নার্স
ডাক্তার রোগ সারায়। নার্স রোগী সামলায়। পার্থক্যটা সম্মানে
১
ছত্রিশ ঘণ্টা হয়ে গেছে। ফাতেমা দাঁড়িয়ে আছেন। পা ফুলে গেছে। জুতোর ভেতর পা ঢুকছে না ঠিকমতো। সকালে যখন ডিউটিতে এসেছিলেন তখন জুতো ঢিলা ছিল। এখন টানটান। পা ফুলেছে। ছত্রিশ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে, হেঁটে, ছুটে। ICU-র মেঝে পাথরের। শক্ত। ঠান্ডা। এই মেঝেতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পায়ের তলায় একটা স্থায়ী ব্যথা হয়ে গেছে। প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস। ডাক্তার বলেছেন বিশ্রাম নিন। বিশ্রাম। ICU নার্সের বিশ্রাম কোথায়?
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ICU-তে আটটা বেড। আটজন রোগী। নার্স একজন। ফাতেমা। রাতের শিফটে আরেকজন থাকার কথা ছিল। আসেনি। অসুস্থ। ফাতেমা একাই সামলাচ্ছেন।
আটজন রোগী। তিনজন ভেন্টিলেটরে। দুজন পোস্ট-অপারেটিভ। একজন সেপটিক শক। একজন কিডনি ফেইলিওর, ডায়ালাইসিসের জন্য অপেক্ষা করছেন। একজন বৃদ্ধ, স্ট্রোক, কোমায়।
প্রতিটা রোগীর ভাইটালস চেক করতে হয় ঘণ্টায় ঘণ্টায়। ব্লাড প্রেশার, পালস, অক্সিজেন স্যাচুরেশন, টেম্পারেচার। ভেন্টিলেটরের সেটিংস দেখতে হয়। আইভি ফ্লুইডের রেট ঠিক আছে কি না। ক্যাথেটারের ব্যাগ ভরে গেছে কি না। বেডশোর হচ্ছে কি না। পজিশন চেঞ্জ করতে হয় প্রতি দুই ঘণ্টায়। একটা অচেতন মানুষকে পাশ ফেরানো ভারী কাজ। একা পাশ ফেরান। কোমর ব্যথা করে।
আটজন রোগী, একজন নার্স। অনুপাত হওয়া উচিত ১:২। অর্থাৎ চারজন নার্স থাকা উচিত। আছেন একজন।
২
রাত দুটো। তিন নম্বর বেডের মনিটর বিপ করছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন নামছে। ৮৮। ৮৫। ৮২। ফাতেমা ছুটলেন। ভেন্টিলেটরের সেটিং চেক করলেন। টিউব ব্লক হয়ে গেছে। সাকশন করতে হবে। সাকশন মেশিন টানলেন। ক্যাথেটার ঢোকালেন। শ্লেষ্মা বের করলেন। ঘন, হলুদাভ। ইনফেকশন হচ্ছে।
স্যাচুরেশন উঠল। ৮৮। ৯২। ৯৫। বিপিং বন্ধ হলো।
এই সময়ে পাঁচ নম্বর বেডের রোগীর স্বজন ঢুকলেন। নিয়ম অনুযায়ী ICU-তে স্বজন ঢুকতে পারেন না রাতে। কিন্তু ঢোকেন। গেট ভেঙে ঢোকেন না, অনুরোধ করে ঢোকেন, কান্নাকাটি করে ঢোকেন, সিকিউরিটি গার্ডকে পাঁচশো টাকা দিয়ে ঢোকেন।
লোকটা মধ্যবয়সী। পাঞ্জাবি পরা। চোখ লাল। ঘুমাননি। হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ, ভেতরে খাবার। "আমার বাবা," বললেন। "পাঁচ নম্বর বেডে। কেমন আছেন?"
"এখন কথা বলতে পারব না। বাইরে অপেক্ষা করুন।"
লোকটা গেলেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন।
"প্লিজ, বাইরে যান। রোগীদের ইনফেকশন হতে পারে।"
"আমার বাবাকে ভালো করেন না কেন?"
ফাতেমা থামলেন। কী বলবেন? ভালো করার চেষ্টা করছেন না? রাতভর করছেন। একা করছেন। আটজনকে একা সামলাচ্ছেন।
"আমরা চেষ্টা করছি।"
"চেষ্টা? আমার বাবা তিন দিন ধরে এখানে। ভালো হচ্ছেন না।"
লোকটা কাছে এলেন। ফাতেমার হাত ধরলেন। শক্ত করে। আঙুল ফাতেমার কব্জিতে বসে গেল।
ফাতেমা হাত ছাড়ালেন। ঝাঁকুনি দিয়ে। হৃৎপিণ্ড দ্রুত চলছে। ভয়? রাগ? অপমান? সব মিশে একটা জিনিস।
৩
সকালে সুপারভাইজারকে রিপোর্ট করলেন।
"গতরাতে একজন স্বজন আমার হাত ধরেছে। জোর করে।"
সুপারভাইজার নার্সিং ম্যানেজার রহিমা খাতুন। বয়স পঞ্চাশের ওপর। তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা। তিনিও নার্স ছিলেন। তিনিও হাত ধরা হয়েছে, ধাক্কা খেয়েছেন, গালি খেয়েছেন। তিরিশ বছরে সব পেয়েছেন।
"এড়িয়ে যাও।"
"এড়িয়ে যাব? উনি আমার হাত ধরেছেন।"
"ফাতেমা, তুমি নতুন না। ছয় বছর হলো। এগুলো হয়। রোগীর স্বজনরা ভয়ে থাকে, রাগে থাকে, হতাশায় থাকে। তারা জানে না কার ওপর রাগ করবে। ডাক্তারকে পায় না, নার্সকে পায়। নার্সের ওপর ঝাড়ে।"
"কিন্তু রিপোর্ট..."
"রিপোর্ট করো। ফাইলে থাকবে। কিছু হবে না। গত বছর সাতটা রিপোর্ট করেছিলাম। একটারও ব্যবস্থা হয়নি।"
ফাতেমা চুপ হয়ে গেলেন। কারণ রহিমা খাতুন মিথ্যা বলছেন না। কারণ এটাই সিস্টেম। নার্সকে হাত ধরলে কিছু হয় না। নার্সকে গালি দিলে কিছু হয় না। নার্সকে ধাক্কা দিলে কিছু হয় না। কারণ নার্স তো নার্স। সেবা দেওয়াই তার কাজ। সেবার সাথে অপমান সহ্য করাটাও কাজের অংশ। অলিখিত। চুক্তিতে নেই কিন্তু বাস্তবে আছে।
৪
ফাতেমার বেতন আঠারো হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতাল। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী। ছয় বছরের চাকরি। ইনক্রিমেন্ট হয়েছে দুবার। প্রতিবার পাঁচশো টাকা।
প্রাইভেট হাসপাতালে নার্সের বেতন পঁচিশ হাজার। কিন্তু চাকরির নিশ্চয়তা নেই। যেকোনো দিন বের করে দিতে পারে। ম্যাটার্নিটি লিভ নেই। অসুস্থ হলে ছুটি নেই। ওভারটাইম আছে কিন্তু ওভারটাইমের টাকা নেই।
সরকারি চাকরি নিরাপদ। পেনশন আছে। কিন্তু আঠারো হাজার দিয়ে ঢাকায় থাকা? ফাতেমা একটা মেসে থাকেন। মিরপুরে। চারজনের রুম। ভাড়া সাড়ে চার হাজার। খাওয়া তিন হাজার। যাতায়াত দেড় হাজার। ফোন বিল পাঁচশো। মা-বাবাকে পাঠান তিন হাজার। নোয়াখালীতে মা-বাবা। বাবা রিটায়ার্ড। পেনশন আট হাজার। মায়ের ওষুধ লাগে। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন।
আঠারো থেকে বারো হাজার বাদ। বাকি ছয় হাজার। এই ছয় হাজারে কাপড়, ওষুধ, জরুরি খরচ। কিছু থাকে না। মাস শেষে শূন্য।
ফাতেমার বয়স ত্রিশ। বিয়ে হয়নি। পাত্র দেখছেন মা। পাত্র চায় "চাকরিজীবী মেয়ে।" কিন্তু যখন শোনে নার্স, তখন একটু থমকায়। নার্স মানে রাতের ডিউটি। নার্স মানে পুরুষ রোগীর শরীর স্পর্শ করা। নার্স মানে "ওই ধরনের মেয়ে।" কোনো "ওই ধরন" নেই, কিন্তু সমাজের মাথায় আছে। সমাজের মাথা থেকে বের করা ফাতেমার কাজ না।
৫
দুপুরে ওয়ার্ডে ফিরলেন। একটু বিশ্রাম নেওয়ার কথা। নার্সিং স্টেশনে একটা চেয়ার আছে। বসলেন। চোখ বন্ধ করলেন। পাঁচ মিনিট।
বেল বাজল। দুই নম্বর বেড। পোস্ট-অপারেটিভ রোগী। ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। পেইনকিলার লাগবে। ডাক্তারের অর্ডার শিট দেখলেন। ট্রামাডল। আইভিতে দিলেন। রোগী একটু শান্ত হলেন।
ফিরে এলেন। বসলেন। চোখ বন্ধ। তিন মিনিট।
ছয় নম্বর বেডের মনিটর বিপ। ব্লাড প্রেশার ড্রপ। ৮০/৫০। সেপটিক শকের রোগী। ইনোট্রপ বাড়াতে হবে। ডাক্তারকে ফোন করলেন। ডাক্তার বললেন, "নোরাড্রেনালিন পয়েন্ট ফাইভ থেকে পয়েন্ট এইটে বাড়াও।" ফাতেমা বাড়ালেন। ব্লাড প্রেশার একটু উঠল। ৯০/৬০।
ফিরে এলেন। বসলেন না। কারণ বসলে আবার উঠতে হবে। দাঁড়িয়ে থাকলেন। দাঁড়িয়ে থাকা সহজ। বসলে শরীর বিশ্রাম চায়। বিশ্রাম পেলে শরীর আর উঠতে চায় না। তাই বসেন না। দাঁড়িয়ে থাকেন। ক্লান্ত পায়ে। ফোলা পায়ে। ব্যথা পায়ে।
৬
বিকেলে ডাক্তার রাউন্ডে এলেন। সিনিয়র কনসালট্যান্ট। পেছনে চারজন জুনিয়র ডাক্তার। তাঁরা বেড থেকে বেডে যান। রোগীর চার্ট দেখেন। ফাতেমা পাশে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট দেন।
"তিন নম্বরের স্যাচুরেশন রাতে ড্রপ করেছিল। সাকশন দিয়েছি। সিক্রেশন পিউরুলেন্ট। ইনফেকশন সাসপেক্টেড।"
কনসালট্যান্ট চার্ট দেখলেন। বললেন, "কালচার পাঠাও।" তারপর পরের বেডে চলে গেলেন।
ফাতেমা কালচার পাঠাবেন। স্যাম্পল কালেক্ট করবেন। ল্যাবে পাঠাবেন। রিপোর্ট আসলে ডাক্তারকে জানাবেন। ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক চেঞ্জ করবেন। ফাতেমা সেটা দেবেন।
ডাক্তার রোগ সারান। অর্ডার দেন। ফাতেমা সেই অর্ডার বাস্তবায়ন করেন। ডাক্তার পাঁচ মিনিট থাকেন বেডসাইডে। ফাতেমা চব্বিশ ঘণ্টা থাকেন। ডাক্তার চলে গেলে রোগী ফাতেমাকে ডাকেন। "সিস্টার, পানি।" "সিস্টার, ব্যথা।" "সিস্টার, বাথরুম।" "সিস্টার, ভয় লাগছে।"
ভয় লাগছে। এই কথাটা ডাক্তারকে কেউ বলে না। ডাক্তারকে বলে, "ব্যথা হচ্ছে, শ্বাস কষ্ট হচ্ছে, মাথা ঘুরছে।" শারীরিক কথা। কিন্তু নার্সকে বলে, "ভয় লাগছে। আমি কি মরে যাব?" মানসিক কথা। কারণ নার্স কাছে থাকেন। নার্সকে বিশ্বাস হয়।
ফাতেমা বলেন, "ভয় পাবেন না। আমরা আছি।" কিন্তু ফাতেমাও জানেন, কেউ কেউ মরবেন। এই আটজনের মধ্যে দুই-তিনজন হয়তো বাড়ি ফিরবেন না। কিন্তু সেটা বলা যায় না। সেটা বলার অধিকার ডাক্তারের। নার্সের না।
৭
রাতে ডিউটি শেষ। আটচল্লিশ ঘণ্টা পর। প্রতিস্থাপন নার্স এসেছেন। হ্যান্ডওভার দিলেন ফাতেমা। প্রতিটা রোগীর অবস্থা, ওষুধের শিডিউল, পেন্ডিং রিপোর্ট, স্বজনদের আচরণ।
"পাঁচ নম্বরের স্বজন একটু aggressive। সাবধানে থেকো।"
প্রতিস্থাপন নার্স মাথা নাড়লেন। ছয় মাসের অভিজ্ঞতা। নতুন। চোখে ভয় আছে।
ফাতেমা লকার রুমে গেলেন। ইউনিফর্ম খুললেন। সাদা ইউনিফর্মে দুটো দাগ। একটা রক্তের। তিন নম্বরের সাকশনের সময়। আরেকটা বেটাডিনের। ড্রেসিং চেঞ্জের সময়।
নিজের কাপড় পরলেন। সাধারণ সালোয়ার-কামিজ। ব্যাগ কাঁধে নিলেন। হাসপাতালের গেট পার হলেন। বাইরে ঢাকা। সন্ধ্যা। রিকশা, সিএনজি, বাস, মানুষ, হর্ন, ধোঁয়া।
একটা বাসে উঠলেন। মিরপুর যাবেন। বাসে দাঁড়িয়ে আছেন। সিট নেই। পা ফোলা। পায়ে ব্যথা। দাঁড়িয়ে আছেন।
পাশের লোকটা জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কী করেন?"
"নার্স।"
লোকটা একটু সরে গেলেন। কিছু বললেন না। কিন্তু সরে গেলেন। সেটাই উত্তর।
৮
মেসে ফিরলেন। রুমমেটরা ঘুমাচ্ছেন। ফাতেমা গোসল করলেন। ঠান্ডা পানি। গরম পানির ব্যবস্থা নেই। ঠান্ডা পানিতে আটচল্লিশ ঘণ্টার ক্লান্তি ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করলেন। ধোয়া গেল না। ক্লান্তি হাড়ে ঢুকে গেছে।
ভাত খেলেন। ঠান্ডা ভাত। ডাল। আলুভর্তা। একা একা খেলেন। কেউ জিজ্ঞেস করল না কেমন আছো। কেউ জিজ্ঞেস করল না কেমন গেল ডিউটি। কারো জিজ্ঞেস করার কথা না। সবাই ক্লান্ত। সবাই নিজের মতো।
বিছানায় শুয়ে মাকে ফোন করলেন।
"মা, কেমন আছো?"
"ভালো আছি, মা। তুই কেমন?"
"ভালো।"
দুই মিনিটের কথা। ভালো আছি, ভালো আছি। দুজনেই মিথ্যা বলছেন। মা জানেন মেয়ে ভালো নেই। মেয়ে জানেন মা ভালো নেই। কিন্তু সত্য বললে কী হবে? সত্য বললে চিন্তা বাড়বে। চিন্তা বাড়লে রক্তচাপ বাড়বে। রক্তচাপ বাড়লে ওষুধ বাড়বে। ওষুধ বাড়লে খরচ বাড়বে।
ফোন রাখলেন। চোখ বন্ধ করলেন। ঘুম আসছে না। মাথায় মনিটরের বিপ শব্দ ঘুরছে। চোখের পেছনে ভেন্টিলেটরের সবুজ আলো জ্বলছে-নিভছে। কানে রোগীর কাতরানি।
ডাক্তার রোগ সারায়। নার্স রোগী সামলায়। পার্থক্যটা সম্মানে।
ডাক্তারকে সমাজ সম্মান করে। নার্সকে সমাজ সহ্য করে। সম্মান আর সহ্য, দুটো আলাদা জিনিস। আকাশ-পাতাল আলাদা।
ফাতেমা ঘুমালেন। আটচল্লিশ ঘণ্টা পর। কাল আবার ডিউটি। আবার আটজন রোগী। আবার একজন নার্স। আবার ছত্রিশ ঘণ্টা।