প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক

আমি পড়াই। কিন্তু যারা আসে না, তাদেরও পাস করাতে হয়

পর্ব ২০ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আনিসুর রহমান সকাল সাতটায় স্কুলে আসেন। স্কুল শুরু হয় আটটায়। এক ঘণ্টা আগে আসেন। কারণ ক্লাসরুম খুলতে হয়, বেঞ্চ মুছতে হয়, ব্ল্যাকবোর্ড পরিষ্কার করতে হয়। আয়া আছে একজন, কিন্তু আসেন সাড়ে আটটায়। তখন অ্যাসেম্বলি শেষ। ক্লাস শুরু হয়ে যায়। তাই আনিসুর স্যার নিজেই করেন।

মাগুরা জেলার একটা ইউনিয়নে সরকারি প্রাইমারি স্কুল। টিনের ছাদ। ইটের দেয়াল। দেয়ালে সাদা চুন, অনেক জায়গায় উঠে গেছে। জানালায় গ্রিল আছে, কাচ নেই। বর্ষায় বৃষ্টি ঢোকে। শীতে ঠান্ডা হাওয়া ঢোকে। গরমে পাখা ঘোরে, একটা, মাঝখানে, ষাটজন ছাত্রের ঘরে একটা পাখা।

ষাটজন। একটা ক্লাসরুমে। বেঞ্চ আছে পনেরোটা। এক বেঞ্চে চারজন। মানে ষাটজন ধরে ঠিকমতো। কিন্তু বেঞ্চ ভাঙা তিনটা। বাকি বারোটায় চারজন করে আটচল্লিশ। বাকি বারোজন দাঁড়িয়ে থাকে বা মেঝেতে বসে। মেঝেতে সিমেন্ট। ঠান্ডা। শীতে বাচ্চারা কাঁপে। গরমে ঘামে।

আনিসুর স্যার পনেরো বছর ধরে এই স্কুলে পড়ান। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফাইভ। সব বিষয়। গণিত, বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, সমাজ, ধর্ম। ছয়টা বিষয়। একজন শিক্ষক। আরেকজন শিক্ষক আছেন, শামীমা ম্যাডাম, কিন্তু তিনি হেড টিচার। অফিসের কাজ, রিপোর্ট, ইউনিয়ন মিটিং, উপজেলা মিটিং, SLIP বাজেট, মিড-ডে মিল কর্মসূচি। পড়ানোর সময় পান না।

আনিসুর স্যার পড়ান। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা। ছয় ঘণ্টা। কিন্তু ছয় ঘণ্টায় পাঁচটা ক্লাস পড়ান। কারণ প্রথম শ্রেণি আর দ্বিতীয় শ্রেণি একসাথে বসে। তৃতীয় আর চতুর্থ একসাথে। পঞ্চম আলাদা। মাল্টিগ্রেড টিচিং। সরকারের নাম দেওয়া আছে। বাস্তবে এটা একজন মানুষের তিনজনের কাজ করা।

চক নেই।

স্কুলে চক বরাদ্দ হয় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে। এক কোয়ার্টারে দুই বাক্স। এক বাক্সে পঞ্চাশটা চক। মোট একশো চক। তিন মাসে একশো চক। দিনে গড়ে একটার একটু বেশি। কিন্তু আনিসুর স্যার দিনে চার-পাঁচটা ক্লাস পড়ান। প্রতিটা ক্লাসে বোর্ডে লেখেন। একটা চক দিয়ে একটা ক্লাস চলে না। দুই ক্লাসেই শেষ।

চক শেষ হয়ে যায় দুই মাসে। তৃতীয় মাস চক নেই। তখন আনিসুর স্যার নিজের পকেট থেকে কেনেন। হকারের কাছ থেকে। বারোটা চক বিশ টাকা। মাসে তিন-চার প্যাকেট লাগে। ষাট-আশি টাকা। বছরে সাতশো-আটশো টাকা। নিজের পকেট থেকে।

বেতন ষোলো হাজার টাকা। পনেরো বছরের চাকরি। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক। ইনক্রিমেন্ট হয়েছে, কিন্তু মূল বেতন বারো হাজারের কাছাকাছি, বাড়িভাড়া আর মেডিকেল ভাতা মিলিয়ে ষোলো।

ষোলো হাজার টাকায় পরিবার চালান। স্ত্রী, দুই সন্তান। বড় মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে, ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে। ছোট ছেলে এই স্কুলেই পড়ে। বাবার ক্লাসে বসে। বাবা পড়ান, ছেলে শোনে। এটা সুবিধা না, অসুবিধা। কারণ ছেলে বাড়িতেও বাবাকে স্যার বলে। "স্যার" আর "বাবা" মিশে যায়। সীমানাটা ঝাপসা হয়ে যায়।

টেক্সটবুক তিনটা। সরকারি ফ্রি। প্রতিটা ছাত্রের জন্য তিনটা বই। কিন্তু সংখ্যায় কম আসে। ষাটজন ছাত্রের জন্য চল্লিশ সেট আসে। বাকি কুড়িজনের বই? নেই। তারা পাশের জনের বই দেখে। তিনজন মিলে একটা বই।

কিন্তু তিনজন মিলে একটা বই পড়া কঠিন। কারণ একজন দ্রুত পড়ে, আরেকজন ধীরে। একজন বই নিয়ে যায় বাড়িতে, বাকি দুজন পায় না। পরদিন পড়া করে আসতে পারে না। আনিসুর স্যার বলেন, "পড়া করে এসেছিস?" তারা মাথা নামায়।

আনিসুর স্যার জানেন কারণটা। বই নেই। বাড়িতে আলো নেই, কিছু বাড়িতে সোলার প্যানেল আছে, কিন্তু সন্ধ্যার পর ব্যাটারি দুর্বল হয়ে যায়। বাড়িতে জায়গা নেই, একটা ঘরে চারজন-পাঁচজন থাকে। পড়ার টেবিল নেই। কাঠের টুল, বা চৌকির ওপর বই রেখে পড়ে। মশা কামড়ায়। গরমে ঘামে।

এই শিশুরা পড়ালেখা করে। কীভাবে? আনিসুর স্যার জানেন না। কিন্তু করে। কেউ কেউ ভালো করে। প্রতি বছর দুই-তিনজন ট্যালেন্টপুলে স্কলারশিপ পায়। সেই দুই-তিনজনের চোখে একটা আগুন থাকে। সেই আগুন পরিবেশ দেয়নি। সেই আগুন ভেতর থেকে এসেছে। আনিসুর স্যারের কাজ সেই আগুনকে বাঁচিয়ে রাখা।

একদিন একজন অভিভাবক এলেন।

মতিন মিয়া। কৃষক। মুখ রোদে পোড়া। হাত রুক্ষ। লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা। পায়ে চপ্পল নেই। খালি পা।

"স্যার, আমার ছেলে ফেল করেছে কেন?"

ছেলে সাইফুল। ক্লাস ফোর। বার্ষিক পরীক্ষায় গণিত আর ইংরেজিতে ফেল।

"সাইফুল তো স্কুলে আসে না, মতিন ভাই।"

"আসে না?"

"এ বছর দুইশো দিন স্কুল ছিল। সাইফুল এসেছে বাহাত্তর দিন।"

মতিন মিয়া চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "মাঠে কাজ করে। ধানের সময় মাঠে যায়। সবজির সময় মাঠে যায়। গরু চরায়।"

আনিসুর স্যার জানেন। সাইফুল মাঠে কাজ করে। সাইফুলের বাবার জমি দুই বিঘা। সেই জমিতে ধান হয়, সবজি হয়, কিন্তু শ্রমিক রাখার সামর্থ্য নেই। ছেলেকে নিয়ে যায় বাবা। সকালে মাঠে, দুপুরে মাঠে, বিকেলে মাঠে। স্কুলের সময় নেই।

"কিন্তু পরীক্ষায় পাস করাতে হবে, স্যার।"

আনিসুর স্যার কিছু বলেন না কিছুক্ষণ। কী বলবেন? ছেলে আসে না, পড়ে না, পরীক্ষা দিতে আসে, লিখতে পারে না, ফেল করে। তারপর বাবা আসে, বলে পাস করাতে হবে। কী করবেন আনিসুর স্যার?

"মতিন ভাই, যে ছেলে স্কুলে আসে না, তাকে আমি কীভাবে পাস করাব?"

"অন্য স্যাররা পাস করায়। শুনি অনেক স্কুলে সবাইকে পাস করায়।"

আনিসুর স্যার জানেন এটা সত্য। অনেক স্কুলে সবাইকে পাস করায়। কারণ ফেলের হার বেশি হলে সরকারের রিপোর্টে খারাপ দেখায়। উপজেলা শিক্ষা অফিসার ফোন করেন: "ফেলের হার কমান।" হেড টিচার বলেন: "সবাইকে পাস করাও।" শিক্ষক পাস করান। পড়া না জেনে পাস। হাতের লেখা না জেনে পাস। অঙ্ক না পেরে পাস।

মতিন মিয়া চলে গেলেন। আনিসুর স্যার ক্লাসে ফিরলেন।

ক্লাস ফাইভ। পঁচিশজন ছাত্রছাত্রী। এদের মধ্যে আটজন নিয়মিত আসে। বাকিরা আসে-যায়। মৌসুমের ওপর নির্ভর করে। ধানের মৌসুমে আসে না। বিয়ের মৌসুমে আসে না। বন্যায় আসে না। শীতে আসে না, কারণ কাপড় নেই, ঠান্ডায় কাঁপে।

আটজন যারা নিয়মিত আসে, তাদের আনিসুর স্যার চেনেন ভালো করে।

রুবিনা। মেধাবী। গণিতে ভালো। বাবা ভ্যানচালক। মা পরের বাড়িতে কাজ করেন। রুবিনা প্রতিদিন আসে। বই নিয়ে আসে। খাতা নিয়ে আসে। কলম আছে একটা। সেটা দিয়েই সব লেখে। কলমের কালি শেষ হলে রিফিল কেনে। রিফিল পাঁচ টাকা।

জামাল। পড়তে পারে, লিখতে পারে না ভালো। হাতের লেখা খারাপ। কারণ বাড়িতে অনুশীলনের জায়গা নেই। বাবা রিকশা চালান। মা অসুস্থ। জামাল রান্না করে বাড়িতে। ছোট ভাইবোনকে দেখে। তারপর যে সময় পায়, পড়ে। সময় পায় কম।

শিউলি। চুপচাপ। কথা বলে না ক্লাসে। জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়, কিন্তু গলা নিচু। আনিসুর স্যার জানেন কারণটা। শিউলির বাবা মারেন। মাকে মারেন, শিউলিকে মারেন। শিউলি ভয় পায়। সবকিছু ভয় পায়। স্কুলে আসে কারণ স্কুলে কেউ মারে না। স্কুল শিউলির আশ্রয়। বাড়ি না, স্কুল। এটা আনিসুর স্যারের বুকে বাজে। স্কুলটা পড়ার জায়গা, কিন্তু কোনো কোনো শিশুর কাছে স্কুল বাঁচার জায়গা।

দুপুরে স্কুল ছুটি। বাচ্চারা চলে গেল। আনিসুর স্যার বসে আছেন। খাতা দেখছেন। ক্লাস থ্রির গণিতের খাতা। পঁচিশটা খাতা। পনেরোটায় উত্তর ভুল। দশটায় ঠিক। কিন্তু দশটার মধ্যে তিনটা হুবহু একই উত্তর। মানে নকল করেছে।

আনিসুর স্যার জানেন কারা নকল করেছে। পাশাপাশি বসে। একজন দেখে লেখে, অন্যজন দেখে লেখে। এটা দোষ? দোষ। কিন্তু এটাও সত্য যে যে ছেলেটা নকল করেছে, সে বুঝতে চায়। সে পারে না বলে দেখে লেখে। সে যদি বুঝত, দেখার দরকার হতো না। আনিসুর স্যারের দায়িত্ব বোঝানো। কিন্তু ষাটজনকে একজন শিক্ষক কতটুকু বোঝাবেন?

প্রতিটা শিশুর মাথা আলাদা। প্রতিটা শিশু আলাদা গতিতে শেখে। কেউ দ্রুত, কেউ ধীর। কেউ চোখে দেখে শেখে, কেউ কানে শুনে শেখে, কেউ হাতে করে শেখে। একটা ক্লাসে ষাটজনকে একভাবে পড়ালে ষাটজন একভাবে শিখবে না। এটা পেডাগজির প্রথম পাঠ। আনিসুর স্যার জানেন।

কিন্তু জানলে কী হবে? একটা ক্লাসরুম, একটা ব্ল্যাকবোর্ড, একটা চক, ষাটটা মুখ। কী করবেন? প্রতিটা শিশুর কাছে আলাদা যাবেন? সময় নেই। কারণ পরের ক্লাসে আরো ষাটজন অপেক্ষা করছে।

বিকেলে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে ফোন এলো। শামীমা ম্যাডাম ধরলেন। কথা শেষে আনিসুর স্যারকে বললেন।

"বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে ফেলের হার ২৮ পার্সেন্ট। উপজেলা অফিসার বলেছেন কমাতে হবে। সর্বোচ্চ ১০ পার্সেন্ট।"

"কীভাবে কমাব? যারা পারে না তাদের পাস করাব?"

"নম্বর বাড়িয়ে দাও। গ্রেস মার্কস।"

আনিসুর স্যার চুপ করে রইলেন। গ্রেস মার্কস। মানে যে শিশু গণিতে দশ পেয়েছে, তাকে তেত্রিশ দাও। পাস। যে শিশু ইংরেজিতে পাঁচ পেয়েছে, তাকে তেত্রিশ দাও। পাস। কাগজে পাস। বাস্তবে? বাস্তবে সে যোগ-বিয়োগ পারে না। বাস্তবে সে A-B-C লিখতে পারে না। কিন্তু কাগজে পাস। সার্টিফিকেটে পাস।

এই শিশু ক্লাস ফাইভ পাস করে ক্লাস সিক্সে যাবে। ক্লাস সিক্সে গিয়ে কিছু বুঝবে না। কারণ ফোরের ভিত্তি নেই। ক্লাস সেভেনে আরো বুঝবে না। এইটে আরো কম। নাইনে ড্রপ আউট। রাস্তায়। রিকশায়। গার্মেন্টসে। ইটভাটায়।

আনিসুর স্যার জানেন এই গল্প। কারণ এই গল্প প্রতি বছর হয়। প্রতি বছর কিছু শিশু পাস করে যারা পাস করার যোগ্য না। তারা পরে ঝরে পড়ে। তখন কেউ জিজ্ঞেস করে না, "এই শিশু কীভাবে পাস করল?" তখন বলে, "গরিবের ছেলে, পড়াশোনা করতে পারেনি।" দোষ গরিবের। দোষ সিস্টেমের না।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন। স্ত্রী নাসরিন চা দিলেন। আনিসুর স্যার চা খান। চায়ে চিনি কম। অভ্যাস। শিক্ষকের অভ্যাস কম দিয়ে চলা।

ছোট ছেলে তানভীর এলো। "বাবা, অঙ্ক বুঝতে পারছি না।"

আনিসুর স্যার ছেলেকে পড়ালেন। ভগ্নাংশ। এক-তৃতীয়াংশ আর এক-চতুর্থাংশ যোগ করো। ছেলে পারল না প্রথমে। আনিসুর স্যার বোঝালেন। ধীরে। একটা রুটি নিলেন। তিন ভাগ করলেন। "এটা এক-তৃতীয়াংশ।" চার ভাগ করলেন। "এটা এক-চতুর্থাংশ।" ছেলে বুঝল।

এভাবে পড়াতে হয়। একজন একজন করে। হাতে ধরে। চোখে চোখ রেখে। সময় নিয়ে। ষাটজনের ক্লাসে এটা সম্ভব না। কিন্তু একজনের সাথে সম্ভব।

আনিসুর স্যারের মাথায় একটা প্রশ্ন ঘোরে। যদি প্রতিটা ক্লাসে কুড়িজন থাকত? যদি দুইজন শিক্ষক থাকতেন? যদি চক কিনতে না হতো নিজের পকেট থেকে? যদি বই থাকত সবার জন্য? যদি ক্লাসরুমে দুটো পাখা থাকত? যদি জানালায় কাচ থাকত?

যদি, যদি, যদি।

"যদি" দিয়ে স্কুল চলে না। "আছে" দিয়ে চলে। যা আছে তা নিয়ে চলেন আনিসুর স্যার। একটা চক, একটা বোর্ড, একটা গলা, ষাটটা কান। এই নিয়ে পড়ান।

রাতে আনিসুর স্যার বারান্দায় বসলেন। মাগুরার আকাশে তারা দেখা যায়। ঢাকার মতো না। এখানে আকাশ খোলা। তারা ঝকমক করে। চাঁদ উঠেছে।

ভাবলেন। পনেরো বছরে কতজনকে পড়িয়েছেন। হিসাব করলেন। প্রতি বছর প্রায় তিনশো ছাত্রছাত্রী। পনেরো বছরে সাড়ে চার হাজার। সাড়ে চার হাজার শিশু তাঁর ক্লাসে বসেছে, তাঁর গলা শুনেছে, তাঁর চক দেখেছে।

তাদের মধ্যে কতজন পড়াশোনা চালিয়ে গেছে? অর্ধেক? তার কম? কতজন এসএসসি পাস করেছে? কতজন কলেজে গেছে? কতজন চাকরি পেয়েছে?

আনিসুর স্যার জানেন না। কারণ কেউ ফিরে আসে না বলতে। কেউ ফোন করে না বলতে, "স্যার, আমি পেরেছি।" হয়তো পেরেছে। হয়তো পারেনি। কিন্তু আনিসুর স্যার জানেন না।

শিক্ষকের কাজ বীজ বোনা। গাছ দেখা শিক্ষকের ভাগ্যে জোটে না সবসময়। বীজ বোনেন, মাটি দেন, পানি দেন। তারপর শিশু চলে যায়। অন্য স্কুলে, অন্য জেলায়, অন্য জীবনে। গাছ হয় কি না, ফুল ফোটে কি না, ফল ধরে কি না, আনিসুর স্যার জানেন না।

১০

কিন্তু একটা জিনিস জানেন।

আজ সকালে রুবিনা একটা অঙ্ক করেছে। ভগ্নাংশের গুণ। কঠিন অঙ্ক। ক্লাস ফাইভের মেধাবী ছাত্রীরাও পারে না অনেক সময়। রুবিনা পেরেছে। নিজে নিজে। বোর্ডে গিয়ে করেছে। আনিসুর স্যার দেখেছেন।

রুবিনার চোখে সেই আগুন ছিল। সেই আগুন যেটা বই থেকে আসে না, শিক্ষক থেকে আসে না, স্কুল থেকে আসে না। সেই আগুন ভেতর থেকে আসে। আনিসুর স্যারের কাজ সেই আগুনে হাওয়া দেওয়া। বেশি কিছু করতে পারেন না। শুধু হাওয়া দিতে পারেন।

আমি পড়াই। কিন্তু যারা আসে না, তাদেরও পাস করাতে হয়। এটা শিক্ষা না, অভিনয়।

আনিসুর স্যার জানেন তিনি অভিনেতা না। তিনি শিক্ষক। কিন্তু সিস্টেম তাঁকে অভিনেতা বানাতে চায়। সিস্টেম চায় কাগজে সব ভালো দেখাক। কাগজে সব পাস করুক। কাগজে সব শিখুক। বাস্তবে যা হোক।

আনিসুর স্যার অভিনয় করেন না। পড়ান। যারা আসে তাদের পড়ান। যারা আসে না তাদের জন্য অপেক্ষা করেন। যারা পারে না তাদের আবার বোঝান। যারা পারে তাদের আরো শেখান।

বেতন ষোলো হাজার। চক নিজে কেনেন। বই কম। পাখা একটা। বেঞ্চ ভাঙা। জানালায় কাচ নেই। ছাত্র ষাটজন। শিক্ষক একজন।

আনিসুর রহমান। প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক। পনেরো বছর। সাড়ে চার হাজার শিশু। একটা চক। একটা গলা।

চলছেন। কারণ থামলে ষাটটা শিশু বসে থাকবে। ষাটটা চোখ তাকিয়ে থাকবে। ষাটটা কান অপেক্ষা করবে।

তাদের জন্য চলছেন। নিজের জন্য না। কবেই নিজের জন্য চলা বন্ধ হয়ে গেছে।