তাঁতি
হাতের কাজ মরে যাচ্ছে। কিন্তু হাত মরে না। হাত শুধু খালি থাকে
রজব আলী
তাঁতের শব্দ একটা ছন্দ। খটখট। খটখট। খটখট। রজব আলী চোখ বন্ধ করেও বুনতে পারে। আঙুলগুলো নিজে চেনে কোন সুতো কোথায় যাবে। মাথার ভেতরে কোনো হিসাব নেই, হাতের ভেতরে আছে। হাত চিন্তা করে, মাথা বিশ্রাম নেয়।
চল্লিশ বছর ধরে বুনছে। প্রথম তাঁতে বসেছিল ছয় বছর বয়সে। বাবার পাশে। বাবা মাকু চালাত, রজব সুতো গোছাত। ছোট ছোট আঙুল, ছোট ছোট গিঁট। আঙুলের ডগা দিয়ে সুতোর টান বোঝা, সেটা স্কুলে শেখায় না। সেটা তাঁতেই শিখতে হয়।
রজব আলী স্কুলে যায়নি। পড়তে পারে না। লিখতে পারে না। নিজের নাম সই করতে পারে। টিপসই দেয় বাকি জায়গায়। কিন্তু দুইশো নকশা জানে। দুইশো নকশার প্রতিটা সুতোর হিসাব মাথায় আছে। কোনো কাগজে লেখা নেই। কোনো বইতে নেই। শুধু হাতে আছে।
পড়ালেখা না জানা মানে বোকা না। রজব আলী বোকা না। রজব আলী শুধু অন্য ভাষায় জানে। সুতোর ভাষায়।
রজব আলীর ঘর তাঁতঘর। মানে ঘরের মধ্যে তাঁত, তাঁতের মধ্যে ঘর। কোথায় ঘর শেষ, কোথায় তাঁত শুরু, বোঝা যায় না। সুতোর গুচ্ছ ঝুলছে দেয়ালে। মাকু পড়ে আছে মেঝেতে। রঙের কৌটা সারি দিয়ে তাকে। ঘরে ঢুকলে নাকে সুতোর গন্ধ লাগে। তুলার গন্ধ। রঙের গন্ধ। ঘামের গন্ধ।
শাড়ি
টাঙ্গাইলের শাড়ি। নামটা শুনলে মানুষের চোখে একটা রঙ ভাসে। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, কত রঙ। কিন্তু রজব আলীর চোখে রঙ ভাসে না। সুতো ভাসে। কোন সুতো কোথায় গেলে কোন নকশা হবে, সেটা ভাসে।
দুইশো নকশা জানে রজব আলী। জামদানির বুটি, টাঙ্গাইলের পাড়, ময়ূরের চোখ, পদ্মফুল, লতাপাতা। প্রতিটা নকশা বুনতে গেলে হাতের তালু ঘামে। আঙুল কাঁপে না, তালু ঘামে। এটাই ফারাক। আঙুল কাঁপলে কাজ হয় না। তালু ঘামলে কাজ ভালো হয়।
একটা শাড়ি বুনতে তিন দিন। সকাল ছয়টা থেকে রাত দশটা। ষোলো ঘণ্টা। মাঝে দুবার খায়, একবার নামাজ পড়ে, একবার চা খায়। বাকি সময় তাঁতে। পিঠে ব্যথা ধরে। ঘাড় জমে যায়। চোখ লাল হয়ে যায় সুতো দেখতে দেখতে। আঙুলের মাথায় ক্ষত। সুতোর ঘর্ষণে চামড়া উঠে যায়, তারপর শক্ত হয়, তারপর আবার উঠে যায়।
রজব আলীর আঙুলের ছাপ প্রায় নেই। সুতোর ঘর্ষণে ক্ষয়ে গেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র করতে গিয়ে আঙুলের ছাপ নিতে পারেনি। তিনবার চেষ্টা করেছে। মেশিন পড়তে পারে না। তাঁতি মানে পরিচয়হীন। আঙুলেরও পরিচয় নেই, মানুষেরও নেই।
তিন দিনে একটা শাড়ি। দাম পনেরোশো টাকা।
মহাজন
পনেরোশো টাকা রজব আলী পায় না। মহাজন পায়। মহাজন মানে মধ্যস্বত্বভোগী। যে সুতো দেয়, ডিজাইন দেয়, শাড়ি নিয়ে যায়। রজব আলী শুধু শ্রম দেয়। শ্রমের দাম পনেরোশো।
মহাজন সেই শাড়ি ঢাকায় নিয়ে যায়। নিউ মার্কেটে। বসুন্ধরায়। দাম হয়ে যায় পাঁচ হাজার।
পাঁচ হাজারের মধ্যে রজব আলীর ভাগ পনেরোশো। সুতোর দাম বাদ দিলে মহাজনের খরচ তিনশো। মহাজনের লাভ তিন হাজার দুইশো। রজব আলীর তিন দিনের শ্রমের চেয়ে মহাজনের এক ঘণ্টার ট্রাভেলে বেশি টাকা আসে।
মহাজনের নাম আনোয়ার। আনোয়ারের বাড়ি পাকা। দুইতলা। ছাদে ডিশ অ্যান্টেনা। গ্যারেজে মোটরসাইকেল। আনোয়ারের ছেলে ঢাকায় পড়ে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। সেমিস্টার ফি ষাট হাজার। ষাট হাজার মানে রজব আলীর চল্লিশটা শাড়ি। চল্লিশটা শাড়ি মানে একশো কুড়ি দিন। চার মাস।
রজব আলী হিসাবটা জানে। জানে কিন্তু কিছু করতে পারে না। নিজে ঢাকায় গিয়ে বেচবে কোথায়। দোকান নেই। পরিচিতি নেই। পুঁজি নেই। মহাজন ছাড়া রাস্তা নেই।
মহাজন ছাড়া রাস্তা নেই। এই কথাটা রজব আলীর বাবাও বলত। বাবার বাবাও।
ইউনেস্কো
ইউনেস্কো বলেছে এটা অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ইনট্যানজিবল হেরিটেজ। একটা সার্টিফিকেট দিয়েছে। সেই সার্টিফিকেটের একটা ফটোকপি ইউনিয়ন পরিষদে ঝুলছে। কেউ দেখে না।
রজব আলী ইউনেস্কো চেনে না। নামটা শুনেছে টিভিতে। চেয়ারম্যান সাহেব একবার এসেছিলেন, ক্যামেরাওয়ালা নিয়ে। রজব আলীকে তাঁতে বসিয়ে ছবি তুলেছেন। রজব আলী হেসেছিল ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। হাসিটা ভালো আসেনি, আবার তুলেছে। রজব আলীকে বলেছিলেন, দাঁত দেখিয়ে হাসেন। রজব আলী দাঁত দেখিয়ে হেসেছিল। সামনের দুটো দাঁত নেই। ছবিটা ভালো লাগেনি। আরেকটা তুলেছে, মুখ বন্ধ করে।
সেই ছবি কোথায় গেছে জানে না। হয়তো কোনো অফিসে ফ্রেমে ঝুলছে। হয়তো কোনো রিপোর্টে ছাপা হয়েছে। হয়তো কেউ দেখে বলেছে, বাহ, কী সুন্দর ঐতিহ্য। তারপর পাতা উল্টেছে।
ঐতিহ্যের পেটে খিদে লাগে কি না, সেটা ইউনেস্কো জানে না। রজব আলী জানে। ঐতিহ্যের পেটে খিদে লাগে। প্রতিদিন লাগে।
একবার একদল বিদেশি এসেছিল। গোরা। ক্যামেরা নিয়ে। রজব আলীর তাঁত দেখেছে। হাততালি দিয়েছে। ওয়ান্ডারফুল বলেছে। রজব আলী ওয়ান্ডারফুল বোঝে না। বুঝেছে তারা খুশি হয়েছে। তারপর চলে গেছে। কিছু কেনেনি।
মেশিন লুম
বগুড়ায় একটা মেশিন লুম বসেছে গত বছর। চায়নিজ মেশিন। দুই ঘণ্টায় একটা শাড়ি। রজব আলী যেটা বোনে তিন দিনে, মেশিন বোনে দুই ঘণ্টায়।
মেশিনের শাড়ি সস্তা। পাইকারি চারশো টাকা। রজব আলীর শাড়ি পনেরোশো। মানুষ পার্থক্য বোঝে, যারা বোঝে তারা পনেরোশো দেয়। কিন্তু যারা বোঝে তাদের সংখ্যা কমছে। ক্রেতা কমছে। অর্ডার কমছে।
মেশিনের শাড়ি দেখতে সুন্দর। রঙ ঝকঝকে। নকশা সমান। প্রতিটা শাড়ি হুবহু একই। যেন ফটোকপি। কিন্তু ধরলে বোঝা যায়। সুতোর টান অন্য। মেশিনের টান সমান, হাতের টান অসমান। এই অসমানতাই হাতের শাড়ির প্রাণ। প্রতিটা সুতোয় আঙুলের চাপ আছে। সেই চাপ মেশিনে আসে না।
কিন্তু কে ধরে দেখে শাড়ি। দোকানে চোখে দেখে কেনে। দাম দেখে কেনে। চোখ ভুল করে। পকেট ভুল করে না। পকেটে চারশো আছে, পনেরোশোর শাড়ি কিনবে কী করে। গরিবের পক্ষে হাতের কাজ কেনা সম্ভব না। ধনীর পক্ষে সম্ভব, কিন্তু ধনী কেনে বিদেশি ব্র্যান্ড।
মাঝখানে রজব আলী পড়ে আছে। না গরিবের, না ধনীর।
গত মাসে মহাজন দুটো শাড়ির অর্ডার দিয়েছে। আগে মাসে দশটা দিত। দুটো মানে ছয় দিনের কাজ। বাকি চব্বিশ দিন তাঁত চুপ।
তাঁত চুপ থাকলে রজব আলীও চুপ থাকে। বসে থাকে তাঁতের সামনে। সুতো ছোঁয়। মাকু ধরে। চালায় না। শুধু ধরে রাখে।
ছেলে
ছেলের নাম মিজান। বয়স আঠারো। রজব আলী শেখাতে চেয়েছিল। মিজান বসেছিল তাঁতে। দুই দিন। তৃতীয় দিন উঠে গেছে।
বলেছে, বাবা, এই দিয়া হইব না।
রজব আলী কিছু বলেনি। কী বলবে। ছেলে ভুল বলেনি। এই দিয়া হইব না। সত্যি হবে না। তাঁত দিয়ে সংসার চলে না আর। হিসাব পরিষ্কার। আবেগ দিয়ে হিসাব পাল্টানো যায় না।
মিজান গেছে সাভারে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। মাসে বারো হাজার টাকা। ওভারটাইম করলে পনেরো। রজব আলীর মাসিক আয়ের চেয়ে বেশি। অনেক বেশি।
মিজান প্রতি মাসে পাঁচ হাজার পাঠায়। সেই টাকায় সংসার চলে। রজব আলীর তাঁতের আয়ে চলে না। তাঁতির সংসার চলে গার্মেন্টস শ্রমিকের টাকায়। এই কথায় একটা তিক্ত মজা আছে। মিজান মেশিনে কাপড় বানায়। রজব আলী হাতে কাপড় বানায়। বাবার হাতে যে জ্ঞান আছে, ছেলে সেটা ফেলে দিয়ে মেশিনের চাকরি নিয়েছে। কারণ মেশিনের চাকরিতে ভাত আছে। হাতের জ্ঞানে ভাত নেই।
যে ছেলে তাঁতির ছেলে, সে এখন মেশিনের লোক। রজব আলী এটা নিয়ে কিছু বলে না।
বাজার
রজব আলী মাসে একবার বাজারে যায়। সুতো কিনতে না, কিন্তু অন্য তাঁতিদের খোঁজ নিতে। আগে এই বাজারে বিশজন তাঁতি আসত। সুতোর দোকানে ভিড় থাকত। কে কোন রঙ নেবে, কোন সুতো ভালো, কার নকশা নতুন, এসব নিয়ে আড্ডা হতো।
এখন সুতোর দোকানটা বন্ধ। হক সাহেব দোকান বন্ধ করে দিয়েছে। সুতোর ক্রেতা নেই। তাঁতি নেই তো ক্রেতা কোথা থেকে আসবে।
রজব আলী বাজারে গিয়ে কালু তাঁতির খবর নেয়। কালু বুনছে না আর। মুদির দোকান দিয়েছে। আব্দুল তাঁতির খবর নেয়। আব্দুল তাঁত বেচে দিয়েছে। জমি কিনেছে, চাষ করে। মোবারক তাঁতির খবর নেয়। মোবারক মারা গেছে গত বছর। ক্যান্সার। রঙের ক্যান্সার। তাঁতের রঙে বিষ থাকে, সেটা কেউ বলে না। কিন্তু তাঁতিরা জানে। নাকে ঢোকে, ফুসফুসে যায়, রক্তে মেশে।
রজব আলী নিজের হাত দেখে। আঙুলের ডগায় নীল রঙ আছে। ধোয়ে যায় না। রঙ চামড়ার ভেতরে ঢুকে গেছে। শরীরের ভেতরেও ঢুকেছে হয়তো। সেটা বাইরে থেকে দেখা যায় না। ভেতর থেকেও টের পাওয়া যায় না। যতদিন না রোগ হয়।
বাজার থেকে ফেরার পথে রজব আলী থামে নদীর ধারে। বসে। নদীর পানি দেখে। পানিতে নিজের ছায়া দেখে। ছায়াটা বুড়ো। চুল পাকা। পিঠ বাঁকা। তাঁতে বসতে বসতে পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে। সোজা দাঁড়াতে পারে না আর। তাঁতি সোজা দাঁড়ায় না। তাঁতি ঝুঁকে থাকে। সুতোর দিকে, নকশার দিকে, জীবনের দিকে।
রজব আলী পানিতে হাত ডোবায়। ঠান্ডা। আঙুলের রঙ পানিতে ছড়ায় না। রঙ ত্বকের ভেতরে। পানি ত্বকের বাইরে। দুটো আলাদা দুনিয়া।
পুরোনো তাঁত
রজব আলীর তাঁতটা একশো বছরের পুরোনো। কাঠের। শাল কাঠের। তার দাদা বানিয়েছিলেন। কাঠে ঘুণ ধরেনি এখনো। শাল কাঠ শক্ত। ঘুণে কাঁদে।
তাঁতের গায়ে দাগ আছে। বাবার সময়ের দাগ। দাদার সময়ের দাগ। প্রতিটা দাগে একটা গল্প। এই দাগটা বাবা একবার হাতুড়ি দিয়ে ঠুকেছিলেন, মাকু আটকে গিয়েছিল। ওই দাগটা দাদা জলে ভিজিয়ে রেখেছিলেন কাঠ ফুলানোর জন্য, জলের দাগ শুকোয়নি।
রজব আলী তাঁতে হাত বুলায়। কাঠ মসৃণ। হাতের ঘামে মসৃণ হয়েছে। তিন প্রজন্মের ঘাম। কাঠ সেই ঘাম শুষে নিয়েছে। কাঠের ভেতরে তিন প্রজন্মের শ্রম জমা আছে।
তাঁত বেচলে কত পাবে। পাঁচ হাজার। দশ হাজার। পুরোনো কাঠ, কে কিনবে। জ্বালানি কাঠ হিসেবে বিক্রি হবে। একশো বছরের তাঁত জ্বালানি হবে। সেই চিন্তায় রজব আলীর বুকে ব্যথা হয়। শারীরিক ব্যথা না। অন্য ব্যথা।
সুতো
সন্ধ্যায় রজব আলী সুতো গোছায়। কেউ অর্ডার দেয়নি। কোনো কাজ নেই। তবু সুতো গোছায়। অভ্যাস। হাত খালি থাকলে অস্থির লাগে। হাত যেন নিজেই খোঁজে কাজ। মাথা বলে কাজ নেই, হাত মানে না। হাত সুতো ধরে, গোছায়, রঙ মেলায়, প্যাঁচ দেয়। কোনো কারণ ছাড়া।
সুতোর গন্ধ। তুলার গন্ধ। রঙের গন্ধ। এই গন্ধ রজব আলীর নাকে জন্ম থেকে। এই গন্ধ ছাড়া ঘর ঘর মনে হয় না।
বউ বলে, তাঁত বেচে দাও। জায়গাটায় মুরগির খামার করো।
রজব আলী কিছু বলে না। তাঁত বেচে দেওয়া মানে কী, সেটা বউ বোঝে না। তাঁত বেচে দেওয়া মানে নিজের হাত বেচে দেওয়া। হাত বেচলে বাকি শরীরটা দিয়ে কী করবে।
বউ ভুল বলে না। মুরগির খামারে বেশি টাকা আসবে। তিনশোটা মুরগি, প্রতিদিন দুইশো ডিম, ডিম বিক্রি, মাসে আট-দশ হাজার। হিসাবটা সোজা। কিন্তু রজব আলী মুরগি পালবে না। রজব আলী তাঁতি। তাঁতি মুরগি পালে না। তাঁতি সুতো বোনে।
শেষ নকশা
রজব আলী একটা শাড়ি বুনছে। কেউ অর্ডার দেয়নি। নিজের জন্য বুনছে। নিজের মানে বউয়ের জন্য। বিয়ের পর বউকে একটা শাড়ি বুনে দেবে বলেছিল। পঁচিশ বছর হয়ে গেছে, বোনা হয়নি। সবসময় মহাজনের অর্ডার। মহাজনের শাড়ি আগে, নিজের শাড়ি পরে। পরে কখনো আসেনি। এখন এসেছে। কাজ নেই, সময় আছে।
এখন বুনছে। সবচেয়ে সুন্দর নকশা। ময়ূরের চোখ আর পদ্মফুল। লাল পাড়, সাদা জমিন। প্রতিটা সুতো যত্নে বসাচ্ছে। তাড়া নেই, মহাজনের ডেডলাইন নেই। নিজের কাজ, নিজের সময়।
তিন দিন না, পাঁচ দিন লাগবে। ব্যাপার না। সময় তো আছে। কাজ তো নেই।
বউ দেখতে আসে। দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়। কিছু বলে না। রজব আলীও কিছু বলে না। দুজনেই জানে এই শাড়িটা কার জন্য। পঁচিশ বছরের দেনা শোধ হচ্ছে।
হাতের কাজ মরে যাচ্ছে। কিন্তু হাত মরে না। হাত শুধু খালি থাকে।
রজব আলীর হাত খালি থাকবে না। যতদিন সুতো আছে, ততদিন বুনবে। কেউ কিনুক আর না কিনুক।
তাঁতে খটখট শব্দ হয়। সন্ধ্যার অন্ধকারে শব্দটা একলা শোনায়। আগে পাড়ায় বিশটা তাঁত চলত। এখন একটা। রজব আলীর।
খটখট। খটখট। খটখট।
শব্দটা থামবে একদিন। রজব আলী জানে। তারপর পাড়ায় কোনো তাঁতের শব্দ থাকবে না। শুধু মেশিনের গুনগুন থাকবে। দূরের ফ্যাক্টরি থেকে ভেসে আসবে।
কেউ ফারাক বুঝবে না।
শুধু রজব আলীর বউ বুঝবে। বউ যে শাড়িটা পরে আছে, সেটা রজব আলীর বোনা। বউ সেটা জানে। বউ সেই শাড়ির সুতোয় রজব আলীর আঙুলের চাপ বোঝে। সেই চাপ পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।
সেই চাপ শেষ হয়ে যাবে একদিন। তখন শুধু মেশিনের সমান চাপ থাকবে। নিখুঁত। প্রাণহীন।
কিন্তু সেদিন আসতে এখনো দেরি আছে। রজব আলীর হাতে এখনো জোর আছে। চোখে এখনো আলো আছে। মাকু চালাতে পারে। সুতো বুনতে পারে। পারে যতদিন পারে।
তাঁত থামবে একদিন। কিন্তু আজ থামেনি। আজ খটখট আছে।
রজব আলী তাঁতে বসে। মাকু তোলে। সুতো টানে। বউয়ের শাড়ি বুনতে থাকে। এই শাড়ি কেউ কিনবে না। এই শাড়ি বিক্রি হবে না। এই শাড়ির কোনো বাজারমূল্য নেই।
কিন্তু এই শাড়ির একটা মূল্য আছে যেটা বাজার বোঝে না। পঁচিশ বছরের ভালোবাসার মূল্য। সেটা কত টাকা। কেউ জানে না। রজব আলীও জানে না। শুধু বোনে।