কাঠমিস্ত্রি

ছেলে টাকা পাঠায়। কিন্তু কাঠের গন্ধ পাঠাতে পারে না

পর্ব ১৬ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আব্দুর রহিমের হাতে কাঠের গন্ধ মিশে গেছে। চল্লিশ বছর। সেগুন, মেহগনি, কাঁঠালকাঠ, শিশু, গামারি। প্রতিটা কাঠের আলাদা গন্ধ, আলাদা ওজন, আলাদা শরীর। হাত দিলেই বোঝা যায়। চোখ বন্ধ করে শুঁকলেই বলতে পারেন এটা সেগুন না কাঁঠাল। রান্ডা চালালে কাঠ কথা বলে। শক্ত কাঠ বলে ধীরে চালাও। নরম কাঠ বলে জোরে চালাও। আব্দুর রহিম শোনেন। কাঠ যা বলে তাই করেন।

ময়মনসিংহ শহরের উত্তর দিকে, রেললাইনের ধারে, একটা টিনের ছাউনি। সামনে সাইনবোর্ড: "রহিম ফার্নিচার।" সাইনবোর্ডের রং উঠে গেছে। অক্ষরগুলো আবছা। কিন্তু এলাকার সবাই চেনে। তিন প্রজন্মের খাট, আলমারি, টেবিল, চেয়ার বানিয়েছেন আব্দুর রহিম। বিয়ের খাট বানিয়ে দিয়েছেন কতশত কনের জন্য। প্রতিটা খাটের মাথায় ফুলের নকশা। নিজের ডিজাইন। কোনো বই থেকে শেখেননি। বাবার কাছ থেকে। বাবা শিখেছিলেন দাদার কাছ থেকে।

তিন প্রজন্মের হাত। তিন প্রজন্মের কাঠের গন্ধ।

এখন ওয়ার্কশপ চুপ।

রান্ডা ঝুলছে পেরেকে। করাত দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে। বাটালির ধার উঠে গেছে। শানে শান দেওয়া হয়নি মাসখানেক। কাঠের গুঁড়ো জমে আছে মেঝেতে। পুরনো গুঁড়ো। শুকনো। নতুন কাটা হয়নি।

পার্টিকেল বোর্ড এসে গেছে। HATIL, Otobi, Brothers, Nurjahan। শোরুম ঝকমক করে। কাচের দরজা, এসি, সুন্দর মেয়ে সেলসগার্ল। ক্যাটালগ দেখাও, অর্ডার দাও, দশ দিনে ডেলিভারি। EMI-তে কেনা যায়। বিকাশে পেমেন্ট। ফেসবুকে অ্যাড।

আব্দুর রহিমের কাছে কেউ আসে না। মাঝে মাঝে কেউ আসে, দাম শুনে চলে যায়। একটা সেগুন কাঠের আলমারি বানাতে পনেরো হাজার। HATIL-এ পার্টিকেল বোর্ডের আলমারি বারো হাজার। দেখতে একই রকম। ভেতরে আকাশ-পাতাল ফারাক। পার্টিকেল বোর্ডে পানি পড়লে ফুলে যায়, তিন বছরে নষ্ট হয়। সেগুন কাঠ তিন প্রজন্ম টেকে। কিন্তু কে ভাবে তিন প্রজন্ম? এই দেশে মানুষ তিন মাস ভাবে।

"সস্তা চাই। তাড়াতাড়ি চাই। দেখতে ভালো চাই।" এই তিনটা শর্ত পূরণ করতে পারেন না আব্দুর রহিম। তিনি দেন মজবুত, দেন ধীরে, দেন আত্মা দিয়ে। বাজার চায় দ্রুত, চায় সস্তা, চায় চকচকে। আত্মার দরকার নেই।

ছেলে রাশেদ মালয়েশিয়ায়।

আট লাখ টাকা দিয়েছিলেন দালালকে। জমি বিক্রি করেছিলেন। বাপ-দাদার জমি। আধা বিঘা। সেই জমিতে একসময় কাঁঠাল গাছ ছিল। সেই কাঁঠাল গাছের কাঠ দিয়ে আব্দুর রহিম প্রথম আলমারি বানিয়েছিলেন। সতেরো বছর বয়সে। বাবা দেখে বলেছিলেন, "হাত ভালো। কিন্তু কোণাটা ঠিক হয়নি।" সেই কোণা ঠিক করতে আরো দুই বছর লেগেছিল। কোণা ঠিক হওয়ার পর বাবা আর কিছু বলেননি। শুধু একটু মাথা নেড়েছিলেন। সেটাই সার্টিফিকেট।

সেই জমি গেল। দালালের পেটে।

রাশেদ কুয়ালালামপুরে একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশ বানায়। মেশিন চালায়। দিনে বারো ঘণ্টা। মাসে ত্রিশ হাজার টাকা পাঠায়। bKash-এ আসে। আব্দুর রহিমের স্ত্রী জোহরা নিয়ে আসেন। বাজার করেন। ওষুধ কেনেন। রহিমের হাঁটুর ব্যথার ওষুধ। জোহরার ডায়াবেটিসের ওষুধ। বিদ্যুৎ বিল। গ্যাস বিল। মেয়ের স্কুলের বেতন।

ত্রিশ হাজার টাকা। সব চলে যায়। কিছু থাকে না।

রাশেদ ফোন করে সপ্তাহে একবার। শুক্রবার রাতে। কথা বলে পাঁচ মিনিট। "বাবা কেমন আছেন? মা কেমন আছেন? মুনিয়া কেমন আছে?" আব্দুর রহিম বলেন, "ভালো আছি।" এর বেশি কিছু বলেন না। কী বলবেন? ওয়ার্কশপে কাজ নেই? হাতের কাজ কেউ চায় না? তুমি যে টাকা পাঠাও সেটা দিয়ে বেঁচে আছি কিন্তু বেঁচে থাকা আর জীবন এক জিনিস না?

বলেন না। ছেলে দূরে। ছেলের কাঁধে যথেষ্ট বোঝা।

একদিন সকালে একটা লোক এলো।

বয়স ষাটের ওপর। পাজামা-পাঞ্জাবি। হাতে লাঠি। চোখে চশমা। পেছনে একটা অল্পবয়সী মেয়ে, বোধহয় নাতনি।

"রহিম ভাই?"

আব্দুর রহিম তাকালেন। চিনতে পারলেন না প্রথমে। তারপর চিনলেন। ইব্রাহিম হাজি। আজিমপুরের ইব্রাহিম হাজি। পঁচিশ বছর আগে একটা খাট বানিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের খাট। মেহগনি কাঠ। মাথায় পদ্মফুলের নকশা। সেই খাটের জন্য এগারো দিন লেগেছিল।

"আমার নাতনির বিয়ে। দোলনা বানাবেন একটা?"

"দোলনা?"

"নাতির জন্য। জামাই চাইছে কাঠের দোলনা। বলল, 'HATIL-এ দেখলাম, প্লাস্টিকের মতো লাগে। আসল কাঠের চাই।' আমি বললাম, রহিম ভাই ছাড়া কেউ পারবে না।"

আব্দুর রহিমের বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ল। কী সেটা? গর্ব? কৃতজ্ঞতা? বেদনা? সব মিশে একটা জিনিস। নাম নেই সেটার।

দোলনা বানাতে তিন দিন লাগল।

কাঁঠালকাঠ। পুরনো স্টক। শুকনো, পাকা, হলুদাভ। কাঁঠালকাঠের একটা মিষ্টি গন্ধ আছে। রান্ডা চালালে সেই গন্ধ ঘরে ছড়িয়ে যায়। তিন দিন আব্দুর রহিমের ওয়ার্কশপে সেই গন্ধ ছিল। তিন দিন করাতের আওয়াজ ছিল। বাটালির ঠুকঠুক ছিল। রান্ডার শোঁ-শোঁ ছিল।

তিন দিন আব্দুর রহিম জীবিত ছিলেন।

দোলনার ফ্রেম বানালেন প্রথমে। চারটে পা, ওপরে আর্চ, আর্চ থেকে দড়ি, দড়িতে ঝুলবে দোলনা। দোলনার গা মসৃণ করলেন এমনভাবে যে শিশুর ত্বকে আঁচড় না লাগে। ধারগুলো গোল করলেন। কোণাগুলো নরম করলেন। প্রতিটা জয়েন্ট এমনভাবে বসালেন যে পেরেক দরকার হলো না। শুধু কাঠে কাঠে। টেনন আর মর্টিস। পুরনো পদ্ধতি। বাবার শেখানো।

দোলনার মাথায় একটা ছোট পাখি খোদাই করলেন। কেউ বলেনি করতে। নিজে থেকে করলেন। কারণ কাঠ বলেছে। কাঠের শরীরে একটা জায়গা ছিল যেখানে গিঁট ছিল। গিঁটটাকে পাখি বানিয়ে দিলেন। খুঁত হয়ে গেল শিল্প।

তিন দিনে দোলনা তৈরি।

ইব্রাহিম হাজি এসে দেখলেন। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর দোলনার গায়ে হাত বোলালেন। আঙুল দিয়ে পাখিটা ছুঁলেন।

"এটা?"

"এমনি। মনে হলো করি।"

ইব্রাহিম হাজি কিছু বললেন না। পকেট থেকে টাকা বের করলেন।

"কত?"

আব্দুর রহিম হিসাব করলেন। কাঠের দাম, তিন দিনের শ্রম, বার্নিশ। মোট খরচ দুই হাজার। শ্রম ধরলে চার হাজার হওয়া উচিত। বললেন, "তিন হাজার।"

ইব্রাহিম হাজি তিন হাজার দিলেন। একটা পাঁচশো টাকার নোট বেশি দিলেন। "এটা পাখির জন্য।"

আব্দুর রহিম ফেরত দিতে চাইলেন। ইব্রাহিম হাজি নিলেন না।

তিন হাজার পাঁচশো টাকা। HATIL-এর শোরুমে একটা প্লাস্টিক-কাঠের দোলনা আট হাজার। পার্টিকেল বোর্ড, ল্যামিনেট, স্টিকার দিয়ে কাঠের রং। ছয় মাসে রং ওঠে। এক বছরে জয়েন্ট নড়ে। দুই বছরে ফেলে দিতে হয়।

আব্দুর রহিমের দোলনা কুড়ি বছর টিকবে। নাতি বড় হবে, দোলনা থাকবে। নাতির ছেলে হবে, দোলনা তখনো থাকবে।

কিন্তু দাম তিন হাজার। আট হাজার না।

হাতের কাজের দাম কম। মেশিনের কাজের দাম বেশি। কারণ মেশিনের পেছনে শোরুম আছে, বিজ্ঞাপন আছে, ব্র্যান্ড আছে। হাতের পেছনে শুধু হাত আছে। হাত দিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া যায় না।

সন্ধ্যায় আব্দুর রহিম ওয়ার্কশপে বসে আছেন। দোলনা চলে গেছে। ওয়ার্কশপ আবার খালি। কাঠের গুঁড়ো ঝাড়ু দেওয়া হয়নি। দেবেন না। এই গুঁড়ো তিন দিনের স্মৃতি। এই গুঁড়ো কাঁঠালকাঠের। গন্ধ আছে এখনো।

জোহরা চা নিয়ে এলেন। রহিম চা খান। চায়ে চিনি কম। ডায়াবেটিস নেই তাঁর, কিন্তু চিনি কমিয়ে দিয়েছেন। অভ্যাস। কম দিয়ে চলার অভ্যাস।

"রাশেদ ফোন করেছিল," জোহরা বললেন।

"কী বলল?"

"টাকা পাঠাবে। আর বলল পরের বছর আসবে।"

"পরের বছর। গত বছরও বলেছিল পরের বছর।"

জোহরা চুপ করে রইলেন। কিছু বলার নেই। ছেলে দূরে। দূরত্ব কমার নাম নেই। টাকা আসে। ছেলে আসে না। টাকা দিয়ে চাল কেনা যায়, ওষুধ কেনা যায়, বিদ্যুৎ বিল দেওয়া যায়। কিন্তু টাকা দিয়ে ছেলের মুখ কেনা যায় না। টাকা দিয়ে ছেলের হাতের ছোঁয়া কেনা যায় না।

আব্দুর রহিম বললেন, "ছেলে টাকা পাঠায়। কিন্তু কাঠের গন্ধ পাঠাতে পারে না।"

জোহরা বুঝলেন। বুঝলেন কারণ জোহরাও জানেন, রহিমের কাছে কাঠের গন্ধ মানে জীবন। কাঠের গন্ধ না থাকলে রহিম শুধু শ্বাস নেন। বেঁচে থাকেন না।

রাতে আব্দুর রহিম ওয়ার্কশপে গেলেন। লাইট জ্বালালেন। একটা ষাট ওয়াটের বাল্ব। হলুদ আলো। ছায়া পড়ল যন্ত্রপাতির ওপর।

করাতটা তুললেন। ধার আছে এখনো। বাটালি তুললেন। ভারী, ঠান্ডা, পরিচিত। রান্ডা তুললেন। হাতল মসৃণ, কত হাজার ঘণ্টা ধরেছেন এই হাতল। হাতের ঘাম কাঠকে পালিশ করে দিয়েছে।

দেয়ালে একটা ছবি। সাদাকালো। বাবা দাঁড়িয়ে আছেন একটা আলমারির পাশে। আলমারিটা সেগুন কাঠের। বাবার মুখে হাসি নেই। কাঠমিস্ত্রিরা হাসেন না ছবিতে। তাঁরা গম্ভীর থাকেন। কারণ কাঠ গম্ভীর। কাঠ হাসে না। কাঠ সহ্য করে। কুড়াল সহ্য করে, করাত সহ্য করে, রান্ডা সহ্য করে। তারপর সুন্দর হয়ে যায়। কাঠমিস্ত্রিও তাই। সহ্য করেন। তারপর সুন্দর কিছু তৈরি করেন।

আব্দুর রহিম বাল্ব নেভালেন। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলেন। কাঠের গন্ধ আসছে। পুরনো কাঠের গন্ধ। নতুন কাঠের গন্ধ। কাঁঠালের মিষ্টি, সেগুনের তীব্র, মেহগনির ভারী।

এই গন্ধ তাঁর। এই গন্ধ তাঁর বাবার। এই গন্ধ তাঁর দাদার।

রাশেদ কুয়ালালামপুরে প্লাস্টিক বানায়। প্লাস্টিকের কোনো গন্ধ নেই। প্লাস্টিকের কোনো স্মৃতি নেই। প্লাস্টিকের কোনো প্রজন্ম নেই।

পরদিন সকালে আব্দুর রহিম ওয়ার্কশপ খুললেন। কোনো কাস্টমার আসবে না জানেন। তবু খুললেন। কারণ এটাই তাঁর জীবন। সকালে উঠে ওয়ার্কশপ খোলা। এটা কাজ না। এটা ধর্ম। এটা শ্বাস নেওয়ার মতো।

একটা পুরনো সেগুন কাঠের টুকরো তুললেন। অবশিষ্ট। কোনো কাজের বাকি। কী বানাবেন? কেউ অর্ডার দেয়নি। কেউ চায়নি।

বসলেন। বাটালি হাতে নিলেন। কাঠে প্রথম আঘাত করলেন। কাঠ বলল, "কী বানাবে?" রহিম বললেন, "জানি না। তুই বল।"

কাটতে লাগলেন। ধীরে ধীরে একটা আকৃতি বেরিয়ে এলো। একটা হাত। একটা মানুষের হাত। খোলা আঙুল। যেন কিছু ধরতে চাইছে। যেন কিছু ছেড়ে দিচ্ছে। দুটোই।

কারো জন্য বানাননি। কেউ কিনবে না। কেউ চায়নি।

হাতের কাজে প্রাণ আছে। প্রাণের দাম বাজারে নেই।

আব্দুর রহিম কাঠের হাতটা তাকে রেখে দিলেন। পাশে বাবার ছবি। পাশে করাত, বাটালি, রান্ডা। পাশে কাঠের গুঁড়ো।

বাইরে রোদ উঠেছে। রাস্তায় একটা HATIL-এর ডেলিভারি ভ্যান যাচ্ছে। ভ্যানের গায়ে লেখা: "আধুনিক জীবনের সঙ্গী।"

আব্দুর রহিম দেখলেন। কিছু বললেন না। কাঠের গুঁড়োয় পা ডোবালেন। গুঁড়ো নরম। উষ্ণ। পরিচিত।

এই গুঁড়ো তাঁর মাটি। এই ওয়ার্কশপ তাঁর দেশ। এই যন্ত্রপাতি তাঁর ভাষা।

ভাষা মরে যাচ্ছে। কেউ শুনছে না। কিন্তু আব্দুর রহিম বলে যাচ্ছেন। কারণ ভাষা যে বলে, সে থামতে পারে না। থামলে মরে যায়।