চা-বিক্রেতা

চা বানানো মানুষকে কেউ জিজ্ঞেস করে না চা কেমন লাগে

পর্ব ৫ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

কাদেরের দিন শুরু হয় অন্ধকারে।

ভোর পাঁচটা। আজান হয়নি এখনো। কিন্তু কাদের উঠে গেছে। চোখে ঘুম আছে, শরীরে আছে, কিন্তু হাত জেগে গেছে। হাত জানে কী করতে হবে।

চুলায় আগুন ধরাল। কাঠকয়লা। গ্যাসের সংযোগ নেই টং দোকানে। কয়লার আগুনে চায়ের স্বাদ অন্যরকম হয়, কাদের বিশ্বাস করে। গ্যাসের আগুন তাড়াহুড়োর আগুন। কয়লার আগুন ধৈর্যের।

হাঁড়িতে পানি বসাল। বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি, কালো হয়ে গেছে তলা। কত পানি ফুটেছে এই হাঁড়িতে, কাদের হিসাব রাখেনি। হাজার হাজার লিটার। লাখ কাপ চা।

পানি ফুটতে শুরু করল। কাদের চা পাতা ঢালল। গুঁড়ো চা, ব্রোকেন লিফ, সস্তা। ভালো চা পাতা দিলে খরচ বাড়ে। সস্তা পাতায় রঙ ভালো আসে, স্বাদ চলে। দুধ ঢালল। গুঁড়ো দুধ, পানিতে গোলা। তরল দুধের দাম বেশি, গুঁড়ো দুধে চলে।

চিনি। তিন চামচ। চা তৈরি। প্রথম কাপ ঢালল নিজের জন্য। প্রতিদিনের প্রথম কাপ কাদের নিজে খায়। এটা তার নিয়ম। দোকান খোলার আগে, পৃথিবী জাগার আগে, একটা কাপ চা। একা।

চায়ে চুমুক দিল। গরম। জিভ পুড়ল একটু। তবু ভালো লাগল।

টং দোকান। গাজীপুরের টঙ্গী বাস স্ট্যান্ডে। দোকান বলতে একটা টিনের চালা, তিন দিকে খোলা, এক দিকে দেয়াল। দেয়ালে একটা তাক, তাকে কাচের বয়ামে বিস্কুট, কলা, সিগারেট। সামনে একটা কাঠের বেঞ্চ। পাশে আরেকটা। মোট ছয়জন বসতে পারে।

কাদের এই দোকান চালায় বাইশ বছর ধরে। ২০০৪ সালে শুরু। তখন বাস স্ট্যান্ড ছোট ছিল। এখন বড় হয়েছে। বাস বেড়েছে। মানুষ বেড়েছে। চায়ের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু টং দোকানও বেড়েছে। আগে কাদের একাই ছিল। এখন তিনটা চায়ের দোকান এই বাস স্ট্যান্ডে।

প্রতিযোগিতা বেড়েছে। কিন্তু কাদেরের খদ্দের কমেনি। কারণ কাদের সবচেয়ে আগে খোলে আর সবচেয়ে দেরিতে বন্ধ করে। ভোর পাঁচটা থেকে রাত দশটা। সতেরো ঘণ্টা।

দিনে দুইশো কাপ চা বিক্রি হয়। কাপ প্রতি দশ টাকা।

রেভিনিউ: দুই হাজার টাকা। চা পাতা, দুধ, চিনি, কয়লা: আটশো টাকা। দোকানের ভাড়া (জায়গাটা পৌরসভার, মাসিক তিন হাজার, দৈনিক একশো): একশো টাকা। বিস্কুট, কলা, সিগারেটের কস্ট: তিনশো টাকা। সেগুলোর বিক্রি থেকে আয়: চারশো টাকা।

মোট আয়: দুই হাজার চারশো। মোট খরচ: বারোশো। নেট: বারোশো টাকা।

কিন্তু এটা ভালো দিনের হিসাব। হরতালের দিনে বিক্রি শূন্য। বৃষ্টির দিনে অর্ধেক। রমজানে দিনের বেলা শূন্য। গড়ে দৈনিক নেট আয়: এক হাজার টাকা।

মাসে ত্রিশ হাজার। ঢাকার বাইরে একটা পরিবারের জন্য মন্দ না। কিন্তু কাদেরের দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে ফারুক ক্লাস নাইনে, ছোট ছেলে জামাল ক্লাস ফাইভে, মেয়ে তানিয়া ক্লাস থ্রিতে। তিনজনের স্কুলের খরচ, কাপড়, বই, মাঝে মাঝে অসুখ। বউ শিরিনের সংসার খরচ। ভাড়া। ওষুধ।

ত্রিশ হাজারে চলে। বেশি কিছু হয় না।

সকাল সাতটা। প্রথম ঢেউ আসে।

বাস স্ট্যান্ডে মানুষ আসতে শুরু করে। অফিস যাচ্ছে যারা, কারখানায় যাচ্ছে যারা, বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষার সময় চা।

কাদেরের সামনে দিয়ে সব রকমের মানুষ যায়।

স্কুলের ছেলে, ব্যাগ পিঠে, ইউনিফর্ম পরা। চা খায় না। কিন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে অন্যদের খাওয়া। কাদের মাঝে মাঝে ছোট ছেলেদের এক কাপ দেয়, বিনা পয়সায়। "যা, পড়তে যা।"

উকিল সাহেব। প্রতিদিন সকালে এক কাপ। চিনি কম। দুধ বেশি। কাদের জানে। বলতে হয় না। উকিল সাহেব চা খেতে খেতে পত্রিকা পড়েন। কাদেরকে কখনো জিজ্ঞেস করেন না কেমন আছে।

রিকশাচালক। দুই-তিনজন প্রতিদিন। দশ টাকার চা খায়। কখনো বাকি রাখে। কাদের বাকি দেয়। কারণ কাদের জানে দশ টাকা তাদের জন্য কত বড়।

পুলিশ।

এই পুলিশের কথা আলাদা করে বলতে হয়।

থানার হাবিলদার মোস্তফা। প্রতিদিন দুই কাপ চা। সকালে একবার, বিকালে একবার। টাকা দেয় না। কখনো দেয়নি।

প্রথম দিকে কাদের অপেক্ষা করত। ভাবত হাবিলদার সাহেব আজ দেবেন। কাল দেবেন। কিন্তু দিন গেল, মাস গেল, বছর গেল। হাবিলদার পাল্টাল, নতুন হাবিলদার এল, সেও দেয় না।

কাদের হিসাব করেছে। দিনে দুই কাপ, মাসে ষাট কাপ, বছরে সাতশো কুড়ি কাপ। দশ টাকা কাপ। বছরে সাত হাজার দুইশো টাকা। বাইশ বছরে এক লাখ আটান্ন হাজার চারশো টাকা।

দেড় লাখ টাকার চা। বিনা পয়সায়।

কাদের কিছু বলে না। বলতে পারে না। বললে থানায় ডেকে নেবে। দোকান ভাঙবে। লাইসেন্স নেই কাদেরের। পৌরসভার অনুমতি আছে, কিন্তু ট্রেড লাইসেন্স নেই। লাইসেন্স করতে গেলে ঘুষ লাগে। ঘুষ দেওয়ার টাকা নেই। তাই লাইসেন্স নেই। তাই পুলিশকে চা দিতে হয়।

এটা একটা চক্র। দারিদ্র্যের চক্র না, ক্ষমতার চক্র। যার ক্ষমতা আছে সে বিনা পয়সায় চা খায়। যার ক্ষমতা নেই সে বিনা পয়সায় চা দেয়।

দুপুরে ভিড় কমে। কাদের বেঞ্চে বসে। একটু বিশ্রাম নেয়। পিঠটা দেয়ালে ঠেকায়। চোখ বোজে। ঘুমায় না। শুধু চোখ বোজে।

কাদের অনেক কথা শোনে।

বাস স্ট্যান্ডে মানুষ অপেক্ষা করে। অপেক্ষার সময় কথা বলে। কাদেরের দোকানে বসে কথা বলে। কাদের শোনে।

রাজনীতির কথা শোনে। কে ক্ষমতায় আসবে, কে যাবে, কার দুর্নীতি কত, কার টাকা কোথায়। কাদের শোনে। নিজে কিছু বলে না।

পরকীয়ার কথা শোনে। কার বউ কোথায় যায়, কার স্বামী কাকে দেখে। কাদের শোনে। বিচার করে না।

ব্যবসার কথা শোনে। জমির দাম বাড়ছে, ফ্ল্যাটের দাম কমছে, ডলারের রেট কত। কাদের শোনে। তার কোনো জমি নেই, ফ্ল্যাট নেই, ডলার নেই।

কাদের একজন শ্রোতা। টং দোকানের মালিক না, টং দোকানের কান। সে শোনে সবকিছু, জানে সবকিছু, কিন্তু কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না কিছু।

কাদের হয়তো এই বাস স্ট্যান্ডের সবচেয়ে বেশি জানা মানুষ। কিন্তু সে চা বানায়। চা বানানো মানুষের জ্ঞানের কোনো দাম নেই।

বিকালে দ্বিতীয় ঢেউ। স্কুল ছুটির পর ছেলেমেয়ে, অফিস ফেরত মানুষ, সন্ধ্যায় আড্ডাবাজ।

একদল ছেলে আসে প্রতিদিন। কলেজ স্টুডেন্ট। চার-পাঁচজন। এক কাপ চা নেয়, ত্রিশ মিনিট বসে, তর্ক করে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে, ক্রিকেট নিয়ে, সিনেমা নিয়ে। কাদের শোনে।

একজন ছেলে বলল, "এই দেশে কিছু হবে না। বাইরে যেতে হবে।"

আরেকজন বলল, "বাইরে গিয়ে কী করবি? ডিশ ধুবি?"

"ডিশ ধুলেও এখানকার চেয়ে ভালো।"

কাদের চা ঢালল কাপে। ছেলেটাকে দিল। ছেলেটা নিল। ধন্যবাদ বলল না। ধন্যবাদ বলার কথা মনে হলো না। চা-ওয়ালাকে ধন্যবাদ বলে কে?

কাদের ভাবল, এই ছেলে বাইরে যাবে। ডিশ ধোবে হয়তো। কিন্তু সেখানেও চা খাবে। সেখানেও কেউ বানিয়ে দেবে। সেই চা-ওয়ালাকেও ধন্যবাদ বলবে না।

সন্ধ্যায় একটা ঘটনা ঘটল।

একজন লোক চা খেয়ে দশ টাকা দিতে গিয়ে দেখল পকেটে টাকা নেই। লোকটা বিব্রত। "ভাই, টাকা ভুলে এসেছি। কাল দেব।"

কাদের বলল, "থাক। যান।"

দশ টাকা। কাদেরের কাছে দশ টাকা কত? দিনের আয়ের একশো ভাগের এক ভাগ। কিন্তু দশ টাকা দশ টাকাই। চা পাতা কিনতে লাগে, দুধ কিনতে লাগে, চিনি কিনতে লাগে।

লোকটা চলে গেল। কাল আসবে? জানে না কাদের। অভিজ্ঞতা বলে আসবে না। যারা বাকি রেখে যায়, তারা সাধারণত ফেরে না। কারণ দশ টাকার জন্য ফেরত আসা মানে স্বীকার করা যে দশ টাকা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ সেটা স্বীকার করতে চায় না।

কাদের হিসাব করেছে। মাসে গড়ে পাঁচশো টাকার চা বাকি থাকে। বছরে ছয় হাজার। বাইশ বছরে এক লাখ বত্রিশ হাজার।

পুলিশের বিনা পয়সার চা: দেড় লাখ। বাকি থাকা চা: সোয়া লাখ। মোট: প্রায় তিন লাখ টাকা।

তিন লাখ টাকা কাদের দান করেছে। ইচ্ছায়, অনিচ্ছায়, বাধ্য হয়ে। কেউ ধন্যবাদ দেয়নি।

রাত নটা। ভিড় কমেছে। শেষ কয়েক কাপ বিক্রি হচ্ছে।

একটা লোক এল। মধ্যবয়সী। ক্লান্ত চেহারা। বসল বেঞ্চে। চা অর্ডার করল।

"এক কাপ। চিনি বেশি দেন।"

কাদের বানাল। দিল।

লোকটা চা খেতে খেতে বলল, "ভাই, আপনার চা ভালো।"

কাদের অবাক হলো। কেউ কখনো বলে না চা ভালো কি মন্দ। চা খায়, টাকা দেয়, চলে যায়। চায়ের মান নিয়ে কেউ মন্তব্য করে না। চা একটা পণ্য, একটা অভ্যাস, একটা সময় কাটানোর উপায়। চায়ের স্বাদ কেউ লক্ষ করে না।

"ধন্যবাদ।"

কাদের বলল শব্দটা। নিজের কানে অদ্ভুত লাগল। সে কত দিন ধন্যবাদ বলেনি? সে কত দিন ধন্যবাদ শোনেনি?

লোকটা চা শেষ করল। দশ টাকা দিল। চলে গেল।

কাদের কাপটা ধুলো। পানিতে ধুয়ে, কাপড় দিয়ে মুছে, তাকে রাখল। এই কাপে আগামীকাল আবার চা ঢালা হবে। অন্য কেউ খাবে। সে বলবে না চা ভালো। বলার দরকার নেই। চা চা-ই।

রাত দশটা। কাদের দোকান গোছাচ্ছে।

হাঁড়ি ধুলো। কাপ ধুলো। বয়াম বন্ধ করল। চুলা নিভিয়ে দিল। কয়লার শেষ আভা লাল, তারপর কালো।

আজকের হিসাব: একশো আশি কাপ চা। বিক্রি এক হাজার আটশো। বিস্কুট-সিগারেট তিনশো। মোট দুই হাজার একশো। খরচ বাদে নেট: নয়শো।

হাজারের নিচে। খারাপ দিন। কিন্তু চলবে। কাল ভালো হবে হয়তো। না-ও হতে পারে। কাদের জানে না। কাদের ভবিষ্যৎ দেখে না। কাদের দেখে আজকের কাপ, আজকের পানি, আজকের কয়লা।

দোকান বন্ধ করে হাঁটতে শুরু করল। বাড়ি দশ মিনিটের পথ। গলির ভেতর, একটা ভাড়ার ঘর। দুই রুম।

হাঁটতে হাঁটতে কাদের ভাবে। সে কত মানুষকে চেনে? শত শত। হাজার হয়তো। বাইশ বছরে কত মুখ দেখেছে, কত কথা শুনেছে, কত গোপন জেনেছে। সে জানে কোন উকিল ঘুষ খায়, কোন ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করে, কোন ব্যবসায়ী ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, কোন শিক্ষক প্রাইভেট পড়ায় স্কুলে না পড়িয়ে।

কাদের এসব জানে। কিন্তু কেউ জানে না কাদের জানে। কেউ জানে না কাদের কী ভাবে, কী চায়, কী স্বপ্ন দেখে।

চা বানানো মানুষকে কেউ জিজ্ঞেস করে না চা কেমন লাগে।

১০

বাড়ি ফিরল। শিরিন জেগে আছে। ভাত গরম করেছে। কাদের হাত-মুখ ধুলো। খেতে বসল। ভাত, ডাল, আলু ভর্তা, কাঁচা মরিচ।

ফারুক পড়ছে। পরীক্ষা আছে সামনের সপ্তাহে। জামাল আর তানিয়া ঘুমিয়ে গেছে।

শিরিন বলল, "ফারুক বলেছে সায়েন্সে পড়বে।"

"পড়ুক।"

"খরচ বাড়বে। গাইড বই, কোচিং।"

"হবে।"

শিরিন আর কিছু বলল না। "হবে" মানে কাদের ব্যবস্থা করবে। কীভাবে করবে সেটা কাদেরের ব্যাপার। হয়তো আরো দুটো ঘণ্টা বেশি দোকান খোলা রাখবে। হয়তো চায়ের দাম বারো টাকা করবে। হয়তো কিছুই করবে না, শুধু আরেকটু কম খাবে নিজে।

কাদের খেল। শুয়ে পড়ল। হাতে কয়লার গন্ধ। সারাদিনের ধোঁয়া চুলে, কাপড়ে। গোসল করেছে, তবু গন্ধ যায় না। কয়লার গন্ধ কাদেরের শরীরের অংশ হয়ে গেছে।

ঘুম আসছে। চোখ বুজে আসছে।

আগামীকাল ভোর পাঁচটায় আবার উঠতে হবে। চুলায় আগুন দিতে হবে। পানি ফোটাতে হবে। চা পাতা, দুধ, চিনি। দুইশো কাপ। দুই হাজার টাকা। পুলিশের বিনা পয়সার চা। বাকি থাকা খদ্দের। রাজনীতির কথা, পরকীয়ার কথা, ব্যবসার কথা।

সব শুনবে কাদের। কিছু বলবে না।

চা বানানো মানুষকে কেউ জিজ্ঞেস করে না চা কেমন লাগে। আর কাদের? কাদেরকে কেউ জিজ্ঞেস করে না কাদের কেমন আছে।

কাদের আছে। এটুকুই।

ঘুম এল। কাদের ঘুমাল। স্বপ্ন দেখল না। স্বপ্ন দেখার সময় কই? ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে।