কুমোর
মাটি ধর্ম মানে না। মাটি শুধু আকার মানে
মালেকা
মাটির গন্ধ। ভেজা মাটি। নদীর তলার মাটি, যেটা হাতে নিলে মনে হয় কারো চামড়া ধরেছি। মসৃণ, শীতল, জীবন্ত। মালেকা সকালবেলা মাটি ছানে। খালি পায়ে। গোড়ালি ডোবে মাটিতে। মাটি উঠে আসে আঙুলের ফাঁকে। নখের তলায় ঢোকে। চুলে লাগে। শাড়িতে লাগে। সারা গায়ে মাটি।
মালেকা মাটির মানুষ। মানে মাটি দিয়ে জিনিস বানায়। হাঁড়ি, কলসি, সরা, মালসা, বাসন। প্রতিটা জিনিস তার হাতে আকার পায়। প্রতিটা জিনিস গোল হয়, উঁচু হয়, চওড়া হয়, তার আঙুলের চাপে।
চাকায় বসে মাটি ঘোরায়। চাকাটা পায়ে ঠেলে ঘোরায়। বিদ্যুতের চাকা নয়। পায়ের চাকা। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে ঠেলে ঘোরায়। সেই আঙুলটা অন্য আঙুলের চেয়ে মোটা, শক্ত। চাকা ঘোরানোর আঙুল।
মালেকার বয়স পঞ্চাশ। শরীর শুকিয়ে গেছে। কোমরে ব্যথা। হাঁটুতে ব্যথা। সারাদিন মাটিতে বসে কাজ করলে শরীর ভাঙে। মাটি ভাঙে না, শরীর ভাঙে। কিন্তু হাত দুটো এখনো শক্ত। আঙুলে জোর আছে। মাটি চেপে আকার দেওয়ার জোর। এই জোর শরীরের না। এই জোর অভ্যাসের। তিরিশ বছরের অভ্যাস হাতে জমা আছে।
মালেকার মুখে বলিরেখা। রোদে পুড়ে চামড়া কালো হয়ে গেছে। ভাটার তাপে মুখের চামড়া শুকনো। ক্রিম লাগায় না। ক্রিম কিনতে পঞ্চাশ টাকা। পঞ্চাশ টাকায় দুই কেজি চাল হয়। চাল দরকার, ক্রিম না।
প্লাস্টিক
আগে প্রতি ঘরে মাটির জিনিস ছিল। পানি রাখত কলসিতে। কলসির পানি ঠান্ডা, ফ্রিজের দরকার নেই। রান্না হতো মাটির হাঁড়িতে। মাটির হাঁড়ির ভাত অন্য স্বাদ। ভাতের সাথে একটু মাটির গন্ধ মেশে, সেটাই আসল স্বাদ। দইও রাখত মাটির পাত্রে। মাটির পাত্রের দই ঘন হয়, টক হয় ঠিকমতো। প্লাস্টিকে হয় না। প্লাস্টিক মরা জিনিস, দইকেও মারে।
এখন প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের বালতি, প্লাস্টিকের জগ, প্লাস্টিকের বাসন। অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি। স্টিলের থালা। সস্তা, টেকসই, হালকা। ভাঙে না। মাটির জিনিস ভাঙে। একবার পড়লে শেষ। প্লাস্টিক পড়লে ওঠে।
মালেকার মা মাটির জিনিস বানাত। মালেকা মায়ের কাছে শিখেছে। শাশুড়িও বানাত। এই বাড়িতে তিন পুরুষের নারী মাটি ছেনেছে। চাকা ঘুরিয়েছে। ভাটায় পুড়িয়েছে। এখন মালেকা একা।
মালেকা জানে প্লাস্টিক জিতে গেছে। মাটি হেরে গেছে। পৃথিবী মাটির তৈরি, কিন্তু পৃথিবীর মানুষ প্লাস্টিক চায়। মাটি থেকে এসেছে, মাটিতে যাবে, কিন্তু মাঝখানের সময়টুকুতে প্লাস্টিক চায়।
গ্রামের মেয়েরা আর মাটির কলসি আনে না টিউবওয়েল থেকে। প্লাস্টিকের বালতি আনে। হালকা। সহজ। কলসি ভারী, মাথায় নিতে হয়, ঘাড়ে চাপ পড়ে। প্লাস্টিকের বালতি হাতে ঝুলিয়ে আনা যায়। মালেকা দোষ দেয় না। মেয়েদের ঘাড়ে ব্যথা কমেছে। সেটা ভালো। কিন্তু মালেকার কাজ কমেছে। সেটা খারাপ।
দীপাবলি
কিন্তু বছরে একবার মাটির ডাক আসে। দীপাবলি। হিন্দু প্রতিবেশীদের পূজা। মাটির প্রদীপ লাগে। ছোট ছোট মাটির বাতি। ভেতরে সরিষার তেল, তুলোর সলতে, আগুন জ্বলে। প্লাস্টিকে আগুন জ্বালানো যায় না। মোমবাতি চলে, কিন্তু মাটির প্রদীপের জায়গা মোমবাতি নিতে পারে না। ঐতিহ্য। ধর্ম। মাটির প্রদীপই চাই।
রমেশদা আসে মালেকার কাছে। প্রতি বছর আসে। বলে, মালেকা বুবু, একশো প্রদীপ লাগবে।
মালেকা বলে, হইব।
রমেশদা চা খায় মালেকার ঘরে। গল্প করে। ছেলেমেয়ের কথা বলে। রমেশদার মেয়ে কলেজে পড়ে। ভালো ছাত্রী। মালেকা বলে, ভালো কথা, মাইয়াডারে পড়াইয়েন। রমেশদা বলে, পড়ামু। রমেশদার চোখে জল আসে। পড়ানোর টাকা কোথায়। সেও গরিব। কিন্তু মেয়েকে পড়াবে। যেভাবেই হোক।
রমেশদা মুসলমান বলে মালেকাকে বুবু বলে। মালেকা হিন্দু বলে রমেশদাকে দাদা বলে না, রমেশদা বলে। গ্রামে এটা স্বাভাবিক। কেউ ভাবে না এতে কী হলো। মালেকা প্রদীপ বানায়, রমেশদা পূজায় জ্বালায়। প্রদীপের কোনো ধর্ম নেই। আগুনের কোনো ধর্ম নেই। আলোর কোনো ধর্ম নেই।
শহরের মানুষ এটা নিয়ে কথা বলত। পত্রিকায় লিখত। টিভিতে দেখাত। সম্প্রীতি। সৌহার্দ্য। বড় বড় শব্দ। গ্রামের মানুষ এসব শব্দ জানে না। জানার দরকার নেই। তারা শুধু পাশাপাশি থাকে। থাকাটাই যথেষ্ট। থাকার জন্য শব্দ লাগে না। থাকার জন্য শুধু থাকা লাগে।
একশো প্রদীপ
মালেকা প্রদীপ বানায়। চাকায় না। হাতে। প্রদীপ ছোট, চাকায় বসালে আকার ঠিক আসে না। হাতের তালুতে মাটি নেয়। বুড়ো আঙুলে মাঝখানে গর্ত করে। তর্জনীতে পাশ সমান করে। একটা প্রদীপ বানাতে এক মিনিট। একশোটা বানাতে দেড় ঘণ্টা।
প্রতিটা প্রদীপ একটু আলাদা। হাতের কাজ তো। মেশিনে বানালে সব একরকম হতো। মালেকার প্রদীপে একটু এদিক-ওদিক আছে। একটু বেশি গভীর, একটু কম গভীর। একটু বেশি মোটা, একটু কম মোটা। এই অসমানতা হাতের কাজের পরিচয়। মেশিন সমান করে। মানুষ অসমান করে। অসমানতাই প্রাণ।
মালেকার পাশে বসে একটা বিড়াল। পাড়ার বিড়াল। কারো না। মালেকা মাটি ছানলে বিড়াল এসে বসে। মাটির গন্ধ পছন্দ হয়তো। অথবা মালেকার কাছে বসতে ভালো লাগে। একা মানুষের কাছে প্রাণী আসে। প্রাণী বোঝে একাকীত্ব। মানুষ বোঝে না।
তারপর শুকোতে দেয়। রোদে। দুই দিন। শুকোলে পোড়াতে হবে। ভাটায়। কাঠের আগুনে। তিন ঘণ্টা পোড়ালে শক্ত হয়। লাল হয়। টোকা দিলে ঠুন ঠুন শব্দ হয়। সেই শব্দ মানে ঠিক হয়েছে। ভোঁতা শব্দ হলে কাঁচা, আরো পোড়াতে হবে।
মালেকার কান জানে কোন শব্দ ঠিক, কোনটা না। তিরিশ বছর ধরে শুনছে। কানে একটা মাপকাঠি আছে, সেটা কেউ শেখাতে পারে না। সেটা শুধু শোনা থেকে আসে। বারবার শোনা থেকে।
হিসাব
একশোটা প্রদীপ। দাম পাঁচ টাকা পিস। পাঁচশো টাকা।
তিন দিনের কাজ। মাটি আনা, ছানা, বানানো, শুকানো, পোড়ানো। তিন দিন।
মাটি আনতে যেতে হয় নদীর ধারে। আধা মাইল হেঁটে। মাটি খুঁড়ে তুলতে হয়। ভালো মাটি গভীরে থাকে। ওপরের মাটি বালিমেশা, কাজের না। গভীরের মাটি এঁটেল, চিকন, হাতে মাখলে আঠালো লাগে। সেই মাটি বস্তায় ভরে মাথায় করে আনতে হয়। কুড়ি কেজি এক বস্তা। দুই বস্তা লাগে একশো প্রদীপে।
ভাটার খরচ তিনশো টাকা। কাঠ কিনতে হয়। আমগাছের কাঠ ভালো, সমান আঁচ দেয়। কিন্তু আমগাছের কাঠ দামি হয়ে গেছে। এখন ইউক্যালিপটাসের কাঠ কেনে। সস্তা, কিন্তু আঁচ অসমান। প্রদীপ মাঝে মাঝে ফেটে যায়। দশটায় দুইটা ফাটে। ফাটা প্রদীপ ফেলে দিতে হয়। শ্রম গেল, মাটি গেল, কাঠ গেল।
পাঁচশো থেকে তিনশো বাদ। বাকি দুইশো। তিন দিনে দুইশো টাকা। দিনে সাতষট্টি টাকা।
সাতষট্টি টাকায় কী হয়। একটু চাল হয়। একটু ডাল হয়। তেল হয় না। মাছ হয় না। মাংস তো প্রশ্নই আসে না।
মালেকার স্বামী মারা গেছে আট বছর আগে। যক্ষ্মায়। চিকিৎসার টাকা ছিল না। সরকারি হাসপাতালে গিয়েছিল, ওষুধ পেয়েছিল, কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। দেরি মানে টাকা না থাকা। টাকা থাকলে আগে যেত। আগে গেলে বাঁচত।
ছেলে এক, ঢাকায় ভ্যান চালায়। মাসে দুই হাজার পাঠায়। সেটা দিয়ে চলে। প্রদীপের টাকা বোনাস।
বোনাস বলে হাসে মালেকা। হাসিটা শুকনো। শুকনো মাটির মতো। জল নেই।
অন্য মৌসুম
দীপাবলি ছাড়া আর কবে কাজ পায় মালেকা। শ্রাবণে। বৃষ্টিতে মাটির হাঁড়ি ভাঙে, কেউ কেউ নতুন কেনে। পৌষে। পিঠাপুলির সময় মাটির তাওয়া লাগে। কিন্তু এসব কমে আসছে। অ্যালুমিনিয়ামের তাওয়া বেশি টেকে। নন-স্টিক তাওয়া এসে গেছে বাজারে। সাতশো টাকা। একবার কিনলে পাঁচ বছর চলে। মাটির তাওয়া তিন মাসে ফাটে।
বছরে মোটে ত্রিশ-চল্লিশ দিন কাজ পায় মালেকা। বাকি তিনশো পঁচিশ দিন খালি। খালি মানে শুধু ঘর আর উঠোন। ঝাড়ু দেওয়া, রান্না করা, কাপড় ধোয়া। এসব কাজেরও কাজ। কিন্তু টাকা আসে না। টাকা আসে শুধু মাটি থেকে।
মালেকা কখনো কখনো বসে থাকে চাকার পাশে। মাটি ছাড়া। চাকা ঘোরায় না। শুধু বসে থাকে। চাকাটা কাঠের, পুরোনো, মালেকার শাশুড়ির আমলের। চাকার গায়ে মাটির দাগ আছে। শুকনো মাটি। কত হাজার হাঁড়ি কলসি এই চাকায় ঘুরে আকার পেয়েছে। এখন চাকা স্থির।
স্থির চাকা দেখলে মালেকার চোখ ভেজে। কিন্তু কাঁদে না। কান্না বিলাসিতা। গরিবের কান্নার সময় নেই। গরিব কাঁদলে কে দেখবে। কে শুনবে।
ছেলে
ছেলের নাম হাবিব। ঢাকায় ভ্যান চালায়। মিরপুরে থাকে। একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে। ঘর বলতে একটা কামরা। রান্নাঘর নেই, বাইরে রান্না করে। বাথরুম শেয়ার, পুরো বাড়ির সবাই।
হাবিব মাসে দুই হাজার পাঠায়। কখনো আড়াই। কখনো দেড়। ভ্যান ভাড়ায় চালায়, নিজের না। দিনে দুইশো আয় করে, একশো ভ্যানের ভাড়া দেয়, একশো থাকে। একশো টাকায় খায়, থাকে, চলে। মাস শেষে যা জমে পাঠায়।
হাবিব বলে, মা, ঢাকায় আইসেন।
মালেকা বলে, ঢাকায় কী করুম।
হাবিব বলে, থাকবেন।
মালেকা বলে, থাকুম কোথায়। তোর ঘরে তো জায়গা নাই।
চুপ। হাবিব জানে জায়গা নেই। জানে মা আসতে পারবে না। জানে মা একা গ্রামে থাকবে। একা মাটি ছানবে। একা প্রদীপ বানাবে। একা ভাটা জ্বালাবে।
মালেকা ফোন রেখে দিয়ে চাকায় বসে। চাকা ঘোরায়। মাটি নেই, তবু ঘোরায়। খালি চাকা ঘোরে। শব্দ হয়। ঘড়ঘড়। শব্দটা সঙ্গী। একা মানুষের সঙ্গী শব্দ।
মাটি
সন্ধ্যায় মালেকা ভাটার সামনে বসে। প্রদীপ পুড়ছে। আগুনের আলো মুখে পড়েছে। মুখটা লাল দেখায়। চোখের কোণে ভাঁজ। হাতের শিরা বেরিয়ে আছে। পঞ্চাশ বছরের হাত। তিরিশ বছর মাটি ছেনেছে এই হাত।
ভাটার তাপ মুখে লাগে। শীতের রাতে এই তাপ ভালো লাগে। গরমের রাতে কষ্ট হয়। কিন্তু কষ্ট হলেও পোড়াতে হয়। প্রদীপ সময়মতো চাই। রমেশদা অপেক্ষা করছে।
মাটি ধর্ম মানে না। মাটি শুধু আকার মানে।
মালেকা মুসলমান। সে হিন্দুদের পূজার প্রদীপ বানায়। কোনো সমস্যা নেই। মাটি তো জানে না কে মুসলমান কে হিন্দু। মাটি জানে হাতের চাপ। যে ভালো চাপ দেয়, তার হাতে ভালো আকার আসে। ব্যস।
রমেশদার ছেলে একবার জিজ্ঞেস করেছিল: বুবু, আপনার অসুবিধা হয় না পূজার জিনিস বানাতে?
মালেকা বলেছিল: মাটি তো মাটি। মাটিরে হাঁড়ি বানাও, প্রদীপ বানাও, মূর্তি বানাও, মাটির কিচ্ছু যায় আসে না। মাটি আকার নেয়। আকারে ধর্ম নাই।
ছেলেটা চুপ হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ ভেবেছিল। তারপর বলেছিল, ঠিক কইছেন বুবু।
ঠিকই বলেছে। মাটি ঠিক বলে। মাটি মিথ্যা বলতে জানে না। মানুষ জানে।
রাত
রাতে ভাটা নেভে। প্রদীপ ঠান্ডা হয়। মালেকা একটা তুলে দেখে। লাল। শক্ত। টোকা দেয়। ঠুন ঠুন। ঠিক আছে।
একশোটা প্রদীপ সারিতে সাজিয়ে রাখে। সারিবদ্ধ। ছোট ছোট মাটির পাত্র। প্রতিটায় আলো জ্বলবে। প্রতিটায় আগুন থাকবে। প্রতিটা কারো ঘরে আলো দেবে। মালেকার হাতে বানানো আলো।
কাল রমেশদা এসে নিয়ে যাবে। পাঁচশো টাকা দেবে। তিনশো কাঠওয়ালাকে দেবে। দুইশো রাখবে। দুইশো টাকা দিয়ে চাল কিনবে পাঁচ কেজি। পাঁচ কেজি চাল চার দিন চলবে। তারপর আবার খালি।
মালেকা প্রদীপটা মাটিতে রাখে। প্রদীপের তলায় মাটি। প্রদীপও মাটি। মাটি মাটিতে ফিরে গেল।
মালেকা ঘরে যায়। ঘরের মেঝেও মাটি। দেয়ালও মাটি। মালেকাও মাটি। একদিন মাটিতে মিশে যাবে। তখন কে প্রদীপ বানাবে।
কেউ না। প্লাস্টিক বানাবে। মোমবাতি বানাবে। এলইডি বানাবে।
কিন্তু মাটির প্রদীপের যে আলো, সেটা অন্য কোনো আলো দিতে পারবে না। সেই আলোতে একটা কাঁপুনি আছে। বাতাসে কাঁপে। সলতে কাঁপে। ছায়া কাঁপে। দেয়ালে ছায়া নাচে। সব কাঁপে।
এলইডি কাঁপে না। এলইডি স্থির। স্থির আলোতে উৎসব হয় না। উৎসবে একটু কাঁপুনি লাগে। একটু অনিশ্চয়তা লাগে। মাটির প্রদীপ সেই অনিশ্চয়তা দেয়। হয়তো জ্বলবে, হয়তো নিভবে। এই হয়তোটাই সুন্দর।
মালেকা জানে এসব কেউ বুঝবে না। বোঝার দরকারও নেই। সে প্রদীপ বানাবে যতদিন হাত চলে। হাত থামলে চাকা থামবে। চাকা থামলে মাটি আকার পাবে না।
মাটি পড়ে থাকবে। নিরাকার।
রাতে মালেকা ঘুমাতে পারে না। উঠোনে বেরোয়। আকাশে তারা। প্রদীপগুলো সারিতে শুয়ে আছে। চাঁদের আলোতে লাল দেখায়। একশোটা প্রদীপ। একশোটা ছোট পাত্র। প্রতিটায় আগামীকাল আলো জ্বলবে। প্রতিটা কারো ঘরে গিয়ে আঁধার ভাঙবে।
মালেকার হাতে বানানো আলো কারো ঘরে জ্বলবে। সেই কেউ জানবে না মালেকার নাম। জানবে না মালেকা মুসলমান। জানবে না মালেকার স্বামী মারা গেছে। জানবে না মালেকা তিন দিন খেটে দুইশো টাকা পায়।
প্রদীপ জ্বলবে। আলো দেবে। সেটাই যথেষ্ট।
মালেকা ঘরে ফেরে। শোয়। চোখ বন্ধ করে।
মাটির গন্ধ নাকে। সারারাত। সারাজীবন।
কাল ভোরে উঠবে। চাকায় বসবে। মাটি ছানবে। হাঁড়ি বানাবে, কলসি বানাবে। কেউ কিনুক আর না কিনুক। মাটি আছে তো হাত চলবে। হাত আছে তো মাটি ঘুরবে।
মালেকা আর মাটি। মাটি আর মালেকা। আলাদা করা যায় না।