রাজমিস্ত্রি
আমি যে বিল্ডিং বানাই, সেটার লিফটে উঠতে গেলে গার্ড আটকায়
১
চোদ্দ তলায় বাতাস জোরে।
সেলিম দাঁড়িয়ে আছে বাঁশের মাচানের ওপর। পায়ের নিচে দুটো বাঁশ। দুটো বাঁশের মাঝে ফাঁক। ফাঁক দিয়ে নিচে দেখা যায়। চোদ্দ তলা নিচে। রাস্তা। রিকশা। মানুষ। পিঁপড়ের মতো।
সেলিম নিচে তাকায় না। অভ্যাস। নিচে তাকালে পা কাঁপে। পা কাঁপলে ভারসাম্য যায়। ভারসাম্য গেলে পড়ে যায়। পড়লে মরে যায়। তাই নিচে তাকায় না।
গুলশান। বিশতলা টাওয়ার উঠছে। "গুলশান হাইটস রেসিডেন্স"। বিলবোর্ডে লেখা: "Live Above the World." সেলিম ইংরেজি পড়তে পারে না। কিন্তু ছবিটা দেখেছে। একটা ড্রয়িংরুম। বিশাল জানালা। জানালা দিয়ে ঢাকা শহর দেখা যাচ্ছে। একজন মহিলা কফি খাচ্ছে। তার পায়ে জুতো নেই, কার্পেটে পা রাখা।
সেলিম সেই জানালাটা বানাচ্ছে। ইটের গাঁথুনি করছে। সিমেন্টের প্লাস্টার করছে। তার পায়ে জুতো আছে, কিন্তু জুতোর সোল ক্ষয়ে গেছে। কার্পেট নেই। বাঁশ আছে।
সকাল সাতটায় কাজ শুরু। বিকেল পাঁচটায় শেষ। মাঝে দুপুরে আধ ঘণ্টা। খাবার নিচে বসে খায়, মাচানে খাওয়া নিষেধ। নিষেধ মানে কোম্পানির নিয়ম। কিন্তু কোম্পানির আরো নিয়ম আছে: হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক, হার্নেস পরা বাধ্যতামূলক, সেফটি নেট থাকা বাধ্যতামূলক।
সেলিম হেলমেট পরে না। গরম লাগে। মাথায় ঘাম হয়। ঘাম চোখে পড়ে। চোখে ঘাম পড়লে সিমেন্টের লাইন বাঁকা হয়। বাঁকা লাইন মানে ঠিকাদারের বকা। হেলমেট খুললে মাথায় হাওয়া লাগে। কাজ ভালো হয়। ঠিকাদার খুশি।
হার্নেস? আছে। দুটো। পঁয়ত্রিশজন মিস্ত্রির জন্য দুটো হার্নেস। সেলিম কোনোদিন পরেনি। পরার জন্য দশ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। দশ মিনিটে দশটা ইট বসানো যায়।
সেফটি নেট? নেই। বিলবোর্ডে আছে: "International Safety Standards." সাইটে নেই।
২
গত মাসে জব্বার পড়ে গেছে। আট তলা থেকে।
জব্বার সেলিমের পরিচিত। একই গ্রাম। মানিকগঞ্জ। একসাথে ঢাকায় এসেছিল, বারো বছর আগে। জব্বারের বউয়ের নাম রেহানা। দুই ছেলে। বড়টা ক্লাস ফাইভে, ছোটটা ক্লাস টুতে।
সকাল এগারোটায় পড়েছে। সেলিম তখন বারো তলায় ছিল। নিচ থেকে চিৎকারের আওয়াজ শুনল। তারপর সাইরেনের আওয়াজ। তারপর নীরবতা। সবচেয়ে ভয়ংকর আওয়াজ হলো নীরবতা।
জব্বার মারা গেছে। ঘটনাস্থলেই। মাথা ফেটে গেছে। হেলমেট পরলে বাঁচত কিনা কেউ জানে না। আট তলা থেকে পড়লে হেলমেট কতটুকু করে?
কোম্পানি পরিবারকে দুই লাখ টাকা দিয়েছে। ক্ষতিপূরণ। দুই লাখ। জব্বারের বয়স ছিল বত্রিশ বছর। বত্রিশ বছরের একজন মানুষের দাম দুই লাখ টাকা। প্রতিটা বছরের দাম ছয় হাজার দুইশো পঞ্চাশ টাকা।
যে ফ্ল্যাটটা জব্বার বানাচ্ছিল, সেটার দাম দুই কোটি টাকা। একটা ফ্ল্যাট। একশোটা জব্বার।
রেহানা দুই লাখ টাকা নিয়ে মানিকগঞ্জে ফিরে গেছে। দুই ছেলে নিয়ে। বড়টা ক্লাস ফাইভে, ছোটটা ক্লাস টুতে। কিন্তু এখন পড়া বন্ধ হবে। দুই লাখ টাকা কতদিন চলে? ছয় মাস? আট মাস? তারপর বড় ছেলেটাকে কোথাও কাজে ঢুকতে হবে।
হয়তো নির্মাণ সাইটে।
সেলিম জব্বারের কথা ভাবে না। ভাবলে কাজ হয় না। চোদ্দ তলায় দাঁড়িয়ে মৃত মানুষের কথা ভাবা বিপজ্জনক। মাথা ঘোরে। পা কাঁপে।
সেলিম ইট তোলে। সিমেন্ট লাগায়। ইট বসায়। চাপ দেয়। লেভেল দেখে। পরের ইট।
এটাই করে। সকাল থেকে বিকেল।
জব্বারের মৃত্যুর পরদিন সাইট বন্ধ ছিল দুই ঘণ্টা। পুলিশ এসেছিল। ফটো তুলেছিল। একটা ডায়েরিতে কিছু লিখেছিল। তারপর চলে গিয়েছিল। দুই ঘণ্টা পর কাজ শুরু হয়েছিল। যেখানে জব্বার পড়েছিল সেই জায়গাটায় সিমেন্টের দাগ ছিল। কেউ ধুয়ে দিয়েছে। এখন বোঝার উপায় নেই।
বিল্ডিংয়ের বডি মানুষের বডির মতো। ফাউন্ডেশন হলো পা। কলাম হলো হাড়। দেয়াল হলো মাংসপেশি। প্লাস্টার হলো চামড়া। রং হলো কাপড়। সেলিম বিল্ডিংয়ের শরীর বানায়। নিজের শরীর ভেঙে।
৩
সেলিম দিনে ছয়শো টাকা পায়। মাসে ছুটি বাদে আঠারো হাজার। এর মধ্যে দশ হাজার মানিকগঞ্জে পাঠায়। বউ আমেনা আর তিন মেয়ে সেখানে থাকে। বড় মেয়ে সুমি ক্লাস নাইনে। মেজো লিমা ক্লাস সিক্সে। ছোটটা নুসরাত, চার বছর।
ঢাকায় সেলিম থাকে মিরপুরে। একটা ঘরে আটজন। চারটা বাংকার বেড। একটা বাথরুম। রান্না করে পালা করে। ভাড়া মাথাপিছু দেড় হাজার।
আট হাজার টাকায় সেলিম ঢাকায় বাঁচে। খাওয়া, ভাড়া, যাতায়াত, ফোন। মাসের শেষে কিছু থাকে না।
আজ বিকেলে কাজ শেষ করে নামল। চোদ্দ তলা থেকে নিচে। লিফট নেই শ্রমিকদের জন্য। সিঁড়ি। অস্থায়ী সিঁড়ি। কোনো কোনো জায়গায় সিঁড়ি নেই, মই আছে। মই দিয়ে তিন তলা নামতে হয়।
নিচে এসে জুতো পরল। সাইটে খালি পায়ে থাকে। জুতো পরলে বাঁশে গ্রিপ কম পায়। খালি পায়ে গ্রিপ ভালো। আঙুল দিয়ে বাঁশ ধরা যায়।
গেট দিয়ে বেরোতে গেল। গার্ড বলল, "ভাই, আইডি দেখান।"
সেলিম আইডি কার্ড দেখাল। কার্ডে লেখা: সেলিম হোসেন, রাজমিস্ত্রি, প্রকল্প: গুলশান হাইটস।
গার্ড দেখল। যেতে দিল।
সেলিম রাস্তায় বেরিয়ে বিল্ডিংটার দিকে তাকাল। চোদ্দ তলা পর্যন্ত উঠেছে। আরো ছয় তলা বাকি। ছয় মাসের কাজ। তারপর এই বিল্ডিং শেষ। অন্য বিল্ডিং শুরু।
সেলিম জানে, এই বিল্ডিং যখন শেষ হবে, ভেতরে ঢুকতে পারবে না। সামনের গেটে গার্ড থাকবে। রেসিডেন্টদের জন্য লিফট থাকবে। লবিতে মার্বেল থাকবে। আর সেলিম গেটের সামনে দাঁড়ালে গার্ড বলবে, "কী চাই?"
কী চাই। আমি এটা বানিয়েছি। প্রতিটা ইট আমার হাত দিয়ে গেছে। প্রতিটা দেয়াল আমার ঘাম শুষে নিয়েছে। কিন্তু এই উত্তর গার্ড বুঝবে না। গার্ড বুঝবে: তুমি রেসিডেন্ট না। বেরিয়ে যাও।
৪
সন্ধ্যায় মিরপুরে ফিরল। ঘরে ঢুকে জামা খুলল। গায়ে সিমেন্টের গন্ধ। চুলে ধুলো। নখের ভেতরে সিমেন্ট জমে আছে, বেরোয় না। হাতের চামড়া খসখসে। সিমেন্ট ক্ষারীয়। চামড়ার আর্দ্রতা শুষে নেয়। সেলিমের হাতে কোনোদিন ময়েশ্চারাইজার লাগেনি। ময়েশ্চারাইজার শব্দটাই সে জানে না।
পাশের বাংকারে সুমন। সুমনও রাজমিস্ত্রি। অন্য সাইটে। উত্তরায়। সুমন বলল, "শুনলি? নতুন সাইটে একজন পড়েছে।"
"কোথায়?"
"বসুন্ধরায়। দশ তলা থেকে।"
"বাঁচছে?"
"বাঁচছে। পা ভেঙেছে। দুইটাই।"
সেলিম চুপ। পা দুটো ভাঙা মানে আর কোনোদিন মাচানে উঠতে পারবে না। মানে রাজমিস্ত্রির কাজ শেষ। মানে সে এখন পঙ্গু। মানে পরিবার খাবে কী করে।
"কোম্পানি কিছু দিছে?"
"দেড় লাখ।"
দেড় লাখ। দুটো পায়ের দাম দেড় লাখ। একটা পা পঁচাত্তর হাজার।
সেলিম খেতে বসল। ভাত, ডাল, আলুভর্তা। রোজ একই খাবার। সেলিম রোজ একই খায়, রোজ একই বানায়, রোজ একই ঘুমায়। জীবনের কোনো বৈচিত্র্য নেই। বৈচিত্র্য ধনীদের বিষয়।
খেতে খেতে আমেনাকে ফোন করল।
"কেমন আছ?"
"ভালো। তুমি?"
"ভালো।"
এই কথোপকথন প্রতিদিন একই। কেমন আছ, ভালো, তুমি, ভালো। কেউ ভালো নেই। কিন্তু ভালো বলে। অন্য কিছু বলার উপায় নেই।
"সুমির পরীক্ষা কবে?"
"আগামী মাসে।"
"টাকা পাঠাব।"
"ঠিক আছে।"
ফোন রাখল। তিন মিনিটের কল। তিন টাকা। তিন টাকায় যতটুকু পরিবার হওয়া যায়, সেটুকুই।
৫
রাতে বিছানায় শুয়ে সেলিম ছাদের দিকে তাকায়। টিনের ছাদ। এটাও কেউ বানিয়েছে। কোনো মিস্ত্রি। হয়তো সেও এখানে থাকত। হয়তো সেও অন্যের ছাদ বানিয়ে নিজে টিনের নিচে ঘুমাত।
রাজমিস্ত্রি। রাজা আর মিস্ত্রি। নামে রাজা আছে। কোথায় রাজা? ইট বহন করে, সিমেন্ট মেশায়, দেয়াল তোলে, প্লাস্টার করে। রাজার কাজ না। কুলির কাজ। কিন্তু নাম রাজমিস্ত্রি। নামের মধ্যে একটু সম্মান রাখা হয়েছে। যেন নামটুকু দিলে বাকিটা না দিলেও চলে।
সেলিম গত বারো বছরে ঢাকায় কতগুলো বিল্ডিং বানিয়েছে গুনতে পারে না। দশটা? পনেরোটা? বিশটা? প্রতিটা বিল্ডিংয়ে সে ইট বসিয়েছে। প্রতিটা দেয়ালে তার আঙুলের ছাপ সিমেন্টের নিচে চাপা পড়ে আছে।
কেউ জানে না। কেউ জানবে না। বিল্ডিংয়ের গায়ে নাম লেখা থাকে আর্কিটেক্টের। ডেভেলপারের। মালিকের। যে বানিয়েছে তার নাম কোথাও নেই।
সেলিম চোখ বন্ধ করল। কাল সকাল সাতটায় আবার চোদ্দ তলায় উঠতে হবে। বাঁশের মাচানে দাঁড়াতে হবে। নিচে তাকানো যাবে না। ইট তুলতে হবে। সিমেন্ট লাগাতে হবে। লেভেল দেখতে হবে।
সুমি ফোনে বলেছিল, "বাবা, তুমি কোথায় থাকো?"
"ঢাকায়।"
"ঢাকায় কোন জায়গায়?"
"মিরপুরে।"
"মিরপুর কেমন?"
সেলিম কী বলবে? মিরপুর কেমন? আটজনের একটা ঘর। একটা বাথরুম। সিমেন্টের মেঝে। টিনের ছাদ। এটা বলা যায় না। সুমি ভাববে বাবা কষ্টে আছে। সুমি কাঁদবে।
"ভালো জায়গা। অনেক বিল্ডিং।"
সত্যি। অনেক বিল্ডিং। সেলিম যেগুলো বানিয়েছে। সেলিম যেগুলোর ভেতরে ঢুকতে পারে না।
আমি যে বিল্ডিং বানাই, সেটার লিফটে উঠতে গেলে গার্ড আটকায়।
সেলিম ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্ন দেখল না। যারা সারাদিন শরীর দিয়ে কাজ করে তারা স্বপ্ন দেখার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্ন তাদের ধরতে পারে না।
বাতাস টিনের ছাদে লাগছে। খড়খড়। খড়খড়। চোদ্দ তলায় বাতাস জোরে। এখানেও জোরে। পার্থক্য হলো চোদ্দ তলায় কাচের জানালা বন্ধ করলে বাতাস ঢোকে না। টিনের ঘরে বাতাস সবসময় ঢোকে। বাতাস সবার জন্য। ছাদ সবার জন্য না।