গার্মেন্টস শ্রমিক

আমি যে জামা বানাই, সেটা পরার সাধ্য আমার নেই

পর্ব ৩ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রেহানার আঙুল দেখলে মনে হয় মেশিনের অংশ।

ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমায় সুইয়ের দাগ। বহু পুরনো দাগ, নতুন দাগের ওপর নতুন দাগ, স্তরে স্তরে, যেন মাটির নিচে পলি জমে। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের নখ কালচে, কাপড়ের রঙ ঢুকে গেছে চামড়ায়। রেহানার হাত ত্রিশ বছরের মেয়ের হাত না। রেহানার হাত মেশিনের।

সাভার। হেমায়েতপুর রোডের ওপর ফ্যাক্টরি। আটতলা ভবন। তৃতীয় তলায় রেহানার ফ্লোর। একটানা সেলাই মেশিনের সারি, দুই পাশে, মাঝে সরু পথ দিয়ে সুপারভাইজার হাঁটে। মেশিনের শব্দে কানে তালা লাগে। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়, সারাদিন, থামে না।

সকাল আটটায় ঢোকে। রাত দশটায় বের হয়।

চৌদ্দ ঘণ্টা। এক্সপোর্ট রাশ সিজন। অর্ডার বেশি। ওভারটাইম বাধ্যতামূলক। "বাধ্যতামূলক" শব্দটা কারখানায় অন্যভাবে বলে: "যে করবে না, তার কার্ড কেটে দেওয়া হবে।"

মাসে আটহাজার পাঁচশো টাকা। বেসিক। ওভারটাইম মিলিয়ে দশ-এগারো হাজার।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল।

রেহানা তখন অন্য ফ্যাক্টরিতে ছিল। রানা প্লাজায়। পাঁচতলায়। সকালে ভবনে ঢুকতে গিয়ে দেখল দেয়ালে ফাটল। বড় ফাটল। আগের দিনও ছিল। পুলিশ এসেছিল। বলেছিল ভবন খালি করতে। কিন্তু সকালে মালিক বলল, "ঢোকো। কাজ করো। কিছু হবে না।"

রেহানা ঢুকল। কারণ না ঢুকলে মাইনে কাটবে। তিন দিনের মাইনে। রেহানার মেয়ে তাহমিনার স্কুলের ফি বাকি আছে।

সকাল নটার কিছু পরে ভবন ভেঙে পড়ল।

রেহানা পাঁচতলায় ছিল। মেঝে দুলল আগে। তারপর শব্দ হলো, কামানের গোলার মতো, পৃথিবী ফেটে যাওয়ার মতো। তারপর অন্ধকার।

রেহানা সতেরো ঘণ্টা চাপা পড়ে ছিল। একটা কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে, দুটো মেশিনের মাঝে। ডান পা-টা পিষে গেছে। শ্বাস নেওয়া কঠিন ছিল। ধুলো, সিমেন্টের গুঁড়ো, রক্তের গন্ধ। পাশে কেউ চিৎকার করছিল। তারপর চিৎকার থেমে গেল।

রেহানা বেঁচে গেল। এক হাজার একশো চৌত্রিশ জন বাঁচল না।

পা-টা সারল। হাঁটতে পারে। কিন্তু দৌড়াতে পারে না। সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি নামতে পারে না। আর রাতে ঘুমালে মাঝে মাঝে মেঝে দোলে। মেঝে দোলে না আসলে। রেহানার মাথার ভেতরে দোলে। সে চিৎকার করে উঠে বসে। তাহমিনা ভয় পায়।

আজ ফ্যাক্টরিতে অডিট।

বিদেশি ক্রেতার অডিট। ইউরোপের কোনো কোম্পানি। তাদের লোক আসবে দুজন, ইন্টারপ্রেটার সাথে। দেখবে ফ্যাক্টরি পরিষ্কার কি না, ফায়ার এক্সিট ঠিক আছে কি না, টয়লেট আছে কি না, শ্রমিকরা কত ঘণ্টা কাজ করে।

রেহানা সকালে ঢুকে দেখল ফ্লোর ঝকঝক করছে। রাতে পরিষ্কার করা হয়েছে। যে ফায়ার এক্সিট গত ছয় মাস ধরে তালাবন্ধ ছিল, কাপড়ের বান্ডিলে ঢাকা ছিল, সেটা আজ খোলা। পরিষ্কার। সবুজ সাইন জ্বলছে উপরে। EXIT।

টয়লেটে সাবান আছে আজ। গত সপ্তাহে ছিল না। গত মাসে ছিল না। গত বছরে কখনো ছিল না।

সুপারভাইজার সবাইকে বলেছে: "কেউ অভিযোগ করবে না। কেউ বেশি কথা বলবে না। জিজ্ঞেস করলে বলবে সব ঠিক আছে।"

রেহানা সেলাই করতে বসল। আজ একটু ধীরে কাজ করছে সবাই। অডিটের দিনে তাড়া নেই। অডিটের দিনে সুপারভাইজার চিৎকার করে না। অডিটের দিনে ফ্যাক্টরি একটা সুন্দর জায়গা।

কাল সব আগের মতো হবে। ফায়ার এক্সিটে তালা লাগবে। কাপড়ের বান্ডিল জমবে সামনে। টয়লেটে সাবান থাকবে না। সুপারভাইজার চিৎকার করবে। আর রেহানা ঘণ্টায় একশো কুড়িটা পিস সেলাই করবে।

অডিটর এল দুপুরে। দুজন সাদা মানুষ। একজন লম্বা, চশমা, ক্লিপবোর্ড হাতে। আরেকজন মেয়ে, ছোটখাটো, ক্যামেরা হাতে। তাদের সাথে একজন বাঙালি ছেলে, ইংরেজি-বাংলা অনুবাদ করছে।

তারা ফ্লোরে ঢুকল। মেশিনের সারি দেখল। ফায়ার এক্সিট দেখল। টয়লেট দেখল। ক্লিপবোর্ডে টিক দিল।

লম্বা অডিটর রেহানার কাছে এল। ইন্টারপ্রেটার জিজ্ঞেস করল, "আপনি কত ঘণ্টা কাজ করেন?"

রেহানা বলল, "আট ঘণ্টা।"

মিথ্যা। চৌদ্দ ঘণ্টা। কিন্তু সুপারভাইজার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।

"ওভারটাইম আছে?"

"মাঝে মাঝে।"

মাঝে মাঝে না। প্রতিদিন। কিন্তু এটাও বলা যায় না।

"ফায়ার ড্রিল হয়?"

"হ্যাঁ।"

কখনো হয়নি। একবারও না। কিন্তু বলল হ্যাঁ। কারণ না বললে চাকরি যাবে। চাকরি গেলে তাহমিনার স্কুল বন্ধ হবে। ঘরের ভাড়া বন্ধ হবে। খাওয়া বন্ধ হবে।

অডিটর হাসল। "Thank you." চলে গেল পরের মেশিনে।

রেহানা সেলাই করতে লাগল। সুই চলল। কাপড় এগোল। মেশিনের নিচে ট্যাগ লাগানো: "Made in Bangladesh."

রেহানা যে জামা সেলাই করে, সেটা কোথায় যায়?

নিউ ইয়র্কে। লন্ডনে। প্যারিসে। টোকিওতে। দোকানের হ্যাঙারে ঝুলে, নরম আলোয়, এসি-ঠান্ডা ঘরে। দাম ত্রিশ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় তিন হাজার ছয়শো।

রেহানা একটা জামায় পায় কত?

একটা জামা সেলাই করতে লাগে তিন মিনিট। ঘণ্টায় কুড়িটা। একশো কুড়িটা ছয় ঘণ্টায়। চৌদ্দ ঘণ্টায় দুইশো আশি। মাসে ছাব্বিশ কাজের দিনে সাত হাজার দুইশো আশি পিস।

মাসে পায় দশ হাজার টাকা। সাত হাজার দুইশো আশি পিসে ভাগ করলে পিস প্রতি এক টাকা আটত্রিশ পয়সা।

ত্রিশ ডলারের জামায় রেহানার ভাগ: এক টাকা আটত্রিশ পয়সা। রিটেইল প্রাইসের ০.০৪ শতাংশ।

রেহানা এই হিসাব জানে না। কিন্তু সে জানে যে সে যে জামা বানায়, সেটা পরার সাধ্য তার নেই। সে জানে কারণ একবার ঢাকার একটা শপিং মলে গিয়েছিল। তাহমিনাকে নিয়ে। একটা দোকানে ঢুকেছিল। একটা জামা দেখেছিল। ট্যাগে দাম: দুই হাজার পাঁচশো টাকা। রেহানা ট্যাগ ধরে দেখল। তারপর ভেতরের লেবেল দেখল। "Made in Bangladesh." সেলাইটা চিনল। এই স্টিচ সে নিজে করে।

তাহমিনা বলল, "আম্মু, এটা সুন্দর।"

রেহানা বলল, "চলো।"

দোকান থেকে বের হয়ে এল।

রাতে ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে রেহানা হাঁটে। বাস ধরে হেমায়েতপুর থেকে সাভার বাজার। সেখান থেকে আবার হাঁটে। বস্তি পর্যন্ত। একটা ঘর। দশ বাই আট ফুট। টিনের চাল, ইটের দেয়াল। একটা খাট, একটা চুলা, একটা প্লাস্টিকের তাক।

তাহমিনা ঘুমিয়ে আছে। বারো বছর। ক্লাস সিক্সে পড়ে। পাশের ঘরের খালা দেখে রাখে রাতে।

রেহানা চুলায় আগুন ধরাল। গরম ভাত আছে, ডাল আছে। খেল। গোসল করল ঠান্ডা পানিতে। শরীরে কাপড়ের তুলোর গুঁড়ো, ঘামের লবণ, মেশিনের তেলের গন্ধ। পানি দিলে সব যায়। ক্লান্তি যায় না।

শুয়ে পড়ল তাহমিনার পাশে। মেয়ের চুলে হাত বোলাল। মেয়ের হাত নরম। রেহানার হাত শক্ত। এই দুটো হাত পাশাপাশি আছে। একটা শ্রমের, একটা শৈশবের।

রেহানা চায় তাহমিনার হাত নরম থাকুক। তাহমিনা যেন গার্মেন্টসে না আসে। তাহমিনা যেন পড়ে, চাকরি করে, অফিসে বসে। তাহমিনার আঙুলে যেন সুইয়ের দাগ না পড়ে।

এইজন্য রেহানা চৌদ্দ ঘণ্টা সেলাই করে।

রাত দুইটায় মেঝে দুলল।

না, দোলেনি আসলে। রেহানার মাথায় দুলল। ২০১৩-র সেই শব্দ ফিরে এল। কামানের গোলা। কংক্রিট ভাঙার শব্দ। চিৎকার। ধুলো। অন্ধকার।

রেহানা উঠে বসল। বুক ধড়ফড় করছে। হাতে ঘাম। ঘরটা স্থির আছে, দেয়াল স্থির, চাল স্থির। কিছু হয়নি।

তাহমিনা ঘুমিয়ে আছে। কিছু জানে না।

রেহানা উঠে পানি খেল। তারপর দরজা খুলে বাইরে দাঁড়াল। বস্তির গলি। অন্ধকার। দূরে কুকুর ডাকছে। কোথাও একটা বাচ্চা কাঁদছে।

তেরো বছর হয়ে গেল। তেরো বছরে রানা প্লাজা একটা স্মৃতি হয়ে গেছে সবার কাছে। পত্রিকায় প্রতি বছর এপ্রিলে একটা ফিচার হয়। কেউ শেয়ার করে, কেউ করে না। সরকার ক্ষতিপূরণের কথা বলে। কতজন পেয়েছে, কতজন পায়নি, সেটা কেউ হিসাব করে না।

রেহানা পেয়েছে বিশ হাজার টাকা। এক হাজার একশো চৌত্রিশ জন মারা গেল, আর রেহানা পেল বিশ হাজার টাকা।

রেহানা ঘরে ঢুকল। শুয়ে পড়ল। ঘুম এল না। চোখ খোলা রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। ছাদে একটা টিকটিকি চলছে।

সকাল আটটায় আবার ফ্যাক্টরিতে ঢুকতে হবে।

পরের দিন অডিট শেষ। ফ্যাক্টরি "পাস" করেছে। ম্যানেজার খুশি। ইউরোপের কোম্পানি আরো এক বছর অর্ডার দেবে। লাখ লাখ পিস।

ফায়ার এক্সিটে আবার কাপড়ের বান্ডিল রাখা হলো। তালা লাগল। সবুজ EXIT সাইন নিভে গেল।

টয়লেট থেকে সাবান সরানো হলো।

সুপারভাইজার চিৎকার করল: "স্পিড বাড়াও! পেন্ডিং অর্ডার আছে!"

রেহানা মেশিনে বসল। পা প্যাডেলে। হাতে কাপড়। সুই চলল। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়।

ঘণ্টায় একশো কুড়ি পিস। প্রতি তিরিশ সেকেন্ডে একটা জামা।

প্রতিটা জামায় রেহানার আঙুলের ছোঁয়া আছে। নিউ ইয়র্কে কেউ সেই জামা গায়ে দেবে। তার শরীরে রেহানার আঙুলের কাজ থাকবে। সে জানবে না রেহানাকে। রেহানা জানবে না তাকে। তাদের মধ্যে একটাই সংযোগ: একটা সেলাই।

রেহানার আঙুল চলে। তার চেয়ে দ্রুত চলে। চিন্তার চেয়ে দ্রুত। স্বপ্নের চেয়ে দ্রুত।

আমি যে জামা বানাই, সেটা পরার সাধ্য আমার নেই।

মেশিন চলে। রেহানা চলে। ফ্যাক্টরি চলে। দিন চলে।