দর্জি
কাপড় কাটতে জানি। নিজের ভাগ্য কাটতে পারি না
১
হাসিনার আঙুলের ডগায় কোনো অনুভূতি নেই। একদম নেই। সুই ফুটলে টের পান না। রক্ত বের হয় আঙুল থেকে, কাপড়ে পড়ে, তখন দেখেন। ব্যথা পান না। চৌদ্দ বছর বয়সে প্রথম সুই ধরেছিলেন। তখন আঙুলে সুই ফুটলে কাঁদতেন। পনেরোতে কাঁদতেন না কিন্তু টের পেতেন। বিশে টের পাওয়া কমে গেল। পঁচিশে আঙুলের ডগা অবশ হয়ে গেল। এখন পঁয়তাল্লিশ। একত্রিশ বছর সুই-সুতোর সঙ্গে। আঙুলের ডগায় চামড়া মোটা হয়ে গেছে। শক্ত। প্রায় কাঠের মতো।
নরসিংদীর একটা বাড়ির সামনের ঘরে বসেন হাসিনা। সেলাই মেশিন পুরনো, জ্যাক কোম্পানির। স্বামী কিনে দিয়েছিলেন বিয়ের পর। স্বামী এখন নেই। তেরো বছর আগে মারা গেছেন। লিভার সিরোসিস। হাসপাতালে ভর্তি করার টাকা ছিল না। বাড়িতে মারা গেলেন। হাসিনা পাশে বসে ছিলেন। সেলাই করছিলেন। থামেননি। কারণ পরদিন কাপড় দিতে হবে। মৃত্যু অপেক্ষা করে, কিন্তু কাস্টমার অপেক্ষা করে না।
সেদিন থেকে হাসিনা একা। দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে।
সেলাই মেশিনের শব্দ হাসিনার ঘড়ি। সকাল ছয়টায় প্রথম ঠকঠক। রাত নয়টায় শেষ ঠকঠক। এই দুটো ঠকঠকের মাঝখানে হাসিনার দিন। খাওয়া, নামাজ, মেয়ের সাথে কথা, সব এই ঠকঠকের ফাঁকে ফাঁকে। মেশিন বন্ধ হলে ঘর চুপ হয়ে যায়। চুপ হলে হাসিনা অস্বস্তি বোধ করেন। শব্দ না থাকলে একাকীত্ব আসে। একাকীত্ব আসলে স্বামীর কথা মনে পড়ে। স্বামীর কথা মনে পড়লে চোখ ভেজে। চোখ ভিজলে সেলাই ঝাপসা হয়ে যায়। তাই মেশিন চালু রাখেন। শব্দ চালু রাখেন। শব্দই সঙ্গী।
২
চোখ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে। বছরে একটু একটু করে ঝাপসা হচ্ছে। সুইতে সুতো পরাতে সময় লাগে। আগে এক সেকেন্ডে পরাতেন। এখন পাঁচ মিনিট লাগে। কখনো দশ মিনিট। চোখ কাছে নিয়ে আসেন, দূরে নিয়ে যান, সুইয়ের ছিদ্র খুঁজে পান না।
ডাক্তার বলেছেন চশমা লাগবে। প্রগ্রেসিভ লেন্স। দাম আট হাজার টাকা। আট হাজার। হাসিনার মাসিক আয় সাত থেকে আট হাজার। পুরো এক মাসের আয় দিয়ে চশমা কিনবেন? তাহলে সেই মাসে খাবেন কী? মেয়ের স্কুলের খরচ? বিদ্যুৎ বিল? ওষুধ?
চশমা কেনা হয়নি। সুইতে সুতো পরানোর জন্য মেয়েকে ডাকেন। মেয়ে স্কুল থেকে ফিরলে দশটা সুইতে সুতো পরিয়ে রাখে। দশটা সুই একসারিতে কাপড়ে গেঁথে রাখেন হাসিনা। একটা শেষ হলে পরেরটা ধরেন। দশটা শেষ হলে আবার মেয়ের জন্য অপেক্ষা।
মেয়ে স্কুলে থাকলে? তাহলে হাসিনা বসে থাকেন। সুই আছে, সুতো আছে, কাপড় আছে, কাজ আছে। কিন্তু সুতো পরাতে পারছেন না। বসে থাকেন। হাত চুলকায়। হাত কাজ চায়। হাত জানে কাটতে, সেলাই করতে, বোতাম লাগাতে। কিন্তু চোখ সাথ দিচ্ছে না।
শরীরের এক অংশ আরেক অংশকে ধোঁকা দিচ্ছে।
হাসিনা একটা কৌশল শিখেছেন। সুইয়ের ছিদ্রের পেছনে সাদা কাগজ রাখেন। সাদা কাগজে ছিদ্র দেখা যায় ভালো। তারপর সুতোর আগা জিভে ভেজান। ভেজা সুতো শক্ত হয়। শক্ত সুতো ছিদ্রে ঢোকে। কখনো কখনো কাজ করে। কখনো কখনো করে না।
এই কৌশল কে শিখিয়েছিল? মা। মায়েরও চোখ খারাপ হয়ে গিয়েছিল শেষ বয়সে। মাও চশমা কিনতে পারেননি। মাও সাদা কাগজ রাখতেন সুইয়ের পেছনে। মায়ের আঙুলেও অনুভূতি ছিল না। তিন প্রজন্মের দর্জি। তিন প্রজন্মের অন্ধত্ব। তিন প্রজন্মের চশমা-না-কেনা।
৩
ফাস্ট ফ্যাশন এসে গেছে।
আড়ং, ইয়েলো, অঞ্জনস, কাপড়ের দোকানগুলোতে রেডিমেড সালোয়ার-কামিজ ঝুলছে। অনলাইনে দারাজ, ইভ্যালি, ফেসবুক পেজ। ছবি দেখো, অর্ডার দাও, বাসায় চলে আসে। দাম? চারশো টাকায় একটা থ্রি-পিস। পাঁচশোতে ভালো। হাজারে "প্রিমিয়াম।"
হাসিনা একটা সালোয়ার-কামিজ সেলাই করেন দুইশো টাকায়। কাপড় কাস্টমার দেয়। হাসিনা শুধু সেলাই করেন। মাপ নেন, কাটেন, সেলাই করেন। একটা কামিজ সেলাই করতে তিন ঘণ্টা লাগে। সালোয়ার দুই ঘণ্টা। ওড়না আধঘণ্টা। মোট সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। দুইশো টাকা। ঘণ্টায় ছত্রিশ টাকা।
রেডিমেড কিনলে? দোকানে গিয়ে দশ মিনিটে বেছে নাও। অনলাইনে দুই মিনিটে অর্ডার দাও। সময় বাঁচে। ঝামেলা কম। ফিটিং ভালো না হলে বদলে নাও।
হাসিনার কাছে আসলে? দুই দিন অপেক্ষা করো। ট্রায়াল দাও। আবার আসো। ঝামেলা। সময় লাগে। কে চায় এত ঝামেলা?
কাস্টমার কমে গেছে। মহল্লায় আগে ত্রিশ-চল্লিশ জন আসতেন নিয়মিত। এখন আট-দশ জন। বাকিরা অনলাইনে কেনেন। দোকানে কেনেন। হাসিনার দরকার নেই।
একদিন পাশের বাড়ির রিনা এলো। হাতে ফোন। ফোনে একটা কামিজের ছবি। "এটা বানিয়ে দেবেন? অনলাইনে দেখলাম, কিন্তু সাইজ পাচ্ছি না।"
হাসিনা ছবিটা দেখলেন। সস্তা কাপড়, মেশিন এমব্রয়ডারি, ভেতরের সেলাই অগোছালো। এটা হাসিনা চোখ বন্ধে বানাতে পারেন। এর চেয়ে দশগুণ ভালো বানাতে পারেন। কিন্তু রিনা চায় হুবহু এটা। কারণ এটা "ট্রেন্ডিং।" হাসিনা ট্রেন্ড বোঝেন না। হাসিনা বোঝেন কাপড়, সুতো, সুই, মাপ। ট্রেন্ড ফোনে আসে, ফোনে যায়। হাসিনার হাতে যা আসে তা থাকে।
"বানাবো। কত দেবে?"
"দুইশো দেবো।"
দুইশো। অনলাইনে ওই কামিজ পাঁচশো। কিন্তু হাসিনার কাছে দুইশো। কারণ হাসিনার শোরুম নেই, ব্র্যান্ড নেই, ফেসবুক পেজ নেই। হাসিনার আছে একটা পুরনো মেশিন আর দুটো ক্লান্ত হাত।
৪
কিন্তু ঈদ আসে।
ঈদ হাসিনার অক্সিজেন। সারা বছর কষ্ট করেন, ঈদের আগে দুই সপ্তাহ ঘুমান না। ঈদের আগে সবাই আসে। যারা সারা বছর আসে না তারাও আসে। কারণ ঈদের কাপড় বিশেষ। ঈদের কাপড় মা বলেছেন এই কাপড় দিয়ে বানাও। ঈদের কাপড় রেডিমেড হলে চলে না, দর্জিকে দিয়ে বানাতে হয়, এটা পরিবারের ঐতিহ্য।
এবার ঈদে ত্রিশটা অর্ডার পেলেন। দুই সপ্তাহে ত্রিশটা সালোয়ার-কামিজ। দিনে সাড়ে দুটো। একটা সালোয়ার-কামিজ সেলাই করতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। দিনে দুটো মানে এগারো ঘণ্টা। সাড়ে দুটো মানে চৌদ্দ ঘণ্টা। আরো দুটো ঘণ্টা কাটাকুটি, ইস্ত্রি, ফিনিশিং। ষোলো ঘণ্টা। দিনে ষোলো ঘণ্টা কাজ।
হাসিনা কাজ করলেন। সকাল ছয়টায় শুরু করেন। রাত দশটায় শেষ করেন। মাঝে দুবার খান। চা পাঁচবার। নামাজ পাঁচবার। বাকি সময় মেশিনের পায়ে পা চাপেন, কাপড় ধরেন, সুই চালান।
পিঠে ব্যথা। কোমরে ব্যথা। ঘাড় ধরে গেছে। আঙুলে সুই ফুটেছে কতবার, রক্ত বের হয়েছে, কাপড়ে পড়েছে, ধুয়ে ফেলেছেন। থামেননি। কারণ ঈদ চৌদ্দ দিন পর। কাস্টমার চায় সময়মতো। একদিনও দেরি চলবে না।
৫
ত্রিশটার মধ্যে ত্রিশটাই শেষ করলেন। ঈদের দুদিন আগে। সব ইস্ত্রি করলেন। সব ভাঁজ করলেন। পলিথিনে মুড়ে নাম লিখলেন। জাহানারা আপা, রোকেয়া ভাবি, করিমনের মা, শিরিন আন্টি। প্রতিটা কাপড়ের সাথে একটা মুখ। প্রতিটা মুখের সাথে একটা পরিবার। হাসিনা জানেন কার কোমর মোটা, কার কাঁধ সরু, কার হাত লম্বা। শরীরের মাপ মনে থাকে। তিরিশ বছরের কাস্টমারের শরীরের মাপ মুখস্থ।
কাস্টমাররা এলেন। কাপড় নিলেন। পরে দেখলেন। খুশি হলেন। "হাসিনা, তোমার হাতে জাদু আছে।" হাসিনা হাসেন। হাসিটা ক্লান্ত কিন্তু সত্যি।
পেমেন্ট? পঁচিশজন দিলেন। পাঁচজন বললেন, "পরে দেবো।"
"পরে" মানে কবে? "পরে" মানে কখনো না।
হাসিনা জানেন। তিরিশ বছরে শিখেছেন। "পরে দেবো" মানে দেবে না। কিন্তু কিছু বলেন না। কারণ বললে কাস্টমার হারাবেন। যে পাঁচজন "পরে দেবো" বলেছেন, তাঁরা পরের ঈদেও আসবেন। আবার কাপড় দেবেন। আবার "পরে দেবো" বলবেন। আবার দেবেন না। কিন্তু আসবেন। কারণ হাসিনার সেলাই ভালো। ভালো সেলাইয়ের জন্য মানুষ আসে। টাকা দেওয়ার জন্য আসে না।
পঁচিশটার পেমেন্ট: পাঁচ হাজার টাকা। দুই সপ্তাহের কাজ। ষোলো ঘণ্টা করে চৌদ্দ দিন। দুইশো চব্বিশ ঘণ্টা। পাঁচ হাজার ভাগ দুইশো চব্বিশ। ঘণ্টায় বাইশ টাকা সত্তর পয়সা।
একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় আটান্ন টাকা।
হাসিনা গার্মেন্টসেও যেতে পারতেন। কেউ কেউ বলেছিল যাও। ফ্যাক্টরিতে কাজ পাবে। বেতন নিয়মিত। ওভারটাইম আছে। কিন্তু হাসিনা যাননি। কারণ ফ্যাক্টরিতে গেলে মেশিন চালাতে হয় অন্যের ডিজাইনে। অন্যের কাটিংয়ে। অন্যের টাইমলাইনে। হাসিনা নিজের মেশিনে নিজের সময়ে কাজ করেন। এটা স্বাধীনতা। স্বাধীনতার দাম আছে। সেই দাম হলো ঘণ্টায় বাইশ টাকা সত্তর পয়সা।
স্বাধীনতা আর দারিদ্র্য, দুটো একসাথে থাকে। সবসময়। বাংলাদেশে যে মানুষ নিজে কিছু করতে চায়, সে গরিব থাকে। যে অন্যের হয়ে করে, সে কম গরিব থাকে। কিন্তু সে নিজের না।
৬
ঈদের দিন হাসিনা ঘুমালেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুমালেন। শরীর আর পারছিল না। দুই সপ্তাহের ক্লান্তি একসাথে এসে চেপে বসল। ঘুমের মধ্যে হাত নড়ছিল। সেলাই করছিলেন ঘুমের মধ্যেও।
ছোট মেয়ে লামিয়া ঈদের কাপড় পরেছে। নতুন কাপড়। হাসিনা নিজে সেলাই করেছেন। গোলাপি জর্জেট। কামিজের কলারে ছোট ছোট ফুলের নকশা। হাতে এমব্রয়ডারি। মেয়ের জন্য সবচেয়ে সুন্দর কাজ করেছেন। কারণ মেয়ের কাপড় থেকে মায়ের হাতের পরিচয়।
"মা, উঠো। ঈদের নামাজ হয়ে গেছে।"
হাসিনা উঠলেন। মুখ ধুলেন। নিজের কাপড় পরলেন। পুরনো। গত বছরের ঈদের কাপড়। তার আগের বছরেরও হতে পারে। হাসিনার নিজের জন্য কাপড় বানানো হয় না। কারণ কাপড় বানানোর সময় নেই। কারণ সময় সব কাস্টমারের কাপড়ে চলে যায়।
দর্জির নিজের কাপড় সবচেয়ে পুরনো। মুচির জুতো সবচেয়ে ছেঁড়া। রাজমিস্ত্রির ঘর সবচেয়ে ভাঙা। যারা বানায় তাদের কাছে নিজের জন্য কিছু থাকে না।
লামিয়া বলল, "মা, তোমার জন্য একটা কাপড় বানাও না।"
হাসিনা হাসলেন। "পরে বানাবো।"
"পরে মানে কবে? প্রতিবার পরে বলো।"
লামিয়া জানে না "পরে" মানে কখনো না। লামিয়া এখনো বিশ্বাস করে "পরে" আসে। বড় হলে শিখবে, বাংলাদেশে "পরে" একটা বাক্য না, একটা সমাধি। জীবিত ইচ্ছাকে "পরে" বলে কবর দেওয়া হয়।
ঈদের রাতে মসজিদ থেকে আজানের শব্দ এলো। হাসিনা নামাজ পড়লেন। দোয়া করলেন। কী দোয়া? চোখ ভালো থাকুক। হাত চলুক। মেয়ে পড়ুক। এর বেশি চান না। এর বেশি চাওয়ার সাহস নেই। কারণ বেশি চাইলে আল্লাহও হয়তো "পরে দেবো" বলবেন।
৭
ঈদের পর বাজার আবার ফাঁকা। কাস্টমার নেই। মেশিন চুপ। হাসিনা বসে আছেন। সামনে একটা কাপড়ের টুকরো। কেটেছেন, কিন্তু সেলাই করেননি। কাস্টমারের না, নিজের।
নিজের জন্য একটা কামিজ বানাবেন ভেবেছিলেন। নীল কাপড়। সাধারণ ডিজাইন। কোনো নকশা নেই। শুধু সোজাসাপ্টা কামিজ।
কাটলেন। সেলাই শুরু করলেন। অর্ধেক হলো। তারপর একজন কাস্টমার এলেন। "হাসিনা, একটা ব্লাউজ সেলাই করে দাও। কাল লাগবে।" হাসিনা নিজের কামিজ সরিয়ে রাখলেন। ব্লাউজ ধরলেন।
নিজের কামিজটা অর্ধেক অবস্থায় আছে। সাত দিন হয়ে গেছে। বারো দিন হয়ে গেছে। এক মাস। দুই মাস। অর্ধেকই আছে। কারণ প্রতিবার নিজের কাজ ধরতে গেলে কারো কাজ চলে আসে। কারো কাজ আগে। নিজের কাজ সবসময় পরে।
কাপড় কাটতে জানেন। সেলাই করতে জানেন। বোতাম লাগাতে জানেন। হুক লাগাতে জানেন। কামিজ বানাতে জানেন, সালোয়ার বানাতে জানেন, ফতুয়া বানাতে জানেন, শাড়ির ব্লাউজ বানাতে জানেন।
কিন্তু নিজের ভাগ্য কাটতে পারেন না। নিজের ভাগ্যে কোনো মাপ নেই, কোনো ছাঁচ নেই, কোনো ডিজাইন নেই। কাঁচি দিয়ে কাটা যায় না। সুই দিয়ে সেলাই করা যায় না।
মেশিনের তলায় একটা ড্রয়ার আছে। সেখানে হাসিনার সংসারের সব কাগজপত্র। স্বামীর মৃত্যু সনদ। বড় মেয়ের বিয়ের কাবিননামা। ছোট মেয়ের জন্ম সনদ। নিজের ভোটার কার্ড। আর একটা পুরনো ছবি। স্বামীর সাথে তোলা। বিয়ের পর। স্বামী হাসছেন। হাসিনা হাসছেন না। কারণ তখনো হাসতে শেখেননি। এখনো শেখেননি।
সেই ড্রয়ারে আরেকটা জিনিস আছে। একটা ছোট কাপড়ের টুকরো। সাদা। কিনারায় লাল সুতোর বর্ডার। হাসিনার মায়ের শেষ কাপড়ের টুকরো। মা মারা যাওয়ার আগে হাসিনাকে দিয়েছিলেন। "এটা রাখিস। এতে আমার হাতের ছোঁয়া আছে।" হাসিনা রেখেছেন। কুড়ি বছর। কাপড়টা হলুদ হয়ে গেছে। কিন্তু হাতের ছোঁয়া আছে। মায়ের হাতও দর্জির হাত ছিল। মা শিখিয়েছিলেন। মা থেকে মেয়ে। এই বংশে সুই-সুতো রক্তে মিশে আছে।
৮
রাতে হাসিনা মেশিনের কভার দেন। কালো কাপড়ের কভার। নিজে সেলাই করা। মেশিনটা ঢেকে দেন যেন ঘুমাচ্ছে। মেশিন ঘুমালে হাসিনাও ঘুমান।
বিছানায় শুয়ে ভাবেন। চোখের চশমা আট হাজার। আট হাজার পেতে চল্লিশটা কামিজ সেলাই করতে হবে। চল্লিশটা কামিজ সেলাই করতে দুই মাস লাগবে যদি নিয়মিত কাজ আসে। কিন্তু নিয়মিত কাজ আসে না। ঈদ ছাড়া মাসে দশটা পেলে ভাগ্য।
চশমা না কিনলে? তাহলে আরো ঝাপসা হবে। আরো সুই ফুটবে। আরো ভুল হবে। কাপড় নষ্ট হবে। কাস্টমার চলে যাবে। আয় আরো কমবে।
চশমা কিনলে? টাকা নেই। ধার নিতে হবে। ধার নিলে সুদ। সুদ দিতে গিয়ে আরো কাজ। আরো কাজ মানে আরো ক্লান্তি। আরো ক্লান্তি মানে চোখ আরো খারাপ।
বৃত্ত। ঘুরে ঘুরে একই জায়গায়। কাঁচি দিয়ে কাটা যায় না এই বৃত্ত।
হাসিনা চোখ বন্ধ করেন। অন্ধকারে সুই-সুতো দেখতে পান। অন্ধকারে কাপড় দেখতে পান। অন্ধকারে মাপ দেখতে পান। চোখ বন্ধে যা দেখেন, চোখ খুললে তা ঝাপসা।
ভোরে আবার মেশিনের কভার খুলবেন। আবার সুই ধরবেন। আবার সুতো পরাতে পারবেন না। আবার মেয়েকে ডাকবেন।
মেয়ে লামিয়া ঘুমিয়ে আছে পাশের ঘরে। লামিয়ার হাত সরু। আঙুল লম্বা। দর্জির আঙুল। হাসিনা জানেন না মেয়ে দর্জি হবে কি না। হয়তো হবে না। হয়তো অন্য কিছু হবে। হয়তো চাকরি করবে। হয়তো কম্পিউটারে কাজ করবে। হয়তো সুই ধরবে না কখনো।
সেটাই ভালো। মেয়ের আঙুলে অনুভূতি থাকুক। মেয়ের চোখে আলো থাকুক। মেয়ের হাতে সুই না থাকুক।
দর্জি সেলাই করেন। থামেন না। কারণ থামলে খাবেন কী?