কামার
আগুন নেভানো সহজ। কিন্তু একবার নিভলে আবার জ্বালানো কঠিন
শুকুর
শুকুরের হাত দুইটা বড়। অস্বাভাবিক বড়। আঙুলগুলো মোটা, গিঁটে গিঁটে কালো। নখের তলায় কালি ঢুকে গেছে, বেরোয় না। তেল দিয়ে ঘষলেও না। লোহার কালি। লোহার গন্ধ। শুকুরের হাতে সবসময় লোহার গন্ধ। শরীরেও।
বউ বলে, গোসল কইরা আয়, গন্ধ লাগে।
শুকুর বলে, গন্ধ যাইব না। শরীরে ঢুইকা গেছে।
সত্যি। চল্লিশ বছর লোহা পেটালে লোহা শরীরের ভেতরে ঢোকে। রক্তে মেশে। ঘামে বেরোয়। শুকুরের ঘাম কালচে, শার্টে দাগ পড়ে, ধোয়ে যায় না।
শুকুরের চোখে সমস্যা। ফুলকির আলো চোখে পড়ত সারাদিন। এখন রাতে ঝাপসা দেখে। ডাক্তার বলেছে ছানি হচ্ছে। অপারেশন করতে হবে। দশ হাজার টাকা। শুকুর হেসেছিল। হাসি না, মুখ বিকৃত হয়েছিল।
শুকুরের বাম হাতে পোড়া দাগ। তিন জায়গায়। গলিত লোহার ছিটা পড়েছিল। ডান হাতের তর্জনীতে কাটা দাগ। ছেনি ফসকে গিয়ে চামড়া কেটেছিল, হাড় দেখা গিয়েছিল। রক্ত পড়েছিল কিন্তু কাজ থামায়নি। গামছা বেঁধে কাজ করেছিল। কামারের রক্ত পড়ে, কামার থামে না।
বংশ
শুকুরের বাবা কামার ছিল। বাবার বাবা কামার ছিল। তার আগেও কামার। কতদিন আগে থেকে কেউ জানে না। শুকুর বলে দুইশো বছর। হতে পারে তিনশো। হিসাব নেই। হিসাব রাখার দরকার ছিল না। কামার সবসময় ছিল, সবসময় থাকবে, এটাই ছিল ধারণা।
ধারণা ভুল ছিল।
শুকুরের বাবা মারা গেছে পনেরো বছর আগে। মরার আগে নেহাই ছুঁয়ে বলেছিল, এইডা রাখবি। শুকুর রেখেছে। নেহাইটা ভারী, প্রায় ত্রিশ কেজি। ঢালাই লোহার। ওপরটা সমতল, পেটানো পেটানো মসৃণ হয়ে গেছে। কত হাজার হাতুড়ির ঘা খেয়েছে এই নেহাই। তার গায়ে ইতিহাস আছে। শুকুরের বাবার ইতিহাস, বাবার বাবার ইতিহাস।
এখন সেই নেহাইয়ের গায়ে মরচে।
শুকুরের চুল্লি নেভে গেছে তিন মাস। ভাটা জ্বলেনি। কয়লা কেনা হয়নি। হাপর পড়ে আছে কোণায়, ধুলো জমেছে। নেহাইয়ের ওপর মরচে। মরচে মানে অপমান। নেহাইতে মরচে পড়া মানে কামারের মৃত্যু।
শুকুর মরচে দেখে কিন্তু ঘষে না। ঘষে কী হবে। আবার তো মরচে পড়বে। যন্ত্র না চললে মরচে পড়বেই।
দা, কাস্তে, কোদাল
গ্রামের মানুষ আগে শুকুরের কাছে আসত। ধান কাটার সময় কাস্তে লাগে, শুকুর বানাত। জমি চাষের সময় কোদাল লাগে, শুকুর বানাত। বাঁশ কাটতে দা লাগে, শুকুর বানাত। রান্নাঘরের বটি, বাটাল, ছেনি, সবকিছু।
গ্রামের প্রতিটা ঘরে শুকুরের হাতের জিনিস ছিল। প্রতিটা ঘরে। কেউ বিয়ে দিলে শুকুরের কাছে আসত, একটা বটি বানিয়ে দেন। কেউ নতুন ঘর তুললে আসত, দুইটা কব্জা বানিয়ে দেন। শুকুর বানাত। লোহা গরম করত, পেটাত, আকার দিত, পানিতে ডোবাত। শ্যাঁ করে শব্দ হতো। বাষ্প উঠত। লোহা শক্ত হতো।
এখন হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে কেনে। চায়নিজ স্টিল। সস্তা। চকচকে। প্লাস্টিকের হাতল। দেখতে সুন্দর। কিন্তু ছয় মাসে ভোঁতা হয়ে যায়। ধার ধরে না। শুকুরের বানানো দা দশ বছর চলত। কিন্তু দশ বছরের দা কেউ চায় না। ছয় মাসের দা চায়। কারণ ছয় মাসেরটা সস্তা।
একশো টাকার দা কেউ কিনবে, তিনশো টাকারটা কিনবে না। যদিও তিনশো টাকারটা বিশ বছর চলবে। মানুষ হিসাব করে না। মানুষ দাম দেখে। দামের পেছনে হিসাব আছে, কিন্তু সেটা অন্য হিসাব। সেটা আজকের হিসাব। আজকে পকেটে কত আছে, সেই হিসাব। কাল কী হবে, সেটা কালের হিসাব। কাল আরেকটা দা কিনবে। আবার একশো টাকায়।
মরসুম
শুকুর বসে আছে দোকানের সামনে। দোকান বলতে টিনের চালা। চুল্লি, নেহাই, হাপর, কিছু লোহার টুকরো। এককালে এখানে আগুন জ্বলত সারাদিন। কয়লার গন্ধে বাতাস ভারী থাকত। হাতুড়ির শব্দে কান পাতা যেত না। ঠং ঠং ঠং। সেই শব্দ শুকুরের কাছে গানের মতো ছিল। প্রতিটা ঘায়ে একটা তাল। প্রতিটা তালে একটা অর্থ। হালকা ঘা মানে আকার দেওয়া। জোরে ঘা মানে বাঁকানো। খুব জোরে ঘা মানে কাটা।
এখন নিস্তব্ধ।
রাস্তা দিয়ে মানুষ যায়। কেউ তাকায় না। আগে তাকাত। আগে কামারের দোকান মানে গ্রামের কেন্দ্র। মানুষ দাঁড়াত, গল্প করত, আগুন দেখত। আগুনের কাছে মানুষ আসে। আগুন আকর্ষণ করে। এখন আগুন নেই তো মানুষও নেই।
পাশের দোকানে হার্ডওয়্যার। রাজু মিয়ার দোকান। চায়না থেকে মাল আসে কন্টেইনারে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ট্রাকে করে জেলায়। জেলা থেকে উপজেলায়। রাজু মিয়া কিনে রাখে। দা পঁচাশি টাকা, কাস্তে ষাট, কোদাল একশো কুড়ি।
শুকুরের দা তিনশো, কাস্তে দুইশো, কোদাল তিনশো পঞ্চাশ।
তিনগুণ দাম। তিনগুণ মান। কিন্তু কে দেবে তিনগুণ দাম। গরিব চাষি তিনগুণ দেবে কেন। তারও তো পয়সা নেই।
রাজু মিয়া শুকুরকে দেখে হাসে। শত্রুতার হাসি না। করুণার হাসি। শুকুরের কাছে করুণার হাসি শত্রুতার চেয়ে খারাপ।
মেরামত
একদিন একটা লোক আসে। বুড়ো। চেনা মুখ। গ্রামের রহমত চাচা। হাতে একটা পুরোনো কাস্তে।
বলে, শুকুর, এইডা একটু ঠিক কইরা দে। ধার নাই।
শুকুর কাস্তেটা হাতে নেয়। পুরোনো। শুকুরের বাবার বানানো। চিনতে পারে। বাবার হাতুড়ির দাগ আছে গায়ে। বাবা একটু বাঁকা করে পেটাত, শুকুর সোজা পেটায়। এই ফারাকটা আঙুলে ছোঁয়ালে বোঝা যায়। যেমন মানুষের হাতের লেখা চেনা যায়, তেমন কামারের হাতুড়ির দাগ চেনা যায়।
শুকুর চুল্লি জ্বালায়। তিন মাস পর। কয়লা কেনা ছিল না, পাশের বাড়ি থেকে কাঠ আনে। কাঠে তাপ কম, সময় বেশি লাগে। ব্যাপার না। সময় তো আছে।
হাপরে বাতাস দেয়। পুরোনো হাপর, চামড়া শুকিয়ে গেছে, ফুটো হয়ে গেছে। বাতাস পুরোপুরি যায় না। তবু আগুন জ্বলে। আগুন অল্প বাতাসেও জ্বলে। আগুন বাঁচতে চায়।
লোহা গরম হয়। লাল হয়। শুকুর হাতুড়ি তোলে। নামায়। ঠং। আবার তোলে। নামায়। ঠং। শব্দটা ফিরে আসে দোকানে। প্রতিধ্বনি হয় টিনের দেয়ালে। শুকুরের বুকের ভেতরেও প্রতিধ্বনি হয়। এই শব্দ তার প্রার্থনা। এই শব্দ তার নামাজ।
কাস্তে ঠিক হয়। ধার বসে। শুকুর আঙুলের পেট দিয়ে ধার পরীক্ষা করে। ঠিক আছে। আগের মতো। বাবা বেঁচে থাকলে খুশি হতো।
রহমত চাচা বলে, কত দিমু।
শুকুর বলে, লাগব না চাচা।
রহমত চাচা পঞ্চাশ টাকা রেখে যায়। শুকুর নেয়। না নিলে চাচা খারাপ পাবে।
পঞ্চাশ টাকা। এটাও দান। মেরামতও দান। নতুন জিনিস বানানো থামলে মেরামত আসে। মেরামতও থামবে একদিন। তারপর কিছু আসবে না।
ছেলের চিঠি
আলম ফোন করে মাঝে মাঝে। মোবাইলে। শুকুরের মোবাইল নেই। পাশের বাড়ির আসলামের মোবাইলে ফোন করে। আসলাম ডেকে দেয় শুকুরকে।
আলম বলে, বাবা, কেমন আছেন।
শুকুর বলে, ভালো।
ভালো মানে বেঁচে আছে। বেঁচে থাকাটাই ভালো। এর বেশি কিছু জানতে চাইলে উত্তর দিতে পারবে না। কেমন আছে সেটা নিজেও জানে না। শরীর আছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, শ্বাস নিচ্ছে। ভালো বলতে এটুকুই।
আলম বলে, টাকা পাঠাইছি।
শুকুর বলে, পাইছি।
আলম বলে, দোকান খোলেন না কেন।
শুকুর চুপ থাকে। কী বলবে। দোকান খোলা আছে। চুল্লি জ্বলে না। খদ্দের আসে না। খোলা আর বন্ধ একই কথা। কিন্তু এসব বলে ছেলেকে চিন্তায় ফেলবে কেন।
শুকুর বলে, খোলা আছে।
আলম বলে, জ্বি।
দুজনেই জানে মিথ্যা বলছে। দুজনেই জানে সত্যি বললে কষ্ট হবে। তাই মিথ্যা বলে। মিথ্যা কখনো কখনো দরকারি। সত্যির চেয়ে দরকারি। গরিবের মিথ্যায় পাপ নেই। গরিবের মিথ্যা বাঁচার ওষুধ।
পুরোনো আগুন
শুকুর মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে চুল্লি জ্বলছে। আগুন লাল। কয়লা কালো আর লাল। হাপরে বাতাস যাচ্ছে। ঠং ঠং ঠং। হাতুড়ি নেহাইতে পড়ছে। লোহা আকার নিচ্ছে। ফুলকি ছিটকে পড়ছে। শুকুরের মুখে আগুনের আলো। ঘাম ঝরছে কপাল থেকে। ঘাম পড়ছে নেহাইতে, সিস করে শব্দ হচ্ছে। ঘামও বাষ্প হচ্ছে। সবকিছু গরম। সবকিছু জীবন্ত।
তারপর ঘুম ভাঙে। ঘর অন্ধকার। বউ পাশে ঘুমাচ্ছে। বাইরে ঝিঁঝির শব্দ। চুল্লিতে আগুন নেই। স্বপ্নটা শেষ।
শুকুর উঠে বসে। অন্ধকারে তাকায়। দোকানের দিকে। দোকান দেখা যায় না, কিন্তু আছে। নেহাই আছে। হাতুড়ি আছে। হাপর আছে। সব আছে। শুধু আগুন নেই। শুধু কাজ নেই। শুধু মানে নেই।
সন্ধ্যা
সন্ধ্যায় শুকুর নেহাইয়ের গায়ে হাত রাখে। ঠান্ডা লোহা। আগে এটা গরম থাকত সারাদিন। হাত রাখলে উষ্ণতা পাওয়া যেত। এখন ঠান্ডা। নেহাইও ঠান্ডা, চুল্লিও ঠান্ডা, হাপরও ঠান্ডা।
শুকুরের ছেলে ঢাকায়। ওয়েল্ডিংয়ের দোকানে কাজ করে। বৈদ্যুতিক ওয়েল্ডিং। আর্ক ওয়েল্ডিং। আগুন আছে, কিন্তু সেটা অন্য আগুন। কয়লার আগুন না। হাপরের আগুন না। সুইচ টিপলে জ্বলে, সুইচ টিপলে নেভে।
ছেলের নাম আলম। আলম মাসে পাঠায় তিন হাজার। তিন হাজার টাকায় শুকুরের সংসার চলে। বউ, শুকুর, আর এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। বিয়ের টাকা কোথা থেকে আসবে জানে না। আলম বলেছে জোগাড় করব। কীভাবে জোগাড় করবে জানে না। ওয়েল্ডারের মাসিক বারো হাজার। তিন হাজার পাঠায়, নয় হাজার ঢাকায় থাকতে লাগে। জমানোর সুযোগ নেই।
শুকুরের আগুন অন্য। কয়লার আগুনে একটা জীবন্ত জিনিস আছে। সেটা নিজে শ্বাস নেয়। হাপরে বাতাস দিলে বড় হয়, না দিলে ছোট হয়। মরে না, ছোট হয়। আবার বাতাস দিলে আবার বড় হয়।
কিন্তু তিন মাস বাতাস না দিলে আগুন মরে যায়।
আগুন নেভানো সহজ। কিন্তু একবার নিভলে আবার জ্বালানো কঠিন।
শুকুর জানে এই কথাটা আগুনের জন্য না। এই কথাটা তার জীবনের জন্য। তার পেশার জন্য। তার বংশের জন্য। দুইশো বছরের আগুন নিভে যাচ্ছে। কে জ্বালাবে আবার। আলম জ্বালাবে না। আলম ওয়েল্ডার। ওয়েল্ডারের আগুন আলাদা।
শেষ কামার
গ্রামে আর কোনো কামার নেই। পাশের গ্রামেও নেই। উপজেলায় একজন ছিল, সেও বন্ধ করেছে। মোবাইলের দোকান দিয়েছে। ভালো চলছে। মানুষের দা লাগে না, মোবাইল লাগে। মোবাইলে কথা বলা যায়। দা দিয়ে শুধু কাটা যায়। কাটার চেয়ে কথা বলার দরকার বেশি। হয়তো।
শুকুর মোবাইলের দোকান দেবে না। শুকুর কামার। কামারই থাকবে। কাজ না থাকলেও কামার।
কিন্তু কামার কাকে বলে। যে লোহা পেটায় তাকে বলে, নাকি যে লোহা পেটাতে জানে তাকে বলে। যদি জানাটাই যথেষ্ট হয়, তাহলে শুকুর কামার আছে। যদি করাটা লাগে, তাহলে শুকুর কামার নেই।
একটা শব্দ আছে, বাংলায়, জীবিকা। জীবনের ইকা। জীবনের সাথে যেটা জড়িত। কামারি শুকুরের জীবিকা ছিল। এখন জীবিকা নেই, কিন্তু জীবন আছে। জীবিকাহীন জীবন কেমন। শ্বাস আছে, অর্থ নেই। চলা আছে, গন্তব্য নেই।
রাতে শুকুর হাতুড়ি রাখে নেহাইয়ের পাশে। দুটো পাশাপাশি। লোহার পাশে লোহা। ঠান্ডা লোহার পাশে ঠান্ডা লোহা।
কাল হয়তো কেউ আসবে। হয়তো আসবে না। শুকুর অপেক্ষা করবে।
কামার অপেক্ষা করা ছাড়া আর কী করবে। আগুন তো নিজে জ্বলে না।
শুকুর দোকানের দরজা বন্ধ করে। তালা লাগায় না। তালা লাগানোর কিছু নেই। কে চুরি করবে নেহাই। নেহাই ত্রিশ কেজি। কে বয়ে নিয়ে যাবে। আর নিয়ে গিয়ে কী করবে। ভাঙাড়িতে বেচবে। ভাঙাড়ি দেবে কেজি পঁচিশ টাকা। ত্রিশ কেজিতে সাতশো পঞ্চাশ টাকা। দুইশো বছরের নেহাই, দাম সাতশো পঞ্চাশ টাকা।
শুকুর বাড়ি ফেরে। বউ ভাত বেড়ে রেখেছে। শুকনো মরিচ ভর্তা, ডাল, পটলের তরকারি। খায়। মুখে স্বাদ নেই। শরীরে খিদে আছে, মনে নেই। মনে একটা ভোঁতা ব্যথা আছে। সেটা কোনো ওষুধে সারবে না।
বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে। স্বপ্নে আবার চুল্লি জ্বলবে। আবার ঠং ঠং ঠং।
জেগে থাকার চেয়ে ঘুমানো ভালো। ঘুমে অন্তত আগুন আছে।