মাদ্রাসা শিক্ষক
আমি আল্লাহর কালাম শেখাই। দুনিয়া বলে সেটা যথেষ্ট না
১
হাফিজ আমিনুল ইসলাম সকাল পাঁচটায় ওঠেন। ফজরের নামাজ পড়েন। তারপর কুরআন তেলাওয়াত। প্রতিদিন দুই পারা। এটা অভ্যাস না, শরীরের অংশ। শ্বাস যেমন নেওয়া হয়, তেমনি আমিনুলের মুখ থেকে আরবি বের হয়।
তিনি হাফেজ। পুরো কুরআন মুখস্থ। ত্রিশ পারা, ছয় হাজার দুইশো ছেষট্টি আয়াত। চৌদ্দ বছর বয়সে হিফজ সম্পন্ন হয়েছিল। বাবা কেঁদেছিলেন সেদিন। বলেছিলেন, "তুই আমাদের জান্নাতে নিয়ে যাবি।"
বাবা মারা গেছেন। জান্নাত কোথায় আমিনুল জানেন না। কিন্তু কুরআন এখনো তাঁর বুকে আছে। অক্ষরে অক্ষরে।
কাওমি মাদ্রাসা। মোমেনশাহী জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায়। টিনের ছাদ। ইটের দেয়াল, কোনো কোনো জায়গায় প্লাস্টার খসে পড়েছে। একটা মাত্র পাখা, সেটাও অর্ধেক গতিতে ঘোরে। চল্লিশজন ছেলে মেঝেতে বসে। তক্তা নেই। বেঞ্চ নেই। পাটির ওপর কুরআন শরিফ খোলা। ছেলেগুলো দুলছে। আরবি পড়ছে। শব্দগুলো তাদের মুখ থেকে বের হচ্ছে, কিন্তু অর্থ তারা জানে না। আমিনুলও প্রথমে অর্থ জানতেন না। পরে শিখেছেন। কিন্তু অর্থ শেখানো সিলেবাসে নেই। সিলেবাসে আছে: উচ্চারণ। তাজবিদ। মুখস্থ।
২
আমিনুলের ক্লাস সকাল সাতটায় শুরু হয়। প্রথম পিরিয়ড: হিফজ। ছেলেরা গতকালের সবক আবৃত্তি করে। আমিনুল চোখ বন্ধ করে শোনেন। একটা হরফ ভুল হলে থামান। "আবার।" ছেলেটা আবার পড়ে। আবার ভুল। "আবার।" তিনবার ভুল হলে বেত।
বেত আমিনুলের হাতে থাকে সবসময়। বাঁশের, পাতলা, নুয়ে আসা। এটা শাস্তি না, আমিনুল মনে করেন। এটা শৃঙ্খলা। তাঁর উস্তাদও তাঁকে মেরেছিলেন। তাঁর উস্তাদের উস্তাদও। এই ধারা। কুরআন কঠিন। শরীরে কষ্ট না দিলে মস্তিষ্কে ঢোকে না। আমিনুল এটা বিশ্বাস করেন।
দ্বিতীয় পিরিয়ড: আরবি ব্যাকরণ। নাহু, সরফ। ছেলেরা ক্রিয়াপদের রূপ লেখে। কাতাবা, ইয়াকতুবু, উকতুব। অতীত, বর্তমান, আদেশ। কেন এটা শিখছে তারা? কুরআন বুঝতে। হাদিস পড়তে। ফিকহ জানতে। দুনিয়ার আর কোনো কাজে এই আরবি ব্যাকরণ লাগবে না।
তৃতীয় পিরিয়ড: হাদিস। বুখারি শরিফ থেকে। আমিনুল পড়েন, ব্যাখ্যা করেন। ছেলেরা শোনে। নোট করে। পরীক্ষায় লেখে। পাস করে। পরের ক্লাসে ওঠে।
বিকালে ফিকহ। ইসলামি আইন। উত্তরাধিকার। বিবাহ। তালাক। ব্যবসায়িক লেনদেন। সব আরবিতে। সব সপ্তম শতাব্দীর পরিপ্রেক্ষিতে।
৩
আমিনুলের বেতন মাসে পাঁচ হাজার টাকা।
এটা বেতন বলা ঠিক না। এটা ভাতা। মাদ্রাসা চলে দানের ওপর। মসজিদের হুন্ডিতে যা পড়ে, জুমার দিন যা ওঠে, রমজানে যা আসে, সেটা দিয়ে শিক্ষকদের মাসোহারা হয়। কখনো পুরো পাঁচ হাজার পান, কখনো তিন হাজার। কখনো দেরি হয় দুই মাস।
আমিনুলের বউ সাকিনা। তিন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে আয়েশা, ষোলো। মেজো ছেলে ইউসুফ, তেরো, এই মাদ্রাসাতেই পড়ে। ছোটো ছেলে ইব্রাহিম, আট।
পাঁচ হাজার টাকায় পাঁচজনের সংসার। চাল কেজি আটান্ন টাকা। ডাল কেজি একশো বিশ। তেল লিটার দুইশো। পেঁয়াজ, আলু, সবজি। গোশত মাসে একবার, হয়তো দুইবার। ছেলেমেয়েদের জামাকাপড়, ইব্রাহিমের স্কুলের খাতাকলম। সাকিনার ওষুধ। সাকিনার গ্যাস্ট্রিক আছে, মাথাব্যথা আছে, পিঠে ব্যথা আছে। ডাক্তার দেখাতে গেলে ভিজিট পাঁচশো। তাই ডাক্তার দেখায় না।
আমিনুলের কোনো সঞ্চয় নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। বীমা নেই। পেনশন নেই। বোনাস নেই। বৈশাখে যা আসে তাই ঈদে যা আসে তাই। কিছু আসে না।
তিনি কুরআন মুখস্থ জানেন। ত্রিশ পারা। ছয় হাজার দুইশো ছেষট্টি আয়াত। কিন্তু একটা সরকারি ফর্ম পূরণ করতে পারেন না বাংলায়।
৪
গত সপ্তাহে একটা কাগজ এসেছিল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। জমিজমা সংক্রান্ত। বাংলায় লেখা। আমিনুল পড়লেন। শব্দগুলো চেনেন। বাক্যগুলো বুঝলেন না। "দাখিলা," "খতিয়ান," "মৌজা," "পরচা" -- এগুলো তাঁর পরিচিত শব্দ না। তাঁর ভাষা আরবি। কুরআনের আরবি। হাদিসের আরবি। ফিকহের আরবি।
তিনি পাশের বাড়ির মতিন মাস্টারের কাছে গেলেন। মতিন সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়ান। তিনি ফর্মটা পড়ে বুঝিয়ে দিলেন। আমিনুলের এক টুকরো জমি আছে, সেটার নামজারি করতে হবে।
ফর্ম পূরণ করতে হবে। বাংলায়। আমিনুলের হাতের লেখা সুন্দর, আরবিতে। বাংলায় লিখতে গেলে অক্ষরগুলো কাঁপে, বানান ভুল হয়। নিজের নামটা লিখতে পারেন: "হাফিজ আমিনুল ইসলাম।" পিতার নাম। ঠিকানা। এটুকু। তারপর আটকে যান।
মতিন মাস্টার ফর্ম পূরণ করে দিলেন। আমিনুল ধন্যবাদ দিলেন। বাড়ি ফিরলেন। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, তিনি চৌদ্দ বছর বয়সে পুরো কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। ছয় হাজার আয়াত। অথচ একটা সরকারি ফর্ম পূরণ করতে পারেন না। এই ভাবনাটা তাঁর ভেতরে একটা ছুরির মতো ঢুকল। তারপর বের হলো। তিনি এটা নিয়ে ভাবেন না সাধারণত।
৫
ছেলেরা বড় হবে। তারপর কী হবে?
আমিনুল জানেন। তিনি নিজে এই মাদ্রাসার প্রোডাক্ট। তাঁর উস্তাদও ছিলেন। তাঁর উস্তাদের উস্তাদও। ছেলেগুলো হাফেজ হবে। কেউ কেউ আলেম হবে। তারপর কী? তিনটা রাস্তা।
এক: ইমাম। মসজিদে ইমামতি। বেতন তিন থেকে সাত হাজার। থাকার জায়গা মসজিদের পাশে একটা ঘর। সারাজীবন।
দুই: মুয়াজ্জিন। আজান দেওয়া। বেতন আরো কম। দুই থেকে চার হাজার। কোনো মসজিদে থাকার ব্যবস্থা আছে, কোনোটায় নেই।
তিন: মাদ্রাসা শিক্ষক। আমিনুলের মতো। পাঁচ হাজার টাকা। এই মাদ্রাসায়, অথবা অন্য কোনো মাদ্রাসায়, যেখানে টিনের ছাদ ফুটো, পাখা ঘোরে না, আর চল্লিশটা ছেলে মেঝেতে বসে দোলে।
চক্র। আমিনুল এটাকে চক্র বলেন না। তিনি বলেন "আল্লাহর রাস্তা।" কিন্তু চক্রের যে সংজ্ঞা, শুরু আর শেষ একই জায়গায়, সেটা এখানে হুবহু খাটে।
চতুর্থ রাস্তা আছে একটা। মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া। সৌদি, কুয়েত, ওমানে মসজিদে ইমামতি। বেতন ভালো। ত্রিশ-চল্লিশ হাজার। কিন্তু সেখানে যেতে দালালকে তিন-চার লাখ দিতে হয়। আমিনুলের কাছে তিন-চার হাজারও নেই।
তাই তিনি এখানে। ঈশ্বরগঞ্জে। টিনের ছাদের নিচে। পাঁচ হাজার টাকায়।
৬
ইউসুফ আমিনুলের মেজো ছেলে। এই মাদ্রাসায় পড়ে। হিফজ করছে। বারো পারা হয়েছে। আরো আঠারো বাকি। ছেলেটা মেধাবী। স্মৃতিশক্তি ভালো। আমিনুল গর্বিত।
কিন্তু ইউসুফ রাতে বাবার মোবাইলে ইউটিউব দেখে। ফোনটা বাটন ফোন না, একটা পুরনো অ্যান্ড্রয়েড, কেউ দিয়েছিল দান হিসেবে। ইউসুফ দেখে: ক্রিকেট, গান, আর মাঝে মাঝে ইংরেজি শেখার ভিডিও। "হাউ টু স্পিক ইংলিশ ইন থার্টি ডেইজ।"
আমিনুল একদিন দেখে ফেললেন। কিছু বললেন না। ভেতরে কিছু একটা নড়ল। ভয়? লজ্জা? রাগ? তিনি ঠিক বুঝলেন না। ফোনটা নিয়ে রেখে দিলেন।
ইউসুফ চুপ করে রইল।
৭
রহিম মিয়ার ছেলে সোহেল এই মাদ্রাসায় পড়ত। গত মাসে রহিম মিয়া এসেছিলেন। আমিনুলের সামনে বসলেন। চা খেলেন।
"হুজুর, সোহেলকে তুলে নেব।"
আমিনুল চুপ। তিনি জানতেন এটা আসবে। সোহেলের বাবা গ্রামের একমাত্র লোক যে ঢাকা গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করে এসেছে। এখন গ্রামে একটা দোকান দিয়েছে। মোবাইলে টাকা পাঠানোর দোকান। চলে ভালো।
"কোথায় দেবেন?"
"স্কুলে। ইংরেজি শিখবে। কম্পিউটার শিখবে। চাকরি পাবে।"
আমিনুল ভাবলেন কী বলবেন। অনেক কিছু বলতে পারতেন। কুরআনের ফজিলত। হাফেজের মর্যাদা। আখিরাতের পুরস্কার। কিন্তু রহিম মিয়ার চোখে এমন কিছু ছিল যেটা দেখে আমিনুল বুঝলেন, এখানে তর্ক করে লাভ নেই। রহিম মিয়া দুনিয়ার কথা বলছেন। আমিনুল আখিরাতের কথা জানেন। এই দুটো ভাষা একই বাক্যে মেশে না।
"আল্লাহ হাফেজ," বললেন আমিনুল।
সোহেল চলে গেল। তার তক্তা খালি রইল। তক্তা নেই আসলে, পাটি। পাটির ওপর একটা ফাঁকা জায়গা।
৮
পরদিন আমিনুল ক্লাস নিলেন। ঊনচল্লিশজন ছেলে। একজন কম।
তিনি সূরা আর-রহমান পড়ালেন। "ফাবিআইয়ি আলা-ই রব্বিকুমা তুকাজ্জিবান।" তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?
ছেলেরা পড়ল। দুলল। আমিনুল শুনলেন।
তিনি ভাবলেন, এই ছেলেগুলোর মধ্যে কয়জন পাঁচ বছর পর এখানে থাকবে? স্মার্টফোন আসছে। ইন্টারনেট আসছে। বাইরের দুনিয়া ডাকছে। "ইংরেজি শিখবে, চাকরি পাবে।" এই বাক্যটা এই মাদ্রাসার জন্য হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মতো। ধীরে ধীরে ক্ষয় করবে।
আমিনুল ভয় পান না। আল্লাহর কালাম চিরন্তন। কিন্তু যারা কালাম শেখায়, তাদের পেটে ভাত থাকা দরকার। পাঁচ হাজার টাকায় পেটে ভাত থাকে কতদিন?
৯
সন্ধ্যায় আমিনুল বাড়ি ফেরেন। বাড়ি মানে মাদ্রাসা সংলগ্ন একটা কক্ষ। দুটো ঘর। একটায় সবাই ঘুমায়। আরেকটায় রান্না, খাওয়া, বসা।
সাকিনা ভাত রেঁধেছে। ডাল। শাক। আমিনুল খান। চুপচাপ।
সাকিনা বলে, "আয়েশার বিয়ের কথা ভাবতে হবে।"
আমিনুল জানেন। আয়েশা ষোলো। গ্রামে এই বয়সে বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ে দিতে টাকা লাগে। যৌতুক না দিলেও খরচ আছে। কাবিন, ওয়ালিমা, জামাকাপড়, আত্মীয়স্বজন। ত্রিশ হাজার কম করে লাগবে। আমিনুলের কাছে তিন হাজারও নেই।
"আল্লাহ ব্যবস্থা করবেন," বলেন আমিনুল।
সাকিনা চুপ থাকে। তার চোখে কিছু নেই। না রাগ, না অভিযোগ। শুধু অভ্যাস। এই বাক্যটা সে হাজারবার শুনেছে। "আল্লাহ ব্যবস্থা করবেন।" ব্যবস্থা হয়। কোনোমতে হয়। সাকিনা জানে না কীভাবে, কিন্তু হয়। সেটাকে সে আল্লাহর ব্যবস্থা বলে, না কি দারিদ্র্যের সাথে শরীরের মানিয়ে নেওয়া বলে, সেটা সে ভাবে না।
১০
রাতে আমিনুল তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন। একা। অন্ধকারে। চাটাইয়ের ওপর কপাল ঠেকান। ফিসফিস করে দোয়া করেন। কার জন্য? নিজের জন্য না। ছাত্রদের জন্য। যেন তারা হাফেজ হয়। যেন তারা আল্লাহর রাস্তায় থাকে।
তিনি দোয়া করেন না যেন তাঁর বেতন বাড়ুক। এটা দুনিয়াবি চাওয়া। তিনি দুনিয়ার জন্য চান না।
কিন্তু সকালে যখন ইব্রাহিম বলে, "বাবা, জুতা ছিঁড়ে গেছে," তখন আমিনুলের বুকে কিছু একটা চাপ দেয়। দুনিয়া তাঁকে টানে। আখিরাত তাঁকে ডাকে। মাঝখানে আমিনুল দাঁড়িয়ে, পাঁচ হাজার টাকা হাতে।
জুতা কিনতে হবে। দুইশো টাকার জুতা। সস্তা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। সেটাও এই মুহূর্তে নেই। আমিনুল সাকিনাকে বলেন, "পরশু দেব।" পরশু কোথা থেকে আসবে? হয়তো কেউ দান দেবে। হয়তো কোনো ছাত্রের বাবা কিছু দেবে। হয়তো আল্লাহর ব্যবস্থা হবে।
ইব্রাহিম খালি পায়ে স্কুলে যায়। স্কুল, মাদ্রাসা না। আমিনুল ছোটো ছেলেকে সরকারি প্রাইমারিতে দিয়েছেন। এটা কেউ জানলে প্রশ্ন করবে। মাদ্রাসার শিক্ষক নিজের ছেলেকে স্কুলে পাঠান? আমিনুল উত্তর দেন না। তিনি জানেন ইব্রাহিমকে বাংলা আর অঙ্ক শিখতে হবে। ফর্ম পূরণ করতে হবে। দুনিয়ায় চলতে হবে। কুরআন সন্ধ্যায় তিনি নিজে পড়াবেন।
তিনি ক্লাসে যান। বেত হাতে নেন। ছেলেদের পড়ান। "ইকরা বিসমি রব্বিকাল্লাজি খালাক।" পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
আমিনুল পড়ান। এটাই তাঁর কাজ। এটাই তাঁর জীবন। তিনি আল্লাহর কালাম শেখান। দুনিয়া বলে সেটা যথেষ্ট না।
আমিনুল বলেন, "দুনিয়া কী জানে আল্লাহ কী বলেছেন?"
দুনিয়া জানে না। দুনিয়া জানে ইংরেজি, কম্পিউটার, চাকরি। আমিনুল জানেন কুরআন। এই দুটো জানার মধ্যে একটা খাদ আছে। সেই খাদে পড়ে আছে আমিনুলের জীবন। পাঁচ হাজার টাকা। ফাটা জুতো। অপূরণ ফর্ম।
ঊনচল্লিশটা ছেলে দোলে। আরবি পড়ে। আমিনুল শোনেন। তাঁর চোখ বন্ধ। মুখে একটা রেখা, হাসি না, কান্না না, শুধু অভ্যাস।