ওয়ার্ড বয়
মানুষ মরলে আমাকে ডাকে। মানুষ বাঁচলে আমাকে এড়ায়
১
শামসুল আজ তিনটা লাশ বহন করেছেন।
প্রথমটা সকালে। ক্যান্সার ওয়ার্ড থেকে। বৃদ্ধা। হাড় ছাড়া কিছু ছিল না শরীরে। ওজন হয়তো পঁয়ত্রিশ কেজি। স্ট্রেচারে তুলতে কষ্ট হয়নি। কিন্তু বৃদ্ধার মেয়ে চিৎকার করে কাঁদছিলেন। শামসুলের কানে সেই কান্না এখনো আছে। কান্নার একটা বিশেষ গুণ আছে। তা কানে থেকে যায়। দিনের শেষে, রাতে, ঘুমের মধ্যে। কান্না শেষ হলেও শব্দ শেষ হয় না।
দ্বিতীয়টা দুপুরে। সার্জারি ওয়ার্ড থেকে। অপারেশন টেবিলে মারা গেছেন। মধ্যবয়সী পুরুষ। পেটের অপারেশন। কমপ্লিকেশন। রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। শরীরে এখনো সেলাইয়ের দাগ, ব্যান্ডেজ, রক্ত। অপারেশন থিয়েটার থেকে সরাসরি মর্গে। ধোয়ার সময় হয়নি। শামসুল ধুয়েছেন। ঠান্ডা পানি দিয়ে। রক্ত ধুয়ে ফেলেছেন। কাপড় পরিয়েছেন। এই কাজ শামসুলের না। কিন্তু আর কে করবে? পরিবার কাঁদছে। নার্স ব্যস্ত। ওয়ার্ড বয়ই করে।
তৃতীয়টা সন্ধ্যায়। মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে। নিউমোনিয়া। বয়স পঁচিশ। তরুণ। শামসুলের ছেলের বয়সী। স্ট্রেচারে তুলতে গিয়ে হাত কেঁপেছিল। কারণ মুখটা ছেলের মতো দেখতে। ঠিক ছেলের মতো না, কিন্তু সেই বয়স, সেই চেহারা, সেই অসহায়ত্ব।
তিনটা লাশ। তিনটা পরিবার। তিনটা কান্না। একটা মর্গ।
শামসুল কখনো কাঁদেন না। প্রথম দিকে কাঁদতেন। প্রথম বছর প্রতিটা লাশের সাথে কাঁদতেন। দ্বিতীয় বছর মাঝে মাঝে। তৃতীয় বছর থেকে কান্না বন্ধ হয়ে গেল। কান্না বন্ধ হলো মানে হৃদয় বন্ধ হলো, এটা ভুল। কান্না বন্ধ হলো মানে শরীর শিখে গেল কীভাবে কান্না ভেতরে রাখতে হয়। বাইরে আসতে দেয় না। কারণ বাইরে এলে কাজ করা যায় না। লাশ বহন করতে গিয়ে কাঁদলে হাত কাঁপে। হাত কাঁপলে স্ট্রেচার নড়ে। স্ট্রেচার নড়লে শরীর পড়ে যায়। শরীর পড়ে গেলে পরিবার চিৎকার করে। তাই কাঁদেন না। ভেতরে রাখেন। ভেতরটা ভারী হয়ে গেছে কুড়ি বছরে।
২
মর্গ হাসপাতালের পেছনে। আলাদা ভবন। একতলা। দেয়ালের রং ধূসর। সবুজ ছিল একসময়, এখন ধূসর। দরজা লোহার। ভারী। খুলতে গেলে শব্দ হয়। ক্যাঁচ ক্যাঁচ। এই শব্দ শামসুলের জীবনের সাউন্ডট্র্যাক।
ভেতরে ঠান্ডা। ফ্রিজার আছে ছয়টা। চারটা কাজ করে। দুটো বন্ধ। কম্প্রেসর নষ্ট হয়ে গেছে। রিপোর্ট করেছেন। ছয় মাস আগে। কেউ আসেনি ঠিক করতে।
গন্ধ। মর্গের গন্ধ। ফরমালিনের ঝাঁঝ, পচনের মিষ্টি-তিক্ত, জীবাণুনাশকের রাসায়নিক। তিনটা গন্ধ মিলে একটা গন্ধ। পৃথিবীতে আর কোথাও এই গন্ধ নেই। শুধু মর্গে। শামসুল এই গন্ধ কুড়ি বছর ধরে শুঁকছেন। নাক আর আলাদা করতে পারে না। গন্ধটা শামসুলের শরীরে ঢুকে গেছে। চামড়ায়, চুলে, কাপড়ে, নিঃশ্বাসে।
স্ত্রী রোকেয়া কাপড় আলাদা ধোয়েন। শামসুলের কাপড় পরিবারের বাকি কাপড়ের সাথে ধোয়া হয় না। আলাদা বালতি। আলাদা সাবান। আলাদা দড়ি। কারণ গন্ধ লেগে যায়।
শামসুল বাড়ি ফিরে প্রথমে গোসল করেন। পাঁচবার সাবান মাখেন। শ্যাম্পু দেন। তবু গন্ধ যায় না পুরোপুরি। গন্ধ চামড়ার নিচে ঢুকে গেছে। কুড়ি বছরের গন্ধ সাবান দিয়ে ওঠে না।
৩
পাড়ায় সবাই জানে শামসুল কী করেন।
"মর্গের শামসুল।" এই নামে চেনে। আব্দুল শামসুল হক নয়, "মর্গের শামসুল।" পরিচয় পেশায় গেঁথে গেছে। মানুষ পরিচয় ছাড়া বাঁচতে পারে না, কিন্তু পরিচয় যখন শেকল হয়ে যায় তখন বাঁচাটাও কঠিন হয়ে যায়।
পাড়ার মানুষ কথা বলেন। সামনে না, পেছনে। "ওই যে মর্গের লোকটা।" "ওর গা থেকে গন্ধ আসে।" "ওর বাড়িতে কে যায়?" "ওর মেয়ের বিয়ে হবে কেমনে?"
শামসুলের দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে কলেজে পড়ে। ছোট ছেলে নবম শ্রেণিতে। মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে।
বড় ছেলে সুমন কলেজে বাবার পেশা বলে না। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলে বলে, "হাসপাতালে কাজ করেন।" ভুল বলে না। সত্য বলে না। মাঝামাঝি একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু একদিন একটা বন্ধু জেনে গেল। তারপর সবাই জানল। সুমনকে কেউ কিছু বলেনি সরাসরি। কিন্তু একটু দূরত্ব তৈরি হলো। অদৃশ্য। পরিমাপযোগ্য না। কিন্তু সুমন টের পায়।
ছোট ছেলে রাহুলের সাথে পাড়ার ছেলেরা খেলে না। "ও তো মর্গের ছেলে। ওর হাতে ধরলে অপয়া হয়।" বাচ্চারা বলে। বাচ্চারা নিজে থেকে বলে না। বাবা-মায়ের কাছ থেকে শোনে। বাবা-মা পেছনে বলেন, বাচ্চারা সামনে বলে। এভাবেই কলঙ্ক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যায়।
মেয়ে সুমাইয়া চুপচাপ। স্কুলে কেউ জানে না বাবা কী করেন। সুমাইয়া বলে না। কেউ জিজ্ঞেস করলে চুপ থাকে। চুপ থাকাটাও একটা উত্তর। কিন্তু সুমাইয়ার চুপ থাকায় লজ্জা নেই। ভয় আছে। ভয় যে জানলে ওরাও দূরে সরে যাবে। যেমন পাড়ার বাচ্চারা সরে গেছে।
৪
বিয়েতে ডাকে না।
পাড়ায় বিয়ে হলে সবাই দাওয়াত পায়। শামসুল পান না। প্রথম দিকে কষ্ট পেতেন। এখন পান না। কষ্ট পাওয়ার জন্যও শক্তি লাগে। সেই শক্তি শেষ হয়ে গেছে।
একবার, বছর চারেক আগে, পাশের বাড়ির রফিক ভাইয়ের ছেলের বিয়েতে ডেকেছিলেন। রোকেয়া গেছিলেন। শামসুল যাননি। "কাজ আছে," বলেছিলেন। কাজ ছিল না। ভয় ছিল। বিয়ের খাবারে মানুষ একসাথে বসে খায়। শামসুল বসলে পাশের মানুষ কী ভাববে? মর্গের লোক। খাবারে গন্ধ লাগবে। খাবারটা বিষাক্ত মনে হবে। কেউ মুখে বলবে না। কিন্তু চোখে বলবে। চোখের ভাষা মুখের ভাষার চেয়ে নিষ্ঠুর।
জানাজায় ডাকে। সেটা মজার ব্যাপার। বিয়েতে ডাকে না, কিন্তু জানাজায় ডাকে। কারণ জানাজায় মৃত্যু আছে। মৃত্যুর সাথে শামসুল পরিচিত। মৃত্যু আর শামসুল এক সারিতে বসেন। সেখানে কেউ আপত্তি করে না।
মানুষ মরলে আমাকে ডাকে। মানুষ বাঁচলে আমাকে এড়ায়।
শামসুল একবার ভেবেছিলেন এই কথাটা কাউকে বলবেন। সুপারভাইজারকে। কিন্তু সুপারভাইজার বললেন, "তুমি তো মর্গে কাজ করো, এটা তো স্বাভাবিক।" স্বাভাবিক। কার কাছে? শামসুল জিজ্ঞেস করেননি। জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসবে না। কারণ স্বাভাবিকের সংজ্ঞা যে ঠিক করে, সে মর্গে কাজ করে না।
হাসপাতালে ডাক্তার আছেন, নার্স আছেন, টেকনিশিয়ান আছেন, ওয়ার্ড বয় আছেন। সবাই একই ছাদের নিচে কাজ করেন। কিন্তু মর্গের ওয়ার্ড বয় আলাদা। ক্যান্টিনে একসাথে বসেন না। "মর্গ থেকে এসেছে" বললে পাশের চেয়ার থেকে মানুষ উঠে যায়। খাবারের প্লেট সরিয়ে নেয়। কেউ মুখে বলে না কিছু। কিন্তু শরীরের ভাষা বলে। শরীর মিথ্যা বলতে পারে না।
৫
কুড়ি বছর। শামসুল হিসাব করেছেন। প্রতিদিন গড়ে তিনটা লাশ। বছরে এক হাজার। কুড়ি বছরে কুড়ি হাজার। কুড়ি হাজার মৃতদেহ শামসুলের হাত দিয়ে গেছে। কুড়ি হাজার পরিবারের কান্না শুনেছেন। কুড়ি হাজারবার মর্গের লোহার দরজা খুলেছেন, ফ্রিজারের ড্রয়ার টেনেছেন, শরীর রেখেছেন, ড্রয়ার বন্ধ করেছেন।
প্রতিটা শরীর আলাদা। কিন্তু মৃত্যু একই। মৃত্যুর পর সব শরীর এক হয়ে যায়। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, পুরুষ-নারী। ফ্রিজারে সবাই সমান। সেখানে কেউ বড় না, কেউ ছোট না।
শামসুল এই সত্যটা কুড়ি বছরে শিখেছেন। কিন্তু এই সত্য কাউকে বলতে পারেন না। কারণ কেউ শুনতে চায় না। মৃত্যুর কথা কেউ শুনতে চায় না। মৃত্যুর সাথে যে কাজ করে, তার কথাও কেউ শুনতে চায় না।
৬
বেতন বারো হাজার টাকা। কুড়ি বছরের চাকরি। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সর্বনিম্ন গ্রেড। ইনক্রিমেন্ট হয়েছে কয়েকবার। প্রতিবার দুইশো-তিনশো টাকা। বারো হাজারে তিনটা সন্তান, স্ত্রী, ভাড়া, খাওয়া, স্কুলের খরচ। হিসাব মেলে না। কখনো মেলে না। প্রতি মাসের শেষে দুই-তিন হাজার টাকা ধার। পরের মাসে সেই ধার শোধ। আবার ধার। বৃত্ত।
রোকেয়া সেলাই করেন। পাড়ার মেয়েদের কাপড় সেলাই করেন। মাসে তিন-চার হাজার আসে। সেটা দিয়ে চলে কোনোমতে।
শামসুল কখনো অন্য কাজ খোঁজেননি। কারণ এই কাজ ছাড়া আর কী পারেন? কুড়ি বছর ধরে লাশ বহন করেছেন। অন্য কোনো দক্ষতা তৈরি হয়নি। অন্য কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সিভিতে কী লিখবেন? "দক্ষতা: মৃতদেহ পরিবহন, মর্গ পরিষ্কার, ফ্রিজার রক্ষণাবেক্ষণ।"
কে নেবে? কোন কোম্পানি? কোন দোকান? কোন অফিস?
পরিচয় যখন মৃত্যুর সাথে জড়িয়ে যায়, তখন জীবনের দিকে ফিরে তাকানো কঠিন হয়ে যায়।
একবার চেষ্টা করেছিলেন। একটা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে। ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করলেন, "আগে কোথায় কাজ করতেন?" শামসুল বললেন, "হাসপাতালে।" "কী কাজ?" শামসুল চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "ওয়ার্ড বয়।" "কোন ওয়ার্ডে?" শামসুল বললেন, "মর্গে।"
ইন্টারভিউয়ারের চেহারা বদলে গেল। সূক্ষ্ম পরিবর্তন। চোখে একটু সঙ্কোচ। ঠোঁটে একটু টান। "আমরা জানাবো।" জানায়নি। শামসুল অপেক্ষা করেছিলেন দুই সপ্তাহ। ফোন করেছিলেন একবার। "পজিশনটা ফিল আপ হয়ে গেছে।" শামসুল জানেন, পজিশন ফিল আপ হয়নি। মর্গ ফিল আপ করেছে। শামসুলের মর্গ।
৭
রাতে বাড়ি ফিরলেন শামসুল। গোসল করলেন। পাঁচবার সাবান। তিনবার শ্যাম্পু। কাপড় বদলালেন। আলাদা বালতিতে কাপড় ভেজালেন।
রোকেয়া ভাত বেড়ে দিলেন। ডাল, আলুভর্তা, শুটকি ভর্তা। শামসুল খান। চুপচাপ। ছেলেমেয়েরা খায়। সুমন চুপচাপ। রাহুল চুপচাপ। সুমাইয়া চুপচাপ।
এই পরিবারে কথা কম হয়। কারণ কথা বললেই কোনো না কোনোভাবে বাবার কাজের কথা উঠে আসে। বাবার কাজের কথা উঠলে সবার মুখ ভারী হয়ে যায়। তাই কথা কম।
একবার রাহুল জিজ্ঞেস করেছিল, "বাবা, তুমি কেন এই কাজ করো?"
শামসুল কিছুক্ষণ চুপ ছিলেন। তারপর বললেন, "কারণ কেউ না কেউ তো করবে। কেউ যদি না করে, তাহলে মৃতদের কী হবে? তারা ওয়ার্ডেই পড়ে থাকবে? করিডোরে? কেউ তো তাদের শেষ জায়গায় নিয়ে যাবে। আমি নিয়ে যাই।"
রাহুল কিছু বলেনি। হয়তো বুঝেছে, হয়তো বোঝেনি। কিন্তু আর জিজ্ঞেস করেনি।
শামসুলের উত্তরটা সত্য, কিন্তু পূর্ণ সত্য না। পূর্ণ সত্য হলো চাকরি পাওয়া কঠিন ছিল। কুড়ি বছর আগে শামসুলের বয়স পঁচিশ। পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। রিকশা চালিয়েছেন, হোটেলে কাজ করেছেন, গার্মেন্টসে চেষ্টা করেছেন। কিছু টেকেনি। একজন পরিচিত বলল, "হাসপাতালে একটা পদ খালি আছে। চতুর্থ শ্রেণি।" শামসুল গেলেন। পদটা মর্গে। অন্য কেউ চায়নি। শামসুল নিলেন। কারণ শামসুলের বিকল্প ছিল না।
খাওয়ার পর শামসুল বারান্দায় বসেন। একটা চেয়ারে। পুরনো প্লাস্টিকের চেয়ার। বসে আকাশ দেখেন। ঢাকায় তারা দেখা যায় না। ধোঁয়া, আলো, ধুলো সব মিলে আকাশকে ঢেকে দেয়। কিন্তু শামসুল তাকান। কারণ তাকানোর আর কোথাও নেই।
রোকেয়া এসে বসেন পাশে। কিছু বলেন না। শুধু বসেন। কুড়ি বছরের সংসার। কুড়ি বছরের নীরবতা। কুড়ি বছরের গন্ধ। রোকেয়া অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। গন্ধও, নীরবতাও।
"সুমাইয়ার স্কুলের ফি দিতে হবে," রোকেয়া বললেন।
"কত?"
"বারোশো।"
শামসুল মাথা নাড়লেন। বারোশো। বেতনের দশ ভাগ। দেবেন। কোনোভাবে দেবেন। কারণ মেয়ে পড়বে। মেয়ে পড়লে মেয়ের পরিচয় বদলাবে। মেয়ে ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, শিক্ষক হবে। মেয়ের পরিচয় "মর্গের শামসুলের মেয়ে" থাকবে না। মেয়ের পরিচয় হবে মেয়ের নিজের।
সুমাইয়া পড়ে ভালো। ক্লাসে প্রথম পাঁচে থাকে। গণিতে ভালো। বিজ্ঞানে ভালো। শিক্ষকরা বলেন, "এই মেয়ে পারবে।" শামসুল শোনেন। বুকের ভেতর কিছু একটা জ্বলে। আগুন না, আলো। ছোট্ট আলো। সেই আলো দিয়ে শামসুল মর্গের অন্ধকার সহ্য করেন। সেই আলো দিয়ে পাড়ার মানুষের চোখ সহ্য করেন। সেই আলো দিয়ে গন্ধ সহ্য করেন।
একটা বাবার কাছে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে বেশি আলো দেয়। শামসুলের নিজের ভবিষ্যৎ নেই। মর্গ আছে, ফ্রিজার আছে, লাশ আছে। পেনশন পর্যন্ত এই পথ। কিন্তু সুমাইয়ার পথ আলাদা। সুমাইয়ার পথে মর্গ নেই। সুমাইয়ার পথে বই আছে, স্কুল আছে, পরীক্ষা আছে, সম্ভাবনা আছে।
৮
পরদিন সকালে শামসুল হাসপাতালে গেলেন। ইউনিফর্ম পরলেন। নীল। পুরনো। দুটো ছেঁড়া জায়গা সেলাই করা। রোকেয়া সেলাই করে দিয়েছেন।
মর্গের দরজা খুললেন। ক্যাঁচ ক্যাঁচ। ভেতরে ঢুকলেন। ফ্রিজারগুলো দেখলেন। গতকালের তিনটা লাশ আছে। পরিবার এসে নিয়ে যাবে। পোস্টমর্টেমের একটা আছে। পুলিশ কেস।
মেঝে মুছলেন। ফিনাইল দিয়ে। প্রতিদিন সকালে মর্গের মেঝে মোছেন। এটা তাঁর প্রথম কাজ। পরিষ্কার রাখেন। কারণ মৃতদের জায়গাও পরিষ্কার থাকা উচিত। মৃতরা কিছু বলতে পারেন না। তাঁদের হয়ে শামসুল বলেন।
দশটায় প্রথম কল আসবে। কোনো ওয়ার্ড থেকে। কোনো পরিবারের কান্না আসবে। কোনো স্ট্রেচার আসবে। শামসুল তৈরি থাকবেন। কারণ মৃত্যু অপেক্ষা করে না। মৃত্যু আসে, শামসুল যায়।
দরজা বন্ধ করলেন।
একটু পর একটা পরিবার এলো। গতকালের বৃদ্ধার পরিবার। মেয়ে এসেছেন, জামাই এসেছেন, নাতি এসেছে। কাগজপত্র আছে। রিলিজ অর্ডার আছে। শামসুল ফ্রিজার খুললেন। শরীর বের করলেন। পরিবারকে দেখালেন। মেয়ে আবার কাঁদলেন। নাতি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট ছেলে। দাদিকে দেখছে। বুঝতে পারছে না দাদি কেন চুপ।
শামসুল শরীরটা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিলেন। সাবধানে। যত্নে। কারণ মৃতদেরও যত্ন প্রাপ্য। জীবিতরা ভুলে যায়, কিন্তু শামসুল ভোলেন না। তাঁর হাত দিয়ে শেষ স্পর্শ হয়। তাঁর হাত যত্নশীল হওয়া উচিত।
বাইরে রোদ উঠেছে। হাসপাতালের মাঠে গাছপালা আছে। পাখি ডাকছে। জীবন চলছে।
শামসুলও চলছেন। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে। দুটোকেই বহন করে। একটা কাঁধে জীবন, আরেকটা কাঁধে মৃত্যু। কোনটা ভারী? দুটোই সমান। কিন্তু মৃত্যুর দিকটায় মানুষ তাকায়। জীবনের দিকটায় কেউ তাকায় না।
মর্গের দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। গত বছরের। কেউ বদলায়নি। শামসুলও বদলাননি। কারণ মর্গে তারিখের দরকার নেই। মর্গে সময় থেমে আছে। বাইরে দিন যায়, রাত আসে, ঋতু বদলায়। মর্গে সবসময় একই। ঠান্ডা। চুপ। অন্ধকার। ফ্রিজারের গুনগুন শব্দ।
শামসুল এই গুনগুন শব্দ শোনেন। বাড়িতে যখন সব চুপ থাকে, তখনো এই শব্দ কানে বাজে। ফ্রিজারের কম্প্রেসরের শব্দ। কুড়ি বছর ধরে এই শব্দ শুনেছেন। এই শব্দ তাঁর হৃদস্পন্দনের সাথে মিশে গেছে।
আমার পরিচয় মৃত্যুর সাথে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু আমি বেঁচে আছি। প্রতিদিন বেঁচে আছি। প্রতিদিন মৃতদের বহন করে, জীবিতদের কান্না শুনে, গন্ধ গায়ে মেখে, বাড়ি ফিরে গোসল করে, ভাত খেয়ে, ছেলেমেয়ের মুখ দেখে। বেঁচে আছি।
এটাও একটা জীবন। এটাও যেভাবে চলে, সেভাবে চলে।