মুচি

একই কাজ। দুই দাম। পার্থক্য শুধু জন্মস্থান

পর্ব ১২ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রফিকের হাতে গন্ধ আছে।

চামড়ার গন্ধ। আঠার গন্ধ। পলিশের গন্ধ। পুরনো ঘামের গন্ধ। অন্যের পায়ের গন্ধ। এই গন্ধ সাবানে যায় না। তেলে যায় না। এটা চামড়ার নিচে ঢুকে গেছে। হাড়ের সাথে মিশে গেছে। রফিক নিজে আর টের পায় না। কিন্তু বাসে পাশে যে বসে সে পায়। মুখ ঘোরায়। জানালার দিকে তাকায়। রফিক বোঝে। চুপ করে বসে থাকে।

মতিঝিল ওভারব্রিজের নিচে। ফুটপাত। একটা ছাতার নিচে। সামনে একটা কাঠের বাক্স। বাক্সের ওপর সুই, সুতো, আঠা, পলিশ, কাঁচি, ছুরি, হাতুড়ি, তালি। পাশে জুতোর সোল, রাবারের, চামড়ার, বিভিন্ন সাইজের। এটা রফিকের দোকান। দেয়াল নেই, ছাদ নেই, দরজা নেই। একটা ছাতা। রোদে ভাঁজ করে, বৃষ্টিতে খোলে। এই দোকানে রফিক ১৯৯০ সাল থেকে বসে।

ছত্রিশ বছর।

তখন মতিঝিলে এত অফিস ছিল না। রাস্তা ছোট ছিল। রিকশা বেশি ছিল। মানুষ জুতা সারাত। জুতা ছিঁড়লে ফেলে দিত না। মুচির কাছে নিয়ে আসত। রফিকের বাবাও মুচি ছিল, এই একই জায়গায় বসত। বাবা মারা গেল ১৯৮৯-তে। রফিক বাবার জায়গায় বসল। বাবার বাক্সটা নিল। বাবার হাতুড়িটা নিল। একই বাক্স, একই হাতুড়ি, একই ফুটপাত।

সোল বদলাতে পঞ্চাশ টাকা নেয়। সেলাই করলে ত্রিশ। আঠা লাগালে বিশ। পলিশ করলে পনেরো।

একসময় দিনে তিরিশ-চল্লিশজন আসত। এখন আসে আট-দশজন। কোনো কোনো দিন পাঁচজন। কোনো কোনো দিন তিনজন।

স্নিকার কালচার। রফিক শব্দটা জানে না। কিন্তু ব্যাপারটা বোঝে।

ছেলেমেয়েরা জুতো কেনে। দামি। দুই হাজার, তিন হাজার, পাঁচ হাজার টাকার। রঙিন। ফিতেওয়ালা। সোলটা মোটা, ফোম দিয়ে বানানো। ছয় মাস পরে সোলটা ক্ষয়ে যায়। তখন ফেলে দেয়। নতুন কেনে। মুচির কাছে আসে না।

কেন আসবে? নতুন জুতার দাম তিন হাজার। মেরামতে লাগে একশো। কিন্তু মেরামত করা জুতো পুরনো দেখায়। পুরনো জুতো পরলে বন্ধুরা হাসে। "ওটা এখনো পরো?" হাসিটা আসল অস্ত্র। একশো টাকা বাঁচানোর চেয়ে হাসি এড়ানো বেশি জরুরি।

রফিক এটা বোঝে। রাগ করে না। রাগ করে লাভ কী? দুনিয়া বদলায়। মুচি বদলায় না। দুনিয়া এগিয়ে যায়। মুচি বসে থাকে।

মাসিক আয় আট হাজার থেকে নেমে এসেছে তিন হাজারে। তিন হাজার। ভাড়া দিলে কিছু থাকে না। বউ সাকেরা অন্যের বাসায় কাজ করে। দুই বাসায়। সকালে একটায়, বিকেলে আরেকটায়। সাকেরা আয় করে পাঁচ হাজার। রফিকের চেয়ে বেশি। রফিক জানে। সাকেরাও জানে। কেউ বলে না।

ছেলে ফারুক অটো চালায়। মেয়ে লিপি গার্মেন্টসে। দুজনেই বলে, "বাবা, ওই ফুটপাতে বসে কী হবে? কিছু আয় হয় না। চলো, অন্য কিছু করো।"

অন্য কিছু। রফিক পঞ্চান্ন বছর বয়সে অন্য কী করবে? জুতো সারানো ছাড়া সে কিছু জানে না। জুতোর ভেতরের কাঠামো দেখে বলতে পারে কোন কোম্পানির। সোলের ক্ষয় দেখে বলতে পারে মানুষটা হাঁটে কেমন করে, বাঁ পায়ে বেশি ভর দেয় না ডান পায়ে। গোড়ালির ভেতরটা ক্ষয়ে গেলে বোঝা যায় হাঁটু সমস্যা আছে। রফিক ডাক্তার না, কিন্তু জুতো দেখে মানুষ পড়ে।

এই বিদ্যার কোনো সার্টিফিকেট নেই। কোনো ডিগ্রি নেই। কোনো দাম নেই।

বিকেল চারটা। রফিক ছাতার নিচে বসে আছে। আজ সাতজন এসেছে। মোট আয় দুইশো ত্রিশ টাকা। আর কেউ আসবে না। বাক্স গোছাতে শুরু করল।

তখন একটা গাড়ি দাঁড়াল। সিলভার রঙ। ভেতর থেকে একজন লোক নামল। পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি। শার্ট ইন করা। কালো প্যান্ট। হাতে একটা জুতো।

"জুতা ঠিক করতে পারবে?"

রফিক জুতোটার দিকে তাকাল। বাদামি। চামড়া। নরম। সোলটা পাতলা। সেলাই সূক্ষ্ম। হাতে তুলে নিল। ওজন কম। চামড়াটা ভেড়ার, গরুর না। আস্তারে লেখা আছে: Gucci। Made in Italy।

রফিক ইতালির জুতো আগে ধরেনি। কিন্তু চামড়া চামড়াই। বাংলাদেশের গরুর চামড়া আর ইতালির ভেড়ার চামড়া, দুটোই পশুর চামড়া। দুটোরই তন্তু আছে, ছিদ্র আছে, শস্য আছে। পার্থক্য হলো প্রক্রিয়ায়। ইতালিতে ভেজিটেবল ট্যানিং করে, ছয় মাস সময় নেয়। এখানে ক্রোম ট্যানিং, দুদিনে হয়ে যায়। রফিক ট্যানিংয়ের নাম জানে না। কিন্তু চামড়া ছুঁলে বোঝে কোনটা ভালো।

সমস্যাটা সোলের কাছে। চামড়া ছিঁড়ে গেছে। দুই ইঞ্চি। ভেতরের সেলাই খুলে গেছে।

"কী হয়েছে?" লোকটা জিজ্ঞেস করল।

"সেলাই উঠে গেছে। সোল আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক হবে।"

"কতক্ষণ?"

"বিশ মিনিট।"

লোকটা ফোনে কথা বলতে বলতে পাশে দাঁড়াল।

রফিক কাজ শুরু করল। প্রথমে পুরনো সুতো খুলল। তারপর চামড়া পরিষ্কার করল। আঠা লাগাল। শুকাতে দিল দুই মিনিট। তারপর সুই বের করল। বাঁকা সুই। চামড়ার জুতোয় বাঁকা সুই লাগে। সোজা সুই ঢোকে না।

হাতের আঙুল চলল। বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝে সুই। প্রতিটা ফোঁড় সমান। প্রতিটা টান সমান। এটা পঁয়ত্রিশ বছরের অভ্যাস। মাথায় চিন্তা করতে হয় না। আঙুল নিজে জানে কোথায় ঢোকাতে হবে, কতটা টানতে হবে।

বিশ মিনিট। জুতো ঠিক। সেলাই দেখা যায় না। চামড়ায় কোনো দাগ নেই।

"হয়ে গেছে।"

লোকটা ফোন রাখল। জুতো হাতে নিয়ে দেখল। একবার ওলটাল। পালটাল। তারপর পকেট থেকে দুইশো টাকা বের করে রফিকের হাতে দিল। তাকাল না। ধন্যবাদ বলল না। গাড়িতে উঠল। গাড়ি চলে গেল।

দুইশো টাকা। রফিক টাকাটা হাতে ধরে বসে রইল। আজকের মোট আয় চারশো ত্রিশ টাকা। এর মধ্যে দুইশো একটা জুতো থেকে।

একটা ইতালিয়ান জুতো।

রফিক জানে না গুচ্চি জুতোর দাম কত। জানলে অবাক হতো না। সে অবাক হওয়ার বয়স পেরিয়ে গেছে।

জুতোটার দাম এক লাখ বিশ হাজার টাকা। সেটা ইতালিতে বানানো। একজন কারিগর বানিয়েছে। সেই কারিগরের ঘণ্টা প্রতি আয় দুইশো ডলার। ষোলো হাজার টাকা। রফিক একই কাজ করে। একই দক্ষতায়। তার ঘণ্টা প্রতি আয় পঁচিশ টাকা।

একই হাত। একই সুই। একই চামড়া। একই ফোঁড়।

পার্থক্য কোথায়?

পার্থক্য হলো ইতালির কারিগর একটা কারখানায় বসে। কারখানার নাম আছে। ব্র্যান্ড আছে। ইতিহাস আছে। সেই কারিগরের কাজ একটা বাক্সে ভরে, টিস্যু পেপারে মুড়ে, লোগো লাগিয়ে বিক্রি করা হয়। লোকে কেনে। লোকে গর্ব করে। "গুচ্চি পরি।"

রফিক ফুটপাতে বসে। তার কোনো নাম নেই। কোনো বাক্স নেই। কোনো লোগো নেই। তার কাজকে কেউ বাক্সে ভরে না। তার কাজ শুধু কাজ। এর বেশি কিছু না।

ইতালিতে চামড়ার কাজকে বলে "আর্টিজান ক্র্যাফট"। যাদুঘরে রাখা হয়। সরকার ভর্তুকি দেয়। পর্যটকরা দেখতে আসে।

বাংলাদেশে চামড়ার কাজকে বলে "মুচির কাজ"। ছোটলোকের কাজ। নীচু জাতের কাজ। কেউ দেখতে আসে না। কেউ ভর্তুকি দেয় না। কেউ যাদুঘরে রাখে না।

একই কাজ। দুই দাম। পার্থক্য শুধু জন্মস্থান।

রফিক একবার টিভিতে দেখেছিল, ইতালিতে একজন জুতোর কারিগর। বৃদ্ধ লোক। সাদা চুল। চশমা। সুন্দর দোকান। কাঠের তাক। চামড়ার গন্ধ। লোকটা একটা জুতো বানাচ্ছে। আলতো করে। যত্নে। ক্যামেরা তার হাতের ক্লোজআপ দেখাচ্ছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক।

রফিক নিজের হাতের দিকে তাকিয়েছিল। একই হাত। একই কাজ। কিন্তু রফিকের হাতের কোনো ক্লোজআপ হবে না। কোনো মিউজিক বাজবে না। রফিক ফুটপাতে বসে। ফুটপাতে ক্যামেরা আসে না। ক্যামেরা দোকানে আসে।

সন্ধ্যায় রফিক বাক্স গুছিয়ে বাসায় ফিরল। দুই কিলোমিটার হাঁটা। বাসের টাকা বাঁচায়। হাঁটতে হাঁটতে ভাবে না। ভাবনা বিলাসিতা। রফিকের বিলাসিতার সময় নেই।

বাসায় ঢুকে দেখল সাকেরা ভাত রান্না করছে। ঘরে মাছের গন্ধ। ছোট মাছ। শিং মাছ। সস্তা।

"আজ কত হলো?"

"চারশো ত্রিশ।"

সাকেরা কিছু বলল না। ভাত নাড়ল।

রফিক হাত-মুখ ধুয়ে বসল। হাত ধুলেও গন্ধ যায় না। চামড়া, আঠা, পলিশ। গন্ধটা রফিকের পরিচয়পত্র। যে কাছে আসে সে বোঝে: এই লোক চামড়া নিয়ে কাজ করে।

খেতে বসল। ভাত, মাছ, ডাল। সাকেরা পাশে বসে আছে।

"একটা জুতো এসেছিল আজ," রফিক বলল। "বিদেশি। ইতালির।"

"ঠিক করতে পারলে?"

"বিশ মিনিটে।"

"কত দিল?"

"দুইশো।"

সাকেরা মাথা নাড়ল। ভালো।

রফিক ভাত খেতে খেতে ভাবল, জুতোটা লাখ টাকার। সেটা বানাতে ইতালিতে কত সময় লেগেছে জানি না। কিন্তু ছিঁড়ে গেলে ঠিক করতে পারল না কেউ। ঢাকায় কোনো শোরুম পারেনি। কোনো দোকান পারেনি। কারণ ওরা মেশিনে কাজ করে। মেশিন জানে কীভাবে বানাতে হয়। মেশিন জানে না কীভাবে সারাতে হয়।

সারানো হাতের কাজ। ভাঙা জিনিস জোড়া দেওয়া হাতের কাজ। মেশিন বানায়। হাত সারায়।

কিন্তু দুনিয়া বানানোর দাম দেয়। সারানোর দাম দেয় না।

রফিক ভাতের থালা সরাল। সাকেরা থালা ধুতে নিয়ে গেল। রফিক উঠোনে গিয়ে বসল। আকাশে তারা। মতিঝিলের আলোতে তারা দেখা যায় না। এখানে, এই গলিতে, কয়েকটা দেখা যায়।

আঙুলগুলো নাড়ল। বুড়ো আঙুল আর তর্জনী। পঁয়ত্রিশ বছরের অভ্যাস। সুই ছাড়াও আঙুল চলে। শরীর ভুলে না। মাথা ভুললেও শরীর ভুলে না।

রফিকের আঙুলে একটা ইতালিয়ান কারিগরের সমান দক্ষতা আছে। দুনিয়া একজনকে শিল্পী বলে, আরেকজনকে মুচি। একজন আর্ট গ্যালারিতে ঢুকতে পারে, আরেকজন গ্যালারির জুতো মোছে।

রফিক তারার দিকে তাকাল। তারা কোনো দেশের না। তারা শুধু জ্বলে। কোথায় জ্বলে তাতে তারার দাম কমে না, বাড়ে না।

মানুষের দাম কমে। মানুষের দাম বাড়ে। জন্মস্থান অনুযায়ী।

ফুটপাতে একটা কুকুর ঘুমাচ্ছে। রফিকের বাক্সের পাশে। কুকুরটা রোজ আসে। রফিক ভাত দেয় কখনো কখনো। কুকুরটা রফিকের পাশে বসে। সরে যায় না। নাক ঘোরায় না। কুকুরের কোনো সমস্যা নেই রফিকের গন্ধে।

রফিক কুকুরটার মাথায় হাত বুলাল। চামড়ার গন্ধমাখা হাত। কুকুর লেজ নাড়ল।

এই পৃথিবীতে একটা কুকুর রফিককে যতটা সম্মান দেয়, মানুষ ততটা দেয় না।

রফিক উঠল। বাক্স কাঁধে তুলল। হাঁটতে লাগল। পেছনে ফুটপাত। সামনে রাস্তা। পায়ে পুরনো জুতো। নিজে সারানো। সোল নতুন। সেলাই মজবুত। পৃথিবীর সেরা জুতো।