ইলেকট্রিশিয়ান
আমার মেয়ে ডাক্তার হবে। চুরির বিদ্যুতে পড়ে
১
বাবুলের হাতে বিদ্যুৎ চেনে।
এটা রূপক না। সত্যি। বাবুলের বাঁ হাতের তর্জনী দিয়ে তার ছুঁলে বোঝে লাইভ কিনা। শরীরে একটা ঝিনঝিন করে। অন্যরা টেস্টার ব্যবহার করে। বাবুল আঙুল ব্যবহার করে। এটা বোকামি। বাবুল জানে। কিন্তু টেস্টার কেনার টাকা বাঁচে। তাছাড়া আঙুল দ্রুত।
বাবুল ইলেকট্রিশিয়ান। স্বশিক্ষিত। কোনো কোর্স করেনি। কোনো সার্টিফিকেট নেই। কোনো লাইসেন্স নেই। সে শিখেছে দেখে দেখে। চোদ্দ বছর বয়সে চাচার সাথে ওয়্যারিংয়ের কাজে গেছে। চাচা তার ঘাড়ে ধরে দেখিয়েছে: এটা ফেজ, এটা নিউট্রাল, এটা আর্থ। ফেজে হাত দিলে শক লাগে। নিউট্রালে লাগে না। আর্থ মাটিতে যায়।
এটুকু। এই তিনটা তার। এই তিনটা শব্দ। এই দিয়ে বাবুল আঠারো বছর ধরে কাজ করছে।
বাসাবাড়ি ওয়্যারিং করে। সুইচ-সকেট লাগায়। ফ্যান ঠিক করে। ট্রান্সফরমার মেরামত করে। জেনারেটরের কানেকশন দেয়। বড় বড় বিল্ডিংয়ের কাজ পায় না, কারণ সেখানে সার্টিফিকেট লাগে। বাবুলের সার্টিফিকেট নেই। বাবুলের আছে আঠারো বছরের অভিজ্ঞতা। কিন্তু অভিজ্ঞতার কোনো কাগজ হয় না।
বাবুলের আরেকটা কাজ আছে। এটা সে বলে না। জিজ্ঞেস করলেও বলে না।
২
বস্তিতে বিদ্যুৎ নেই। মানে, সরকারি বিদ্যুৎ নেই। মিটার নেই। সংযোগ নেই। বস্তি মানে অবৈধ। অবৈধ জায়গায় বৈধ সংযোগ দেওয়া যায় না। তাহলে বস্তির মানুষ কী করবে? অন্ধকারে থাকবে?
বাবুল হুকআপ দেয়। রাস্তার খুঁটি থেকে তার টেনে বস্তিতে নিয়ে যায়। অবৈধ সংযোগ। সরকারি ভাষায়: বিদ্যুৎ চুরি।
একটা হুকআপে বাবুল নেয় দুইশো টাকা। বস্তির লোক দেয়। দুইশো টাকায় তারা বিদ্যুৎ পায়। বাতি জ্বলে। ফ্যান ঘোরে। ফোন চার্জ হয়। বাচ্চারা রাতে পড়তে পারে।
কতদিন চলে? তিন মাস, ছয় মাস, কখনো এক বছর। তারপর পিডিবির লোক আসে। ধরে ফেলে। তার কেটে দেয়।
ধরলে কী হয়? বাবুলের জেল। বস্তির লোকদের কিছু হয় না। কারণ তারা বলে: আমরা জানতাম না, একজন লোক এসে তার দিয়ে গেছে। আমরা কী বুঝব বৈধ না অবৈধ?
বাবুলের একবার জেল হয়েছে। তিন মাস। করিমগঞ্জ জেল। জেল থেকে বের হয়ে আবার একই কাজ করেছে। কারণ অন্য কাজে এত পায় না। একটা হুকআপে দুইশো টাকা। মাসে পনেরো-বিশটা হুকআপ। তিন-চার হাজার টাকা। ওয়্যারিংয়ের কাজ থেকে আরো আট-দশ হাজার। মোট বারো-চৌদ্দ হাজার।
বস্তির লোকেরা বাবুলকে চেনে। ডাকে। ভালোবাসে? না। দরকারে ডাকে। বিদ্যুৎ গেলে ডাকে। বিদ্যুৎ থাকলে চেনে না।
বাবুল এটা জানে। পাত্তা দেয় না।
জেলে থাকার সময় বাবুল ভেবেছিল, ছেড়ে দেব। হুকআপ আর না। ঝুঁকি অনেক। কিন্তু জেল থেকে বের হয়ে প্রথম রাতে বস্তিতে গেল। অন্ধকার। বাচ্চারা অন্ধকারে বসে আছে। একটা মেয়ে মোমবাতিতে পড়ছে। মোমবাতির আলোতে অক্ষর ঝাপসা দেখায়। চোখ নষ্ট হয়।
বাবুল খুঁটিতে উঠল। তার টানল। বাতি জ্বলে উঠল।
মেয়েটা বইয়ের দিকে তাকাল। অক্ষর পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বাবুল খুঁটি থেকে নামল। কেউ ধন্যবাদ বলল না। ধন্যবাদ বলার দরকার নেই। আলো জ্বলেছে। এটুকুই।
৩
বাবুলের মেয়ে শিউলি। ক্লাস এইটে পড়ে। ফটিকছড়ি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। বাবুলের বউ ময়না আর শিউলি চট্টগ্রামে থাকে। বাবুল ঢাকায়।
শিউলি ভালো পড়ে। ক্লাসে ফার্স্ট না, কিন্তু ফাইভের মধ্যে থাকে। গণিতে ভালো। বিজ্ঞানে ভালো। বাবুল চায় শিউলি ডাক্তার হোক। এটা বাবুলের একমাত্র ইচ্ছা। বাকি কোনো ইচ্ছা নেই। নিজের জন্য কিছু চায় না। ভালো খাবার চায় না। ভালো কাপড় চায় না। ভালো ঘর চায় না। শুধু শিউলি ডাক্তার হোক।
টিউশন ফি মাসে পনেরোশো টাকা। কোচিং আলাদা। বই আলাদা। খাতা আলাদা। মোট খরচ মাসে তিন হাজার। বাবুলের আয়ের চার ভাগের এক ভাগ।
ময়না বলে, "শিউলিকে এত খরচ করে কী হবে? মেয়ে তো। বিয়ে দিয়ে দাও।"
বাবুল বলে, "বিয়ে দেব। ডাক্তার হওয়ার পরে।"
ময়না চুপ করে যায়। বাবুলের সাথে এই বিষয়ে তর্ক করে লাভ নেই। বাবুল সবকিছুতে নরম মানুষ। শুধু শিউলির পড়ার ব্যাপারে শক্ত।
শিউলি জানে বাবা কী করে। ওয়্যারিংয়ের কথা জানে। হুকআপের কথা জানে না। বাবুল বলেনি। বলবে না।
আমার মেয়ে ডাক্তার হবে। চুরির বিদ্যুতে পড়ে।
বাবুল এই বাক্যটা মনে মনে বলে। কখনো জোরে বলেনি। এটা তার নিজের সাথে নিজের কথা। একটা কালো হাস্যরস। গরিবের হাস্যরস সবসময় কালো।
৪
আজ বিকেলে একটা কাজ পেল। ধানমন্ডির কাছে। একটা পুরনো বাড়ি। ছাদের ওপর পানির পাম্প। পাম্পের মোটর পুড়ে গেছে। ঠিক করতে হবে।
ছাদে উঠল। পাম্পের কাছে গেল। মোটরের কভার খুলল। ভেতরে তামার তার পুড়ে কালো হয়ে গেছে। রিওয়াইন্ড করতে হবে।
বৃষ্টি হচ্ছিল। হালকা। গুঁড়িগুঁড়ি। ছাদ ভেজা। বাবুলের পা ভেজা। হাত ভেজা। পানি সুপরিবাহী। বাবুল জানে। সবাই জানে।
কিন্তু কাজ করতে হবে। মালিক বলেছে, আজকেই করতে হবে। কাল মেহমান আসবে। পানি লাগবে। বাবুল বলেছিল, "বৃষ্টিতে করা ঠিক হবে না।" মালিক বলেছে, "তোমার কাজ করা। আমার কাজ বলা।"
বাবুল কাজ শুরু করল। মোটরের তার খুলল। নতুন তার জড়াল। সোল্ডারিং আয়রন গরম করল। ভেজা হাতে সোল্ডারিং। মনে মনে বলল, সাবধান। ধীরে। আস্তে আস্তে।
তারপর।
কারেন্ট। দুইশো বিশ ভোল্ট। বাঁ হাত দিয়ে ঢুকল, শরীরের মধ্য দিয়ে গেল, ডান পা দিয়ে বেরোল। ভেজা ছাদ আর্থ হিসেবে কাজ করল। বাবুলের শরীর ঝাঁকি খেল। হাত আটকে গেল তারে। মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। পেশি সংকুচিত হয়ে গেল।
কত সময়? দুই সেকেন্ড? তিন সেকেন্ড? সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করল। কারেন্ট বন্ধ হলো। বাবুল ছিটকে পড়ল ছাদে।
জ্ঞান আছে। শরীর কাঁপছে। বাঁ হাত অবশ। নাড়াতে পারছে না। ডান হাত দিয়ে বাঁ হাত ধরল। আঙুলগুলো বাঁকা হয়ে আছে। সোজা হচ্ছে না।
মালিক ছুটে এলো। "কী হয়েছে?"
"শক লেগেছে।"
"ডাক্তার ডাকি?"
"না। একটু বসি।"
বাবুল বসে রইল। বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে। ঠান্ডা। বাঁ হাত অবশ। আঙুল নাড়ানো যাচ্ছে না। বুড়ো আঙুল নড়ে। তর্জনী নড়ে না। মধ্যমা নড়ে না। অনামিকা একটু নড়ে। কনিষ্ঠা নড়ে।
পাঁচটা আঙুলের তিনটা অবশ। পার্শিয়ালি প্যারালাইজড। নার্ভ ড্যামেজ। বাবুল এই শব্দগুলো জানে না। সে শুধু জানে: তিনটা আঙুল কাজ করছে না।
মালিক বলল, "হাসপাতালে যাও। খরচ আমি দেব।"
বাবুল বলল, "দরকার নেই।"
"কেন?"
"হাসপাতালে গেলে রিপোর্ট হবে। রিপোর্ট হলে প্রশ্ন আসবে। লাইসেন্স আছে কিনা। বৈধ কিনা।"
মালিক চুপ। বাবুল চুপ। দুজনেই জানে, বাবুলের কোনো কাগজ নেই। কোনো বীমা নেই। কোনো সুরক্ষা নেই। বাবুল একটা ভূত। সিস্টেমে নেই। সিস্টেমের বাইরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। সিস্টেমের বাইরে আহত হয়। সিস্টেমের বাইরে সুস্থ হয়। বা হয় না।
মালিক পকেট থেকে দুই হাজার টাকা বের করে দিল। "এটা রাখো।"
বাবুল নিল। কাজের পারিশ্রমিক দেড় হাজার। আহত হওয়ার বোনাস পাঁচশো।
৫
পরদিন ফার্মেসিতে গেল। ফার্মেসির ছেলে ভিটামিন বি ইনজেকশন দিল। পাঁচশো টাকা। বলল, "একটু সময় লাগবে। নার্ভ রিকভারি হলে ঠিক হতে পারে। নাও পারে।"
নাও পারে। বাবুল শব্দটা শুনল। কিছু বলল না।
এক সপ্তাহ কাজ করল না। এক সপ্তাহ কাজ না করা মানে শূন্য আয়। শূন্য আয় মানে শিউলির টিউশন ফি পরের মাসে দিতে হবে। দুই মাসের একসাথে। তিন হাজার। মাসের বাকি খরচ ময়নার ওপর। ময়না অন্যের বাসায় রান্না করে। মাসে তিন হাজার পায়।
দুই সপ্তাহ পর বাবুল কাজে ফিরল। বাঁ হাতের তিনটা আঙুল এখনো অবশ। বুড়ো আঙুল আর কনিষ্ঠা কাজ করে। বাকি তিনটা ঝুলে আছে।
কাজ হয়? হয়। বাবুল ডান হাতে কাজ করে। বাঁ হাত ধরে রাখে। দুটো আঙুল দিয়ে চিমটির মতো ধরে। আগে যেটা দুই মিনিটে করত, এখন পাঁচ মিনিট লাগে। কিন্তু হয়।
ময়না ফোনে কাঁদে। "ঢাকা ছাড়ো। চলে আসো।"
বাবুল বলে, "আসব। শিউলি ডাক্তার হলে।"
"হাত তো গেছে।"
"হাত একটা গেছে। আরেকটা আছে।"
ময়না চুপ। বাবুল চুপ।
বাবুল ডান হাতের দিকে তাকায়। এই হাত। এই একটা হাত দিয়ে তার বানাতে হবে। হুকআপ দিতে হবে। সোল্ডারিং করতে হবে। পনেরোশো টাকা টিউশন ফি জোগাতে হবে। প্রতি মাসে। প্রতি বছরে। যতদিন না শিউলি ডাক্তার হয়।
সন্ধ্যায় বস্তিতে গেল। একটা হুকআপ। খুঁটি থেকে তার টানল। ডান হাতে। বাঁ হাত পকেটে। খুঁটিতে উঠল। একহাতে তার জোড়া দিল। একহাতে স্ক্রু টাইট করল।
নিচে নেমে বস্তির লোকটাকে বলল, "হয়ে গেছে।"
লোকটা দুইশো টাকা দিল। বলল, "বাবুল ভাই, হাতের কী হয়েছে?"
"কিছু না।"
বাবুল টাকাটা পকেটে রাখল। ডান পকেটে। বাঁ পকেটে বাঁ হাত। তিনটা অবশ আঙুল। দুটো জ্যান্ত আঙুল।
অন্ধকারে বস্তির ঘরগুলোতে একটা একটা করে বাতি জ্বলে উঠল। হলুদ আলো। কম ওয়াটের বাল্ব। চুরির বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুতে একটা মেয়ে হয়তো পড়ছে কোথাও। অন্য কোনো বস্তিতে। অন্য কোনো বাবুলের মেয়ে।
বাবুল হাঁটতে লাগল। রাস্তায় স্ট্রিটলাইট জ্বলছে। বৈধ বিদ্যুৎ। বস্তিতে বাল্ব জ্বলছে। অবৈধ বিদ্যুৎ। আলো একই। উজ্জ্বলতা একই। পার্থক্য শুধু কাগজে। আলোর কোনো পার্থক্য নেই। মানুষের আছে।
বাবুল বাঁ হাত পকেট থেকে বের করল। তিনটা অবশ আঙুলের দিকে তাকাল। আঙুলগুলো একটু বাঁকা। জীবন্ত কিন্তু নিষ্ক্রিয়। যেমন বাবুল নিজে। জীবন্ত। কিন্তু সিস্টেমে নিষ্ক্রিয়। কোনো কাগজে নেই। কোনো রেকর্ডে নেই। শুধু তারে আছে। তারের মধ্যে বাবুলের হাতের ছোঁয়া আছে। পাড়ার প্রতিটা সুইচের পেছনে বাবুলের আঙুল আছে। কেউ জানে না। জানার দরকার নেই। আলো জ্বলে। এটুকুই মানুষের দরকার। বাবুলের দরকার আরেকটু বেশি। শিউলির পড়া। শিউলির ভবিষ্যৎ। একটা হাতে যতটুকু ভবিষ্যৎ ধরা যায়।
ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করল। শক্ত। এই হাতে তার আছে। এই হাতে বিদ্যুৎ আছে। এই হাতে একটা মেয়ের স্বপ্ন আছে।
বাঁ হাত ঝুলছে। অবশ। কিন্তু ডান হাত জ্যান্ত। এটুকুই যথেষ্ট।