নাপিত
কাটতে জানি। কিন্তু কোথায় কাটবো সেটা আর জানি না
১
কালাম মিয়ার চেয়ারটা কাঠের।
শিরীষ কাঠ। তার বাবা বানিয়েছিলেন, সত্তর সালে, মুক্তিযুদ্ধের এক বছর আগে। চেয়ারের পেছনে একটা আয়না আটকানো, আয়নার ফ্রেমে মরচে ধরেছে, কিন্তু আয়না পরিষ্কার। কালাম প্রতিদিন সকালে আয়না মোছে। আয়না তার কাছে পবিত্র জিনিস। আয়না দেখায় মানুষের মুখ। মুখ দেখে কালাম বোঝে কোন চুল কীভাবে কাটতে হবে।
পঞ্চাশ বছর ধরে কালাম চুল কাটছে।
বটগাছের নিচে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়, পুরনো বাস স্ট্যান্ডের কাছে। বটগাছটা কত পুরনো কেউ জানে না। কালামের বাবা জানতেন না। কালাম জানে না। গাছটা আছে, কালাম আছে, চেয়ারটা আছে।
সকাল সাতটায় আসে। সন্ধ্যা ছটায় গুটিয়ে নেয়। মাঝে বৃষ্টি হলে পলিথিন টাঙায় গাছের ডালে। রোদ হলে গাছের ছায়াই যথেষ্ট।
একটা হেয়ারকাট: ত্রিশ টাকা। দাড়ি কামানো: বিশ টাকা। কান পরিষ্কার: দশ টাকা।
এই দাম পাঁচ বছর ধরে একই আছে। কালাম দাম বাড়ায়নি। বাড়ালে খদ্দের যাবে। খদ্দের যেভাবেই হোক যাচ্ছে।
২
দুই কিলোমিটার পশ্চিমে একটা শপিং মল হয়েছে। তিন তলা। নিচতলায় একটা সেলুন। নাম "স্টাইল জোন।" এসি আছে। বড় আয়না আছে। ক্রিম আছে, জেল আছে, শ্যাম্পু আছে। ছেলেরা সেখানে যায়। হেয়ারকাট পাঁচশো টাকা।
পাঁচশো টাকা।
কালাম যখন এই দাম শুনল, চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর নিজের ক্ষুর বের করে শান দিতে শুরু করল। ক্ষুরটা তার দাদার। ইস্পাতের। হাতলে পিতলের কাজ। একশো বছরের পুরনো। এই ক্ষুর দিয়ে তার দাদা ব্রিটিশ আমলে চুল কেটেছেন। তার বাবা পাকিস্তান আমলে। কালাম বাংলাদেশে।
তিন প্রজন্মের চুল। তিন প্রজন্মের ঘাম। একটা ক্ষুর।
কিন্তু ছেলেরা এখন ক্ষুর চায় না। ট্রিমার চায়। ফেড চায়। আন্ডারকাট চায়। ইউটিউবে দেখে কীভাবে চুল কাটতে হয়, তারপর এসে বলে, "এইভাবে কাটেন।" কালাম পারে না। কালামের হাতে ক্ষুর আছে, কাঁচি আছে, চিরুনি আছে। মেশিন নেই।
মেশিন কিনতে পারে। দুই হাজার টাকা। কিন্তু মেশিন চালানো শিখতে হবে, আর কালামের চোখে এখন ঝাপসা দেখে। ষাটের ওপর বয়স। চশমা লাগে। চশমা আছে, কিন্তু পুরনো নম্বরের। নতুন চশমার খরচ বারোশো টাকা। সেটা কালামের এক সপ্তাহের আয়।
৩
কালামের ছেলে সুমন।
বাইশ বছর। এইচএসসি পাস। ঢাকায় যেতে চায়। গার্মেন্টসে কাজ করবে, অথবা দোকানে, অথবা যা পায়। কোটালীপাড়ায় কিছু নেই, সুমন বলে।
কালাম একদিন বলল, "আমার সাথে বসো। শিখো। ব্যবসা তোমার হবে।"
সুমন হাসল। হাসিটা কালামের বুকে ছুরির মতো ঢুকল।
"বাবা, আমি নাপিত হবো না।"
কালাম কিছু বলল না। কারণ বলার কিছু নেই। সুমনের কথা ভুল না। ত্রিশ টাকায় চুল কেটে কী হবে? দিনে দশজন এলে তিনশো। মাসে নয় হাজার। ঢাকায় গার্মেন্টসে মাসে বারো-পনেরো হাজার পায়, ওভারটাইম করলে আরো বেশি।
ত্রিশ টাকার হেয়ারকাটে জীবন চলে না। এটা কালাম জানে। কিন্তু পঞ্চাশ বছর ধরে চালিয়েছে। কীভাবে চালিয়েছে সেটা সে নিজেও বোঝে না। স্ত্রী রাবেয়া সেলাই করত, পাড়ার মেয়েদের ব্লাউজ, পেটিকোট। সেই টাকা মিলিয়ে কোনোরকমে চলত। রাবেয়া মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। এখন কালাম একা।
৪
সোমবার বিকাল। কালামের সামনে একজন খদ্দের বসে আছে। গোলাম হোসেন। কালামের বয়সী। সারাজীবন কালামের কাছে চুল কাটিয়েছে।
"গোলাম ভাই, কেমন কাটবো?"
"ছোট করো। গরম লাগে।"
কালাম কাঁচি চালায়। চুল পড়ে মাটিতে। সাদা চুল, কালো চুল, মিলেমিশে। কালামের হাত স্থির। পঞ্চাশ বছরের অভ্যাস। চোখ দেখে না ভালো, কিন্তু হাত জানে কোথায় কাঁচি চালাতে হবে।
"তোমার ছেলে?"
"ঢাকায় যাবে।"
"নাপিতি শিখবে না?"
"না।"
গোলাম হোসেন চুপ। তিনিও জানেন। তাঁর ছেলেও মাছের ব্যবসা করে না। ঢাকায় ড্রাইভার।
"কালাম, তোমার পরে কে কাটবে?"
কালাম কাঁচি থামাল। প্রশ্নটা সে আগেও ভেবেছে। কিন্তু উত্তর জানে না। সে জানে তার পরে কেউ এই চেয়ারে বসবে না। এই ক্ষুর ধরবে না। এই আয়নায় কেউ খদ্দেরের মুখ দেখবে না।
"কেউ না।"
গোলাম হোসেন উঠলেন। ত্রিশ টাকা দিলেন। কালাম নিল। পকেটে রাখল।
বটগাছের পাতা ঝরল একটা। কালামের কোলে পড়ল।
৫
খবরটা শুনল মঙ্গলবারে।
ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আবুল কাশেম এসেছিল চুল কাটাতে। কাটাতে কাটাতে বলল, "কালাম ভাই, এই রাস্তা চওড়া হবে।"
"কোন রাস্তা?"
"এই যে, তোমার সামনে দিয়ে যে রাস্তা গেছে। সরকারি প্রকল্প। চার লেন হবে। বটগাছ কাটতে হবে।"
কালাম ক্ষুর ধরে বসে আছে। আবুল কাশেমের গাল মসৃণ করছে। সাবানের ফেনা, ক্ষুরের শব্দ। কিন্তু কালামের কানে একটাই কথা বাজছে।
বটগাছ কাটবে।
"কবে?"
"আগামী মাসে। নোটিশ আসবে।"
কালাম চুপ। ক্ষুর চালায়। গালে একটু কেটে গেল। রক্ত বের হলো। আবুল কাশেম বলল, "আরে!" কালাম তুলো দিয়ে চেপে ধরল। "মাফ করবেন।"
হাত কাঁপছে। পঞ্চাশ বছরে কালামের হাত কখনো কাঁপেনি।
৬
রাতে কালাম বটগাছের কাছে গেল। টর্চ নেই। চাঁদের আলো আছে। গাছের গুঁড়ি ধরল। গুঁড়ি এত মোটা যে দুজন মিলেও জড়িয়ে ধরতে পারবে না। ছাল খসখসে। গন্ধ মাটির, পুরনো পাতার, সময়ের।
এই গাছের নিচে কালামের বাবা প্রথম ক্ষুর ধরেছিলেন। এই গাছের ছায়ায় কালাম প্রথম চুল কেটেছিল, এক কিশোরের, যে এখন বৃদ্ধ, যে এখনো মাঝে মাঝে আসে। এই গাছের শিকড়ের ওপর কালামের পা পড়েছে হাজার হাজার দিন।
গাছটা কাটলে কালাম কোথায় যাবে?
বাজারে একটা দোকান ভাড়া নেওয়া যায়। মাসে তিন হাজার টাকা। কালাম মাসে আট-নয় হাজার কামায়। তিন হাজার ভাড়া দিলে বাকি পাঁচ-ছয় হাজারে চলবে না।
ফুটপাতে বসা যায়। কিন্তু ফুটপাতে পুলিশ তাড়ায়। লাইসেন্স লাগে। লাইসেন্সের জন্য ঘুষ লাগে।
কালাম গাছের গুঁড়ি ছেড়ে দিল। বাড়ি ফিরে গেল। খেল না। শুয়ে পড়ল।
৭
পরের দিন সকালে কালাম যথারীতি সাতটায় এল। চেয়ার পাতল। আয়না ঝুলাল। ক্ষুরে শান দিল। পাথরের ওপর ক্ষুর চালানোর শব্দ, শ্রীই শ্রীই, যেন কেউ কাঁদছে।
প্রথম খদ্দের এল নটায়। এক স্কুলের ছেলে। মা পাঠিয়েছে। "ছোট করে কেটে দেন।"
কালাম কাটল। ছেলেটা চুপ করে বসে রইল। কালাম জিজ্ঞেস করল, "কোন ক্লাসে পড়ো?"
"সেভেন।"
"পড়াশোনা কেমন?"
"ভালো।"
কালাম ভাবে, এই ছেলে বড় হয়ে স্টাইল জোনে যাবে। পাঁচশো টাকা দিয়ে চুল কাটাবে। কালামের কাছে আসবে না। কালামের কাছে আর কেউ আসবে না একদিন।
দুপুরে দুইজন এল। বিকালে একজন। সন্ধ্যায় কেউ না।
চারজন। ত্রিশ টাকা করে। একশো কুড়ি টাকা। চা খেয়েছে দুই কাপ, কুড়ি টাকা। বিড়ি দুইটা, দশ টাকা। দুপুরে মুড়ি-চানাচুর, পনেরো টাকা। খরচ পঁয়তাল্লিশ টাকা।
নেট আয়: পঁচাত্তর টাকা।
৮
সুমন চলে গেল ঢাকায়। একটা ব্যাগে কাপড়চোপড়, একটা পুরনো ফোন, পকেটে দুই হাজার টাকা। বাসে উঠল গোপালগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড থেকে।
কালাম বিদায় দিতে গেল। কিছু বলল না। সুমনও কিছু বলল না। বাস ছাড়ল। ধুলো উড়ল।
কালাম বাস স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে বটগাছের কাছে ফিরে এল। চেয়ারে বসল। খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করল।
কেউ এল না।
কালাম ক্ষুর বের করল। শান দিল। ক্ষুরটা ইতিমধ্যেই ধারালো ছিল। তবু শান দিল। কারণ শান দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই।
বিকালে পাশের দোকানের রহিম এসে বলল, "চা খাবি?"
কালাম বলল, "খাব।"
দুজনে চা খেল। রহিম বলল, "গাছ কাটবে শুনলি?"
"শুনলাম।"
"কী করবি?"
কালাম চায়ের কাপে চুমুক দিল। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ঠান্ডা চায়ের স্বাদ তেতো।
"জানি না।"
৯
এক মাস পর নোটিশ এল। সরকারি কাগজ। বটগাছসহ রাস্তার দুই পাশের সব অস্থায়ী দখল সরাতে হবে। পনেরো দিনের মধ্যে।
কালাম নোটিশটা পড়ল। পড়তে পারে না ভালো, পাশের দোকানদার পড়ে শোনাল। কালাম শুনল।
পনেরো দিন।
কালাম কিছু করল না। প্রতিদিন সকালে এল, চেয়ার পাতল, ক্ষুর বের করল, খদ্দেরের জন্য বসে রইল। যে দুই-তিনজন আসে, তাদের চুল কাটল। সন্ধ্যায় গুটিয়ে বাড়ি গেল।
পনেরো দিনের তেরো দিন কেটে গেল।
চৌদ্দতম দিনে সকালে কালাম এসে দেখল বটগাছের গায়ে লাল রঙের ক্রস চিহ্ন। কাটার চিহ্ন। কাল বা পরশু করাত আসবে।
কালাম চেয়ারে বসল। আয়না ঝুলাল। ক্ষুর বের করল। শান দিল।
একজন খদ্দের এল। বুড়ো রমজান আলী। কালামের বাবার আমল থেকে এখানে চুল কাটায়।
"কালাম, শেষবার?"
"শেষবার কী?"
"এই গাছের নিচে?"
কালাম উত্তর দিল না। রমজান আলীর চুল কাটল। সাদা চুল মাটিতে পড়ল। বাতাসে উড়ল। বটগাছের শিকড়ের ফাঁকে জমল।
রমজান আলী ত্রিশ টাকা দিলেন। কালাম নিল।
"আল্লাহ হাফেজ, কালাম।"
"আল্লাহ হাফেজ।"
১০
সন্ধ্যায় কালাম চেয়ার, আয়না, কাঁচি, চিরুনি গুটিয়ে নিল। ক্ষুরটা আলাদা করে কাপড়ে মুড়ে পকেটে রাখল।
বটগাছের দিকে তাকাল। গাছটা তাকে দেখছে কি না জানে না। গাছের দেখা-না-দেখা কালামের জানা নেই। কিন্তু গাছের ছায়ায় সে পঞ্চাশটা বছর কাটিয়েছে। রোদে, বৃষ্টিতে, শীতে। এই গাছ তার দোকান ছিল, তার ছাদ ছিল।
কাল গাছ কাটবে। আর কালাম? কালামের চেয়ার কোথায় যাবে? কালামের আয়না কোথায় ঝুলবে?
কালাম জানে না।
সে বাড়ি ফিরে গেল। রাতে শুয়ে ক্ষুরটা বালিশের পাশে রাখল। ঘুম এল না। ঘরের টিনের চালে শিশির পড়ছে। টপ টপ।
সকালে কালাম উঠল। চা বানাল। ক্ষুর বের করল। শান দিল।
কাটতে জানে। কিন্তু কোথায় কাটবে সেটা আর জানে না।
ক্ষুর ধারালো। এটুকুই আপাতত যথেষ্ট।