রিকশাচালক
বৃষ্টিতে ভাড়া বাড়ে। শরীরের দাম কমে
১
মজিবরের পা দুটো দেখলে মানচিত্র মনে হয়।
নীল শিরা ফুলে উঠেছে হাঁটুর নিচে থেকে গোড়ালি পর্যন্ত। আঁকাবাঁকা, শাখা-প্রশাখা ছড়ানো, যেন নদী। ভেরিকোজ ভেইন। ডাক্তার একবার বলেছিল শব্দটা। মজিবর মনে রেখেছে। মানে বোঝে না, কিন্তু শব্দটা মনে আছে। "ভেরিকোজ।" সুন্দর শব্দ। কুৎসিত রোগ।
পঞ্চাশ বছর বয়স। তিরিশ বছর রিকশা চালাচ্ছে। মিরপুর থেকে শুরু। এখন মোহাম্মদপুর। প্রতিদিন সকাল ছটায় বের হয়, রাত দশটায় ফেরে। ষোলো ঘণ্টা রাস্তায়।
রিকশাটা তার নিজের না। আমিনুল মালিকের। আমিনুল মালিক মোহাম্মদপুরে একটা মুদির দোকান চালায়, সাথে চারটা রিকশা ভাড়া দেয়। প্রতিদিন আশি টাকা। মজিবর সকালে রিকশা নিয়ে যায়, রাতে ফেরত দেয়, আশি টাকা দেয়। এটাই চুক্তি।
দিনে কত কামায়? ভালো দিনে পাঁচশো। খারাপ দিনে তিনশো। বৃষ্টির দিনে ছশো-সাতশো। বৃষ্টিতে ভাড়া বাড়ে।
আশি টাকা মালিকের। বাকিটা মজিবরের। এর থেকে দুপুরে খাওয়া, চা, মাঝে মাঝে বিড়ি। রাতে বাড়ি ফিরে যা থাকে, সেটা সংসারের।
বউ জোবেদা। ছেলে সজল, বিশ বছর, গার্মেন্টসে কাজ করে। মেয়ে পারভীন, ষোলো বছর, এসএসসি দেবে এ বছর।
মজিবরের শরীরই তার পুঁজি। দুটো পা, দুটো হাত, একটা পিঠ। যেদিন শরীর থামবে, সেদিন সব থামবে।
২
সকাল সাতটা। মিরপুর রোড। মজিবর প্রথম ভাড়া খুঁজছে।
একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। কলেজ স্টুডেন্ট। ব্যাগ কাঁধে।
"ধানমন্ডি কত?"
"ত্রিশ টাকা।"
"বিশ দেব।"
মজিবর রাজি হলো। বিশ টাকা। ধানমন্ডি পর্যন্ত দুই কিলোমিটার। পায়ে জোর দিল। রিকশা চলল। ট্রাফিকের ভেতর দিয়ে, বাসের পাশ দিয়ে, সিএনজির ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে। ডিজেলের গন্ধ। গরম আলকাতরার গন্ধ। রাস্তায় পানি জমে আছে গতকালের বৃষ্টির। চাকা পানিতে পড়লে ছিটে ওঠে।
মেয়েটা ফোনে কথা বলছে। ইংরেজিতে। মজিবর বোঝে না। কিন্তু গলার স্বর শোনে। হালকা, পরিষ্কার, চিন্তামুক্ত।
ধানমন্ডি এল। মেয়েটা নামল। বিশ টাকা দিল। চলে গেল।
মজিবর পরের ভাড়া খুঁজল।
৩
ইলেকট্রিক রিকশা আসতে শুরু করেছে।
ব্যাটারিচালিত। প্যাডেল মারতে হয় না। একটা সুইচ, একটা এক্সেলারেটর। বসে থাকো, রিকশা চলে। ঘাম নেই, হাঁফানি নেই, ভেরিকোজ ভেইন নেই।
মজিবর দেখে। রাস্তায় আজকাল প্রতি দশটা রিকশায় তিনটা ইলেকট্রিক। যাত্রীরা সেগুলো আগে ধরে। দ্রুত যায়। আরামে যায়। রিকশাওয়ালাকে কষ্ট দেওয়ার অপরাধবোধ নেই।
একটা ইলেকট্রিক রিকশার দাম কত? দুই লাখ টাকা।
দুই লাখ।
মজিবর মাসে কত জমাতে পারে? শূন্য। কিছু জমে না। যা কামায়, তা খরচ হয়। সজলের কামাই মিলিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে। পারভীনের পরীক্ষার ফি, বইয়ের দাম, জোবেদার ওষুধ (ডায়াবেটিস, মাসে আটশো টাকার ইনসুলিন), ঘরের ভাড়া (তিন হাজার, একটা ঘর, মোহাম্মদপুরের এক গলিতে), বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল।
দুই লাখ টাকা মজিবরের জন্য চাঁদ ছোঁয়ার মতো।
ব্যাংক লোন? ব্যাংকে যেতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র লাগে (আছে), ট্রেড লাইসেন্স লাগে (নেই), জামানত লাগে (নেই), ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লাগে (নেই)।
এনজিও? মাইক্রোক্রেডিট? সুদ ত্রিশ-চল্লিশ শতাংশ। রিকশায় মাসে যা আয় হয়, তাতে কিস্তি দিয়ে খাওয়া সম্ভব না।
মজিবর প্যাডেল মারে। ঘাম ঝরে। ইলেকট্রিক রিকশা তাকে ওভারটেক করে যায়।
৪
দুপুরে মজিবর ফুটপাতের একটা দোকানে খায়। ভাত, ডাল, একটুকরো মাছ। পঞ্চাশ টাকা। খাওয়ার পর একটু বসে। পিঠটা সোজা করে। মেরুদণ্ড ব্যথা করে। কোমরের নিচে একটা যন্ত্রণা, পুরনো, সারাক্ষণ আছে, মাঝে মাঝে তীব্র হয়।
পায়ের শিরাগুলো দেখে। বাঁ পায়ে বেশি ফোলা। হাঁটুর পেছনে একটা গিট হয়ে গেছে, নীল-বেগুনি, স্পর্শ করলে ব্যথা। ডাক্তার বলেছিল গত বছর:
"রিকশা চালানো বন্ধ করতে হবে।"
মজিবর বলেছিল, "তাহলে খাবো কী?"
ডাক্তার চুপ। ডাক্তারের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই। ডাক্তার শরীর বোঝেন, পেট বোঝেন না।
ডাক্তার বলেছিলেন অপারেশন করতে হবে। খরচ পঁচিশ-ত্রিশ হাজার। সরকারি হাসপাতালে। প্রাইভেটে লাখের ওপর।
মজিবর অপারেশন করায়নি। পঁচিশ হাজার নেই। হলে কি রিকশা চালাত?
সে উঠল। রিকশায় বসল। প্যাডেল মারল। ব্যথাটা প্রথম কয়েক মিনিট তীব্র থাকে, তারপর অসাড় হয়ে যায়। অসাড় হওয়াটাই ভালো। ব্যথা না থাকলে ভুলে যাওয়া যায় যে পা আছে।
৫
বিকালে এক ভদ্রলোক উঠল। স্যুট পরা। টাই। জুতো চকচকে। ফোনে কথা বলছেন। গুলশান যাবেন।
"মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান? রিকশায়?" মজিবর জিজ্ঞেস করল।
"না না, ধানমন্ডি ২৭ পর্যন্ত। সেখান থেকে উবার নেব।"
ধানমন্ডি ২৭। তিন কিলোমিটার। "পঞ্চাশ টাকা।"
"চল।"
মজিবর চালাল। ভদ্রলোকের ওজন বেশি। আন্দাজে আশি-নব্বই কেজি। রিকশা ভারী। ওঠার সময় পায়ে চাপ বাড়ে। শিরা ফুলে ওঠে। ঘাম গড়ায় কপাল থেকে চোখে। লবণ জ্বালা করে।
ভদ্রলোক ফোনে বলছেন, "No, the quarterly report needs revision. Tell Rashid to fix the numbers by EOD."
মজিবর বোঝে না। কিন্তু গলার স্বরে কর্তৃত্ব চেনে। এই গলায় কেউ হুকুম করে, কেউ মানে।
ধানমন্ডি ২৭ এল। ভদ্রলোক নামলেন। পঞ্চাশ টাকা দিলেন। দুই টাকা বকশিশ। বায়ান্ন টাকা। চলে গেলেন। উবারে বসলেন। এসি গাড়ি। ফোনে কথা বলতে বলতে।
মজিবর দাঁড়িয়ে রইল। ঘাম শুকোচ্ছে পিঠে। শার্ট ভিজে গেছে। গন্ধ হচ্ছে শরীর থেকে, ঘামের, পরিশ্রমের।
বায়ান্ন টাকা। তিন কিলোমিটার। মজিবরের শরীরের দাম: কিলোমিটার প্রতি সতেরো টাকা ত্রিশ পয়সা।
৬
সন্ধ্যায় বৃষ্টি শুরু হলো।
মজিবরের কাছে একটা প্লাস্টিকের চাদর আছে। সেটা যাত্রীর ওপর দেয়। নিজে ভেজে। ভেজা শরীরে রিকশা চালানো কঠিন। হাত পিচ্ছিল হয়ে যায় হ্যান্ডেলে। পা পিচ্ছিল হয়ে যায় প্যাডেলে। রাস্তায় পানি জমে। গর্তে চাকা পড়লে ঝাঁকুনি লাগে। যাত্রী বিরক্ত হয়।
কিন্তু বৃষ্টিতে ভাড়া বাড়ে।
ত্রিশ টাকার ভাড়া পঞ্চাশ হয়। পঞ্চাশ টাকার ভাড়া আশি। মানুষ তাড়াহুড়ো করে। ভিজতে চায় না। রিকশা ধরে যেনতেন করে।
মজিবর ভেজে। পায়ের শিরা ফোলে। ঠান্ডা পানিতে পা ভিজলে ব্যথা বাড়ে। কিন্তু ভাড়া বাড়ে।
বৃষ্টিতে ভাড়া বাড়ে। শরীরের দাম কমে।
রাত আটটায় বৃষ্টি থামল। মজিবর তখন পাঁচশো টাকা কামিয়েছে। ভালো দিন। আশি টাকা মালিকের। বাকি চারশো কুড়ি।
ভেজা শরীরে বাড়ি ফিরল। কাপড় বদলাল। জোবেদা গরম ভাত দিল। খেল। শুয়ে পড়ল।
পায়ে ব্যথা। কোমরে ব্যথা। ঘাড়ে ব্যথা। সারা শরীরে ব্যথা।
জোবেদা পায়ে তেল মালিশ করে দিল। জোবেদার হাত গরম। মালিশে একটু আরাম হয়। ব্যথা যায় না, কিন্তু কমে।
৭
রাতে মজিবর জেগে রইল।
পারভীন পাশের ঘরে পড়ছে। মোমবাতির আলোয়। বিদ্যুৎ নেই, লোডশেডিং। মজিবর দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল। মেয়ে খাতায় লিখছে। মেয়ের মুখে আলো পড়েছে। মেয়ে সুন্দর। মেয়ে পড়ালেখায় ভালো।
পারভীন যদি এসএসসি পাস করে, তাহলে কলেজে পড়বে। কলেজে পড়লে খরচ বাড়বে। খরচ বাড়লে মজিবরকে আরো বেশি চালাতে হবে। আরো বেশি ঘাম ঝরাতে হবে।
কত বেশি?
মজিবরের শরীরে আর কত বাকি আছে? পা আর কত দিন চলবে? ডাক্তার বলেছিল অপারেশন না করলে একদিন পা কাজ করবে না। সেই "একদিন" কবে আসবে? আগামীকাল? আগামী মাসে? আগামী বছর?
মজিবর জানে না। সে শুধু জানে আগামীকাল সকালে ছটায় রিকশা নিতে হবে। আমিনুল মালিককে আশি টাকা দিতে হবে। তারপর সারাদিন চালাতে হবে।
সে চোখ বুজল। ঘুমানোর চেষ্টা করল। পায়ে ব্যথা। শিরায় রক্ত জমে আছে। মাধ্যাকর্ষণ টানছে নিচের দিকে। সারাদিন উপরে পাম্প করেছে প্যাডেল মেরে, রাতে সব আবার নিচে।
মজিবরের শরীর একটা পাম্প। ষোলো ঘণ্টা পাম্প করে, আট ঘণ্টা বিশ্রাম নেয়, আবার পাম্প করে। একদিন পাম্প বন্ধ হবে।
৮
সকালে জোবেদা বলল, "সজল বলেছে একটা ইলেকট্রিক রিকশা কিস্তিতে কেনা যায়।"
"কত কিস্তি?"
"মাসে পাঁচ হাজার। তিন বছর।"
মজিবর হিসাব করল। মাসে পাঁচ হাজার। তার আয় থেকে পাঁচ হাজার বের করলে সংসার চলবে না।
"সজলের কামাই মিলিয়ে?"
"সজলের পনেরো হাজার। তোমার দশ-এগারো হাজার। মিলিয়ে পঁচিশ-ছাব্বিশ হাজার। ভাড়া তিন হাজার। খাওয়া আট হাজার। জোবেদার ওষুধ আটশো। পারভীনের খরচ দুই হাজার। বিদ্যুৎ-গ্যাস দেড় হাজার। আর মালিকের আশি টাকা, মানে মাসে চব্বিশশো। মোট খরচ আঠারো হাজার সাতশো।"
হাতে থাকে সাত-আট হাজার। পাঁচ হাজার কিস্তি দিলে বাকি দুই-তিন হাজার। কোনো অসুখ, কোনো দুর্ঘটনা, কোনো বিশেষ খরচ হলেই ধরা।
"না।"
জোবেদা চুপ। সে জানে "না" মানে "না।" মজিবরের "না" তে যুক্তি আছে। যুক্তির পেছনে গণিত আছে। গণিতের পেছনে দারিদ্র্য আছে।
৯
বেলা বারোটায় মজিবর একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে। ভাড়া নেই। পাশে আরো তিনটা রিকশা দাঁড়িয়ে। দুটো ইলেকট্রিক।
একটা ইলেকট্রিক রিকশার চালক অল্পবয়সী ছেলে। পঁচিশ-ছাব্বিশ। ফোনে গান শুনছে। ঘাম নেই তার গায়ে। মজিবরের গায়ে ঘাম।
একজন যাত্রী এল। দেখল তিনটা রিকশা। ইলেকট্রিকে উঠল।
আরেকজন এল। আবার ইলেকট্রিক।
মজিবর বসে রইল। রিকশার সিটে। পা ঝুলিয়ে।
তৃতীয় যাত্রী এল। এবার বুড়ো মানুষ। সে মজিবরের রিকশায় উঠল।
"কেন ইলেকট্রিকে উঠলেন না?" মজিবর জিজ্ঞেস করল।
বুড়ো বললেন, "ইলেকট্রিক দ্রুত যায়। আমি দ্রুত যেতে চাই না।"
মজিবর হাসল। হাসিটা তিক্ত। যারা ধীরে যেতে চায়, তারাই এখন মজিবরের খদ্দের।
সে প্যাডেল মারল। রিকশা চলল। ধীরে।
১০
রাত দশটা। মজিবর রিকশা ফেরত দিল আমিনুল মালিককে। আশি টাকা দিল।
আমিনুল বলল, "মজিবর, আমি একটা রিকশা বেচে দিচ্ছি। ইলেকট্রিক কিনব।"
"কোনটা?"
"তোমারটা।"
"তাহলে আমি?"
"অন্য কারো কাছ থেকে ভাড়া নাও। অথবা..." আমিনুল থামল। "অথবা অন্য কিছু করো।"
অন্য কিছু। মজিবর তিরিশ বছর রিকশা চালিয়েছে। অন্য কিছু মানে কী? সে আর কী পারে? রান্না পারে না, দোকানদারি পারে না, লেখাপড়া জানে না। সে পারে শুধু প্যাডেল মারতে।
মজিবর বাড়ি ফিরল। জোবেদাকে বলল না। শুয়ে পড়ল। পায়ে ব্যথা। আজ বেশি ব্যথা। বৃষ্টিতে ভিজেছে দুপুরে।
বৃষ্টিতে ভাড়া বাড়ে। শরীরের দাম কমে।
মজিবর চোখ বুজল। আগামীকাল আবার রিকশা খুঁজতে হবে। অন্য কোনো মালিকের কাছে। আশি টাকায়, নব্বই টাকায়, একশো টাকায়। যত দামই হোক, চালাতে হবে। কারণ শরীর ছাড়া মজিবরের আর কিছু নেই।
শরীরটাও থাকবে কত দিন, সেটা শরীরই জানে।