মাছধরা জেলে
আইন আমাদের জন্য। তাদের জন্য নয়
জসিম
পদ্মার পানি তামাটে। ভোরের আলো পানিতে পড়লে মনে হয় কেউ তামা গলিয়ে ঢেলে দিয়েছে। জসিম দাঁড়িয়ে আছে নৌকার গলুইতে। খালি পা। পায়ের চামড়া ফেটে গেছে, ফাটলে নদীর পানি ঢুকে জ্বালা করে। ব্যাপার না। জ্বালা করলে বুঝবে বেঁচে আছে।
দেশি নৌকা। কাঠের। বাবার আমলের। তলায় তিন জায়গায় আলকাতরার প্যাঁচ। পানি ঢোকে। দিনে তিনবার সেচতে হয়। নৌকাটাও বাঁচতে চায়, তাই সেচতে দেয়।
জসিমের শরীরে নদীর গন্ধ। কাপড়ে, চুলে, নখের ভেতরে। এই গন্ধ সাবান দিয়ে ধুলেও যায় না। যাবে কেন। রক্তে মিশে গেছে। তিন পুরুষের নদী। জসিমের বাবা পদ্মায় মাছ ধরত। বাবার বাবাও। তারও আগে। নদী তাদের মাটি। নদী তাদের ক্ষেত। ফসল মাছ।
ইলিশের মৌসুম
আষাঢ় মাস। ইলিশ আসে পদ্মায়। নদী ভরে যায় রুপোলি মাছে। জেলেদের চোখে আলো জ্বলে। সারা বছরের হিসাব এই দুই মাসে। বাকি দশ মাস পদ্মা দেয় শুধু ছোট মাছ। পুঁটি, চান্দা, বাইন। সেগুলো দিয়ে সংসার চলে, জমা হয় না।
ইলিশ মানে জমানোর সুযোগ। মেয়ের বিয়ের জন্য। ছেলের স্কুলের জন্য। নৌকা মেরামতের জন্য। ওষুধের জন্য। জসিমের বউয়ের হাঁটুতে ব্যথা, ডাক্তার বলেছে অপারেশন লাগবে। অপারেশনের কথা শুনে জসিম হেসেছিল। হাসি না, মুখটা বেঁকে গিয়েছিল।
ইলিশ ধরতে জানে জসিম। কোন ঘাটে ইলিশ আসে, কোন স্রোতে জাল ফেলতে হয়, কখন টানতে হয়, এসব শরীরে আছে। পানির রঙ দেখে বলতে পারে মাছ আছে কি নেই। ঢেউয়ের ওঠানামা দেখে বলতে পারে ঝড় আসবে কি আসবে না। এই জ্ঞান কোনো বইয়ে নেই। এই জ্ঞান নদীতে আছে। নদী শেখায়।
নিষেধাজ্ঞা
সরকার বলেছে বাইশ দিন মাছ ধরা যাবে না। ইলিশের প্রজনন মৌসুম। মা ইলিশ ডিম পাড়বে। ডিম ফুটবে। পোনা বড় হবে। আগামী বছর আরো ইলিশ পাওয়া যাবে।
বিজ্ঞান বুঝে জসিম। ডিম পাড়তে দিতে হবে, সেটা সে জানে। তার বাবাও জানত। তার বাবার বাবাও। আগে নিজেরাই কিছুদিন মাছ ধরত না। কেউ বলত না, নিজেরা বুঝত।
কিন্তু আগে ট্রলার ছিল না।
আগে নদীতে শুধু দেশি নৌকা ছিল। ছোট জাল। হাতে টানা। যতটুকু দরকার ততটুকু ধরত। নদী শেষ হয়ে যাবে, এমন ভয় ছিল না। কারণ কেউ নদী শেষ করতে পারত না। এখন পারে। মেশিনে পারে।
সরকারের লোক এসেছিল গ্রামে। মিটিং করেছিল। বলেছিল, বাইশ দিন মাছ ধরবেন না, চাল পাবেন। জসিম জিজ্ঞেস করেছিল, ট্রলারও কি বন্ধ থাকবে। সরকারি লোক বলেছিল, সবার জন্য ব্যান। জসিম আর কিছু বলেনি। সবার জন্য ব্যান, মানাটা শুধু তাদের জন্য।
ক্ষতিপূরণ
সরকার দেয় চল্লিশ কেজি চাল। বাইশ দিনের জন্য। জসিমের পরিবারে সাতজন। জসিম, বউ, বুড়ো বাপ, চার ছেলেমেয়ে।
সাতজনে চল্লিশ কেজি চাল। দিনে প্রায় দুই কেজি। সাতজনে দুই কেজি মানে জনপ্রতি তিনশো গ্রাম। তিনশো গ্রাম চালে একবেলা হয়, দুইবেলা হয় না।
তরকারি নেই। ডাল নেই। তেল নেই। নুন আছে, কারণ নুন সস্তা। শুকনো মরিচ আছে, কারণ গাছে ধরে। কিন্তু চাল ফুরোবে বিশ দিনে। বাকি দুই দিন কী হবে।
বাকি দুই দিন কিছু হবে না। খালি থাকবে।
জসিমের বুড়ো বাপ বলে, আগে তো সরকার চালও দিত না। জসিম বলে, আগে তো ট্রলারও ছিল না।
বুড়োর কথা ঠিক। আগে চাল দিত না। কিন্তু আগে মাছও ছিল। নদী ভরা মাছ। ব্যান শেষ হলে নদীতে নামলেই মাছ পাওয়া যেত। এখন ব্যান শেষ হলে নামলে কী পাওয়া যায়। ট্রলারের উচ্ছিষ্ট। যা ট্রলার ফেলে দিয়ে যায়, ছোট মাছ, পচা মাছ, সেটুকু।
চাল দিয়ে সরকার দায় শেষ করে। চল্লিশ কেজি চাল মানে সরকারের হিসাবে একটা পরিবার বাইশ দিন বেঁচে থাকতে পারে। কাগজে পারে। পেটে পারে না।
ট্রলার
রাত দুইটায় ট্রলার চলে। ইঞ্জিনের শব্দ শোনা যায় নদী থেকে। জসিম শোনে। ঘুমাতে পারে না। শব্দটা ভারী, গভীর, ক্রমাগত। দেশি নৌকার শব্দ না। দেশি নৌকায় শব্দ হয় না, শুধু বৈঠার ছপছপ।
ট্রলারে জাল বড়। মেশিনে টানে। একবারে শত শত কেজি। মা ইলিশ, বাচ্চা ইলিশ, ডিমওয়ালা ইলিশ, সব। বাছবিচার নেই। জাল ফেললে যা ওঠে তাই নেয়।
ট্রলারের মালিক এমপি সাহেবের ভাই। সবাই জানে। পুলিশ জানে। প্রশাসন জানে। মৎস্য অফিসার জানে। কেউ কিছু বলে না। বলবে কে। এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে বলা মানে নিজের বিরুদ্ধে যাওয়া। থানায় মামলা হবে। জমি দখল হবে। ঘর ভাঙা হবে।
জসিম গত বছর থানায় গিয়েছিল। বলেছিল, ব্যান পিরিয়ডে ট্রলার চলছে। ওসি বলেছিল, তদন্ত করব। তদন্ত হয়নি। ট্রলার চলেছে। ইলিশ কমেছে। জসিমের ভাগ কমেছে।
পরে শুনেছিল, ওসি এমপি সাহেবকে ফোন করে বলেছে, একটা জেলে এসেছিল, নাম জসিম, অভিযোগ করেছে। এমপি সাহেব হেসেছিলেন।
জাল
জসিমের জালটা পুরোনো। তিন বছরের। নাইলনের সুতো ক্ষয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। মাছ ঢোকে, মাছ বেরোয়। জাল না, চালনি।
নতুন জাল তিন হাজার টাকা। তিন হাজার টাকা মানে দশ দিনের ইলিশ ধরা। ইলিশ ধরতে হলে জাল লাগে। জাল কিনতে হলে টাকা লাগে। টাকা আসে ইলিশ থেকে। ইলিশ আসে জাল থেকে।
চক্র। ভাঙার উপায় নেই।
জসিম বসে জাল সেলাই করে। সন্ধ্যায়, রাতে, ভোরে। যখন নদীতে যেতে পারে না তখন জাল সেলাই করে। পুরোনো সুতো দিয়ে পুরোনো ফুটো বন্ধ করে। নতুন ফুটো হয় পাশে। এক জায়গা সারালে আরেক জায়গা ছেঁড়ে। জালটা জসিমের জীবনের মতো।
জসিমের বউ বলে, জাল বেচে দাও, অন্য কিছু করো।
জসিম বলে, কী করব।
বউ বলে, ভ্যান চালাও।
জসিম বলে, ভ্যান কিনব কিসে।
চুপ। আবার চুপ। এই চুপে সব উত্তর আছে।
নদীতে
ব্যান উঠেছে। তেইশতম দিন। জসিম ভোরে নৌকা ভাসায়। পদ্মা এখন শান্ত। জোয়ারের ঢেউ আসেনি এখনো। পানি ঘোলা, কিন্তু ঘোলার ভেতরেও একটা গন্ধ আছে। পলির গন্ধ। শ্যাওলার গন্ধ। মাছের গন্ধ।
নদীর ওপর কুয়াশা। জসিম ছাড়া আরো নৌকা আছে। পাঁচটা, সাতটা, দশটা। সব জেলের নৌকা। সবাই একই দিনে বেরিয়েছে। বাইশ দিন পর। সবার চোখে একই আশা। সবার জালে একই ছেঁড়া।
জাল ফেলে। টানে। প্রথম টানে পাঁচটা ইলিশ। ছোট। আধা কেজি, পৌনে এক কেজি। আগে এই সময়ে দুই কেজি তিন কেজি উঠত। এখন ওঠে না। ট্রলার যা নেওয়ার নিয়ে গেছে।
জসিম জালটা আবার ফেলে। আবার টানে। তিনটা। আরো ছোট।
পাশের নৌকায় করিম। করিমের জালে আরো কম। দুটো। করিম বলে, মাছ কই গেল। জসিম বলে, ট্রলারে।
দুজনে চুপ করে জাল ফেলে। কথা বলার সময় নেই। সূর্য উঠে যাচ্ছে। দিনের আলোতে ইলিশ গভীরে চলে যায়। ভোরই সময়। ভোর শেষ।
সন্ধ্যায় ফেরে বারো কেজি নিয়ে। আড়তে বিক্রি করে কেজি চারশো টাকায়। বারো কেজি, চার হাজার আটশো। আড়তদার কেটে রাখে পাঁচশো। জসিমের হাতে আসে চার হাজার তিনশো।
জসিমের সাহায্যকারী মজিদকে দিতে হবে এক হাজার। নৌকার ডিজেল দুইশো। জালের সুতো পঞ্চাশ। বাকি তিন হাজার পঞ্চাশ।
তিন হাজার পঞ্চাশ টাকা। বাইশ দিন না খেয়ে থাকার পর প্রথম রোজগার।
ঘাটে
সন্ধ্যায় ঘাটে বসে জসিম জাল শুকায়। জাল গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়। ভেজা জাল ভারী, শুকনো জাল হালকা। জালের ওজন মাছের ওজন বলে দেয়। আজ জাল হালকা। মাছ কম।
পাশে করিম বসে আছে। করিমের বউ মাছ কুটছে। ছোট মাছ। পুঁটি, চান্দা। এগুলো বিক্রি করার মতো না। নিজে খাবে। ইলিশ বিক্রি করবে, ছোট মাছ খাবে। ছোট মাছে কাঁটা বেশি, মাংস কম। কিন্তু ছোট মাছের ঝোল ভালো। গরিবের রান্নায় স্বাদ বেশি। কারণ গরিব খিদেয় খায়। খিদে সবচেয়ে ভালো মসলা।
ঘাটে নৌকাগুলো বাঁধা। পাঁচটা নৌকা। পাঁচ জেলের। সবগুলো পুরোনো। সবগুলোর তলায় প্যাঁচ। কোনোটার রঙ উঠে গেছে। কোনোটার কাঠ পচে যাচ্ছে। নতুন নৌকা কেনার সামর্থ্য কারো নেই। পুরোনোগুলো চলবে যতদিন চলে। তারপর ডুববে। তখন জেলে ডাঙায় উঠবে। ডাঙায় জেলে কী করবে। ভ্যান চালাবে। রিকশা চালাবে। মাছ ধরা ভুলে যাবে।
জসিমের মেয়ে রিনা ঘাট থেকে পানি নিতে আসে। দশ বছর বয়স। রিনা জানে নদীর পানি ফুটিয়ে খেতে হয়। স্কুলে শিখেছে। জসিম জানে না। জসিম সারাজীবন নদীর পানি কাঁচা খেয়েছে। পেটে সমস্যা হয়। ডায়রিয়া হয়। ওষুধ খায়। আবার কাঁচা পানি খায়। অভ্যাস পাল্টায় না।
রিনা বলে, বাবা, পানি ফুটাইয়া খান।
জসিম বলে, তোর দাদাও কাঁচা খাইছে। তার দাদাও।
রিনা চুপ করে যায়। দাদার কথা বলে জসিম সব কথা থামায়। দাদা মানে অকাট্য। দাদা মানে চূড়ান্ত।
বাজার
জসিম ইলিশ নিয়ে বাজারে যায়। আড়তদারের নাম মতিন। মতিন ওজন করে, দাম বলে, টাকা দেয়। দরদাম নেই। মতিন যা বলে তাই। কারণ আড়তদার একজন। জেলে অনেক। একজনের দরদাম চলে, অনেকজনের চলে না।
মতিন বলে, আজকে চারশো।
জসিম জানে ঢাকায় এই ইলিশ আটশো থেকে হাজার টাকা কেজি। মতিন কেনে চারশোয়, বিক্রি করে ছয়-সাতশোয় ঢাকার পাইকারের কাছে। পাইকার বিক্রি করে আটশোয়। খুচরা বিক্রেতা বিক্রি করে হাজারে। প্রতিটা হাতে দাম বাড়ে। শুধু প্রথম হাতে, জেলের হাতে, দাম কম থাকে।
যে মাছ ধরে তার দাম সবচেয়ে কম। যে মাছ খায় তার দাম সবচেয়ে বেশি। মাঝখানের সবাই লাভ করে। দুই প্রান্তের কেউ করে না।
জসিম মাছ বেচে টাকা নিয়ে বাজারে ঢোকে। চাল কেনে। তেল কেনে। ডাল কেনে। পেঁয়াজ কেনে। মরিচ কেনে। হলুদ কেনে। সব মিলিয়ে বারোশো টাকা। যা রোজগার করেছে তার অর্ধেকের বেশি খরচ হয়ে গেল বাজারে। বাকিটা জমানোর কথা। কিন্তু বউয়ের ওষুধ লাগে, মেয়ের খাতা লাগে, বুড়ো বাপের লুঙ্গি ছেঁড়া। জমানোর কিছু থাকে না।
রাতের নদী
রাতে আবার ট্রলারের শব্দ। ইঞ্জিন গর্জায়। সার্চলাইটের আলো নদীর পানিতে পড়ে। জসিম ঘাট থেকে দেখে। ট্রলার ভারী, পানি কাটে, ঢেউ ওঠে। ঢেউয়ে জসিমের বাঁধা নৌকা দোলে।
ট্রলারে আলো জ্বলে। লোকজন কাজ করে। জাল টানে। মাছ ওঠে। শত শত কেজি। তারা ব্যানের আগেও ধরেছে। ব্যানের সময়ও ধরেছে। ব্যানের পরেও ধরবে। আইন তাদের ছোঁয় না। আইনের হাত ছোট। ক্ষমতার হাত লম্বা।
জসিম তাকিয়ে থাকে। রাগ নেই। রাগ করার মতো শক্তি অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু একটা ভোঁতা জানা আছে, হাড়ের ভেতর বসে আছে, নড়ে না।
আইন আমাদের জন্য। তাদের জন্য নয়।
জসিমের ছেলে ফারুক পাশে দাঁড়িয়ে। বারো বছর বয়স। সেও দেখছে ট্রলার। ফারুক বলে, বাবা, আমিও ট্রলারে কাজ করব।
জসিম বলে, না।
ফারুক বলে, কেন।
জসিম বলে না কেন। কী বলবে। বলবে ট্রলারের মালিক তোকে মানুষ মনে করবে না, মেশিনের পার্ট মনে করবে। বলবে তুই নদীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবি। বলবে তোর বাপ-দাদার পেশায় এত লজ্জা নেই যে ট্রলারে যেতে হবে। এসব বলবে না। বলবে না কারণ ফারুক একদিন যাবেই। হিসাব ফারুককেও টানবে। হিসাব সবাইকে টানে।
জসিম জাল গোটায়। নৌকা ঘোরায়। ঘাটে ফেরে।
পদ্মা বইতে থাকে। পদ্মার কোনো পক্ষ নেই। পদ্মা শুধু বয়ে যায়।
ভোরে আবার জাল ফেলবে জসিম। আবার টানবে। আবার ছোট মাছ উঠবে। আবার আড়তে যাবে। আবার মতিন দাম কাটবে। আবার বাজারে যাবে। আবার হিসাব মিলবে না।
এই চক্র ভাঙার কোনো রাস্তা নেই। ভাঙার চেষ্টা করলে নিজেই ভাঙবে। নদী ভাঙে না, মানুষ ভাঙে। জসিম জানে। তাই ভাঙার চেষ্টা করে না। শুধু জাল ফেলে। শুধু টানে। শুধু বেঁচে থাকে।
বেঁচে থাকা ছাড়া জসিমের আর কোনো প্রতিবাদ নেই।