দিনমজুর

দিনমজুর মানে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার অনুমতি চাওয়া

পর্ব ৬ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

হারুন

ফজরের আজান শেষ হতে না হতে হারুন বেরিয়ে পড়ে। পায়ে হাওয়াই চটি। গামছা কাঁধে। মুখে পানি দিয়ে এসেছে, চা খায়নি। চা খাওয়ার পয়সা নেই।

লুঙ্গি ভাঁজ করে গুঁজে রেখেছে কোমরে। শার্টটা ছেঁড়া, ডান কাঁধে সেলাই খুলে গেছে। আছিয়া সেলাই করে দিতে চেয়েছিল, হারুন বলেছে থাক, কাজ করতে গেলে আবার ছিঁড়বে। কাজ পেলে।

মোড়ে আসতে আসতে অন্ধকার পাতলা হয়। কুয়াশার ভেতর দিয়ে মানুষের আকৃতি ফুটে ওঠে। একজন, দুজন, পাঁচজন। সাতটা বাজতে বাজতে ত্রিশজন।

ত্রিশটা শরীর। ত্রিশটা খালি পেট। ত্রিশ জোড়া চোখ রাস্তার দিকে।

কেউ কথা বলে না। কথা বলার শক্তি নেই, কিংবা কথা বলার কিছু নেই। কী বলবে। গতকাল কাজ পায়নি, আজকেও হয়তো পাবে না, এটা বলবে। সবাই জানে। বলার দরকার নেই।

একজন বিড়ি ধরায়। বিড়ির ধোঁয়া কুয়াশায় মেশে। গন্ধটা তীব্র, খালি পেটে আরো তীব্র। হারুনের পেটে গ্যাস হয়। খালি পেটে গ্যাস। টক ঢেকুর ওঠে। মুখে থুতু আসে।

অপেক্ষা

কন্ট্রাক্টর আসে সাড়ে সাতটায়। পিকআপ ভ্যান। সামনের সিটে বসে সিগারেট ফোঁকে। জানালা দিয়ে চোখ বুলায়। বাছাই করে যেমন গরুর হাটে বাছাই করে। শরীর দেখে। বয়স দেখে। চেনামুখ দেখে।

দশজন লাগবে। মাটি কাটার কাজ। পুকুর খনন। ঠিকাদারের জমি।

কন্ট্রাক্টরের নাম বাদল। বয়স তিরিশ। মোটা। পেটটা বেরিয়ে আছে শার্টের ওপর দিয়ে। সে নিজে কোনোদিন মাটি কাটেনি। সে মানুষ সরবরাহ করে। মানুষ মানে শ্রম। শ্রম মানে পণ্য। বাদল পণ্যের দালাল।

ঠিকাদার দেয় জনপ্রতি পাঁচশো। বাদল রাখে দেড়শো। মজুর পায় সাড়ে তিনশো। দেড়শো টাকা বাদলের। দশজনে দেড় হাজার। বাদলের দিনে দেড় হাজার। মাটিতে হাত না লাগিয়ে।

হারুন এগিয়ে যায়। কন্ট্রাক্টর তার দিকে তাকায়। তারপর পাশের লোকটার দিকে তাকায়। পাশের লোকটা তরুণ। কাঁধ চওড়া। হারুনের বয়স পঁয়তাল্লিশ। পিঠে ব্যথা। গত বছর ইটভাটায় কাজ করতে গিয়ে কোমর নষ্ট হয়েছে।

কন্ট্রাক্টর তরুণটাকে ডাকে। হারুনকে ডাকে না।

দশজন উঠে যায় পিকআপে। বাকি কুড়িজন দাঁড়িয়ে থাকে। হারুন তাদের একজন।

পিকআপ চলে যায়। ধুলো ওড়ে। ধুলো থিতিয়ে পড়লে মোড় আবার ফাঁকা। কুড়িজন দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ বসে পড়ে রাস্তার পাশে। কেউ চলে যায়। হারুন দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো আরেকটা পিকআপ আসবে। হয়তো আসবে না। দাঁড়িয়ে থাকাটাই কাজ। দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মজুরি নেই।

গতকালও

গতকালও এমন হয়েছিল। পরশুও। তিনদিন কোনো কাজ নেই। তিনদিন মানে তিনটা শূন্য। তিনটা শূন্যকে পাশাপাশি বসালে যে সংখ্যা হয় সেটা হারুনের ব্যাংক ব্যালেন্স।

শূন্য।

ব্যাংক ব্যালেন্স বলে মজা করা। হারুনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। এনআইডি কার্ড আছে, কিন্তু ব্যাংক দূরে। যেতে ভ্যান ভাড়া ত্রিশ টাকা। ত্রিশ টাকা দিয়ে ব্যাংকে গিয়ে কী রাখবে। শূন্য রাখতে ব্যাংকে যেতে হয় না।

বাড়িতে চাল নেই। শেষ হয়ে গেছে আজ তিনদিন। আছিয়া কিছু বলে না। আছিয়া কখনো বলে না। চুপচাপ কলসির পানি টেনে আনে, উনুনে কাঠ গোছায়, কিন্তু রান্না করে না। কী রান্না করবে। ফাঁকা হাঁড়ি চাপিয়ে রাখলে কি ভাত হয়।

গত রাতে রুবেল জিজ্ঞেস করেছিল, মা, খামু।

আছিয়া বলেছিল, রাইতে খামু। আগে ঘুমা।

রুবেল ঘুমিয়ে পড়েছিল। রাতে খাওয়া হয়নি। রুবেল ঘুমের মধ্যে ভুলে গেছে। শরীর যখন ক্লান্ত, পেট ভুলে যায়। এটা গরিবের সুবিধা। ক্লান্তি খিদের চেয়ে জোরালো।

আছিয়ার পিঠা

আছিয়া ভোরবেলা উঠে পিঠা বানায়। চালের গুঁড়া, গুড়, নারকেল। কিন্তু এই চালের গুঁড়াও ধারে আনা। পাশের বাড়ির ময়না বিবির কাছ থেকে। ময়না বিবি হিসাব রাখে। প্রতিটা কেজির হিসাব।

ময়না বিবির স্বামী দোকানদার। তাদের চাল আছে। তেল আছে। ডাল আছে। ময়না বিবি ধার দেয়, কিন্তু চোখে একটা হিসাব থাকে। ধার বাড়লে চোখ শক্ত হয়। চোখে করুণা কমে, সন্দেহ বাড়ে।

স্কুলের গেটে দাঁড়ায় আছিয়া। টিফিনের সময়। বাচ্চারা বেরোয়। যাদের পকেটে পাঁচ টাকা দশ টাকা আছে তারা কেনে। পঞ্চাশ টাকার পিঠা বিক্রি হয় দিনে। কোনো কোনো দিন চল্লিশ। কোনো দিন ষাট।

আছিয়া দাঁড়ায় রোদে। বৃষ্টিতে ছাতা নেই, পলিথিন মাথায় দেয়। পিঠার ওপর পলিথিন দেয়। পিঠা ভিজলে চলবে না, মানুষ কিনবে না। নিজে ভিজলে চলবে, পিঠা ভিজলে চলবে না।

পঞ্চাশ টাকায় কী হয়। একটু চাল। একটু তেল। একটু নুন। পেঁয়াজ কেনা যায় না। মাছ তো দূরের কথা। শাক তুলে আনে বাড়ির পেছনের পতিত জমি থেকে। কচু শাক। হেলেঞ্চা। কেউ লাগায়নি, এমনি গজায়।

পতিত জমিতে যা গজায় সেটাই গরিবের তরকারি। প্রকৃতি বিনা পয়সায় দেয়। মানুষ দেয় না।

তিনটা বাচ্চা

বড়টার বয়স আট। নাম রুবেল। স্কুলে যায়। বই নেই। পাশের বাড়ির ছেলের পুরোনো বই ধার করে। খাতা একটা, পেন্সিল একটা। সেটাও ভোঁতা হয়ে গেছে। ব্লেড দিয়ে ছেঁচে ছেঁচে পেন্সিল এত ছোট হয়েছে যে আঙুলে ধরাই কষ্ট।

রুবেল পরীক্ষায় প্রথম সারিতে থাকে। শিক্ষক বলেছেন, ছেলেটা মেধাবী। মেধা আছে কিন্তু পেন্সিল নেই। মেধা আছে কিন্তু খাতা নেই। মেধা আছে কিন্তু পেটে খাবার নেই। মেধা দিয়ে কী হবে। মেধা কি চাল হয়।

মেজটার বয়স পাঁচ। নাম শিউলি। সারাদিন ঘরের সামনে খেলে। মাটিতে বসে মাটি খায়। পেটে কৃমি। পেটটা ফোলা, হাত-পা চিকন। চোখের নিচে কালি। চোখ দুটো বড় বড়, কিন্তু সেই বড় চোখে কোনো আলো নেই। থাকে না। পুষ্টিহীন শরীরে চোখের আলো কমে আসে।

ছোটটার বয়স দুই। নাম বলা হয়নি এখনো। সবাই বলে ছোডু। কোলে থাকে সারাদিন। আছিয়ার কোলে, শিউলির কোলে, রুবেলের কোলে। কেউ না কেউ ধরে রাখে। ছোডু কাঁদে। কাঁদলে দুধ দিতে হয়। আছিয়ার বুকে দুধ কমে আসছে। নিজে না খেলে দুধ কোথা থেকে আসবে। শরীর থেকে দুধ বানাতে শরীরে খাবার লাগে। খাবার নেই তো দুধ নেই।

ছোডু কাঁদে। কান্নার আওয়াজ পাতলা হয়ে আসছে দিনে দিনে।

কৃমির ওষুধ

শিউলির পেটে কৃমি। ডাক্তার বলেছে ওষুধ খাওয়াতে হবে। অ্যালবেন্ডাজল। দুইশো টাকা। ফার্মেসিওয়ালা বলেছে দাম। হারুন বলেছে পরে আসবে।

ফার্মেসিওয়ালার নাম নাজমুল। নাজমুল হারুনকে চেনে। জানে হারুনের অবস্থা। কিন্তু ওষুধ বাকিতে দেয় না। আগে দিত। দুইজনকে বাকিতে দিয়ে টাকা পায়নি। এখন কাউকে দেয় না। নাজমুলকে দোষ দেওয়া যায় না। সেও ব্যবসায়ী। তারও পরিবার আছে।

পরে মানে কবে। পরে মানে কাজ পেলে। কাজ মানে কন্ট্রাক্টরের পিকআপে জায়গা হলে। জায়গা মানে কন্ট্রাক্টরের চোখে পড়লে। চোখে পড়া মানে তরুণ হলে, শক্ত হলে, সুস্থ হলে।

হারুন পঁয়তাল্লিশ বছরের ক্লান্ত মানুষ। কোমরে ব্যথা। দুইশো টাকা নেই।

শিউলি মাটি খায়। কৃমি বড় হয়।

মোড়ের ভূগোল

মোড়টা তিনরাস্তার মোড়। একটা রাস্তা শহরে যায়। একটা রাস্তা বাজারে যায়। একটা রাস্তা হারুনের গ্রামে যায়।

শহরের রাস্তায় গাড়ি যায়। প্রাইভেট কার। মাইক্রোবাস। ভেতরে এসি চলে। কাচ বন্ধ। বাইরের মানুষ দেখা যায়, গন্ধ পাওয়া যায় না। গাড়ির ভেতরের মানুষ মোড়ে দাঁড়ানো ত্রিশজনকে দেখে কিন্তু দেখে না। দেখাটা চোখের, না-দেখাটা মনের।

বাজারের রাস্তায় ভ্যান যায়। সবজি, মাছ, মুরগি। ব্যবসায়ীদের রাস্তা। টাকার রাস্তা।

গ্রামের রাস্তায় হারুন যায়। খালি হাতে। খালি পকেটে। খালি পেটে।

তিনটা রাস্তা একটা মোড়ে মিশেছে। কিন্তু তিনটা রাস্তার মানুষ কখনো মেশে না।

মোড়ে একটা বটগাছ আছে। বিশাল। ছায়া পড়ে চারপাশে। গরমের দিনে সেই ছায়ায় দাঁড়ায় মজুরেরা। বটগাছ দেখে না কে গরিব কে ধনী। ছায়া সবাইকে সমান দেয়। বটগাছ বাংলাদেশের একমাত্র সাম্যবাদী।

সন্ধ্যা

সন্ধ্যায় হারুন ফেরে। বাড়িতে ঢুকে দেখে আছিয়া চুলার পাশে বসে আছে। চুলায় আগুন নেই। শিউলি ঘুমিয়ে গেছে। রুবেল বাইরে। ছোডু কাঁদছে।

আছিয়া ওপরে তাকায়। হারুনের দিকে তাকায় না। দেয়ালের দিকে তাকায়। দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। গত বছরের। ছবিতে সমুদ্র আছে, নীল আকাশ আছে, সাদা বালি আছে। আছিয়া সমুদ্র দেখেনি কখনো। কক্সবাজার নামটা শুনেছে। লোকে যায়। লোক মানে যাদের টাকা আছে।

হারুন বলে, কাইল পামু।

আছিয়া কিছু বলে না। এই কথা সে আগেও শুনেছে। গতকালও শুনেছে। তার আগের দিনও।

কাইল পামু। কাইল পামু। কাইল পামু।

কাল কি আসলেই আসবে। নাকি আরেকটা আজকে হয়ে যাবে।

রুবেল ফেরে। হাতে কিছু আনতে পারেনি। পাশের বাড়ি গিয়েছিল, কিছু পাবে ভেবে। পায়নি। পাশের বাড়িরও অবস্থা খারাপ। গ্রামে সবার অবস্থা খারাপ। একজনের খারাপ অবস্থা অন্যজনের খারাপ অবস্থার চেয়ে সামান্য ভালো, এটুকুই পার্থক্য।

রাত

রাতে হারুন শিউলির পেটে হাত রাখে। ফোলা পেট। শক্ত। ভেতরে কিছু নড়ে। কৃমি নড়ে। হারুন জানে এটা কৃমি। ডাক্তার বলে দিয়েছে।

দুইশো টাকা। মাত্র দুইশো টাকা। একদিনের মজুরি সাড়ে তিনশো। একদিন কাজ পেলেই হতো। একটা দিন।

কিন্তু একটা দিনও তো পাচ্ছে না।

হারুন চিৎ হয়ে শোয়। টিনের চালের দিকে তাকায়। চালে ফুটো আছে। আকাশ দেখা যায়। তারা দেখা যায়। তারাগুলো সুন্দর।

সুন্দর জিনিস দেখলে হারুনের কষ্ট হয়। সুন্দর জিনিস তার জন্য না। সুন্দর জিনিস তাদের জন্য যাদের দুইশো টাকা আছে।

আছিয়া পাশে শুয়ে আছে। চোখ খোলা। ঘুমাতে পারে না। খিদে পেটে থাকলে ঘুম আসে না। শরীর ক্লান্ত কিন্তু পেট জেগে আছে। পেটকে ঘুম পাড়ানো যায় না। পেট সারাক্ষণ মনে করিয়ে দেয় সে খালি।

ছোডু আছিয়ার বুকের কাছে। মুখ দিয়ে খুঁজছে। দুধ খুঁজছে। পাচ্ছে না। কাঁদছে না আর। কান্না শেষ। শুধু মুখ দিয়ে খোঁজে। যেন বিশ্বাস করে পাবে। বিশ্বাস ছাড়া শিশুর আর কিছু নেই।

ভোর

আবার ফজরের আজান। আবার হাওয়াই চটি। আবার গামছা কাঁধে। আবার মোড়।

ত্রিশটা শরীর। ত্রিশটা খালি পেট। ত্রিশ জোড়া চোখ।

হারুন দাঁড়ায়। আজ চতুর্থ দিন। চারদিন কাজ নেই। চারদিন আয় নেই। চারদিন ওষুধ নেই।

কন্ট্রাক্টর আজ কি আসবে। কে জানে। হারুন জানে না। কেউ জানে না। এটাই দিনমজুরের জীবন। প্রতিটা দিন একটা প্রশ্নচিহ্ন দিয়ে শুরু হয়। উত্তর সন্ধ্যায় আসে। হ্যাঁ, অথবা না। বেশিরভাগ দিন না।

দিনমজুর মানে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার অনুমতি চাওয়া। অনুমতি দেওয়ার মালিক সে নিজে নয়। অনুমতি দেয় কন্ট্রাক্টর। কন্ট্রাক্টর দেয় ঠিকাদার। ঠিকাদার দেয় জমির মালিক।

জমির মালিক শহরে থাকে। এসি রুমে। তার মেয়ের কুকুরের খাবারের দাম মাসে তিন হাজার টাকা। হারুনের পরিবারের মাসিক খরচ তিন হাজার টাকা। কুকুর আর হারুন, সমান।

হারুন মোড়ে দাঁড়ায়। রোদে। বৃষ্টিতে। কুয়াশায়।

দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া তার আর কিছু করার নেই।