একশো টাকা। সেই হিসাবে ষাট মণে ছেষট্টি হাজার টাকা। সারের খরচ বাদ দিলেও হাতে থাকবে, ঋণও শোধ হবে।

কিন্তু আলম জানে না এখনো।

সে জানে না যে এ বছর সারাদেশে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। সে জানে না যে ফড়িয়ারা ইতিমধ্যে দাম ঠিক করে ফেলেছে।

ধান কাটার সময় এল। আলম শ্রমিক ভাড়া করল। দিনে সাতশো টাকা মজুরি। তিনদিনে ধান কাটা হলো। মাড়াই হলো। শুকানো হলো উঠোনে, রোদে।

ষাট মণ ধান। ঠিক হিসাব।

আলম ধান নিয়ে গেল বাজারে।

ফড়িয়া বলল, "সাতশো।"

আলম ভাবল ভুল শুনেছে। "সাতশো?"

"হ্যাঁ, মণ সাতশো। এই দাম।"

"গত বছর এগারোশো ছিল।"

ফড়িয়া কাঁধ ঝাঁকাল। "গত বছর গত বছর। এ বছর ফলন বেশি। ধান বেশি। দাম কম। নেবেন তো বলেন, না হলে পাশের গুদামে যান। সেখানেও এই দাম।"

আলম তিনটা গুদামে গেল। সব জায়গায় একই দাম। সাতশো। কোথাও সাড়ে সাতশো। কোথাও ছশো পঞ্চাশ।

ষাট মণ, সাতশো টাকা মণ। মোট বিয়াল্লিশ হাজার টাকা।

আলম দাঁড়িয়ে হিসাব করল। সারের খরচ আটচল্লিশশো। সেচ পাঁচ হাজার। কীটনাশক তিন হাজার। শ্রমিক মজুরি সাত হাজার। বীজ দুই হাজার। মোট খরচ একষট্টি হাজার আটশো।

আয় বিয়াল্লিশ হাজার।

লোকসান উনিশ হাজার আটশো টাকা।

এটা শুধু চাষের হিসাব। এর বাইরে আজিজ মিয়ার ঋণ: এক লাখ ত্রিশ হাজার।

আজিজ মিয়ার কাছে গেল। বলল, "ফসলের দাম পাইনি। সময় দেন।"

আজিজ মিয়া চা খাচ্ছিলেন। চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। তারপর বললেন, "আলম, আমার টাকা আমার টাকা। তোমার কষ্ট আমি বুঝি। কিন্তু কাগজে যা লেখা আছে, সেটাই হবে।"

"আরো ছয় মাস দেন। আমন মৌসুমে শোধ দেব।"

"সুদ বাড়বে।"

"জানি।"

আজিজ মিয়া ভাবলেন। আসলে ভাবার কিছু নেই। তিন বিঘা জমি তাঁর হাতে আসবে, এটা তিনি ঋণ দেওয়ার দিনই জানতেন। তিরিশ শতাংশ সুদে এক লাখ, ছয় মাসে এক লাখ ত্রিশ হাজার, আরো ছয় মাসে এক লাখ ঊনসত্তর হাজার। চাষির পক্ষে শোধ দেওয়া অসম্ভব। এটা ঋণ না। এটা জমি কেনার একটা ধীর প্রক্রিয়া।

"ঠিক আছে। আমন মৌসুমের পর।"

নাজমার বিয়ে হলো। পঞ্চাশ হাজার টাকা দিল আলম। যৌতুক। নিজের মেয়েকে বিদায় দিতে গিয়ে সে কাঁদল না। চোখ শুকনো ছিল। ফাতেমা কাঁদল। মা কাঁদলেন। রনি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।

আলম ভাবছিল অন্য কথা। পঞ্চাশ হাজার গেল। ঋণ বাড়ছে সুদে। আমন মৌসুমে ভালো ফলন না হলে জমি যাবে।

আমন মৌসুমে বন্যা এল।

সেপ্টেম্বরে পানি উঠল মাঠে। ধান ডুবে গেল। আলম হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে রইল। পচা পানির গন্ধ। মরা মাছের গন্ধ। কাদামাটিতে পা ডুবে যাচ্ছে। আকাশ ধূসর। বাতাসে জলীয় বাষ্পের ভার।

ফসল গেল।

আজিজ মিয়া এলেন ডিসেম্বরে।

তাঁর সাথে একজন দলিল লেখক। আলমের বাড়ির উঠোনে বসলেন। চা খেলেন। তারপর কাগজ বের করলেন।

"আলম, তুমি ভালো মানুষ। আমি তোমার ক্ষতি চাই না। তিন বিঘার মধ্যে দুই বিঘা আমাকে দাও। বাকি এক বিঘা তোমার। ঋণ মাফ।"

আলম কাগজের দিকে তাকাল। ফাতেমা ঘরের ভেতর থেকে দেখছে। রনি স্কুল থেকে ফিরে উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে, বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে।

আলম সই করল।

সেদিন রাতে সে খেল না। ফাতেমা ভাত বাড়ল। আলম বলল, "খিদা নাই।" ফাতেমা জোর করল না। সে জানে কী হয়েছে।

এখন আলম এক বিঘা জমি চাষ করে। নিজের।

বাকি দুই বিঘা? সেটাও চাষ করে। আজিজ মিয়ার বর্গাচাষি হিসেবে। ফসলের অর্ধেক আজিজ মিয়ার। অর্ধেক আলমের।

যে মাটি তার বাবার ছিল, তার দাদার ছিল, সেই মাটিতে সে এখন ভাড়াটে।

আলম সকালে মাঠে যায়। কোদাল চালায়। ঘাম ঝরে। পিঠে রোদ পড়ে। মাটির গন্ধে তার বুক ভরে, কিন্তু এই গন্ধের অর্ধেক এখন অন্যের।

রনি বলে, "বাবা, আমি বড় হয়ে জমি ফেরত কিনব।"

আলম কিছু বলে না। সে জানে এক বিঘায় যা ফলে তাতে রনির স্কুলের খরচই চলে না। রনি কীভাবে ছয় লাখ টাকা জোগাড় করবে?

সে কোদাল চালায়। মাটি ওলটায়। কেঁচো বের হয়। আলম কেঁচো দেখে। কেঁচোর জমি নেই। কেঁচো কোনো কাগজে সই করে না। কেঁচো শুধু মাটি খায়, মাটিতে থাকে।

আলম ভাবে, কেঁচোর জীবন সহজ।

দুপুরে ফাতেমা মাঠে ভাত নিয়ে আসে। অ্যালুমিনিয়ামের থালায় ভাত, এক টুকরো শুকনো মরিচ, একটু নুন। আলম খায়। ভাতে সে নিজের জমির চাল খায় না। বাজার থেকে সস্তা চাল কেনে। নিজের ধান বিক্রি করে। কারণ নিজের ধানের দামে একটু বেশি পাওয়া যায়, আর সস্তা চালে খরচ কম হয়।

যে লোক চাল ফলায়, সে সস্তা চাল খায়।

বিকালে আলম বাড়ি ফেরে। গোসল করে পুকুরে। সাবান নেই, মাটি দিয়ে গা ঘষে। কাপড় ধোয়ার সাবান দিয়ে মাথা ধোয়। তারপর মাগরিবের আজান হয়। আলম নামাজ পড়ে। নামাজে কী চায় সে? জমি ফেরত চায় না। সে জানে আল্লাহ জমির দলিল বদলান না।

সে শুধু চায় আগামীকাল যেন আজকের মতো কাটে। এটুকুই।

১০

রনি একদিন জিজ্ঞেস করল, "বাবা, আমরা গরিব কেন?"

আলম উত্তর দিতে পারল না। সে কি বলবে সারের দাম বেড়েছে বলে? ধানের দাম কমেছে বলে? মহাজনের সুদ বেশি বলে? বন্যা এসেছে বলে? মেয়ের যৌতুক দিতে হয়েছে বলে?

সব সত্য। কোনোটাই একা কারণ না। সবগুলো মিলে একটা জাল, আর সেই জালে আলম ধরা পড়েছে। তার বাবাও পড়েছিল। তার দাদাও। শুধু জাল একটু একটু করে শক্ত হচ্ছে।

আলম বলল, "গরিব কেন জিজ্ঞেস করো না। পড়াশোনা করো।"

রনি চলে গেল।

আলম জানে রনি পড়বে। হয়তো অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। তারপর সেও মাঠে আসবে। কোদাল ধরবে। ঘাম ফেলবে। একই মাটিতে। একই সূর্যের নিচে।

পরিবর্তন হবে শুধু একটা: জমির পরিমাণ আরো কমবে।

সন্ধ্যায় আলম উঠোনে বসে। আকাশে তারা ফুটছে। মশা কামড়াচ্ছে। দূরে কোথাও বাঁশি বাজছে, হয়তো কোনো রাখাল, হয়তো কোনো রেডিও। আলম শোনে। তার হাত হাঁটুর ওপরে রাখা। মাটিমাখা হাত। ফাটা হাত।

ফাতেমা ডাকে, "খাবে না?"

আলম ওঠে। ঘরে যায়। ভাত খায়। শোয়।

আগামীকাল সকালে সে আবার মাঠে যাবে। যে মাটি তার ছিল, সেই মাটিতে সে এখন ভাড়াটে। কিন্তু মাটি চেনে না কে মালিক, কে ভাড়াটে। মাটি শুধু চেনে কার ঘাম পড়ে তার বুকে।

আলমের ঘাম পড়ে। সেটুকুই তার।