প্লাম্বার
আমি তাদের গু পরিষ্কার করি। তারা আমাকে ময়লা বলে
১
মন্টু গন্ধ পায় না।
নাক আছে। নাক কাজ করে। কিন্তু যে গন্ধে অন্যরা মুখ ঘোরায়, হাত দিয়ে নাক চাপে, চোখ কুঁচকে বলে "উফ", সেই গন্ধ মন্টু পায় না। পেত। প্রথম প্রথম পেত। প্রথম যেদিন সিউয়ার লাইনে নেমেছিল, বমি করেছিল। সেটা পনেরো বছর আগে। তখন সে সতেরো। বাবার সাথে। বাবাও প্লাম্বার। বাবার বাবাও।
বাবা বলেছিল, "গন্ধ পাচ্ছিস? পাবি। একদিন পাবি না। নাক অভ্যস্ত হয়ে যাবে। শরীর সবকিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। গরিবি ছাড়া।"
বাবা ঠিক বলেছিল। দুই মাসের মধ্যে গন্ধ চলে গেল। মানে, গন্ধ আছে। নাক নিচ্ছে। কিন্তু মস্তিষ্ক আর সংকেত পাঠাচ্ছে না। olfactory fatigue। মন্টু এই শব্দ জানে না। সে জানে: আগে গন্ধ পেতাম, এখন পাই না।
মন্টু পাইপের ভেতরে ঢোকে। দুই ফুট চওড়া পাইপ। শরীর গুটিয়ে ঢোকে। হামাগুড়ি দেয়। মাথায় টর্চ বাঁধা। হাতে রেঞ্চ। কখনো কখনো পাইপের ভেতরে এত সরু যে কাঁধ আটকে যায়। তখন একটা কাঁধ নামিয়ে তির্যক হয়ে যেতে হয়।
পাইপের ভেতরে কী আছে? সবকিছু। মানুষ যা ফেলে দেয়, তার সবকিছু। মল। প্রস্রাব। খাবারের উচ্ছিষ্ট। চুল। কাপড়ের টুকরো। স্যানিটারি ন্যাপকিন। কন্ডোম। প্লাস্টিক। একবার একটা মরা ইঁদুর পেয়েছিল। পাইপ ব্লক করে রেখেছিল।
মন্টু এসব সরায়। হাতে। গ্লাভস পরে? কখনো কখনো। বেশিরভাগ সময় পরে না। গ্লাভস পরলে হাতের অনুভূতি কমে যায়। পাইপের ভেতরে অন্ধকার। চোখে দেখা যায় না সব সময়। হাত দিয়ে বুঝতে হয় কোথায় ব্লক, কোথায় জোড়া আলগা, কোথায় ফাটল।
মন্টুর হাত তার চোখ।
২
পাড়ার সবাই মন্টুকে চেনে। মন্টু ভাই। মন্টু প্লাম্বার। পাড়ার প্রতিটা পাইপ মন্টু চেনে। কোন বাড়ির মেইন লাইন কোথায়, কোন জায়গায় পাইপ বাঁক নিয়েছে, কোথায় পুরনো পাইপ আর কোথায় নতুন। মন্টুর মাথায় পাড়ার একটা ম্যাপ আছে। ভূগর্ভস্থ ম্যাপ। যেটা কোনো ইঞ্জিনিয়ারের কাছে নেই।
কিন্তু মন্টুকে কেউ সম্মান করে না।
দিনের বেলায়, যখন সব ঠিক থাকে, পাইপে পানি আসে, টয়লেট ফ্লাশ হয়, সিঙ্কে পানি যায়, তখন মন্টু অদৃশ্য। কেউ ভাবে না পাইপের কথা। কেউ ভাবে না মন্টুর কথা। পানি আসে, পানি যায়। মানুষ ভাবে এটা এমনিতেই হয়। জাদু।
কিন্তু রাত এগারোটায় টয়লেট ব্লক হলে?
তখন মন্টুর ফোন বাজে। "মন্টু ভাই, আসেন প্লিজ! টয়লেট উপচে পড়ছে! বাথরুমে পানি! প্লিজ, মন্টু ভাই, এখনই আসেন!"
প্লিজ। এই শব্দটা মন্টু শুধু রাত এগারোটার পরে শোনে। দিনের বেলায় কেউ বলে না।
মন্টু যায়। রাত বারোটায়। রাত একটায়। রাত দুইটায়। যায়। কারণ এটাই কাজ। কারণ রাতের কাজে বেশি টাকা পাওয়া যায়। দিনে তিনশো-চারশো। রাতে আটশো।
বাড়িতে ঢুকলে মানুষ পেছনে সরে দাঁড়ায়। নাকে রুমাল চাপে। মন্টু বাথরুমে ঢোকে। হাঁটু পানিতে দাঁড়ায়। পানি? পানি না। পানি আর আরো কিছু। সেই কিছু নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না। মন্টু সেই কিছুতে হাঁটু ডুবিয়ে দাঁড়ায়।
রেঞ্চ বের করে। পাইপের মুখ খোলে। ব্লকেজ সরায়। হাতে। কখনো তার দিয়ে। কখনো রডে দিয়ে। ত্রিশ মিনিট। চল্লিশ মিনিট। পানি নামে। পাইপ পরিষ্কার। ফ্লাশ করে দেখে। হয়ে গেছে।
বাইরে আসে। মালিক আটশো টাকা দেয়। বিনা তর্কে। রাত এগারোটায় টয়লেট ব্লক হলে কেউ দরদাম করে না। দুর্গতি মানুষকে উদার বানায়।
মন্টু টাকা নেয়। হাত ধোয়। সাবান দিয়ে। তিনবার। চারবার। তারপর বেরিয়ে যায়।
৩
পরদিন সকাল। মন্টু বাসে উঠল। মিরপুর থেকে গুলিস্তান। বাসে ভিড়। মন্টু একটা সিটে বসল। পাশের সিটে একজন লোক। শার্ট-প্যান্ট। অফিসে যাচ্ছে হয়তো।
লোকটা মন্টুর দিকে তাকাল। তারপর একটু সরে বসল। মুখ ঘোরাল। জানালার দিকে তাকাল।
মন্টু বুঝল। সবসময় বোঝে। গন্ধ। মন্টুর শরীরে একটা গন্ধ আছে। সে পায় না। অন্যরা পায়। সাবান দিয়ে ধুলেও যায় না। পাইপের গন্ধ চামড়ায় ঢুকে গেছে। পনেরো বছরের পাইপের গন্ধ। এটা ধোয়া যায় না। কারণ প্রতিদিন নতুন করে ঢোকে।
লোকটা পরের স্টপেজে নেমে গেল। বাকি দুটো স্টপ যেতে পারত। কিন্তু নামল।
মন্টু জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তা। মানুষ। দোকান। সব চলছে। পাইপের নিচে সব চলছে। মাটির নিচে পাইপ আছে। পাইপের ভেতরে মানুষের ফেলে দেওয়া সবকিছু আছে। সেই সবকিছু নিয়ে মন্টু কাজ করে। সেই সবকিছু পরিষ্কার করে। তারপর মানুষ মন্টুর পাশে বসতে চায় না।
তারা আমাকে ময়লা বলে। আমি তাদের কী বলব?
মন্টু কিছু বলে না। বলার অভ্যাস নেই। বলে লাভও নেই। যে কাজ কেউ করতে চায় না, সেই কাজ যে করে, তাকে কেউ কাছে রাখতে চায় না।
একবার একজন জিজ্ঞেস করেছিল, "এই কাজ করতে খারাপ লাগে না?"
মন্টু বলেছিল, "আপনার টয়লেট ব্লক হলে কী করবেন?"
লোকটা চুপ।
"আমি না করলে কে করবে? আপনি?"
লোকটা আরো চুপ।
মন্টু বলেছিল, "খারাপ তো লাগে। কিন্তু লাগলে কী হবে? লাগা আর না-লাগার মধ্যে পেটের ক্ষুধা কমে না। ক্ষুধা লাগলে সব কাজ ভালো।"
৪
মন্টুর ছেলে রবিন। ক্লাস ফাইভে পড়ে। রবিনকে স্কুলে বাচ্চারা বলে "ময়লা রবিন"।
রবিন একদিন কাঁদতে কাঁদতে বাসায় এসেছিল। "বাবা, তুমি কেন এই কাজ করো?"
মন্টু কী উত্তর দেবে? কেন করে? কারণ বাবা করত। কারণ অন্য কিছু জানে না। কারণ এটা ছাড়া আয় নেই। কারণ কেউ তাকে অন্য কাজ দেবে না। কারণ সার্টিফিকেট নেই। কারণ পড়াশোনা নেই। কারণ গরিবের ছেলে গরিব, এটা প্রাকৃতিক নিয়মের মতো, কেউ ভাঙতে পারে না।
মন্টু বলেছিল, "কাজ ময়লা না। কাজ কাজ।"
রবিন বুঝল না। পাঁচ বছরের বাচ্চা কীভাবে বুঝবে? বাবার কাজ ময়লা না, কিন্তু বাবাকে সবাই ময়লা বলে। এই দুটো জিনিস একসাথে কীভাবে সত্য হয়?
মন্টুর বউ রোজিনা বলল, "রবিনকে বলো তুমি ইঞ্জিনিয়ার। পাইপ ইঞ্জিনিয়ার।"
"মিথ্যা বলব?"
"মিথ্যা না। তুমি তো পাইপের কাজই করো। ইঞ্জিনিয়াররাও করে। তফাৎ কী?"
তফাৎ আছে। ইঞ্জিনিয়ার ড্রয়িংরুমে বসে নকশা আঁকে। মন্টু পাইপের ভেতরে ঢোকে। ইঞ্জিনিয়ারের গায়ে পারফিউমের গন্ধ। মন্টুর গায়ে সিউয়ারের গন্ধ। ইঞ্জিনিয়ারের ছেলেকে কেউ ময়লা বলে না।
মন্টু রবিনকে বলল, "আমি প্লাম্বার। এটাই আমার কাজ। তুই বড় হয়ে যা খুশি হ। কিন্তু বাবার কাজে লজ্জা নেই।"
রবিন চুপ করে গেল। চোখ মুছল। খেলতে গেল।
মন্টু জানে, রবিন বুঝবে না। এখন না। হয়তো কোনোদিন বুঝবে। হয়তো কোনোদিনও বুঝবে না। বোঝাটা জরুরি না। বেঁচে থাকাটা জরুরি।
৫
রাত সাড়ে দশটা। ফোন বাজল।
"মন্টু ভাই? আমি তৃতীয় তলা থেকে বলছি, মিসেস চৌধুরী। টয়লেট ব্লক হয়ে গেছে। উপচে পড়ছে। প্লিজ আসেন।"
মন্টু উঠল। রোজিনা বলল, "এত রাতে?"
"কাজ। আটশো টাকা।"
জামা পরল। ব্যাগ তুলল। ব্যাগে রেঞ্চ, প্লায়ার্স, তার, রড, সাবান। সবসময় সাবান রাখে। কাজের পরে হাত ধোয়ার জন্য।
বাড়িতে গেল। মিসেস চৌধুরী দরজা খুললেন। নাকে রুমাল। ঘরে পারফিউমের গন্ধ। রুম ফ্রেশনার ছিটিয়েছেন।
"তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ। বাচ্চারা ঘুমাতে পারছে না।"
মন্টু বাথরুমে ঢুকল। মেঝেতে পানি। পানি আর বাকিটা। মন্টু জুতো খুলল। খালি পায়ে ঢুকল। হাঁটু পর্যন্ত ভিজল। পাইপের মুখ খুলল। হাত ঢোকাল।
ব্লকেজ পেল। প্লাস্টিকের কিছু একটা। টানল। বেরিয়ে এলো। একটা খেলনা। প্লাস্টিকের গাড়ি। বাচ্চা ফেলে দিয়েছে টয়লেটে।
পাইপ পরিষ্কার করল। পানি নামাল। ফ্লাশ করে দেখল। ঠিক আছে। মেঝে মুছল। সব পরিষ্কার।
বাইরে এসে হাত ধুল। সাবান দিয়ে। তিনবার। মিসেস চৌধুরী আটশো টাকা দিলেন। বললেন, "থ্যাংকস।"
থ্যাংকস। রাত এগারোটায় থ্যাংকস বলে। সকাল এগারোটায় পাশে বসবে না।
মন্টু সিঁড়ি দিয়ে নামল। বিল্ডিংয়ের গেটের বাইরে এলো। রাস্তায় নিস্তব্ধ। দূরে একটা কুকুর ডাকছে। রাতের ঢাকা অন্যরকম। দিনের ভিড় নেই। দিনের মুখোশ নেই।
মন্টু হাঁটতে লাগল। পকেটে আটশো টাকা। শরীরে অন্যের ময়লার গন্ধ। পায়ে অন্যের বাথরুমের পানি।
আমি তাদের গু পরিষ্কার করি। তারা আমাকে ময়লা বলে।
মন্টু হাসল। অন্ধকারে। একা। হাসিটা শব্দহীন। বিষাদের হাসি না। ক্রোধের হাসি না। অভ্যাসের হাসি। পনেরো বছর ধরে একই হাসি। যখন কেউ মুখ ঘোরায়, যখন কেউ পাশ থেকে সরে যায়, যখন রবিনকে ময়লা বলে, তখন মন্টু হাসে। কারণ কাঁদলে কাজ হয় না। রাগ করলে কাস্টমার যায়। চুপ থাকলে ভেতরে পচে। তাই হাসে।
বাসায় ফিরল। রোজিনা ঘুমিয়ে গেছে। রবিন ঘুমিয়ে গেছে। মন্টু বাথরুমে গিয়ে গোসল করল। সাবান দিয়ে। পুরো শরীর। তিনবার। চারবার। পাঁচবার। গন্ধ যায় না। কিন্তু চেষ্টা করে। প্রতিদিন চেষ্টা করে।
তারপর বিছানায় শুয়ে পড়ল। রবিনের মাথায় হাত রাখল। রবিন ঘুমের মধ্যে একটু নড়ল। মন্টুর হাত পরিষ্কার। এইমাত্র ধুয়েছে। পাঁচবার।
ছেলের মাথায় ময়লা হাত রাখা যায় না। তাই পাঁচবার ধোয়।
মন্টু চোখ বন্ধ করল। পনেরো বছর। পনেরো বছর ধরে সে মানুষের বর্জ্য পরিষ্কার করছে। মানুষ যা ত্যাগ করে, যা ফেলে দেয়, যা দেখতে চায় না, যার কথা বলতে চায় না, সেই সবকিছু মন্টুর হাত দিয়ে যায়। মন্টু সেটা সরায়। পরিষ্কার করে। তারপর মানুষ আবার ফ্লাশ করে। আবার ভরে ওঠে। আবার মন্টু আসে।
চক্র। জীবন একটা চক্র। পাইপের মতো। ঢোকে, বেরোয়, আবার ঢোকে।
কাল সকালে আবার পাইপ। আবার অন্ধকার। আবার দুই ফুটের সুড়ঙ্গ। আবার মানুষের ফেলে দেওয়া সবকিছু।
কিন্তু আজ রাতে মন্টুর হাত পরিষ্কার। আজ রাতে সে শুধু বাবা। ময়লা না।
বাইরে একটা কুকুর ডাকছে। দূরে একটা ট্রাক যাচ্ছে। রাতের ঢাকা নিশ্বাস নিচ্ছে। মাটির নিচে পাইপ আছে। পাইপের ভেতরে অন্ধকার আছে। সেই অন্ধকারে মন্টু প্রতিদিন ঢোকে। প্রতিদিন বেরোয়।
একদিন ঢুকবে, বেরোবে না। সেদিনও কেউ খুঁজবে না। অন্য একটা মন্টু আসবে। অন্য কারো ছেলে। অন্য কারো বাবা। সেও পাইপে ঢুকবে। সেও গন্ধ পাবে না। সেও বাসে পাশে বসবে, মানুষ সরে যাবে।
চক্র। পাইপের মতো। ঢোকে, বেরোয়, আবার ঢোকে।