ধোপা

আমি তাদের ময়লা ধুতাম। আমার ময়লা কে ধোবে?

পর্ব ১১ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আনোয়ারের হাত দুটো লাল।

শুধু লাল না। ফাটা। চামড়া উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়। আঙুলের গিঁটে সাদা সাদা ছোপ। হাতের তালুতে চিড় ধরেছে, সেই চিড়ে সাবানের ফেনা ঢুকে জ্বালা করে। সারাদিন জ্বালা। রাতে কমে। সকালে আবার শুরু।

বিশ বছর ধরে এই হাত।

হোটেল গোল্ডেন প্যালেস, ফকিরাপুল। তিনতলা হোটেল। একশো বিশটা রুম। প্রতিটা রুমে দুটো বেডশিট, দুটো তোয়ালে, একটা বালিশের কভার। আনোয়ার প্রতিদিন পাঁচশো বেডশিট ধোয়। হাতে। সাবান আর ব্লিচিং পাউডার দিয়ে। গরম পানিতে ডুবিয়ে, কচলে, মুচড়ে, ঝেড়ে, শুকাতে দিয়ে।

পাঁচশো।

সংখ্যাটা মুখে বললে কিছু মনে হয় না। কিন্তু পাঁচশোটা বেডশিট একটার পর একটা সারিতে রাখলে প্রায় এক কিলোমিটার হয়। আনোয়ার প্রতিদিন এক কিলোমিটার কাপড় ধোয়। হাত দিয়ে।

সকাল ছয়টায় শুরু। রাত আটটায় শেষ। মাঝে দুপুরে আধ ঘণ্টা ভাত। বাকি সময় পানি, সাবান, ব্লিচ, কাপড়। পানি, সাবান, ব্লিচ, কাপড়।

আজ সকালে ধোয়ার সময় একটা বেডশিটে রক্তের দাগ পেল। শুকনো রক্ত। বাদামি হয়ে গেছে। আনোয়ার জানে কোন দাগ কতটুকু পরিশ্রম চায়। পানের পিক: সহজ। চায়ের দাগ: মাঝারি। রক্ত: কঠিন। তেলের দাগ: সবচেয়ে কঠিন।

রক্তের দাগটা ঠান্ডা পানিতে ভেজাল আগে। তারপর সাবান। তারপর ব্লিচ। তারপর ঘষা। দশ মিনিট ঘষল। দাগ উঠল। বেডশিটটা আবার সাদা।

কে রক্ত ফেলেছে সে জানে না। জানার দরকার নেই। আনোয়ারের কাজ ধোয়া। দাগের ইতিহাস তার বিষয় না।

ডার্মাটাইটিস। শব্দটা ডাক্তার বলেছিল। দুই বছর আগে। হাতের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল, আঙুল ফুলে গিয়েছিল, পানি বেরোচ্ছিল। আনোয়ারের বউ রোকেয়া জোর করে নিয়ে গিয়েছিল ফার্মেসিতে। ফার্মেসির ছেলে বলল, "এটা ফার্মেসিতে হবে না। ডাক্তার দেখান।"

ডাক্তার। মানে চেম্বার। মানে ফি। পাঁচশো টাকা।

আনোয়ারের দৈনিক মজুরি চারশো টাকা। একদিনের বেশি কাজ করতে হবে একবার ডাক্তার দেখাতে। তারপর ওষুধ আলাদা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা আলাদা।

রোকেয়া বলল, "যাও।"

আনোয়ার বলল, "পরে যাব।"

পরে মানে কখনো না। আনোয়ার জানে, রোকেয়াও জানে। কিন্তু "পরে" বলাটা একটা শান্তি। এখন না হলেও একদিন হবে, এই বিশ্বাসটা দরকার। বিশ্বাস ছাড়া দিন কাটে না।

ব্লিচিং পাউডারে সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট থাকে। আনোয়ার এই নাম জানে না। সে জানে ব্লিচ ঢাললে কাপড় সাদা হয়। আর হাত পোড়ে। দুটো একসাথে। সাদা কাপড়ের দাম আছে। পোড়া হাতের দাম নেই।

ডিটারজেন্টে সোডিয়াম লরিল সালফেট থাকে। এটাও আনোয়ার জানে না। সে জানে ডিটারজেন্ট দিলে ফেনা হয়। ফেনা মানে ময়লা যাচ্ছে। ফেনা মানে কাজ হচ্ছে। ফেনা মানে চামড়ার প্রাকৃতিক তেল চলে যাচ্ছে, স্কিন ব্যারিয়ার ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু এই ভাষায় আনোয়ার ভাবে না। আনোয়ার ভাবে: হাত জ্বলে, কিন্তু কাপড় ধুতে হবে।

রাতে রোকেয়া নারকেল তেল মাখিয়ে দেয় আনোয়ারের হাতে। আনোয়ার চুপ করে বসে থাকে। রোকেয়ার হাত নরম। সে রান্না করে, ঘর মোছে, কিন্তু তার হাত এরকম না। ব্লিচ আর ডিটারজেন্ট ত্রিশ বছরের ঘরের কাজ যা করে না, একদিনে তা করে।

আনোয়ার রোকেয়ার হাতের দিকে তাকায়। তারপর নিজের হাতের দিকে। দুটো হাত পাশাপাশি। একটা মানুষের হাত। আরেকটা... আনোয়ার জানে না ওটাকে কী বলে। চামড়ায় মোড়া হাড়।

হোটেলের মালিক সেলিম ভাই। সেলিম ভাই আনোয়ারকে চেনে বিশ বছর ধরে। আনোয়ার যখন প্রথম এসেছিল, হোটেলে চল্লিশটা রুম ছিল। এখন একশো বিশটা। আনোয়ার সেই শুরু থেকে আছে।

সেলিম ভাই মাসে একবার আসে লন্ড্রি ঘরে। দুই মিনিট থাকে। বলে, "কেমন আছ, আনোয়ার?" আনোয়ার বলে, "ভালো আছি।" সেলিম ভাই বলে, "ভালো।" চলে যায়।

দুই মিনিট। বিশ বছরে মোট চল্লিশ মিনিট। আনোয়ার হিসেব করে দেখেনি, কিন্তু সংখ্যাটা এরকমই।

আজ সেলিম ভাই এলেন। কিন্তু আজ দুটো জিনিস আলাদা। প্রথমত, সাথে একজন চায়নিজ লোক। দ্বিতীয়ত, একটা বড় বাক্স।

বাক্সটা লন্ড্রি ঘরের পাশের খালি জায়গায় রাখা হলো। চায়নিজ লোকটা বাক্স খুলল। ভেতরে একটা মেশিন। সাদা। চকচকে। সামনে একটা গোল কাচের দরজা। ওপরে অনেক বোতাম।

ওয়াশিং মেশিন। ইন্ডাস্ট্রিয়াল। একবারে পঞ্চাশটা বেডশিট ধুতে পারে। গরম পানি, ঠান্ডা পানি, ব্লিচ, ডিটারজেন্ট, সব নিজে দেয়। বোতাম টিপলেই হয়। পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পঞ্চাশটা বেডশিট ঝকঝকে সাদা।

চায়নিজ লোকটা ডেমো দেখাল। পঞ্চাশটা বেডশিট ঢুকালো। বোতাম টিপলো। মেশিন ঘুরতে লাগলো। ভেতরে পানি ঢুকলো। সাবান ঢুকলো। মেশিন নিজেই কচলালো, নিজেই ঘোরালো, নিজেই থামলো।

পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে কাচের দরজা খুললো।

পঞ্চাশটা বেডশিট। সাদা। পরিষ্কার। কোনো দাগ নেই।

সেলিম ভাই হাসলেন। "চমৎকার।"

আনোয়ার দাঁড়িয়ে দেখছিল। মেশিনটার হাত নেই। আঙুল নেই। কিন্তু সে ধোয়। আনোয়ারের মতো। আনোয়ারের চেয়ে ভালো। আনোয়ারের চেয়ে দ্রুত। আনোয়ারের হাত পচে না। মেশিনের কিছু পচে না।

সেলিম ভাই বললেন, "আনোয়ার, তোমাকে আর লাগবে না।"

এভাবেই বললেন। কোনো ভূমিকা নেই। কোনো "দেখো, ব্যাপারটা হলো..." নেই। শুধু: তোমাকে আর লাগবে না।

আনোয়ার কিছু বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। হাত দুটো শরীরের দুপাশে ঝুলছে। লাল হাত। ফাটা হাত। বিশ বছরের হাত।

"এই মাসের বেতন পাবে। পুরোটা।"

আনোয়ার মাথা নাড়ল।

"আর কিছু?"

আনোয়ার বলল, "না।"

সেলিম ভাই চলে গেলেন। পায়ের আওয়াজ সিঁড়িতে মিলিয়ে গেল।

আনোয়ার লন্ড্রি ঘরে দাঁড়িয়ে রইল। এই ঘরটা সে চেনে নিজের ঘরের চেয়ে ভালো। কোন দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে, কোন কলে জোরে পানি আসে, কোন জায়গায় দাঁড়ালে হাওয়া পাওয়া যায়। বিশ বছর। সাত হাজার তিনশো দিন। প্রতিদিন চৌদ্দ ঘণ্টা। একলক্ষ দুই হাজার ঘণ্টা। এই ঘরে। পানি আর সাবানের মধ্যে।

কোনো সেভারেন্স নেই। কোনো ধন্যবাদ নেই। কোনো সার্টিফিকেট নেই। কোনো চিঠি নেই। শুধু: তোমাকে আর লাগবে না।

আনোয়ার তার সাবানের বারটা তুলে নিল। নিজের সাবান। হোটেলের না। নিজের টাকায় কেনা। দশ টাকার লাইফবয়। সাবানটা পকেটে রাখল।

তারপর বেরিয়ে গেল।

সিঁড়ি দিয়ে নামল। হোটেলের লবিতে এসিতে ঠান্ডা হাওয়া। রিসেপশনের মেয়েটা কম্পিউটারে কিছু করছে। সে আনোয়ারের দিকে তাকাল না। কোনোদিন তাকায়নি।

বাইরে রোদ। ফকিরাপুলের রাস্তায় বাস, রিকশা, মানুষ। সব চলছে। আনোয়ার বেরিয়ে এলো বিশ বছরের চাকরি থেকে যেভাবে মানুষ দোকান থেকে বেরোয়।

পকেটে সাবান। হাতে জ্বালা। চোখে কিছু নেই।

বাসায় ফিরল। রোকেয়া অবাক। "এত আগে?"

"চাকরি নেই।"

রোকেয়া চুপ। পাঁচ সেকেন্ড। দশ সেকেন্ড। তারপর বলল, "কেন?"

"মেশিন এসেছে।"

রোকেয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে আনোয়ারকে চেনে। বেশি প্রশ্ন করলে আনোয়ার চুপ হয়ে যায়। যা বলার বলে দিয়েছে। মেশিন এসেছে। এটুকুই।

রোকেয়া চা বানাতে গেল। আনোয়ার উঠোনে বসল। উঠোনে একটা কাঁথা শুকাচ্ছে। নিজের হাতে ধোয়া। এটাও সে ধোয়। ঘরের কাপড়ও সে ধোয়। বাইরের কাপড়ও সে ধোয়। ধোয়াই তার পরিচয়। ধোপা। ধোপার ছেলে ধোপা। ধোপার নাতি ধোপা। তিন প্রজন্ম ধরে তারা অন্যের ময়লা পরিষ্কার করে। কেউ কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি তাদের নিজেদের ময়লা কে পরিষ্কার করে।

ছেলে সোহেল স্কুলে। ক্লাস সেভেন। সোহেলকে আনোয়ার ধোপা বানাবে না। কিন্তু সোহেলকে আর কী বানাবে? চারশো টাকা দিনে কতদূর পড়ানো যায়? এখন চারশোও নেই।

রোকেয়া চা নিয়ে এলো। আনোয়ার এক চুমুক খেল। চা গরম। জিভ পুড়ল। কিন্তু হাতের জ্বালার কাছে জিভের জ্বালা কিছু না।

"আনোয়ার।"

"হুম।"

"কাল কী করবে?"

আনোয়ার চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। কী করবে? ধোপা আর কী করে? অন্য হোটেল খুঁজবে। কিন্তু সব হোটেলেই মেশিন আসছে। যেটায় এখনো আসেনি, সেটায় আসবে। ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর। মেশিন আসবেই। মেশিন সবখানে আসে। মানুষ সবখান থেকে যায়।

"ধোপাদের আর দরকার নেই।" আনোয়ার বলল। গলার স্বর সমান। যেন অন্য কারো কথা বলছে।

রোকেয়া কিছু বলল না। উঠোনের কাঁথাটার দিকে তাকাল। কাঁথাটা বাতাসে দুলছে। সাদা। পরিষ্কার। আনোয়ারের হাতে ধোয়া।

আনোয়ার পকেট থেকে সাবানটা বের করল। লাইফবয়। লাল রঙের মোড়ক। সাবানটা হাতের তালুতে রাখল। ছোট। হালকা। দশ টাকা দাম।

বিশ বছর সে এই দিয়ে পাঁচশো বেডশিট ধুয়েছে প্রতিদিন। এই সাবান তার যন্ত্র। তার পুঁজি। তার সবকিছু। এখন এটা শুধু সাবান। ঘরের কাজে লাগবে।

আনোয়ার সাবানটা রোকেয়ার দিকে এগিয়ে দিল। "রেখে দে।"

রোকেয়া সাবানটা নিল। কিছু বলল না।

আনোয়ার আকাশের দিকে তাকাল। বিকেলের রোদ। ফ্যাকাশে। হাত দুটো হাঁটুর ওপর। লাল। ফাটা। ফেলে দেওয়া।

আমি তাদের ময়লা ধুতাম। আমার ময়লা কে ধোবে?

কেউ না। ময়লা থাকবে। শুধু ধোপা থাকবে না।

সোহেল স্কুল থেকে ফিরবে বিকেলে। রোকেয়া বলবে, "বাবার চাকরি নেই।" সোহেল কী বলবে? হয়তো কিছু বলবে না। হয়তো বলবে, "তাহলে আমি কাজ করি।" আনোয়ার সেটা হতে দেবে না। সোহেল পড়বে। সোহেল ধোপা হবে না।

কিন্তু ধোপা না হলে কী হবে?

আনোয়ার জানে না। জানার দরকার নেই। শুধু ধোপা হবে না। এটুকুই।

রোদ সরে গেল। ছায়া এলো। আনোয়ারের হাত দুটো হাঁটুর ওপরেই আছে। লাল। ফাটা। রাসায়নিকে খাওয়া। বিশ বছরের স্মৃতি প্রতিটা ফাটলে জমে আছে। মেশিন এলে ফাটল থাকে। দাগ থাকে। কাজ থাকে না। শুধু প্রমাণ থাকে যে একজন মানুষ ছিল, সে হাত দিয়ে ধুত।