পল্লী ডাক্তার
আমি ডাক্তার না। কিন্তু এখানে আমি ছাড়া কে আছে?
১
মঈন উদ্দিনের চেম্বার বলতে বাজারের মোড়ে একটা টিনের ঘর। আট ফুট বাই দশ ফুট। একটা টেবিল, দুটো চেয়ার, একটা কাঠের বেঞ্চ রোগীদের জন্য। দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার, একটা স্টেথোস্কোপ ঝোলানো, আর একটা ফ্রেমে বাঁধানো সার্টিফিকেট। এলএমএএফ। লাইসেন্সিয়েট অব মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি। এমবিবিএস না। ডিগ্রিটা ছোটো, তিন বছরের কোর্স, এখন আর হয় না। কিন্তু মঈন উদ্দিনের জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল।
সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলা। মঈনের গ্রাম থেকে নিকটতম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আঠারো কিলোমিটার। সদর হাসপাতাল ঊনচল্লিশ কিলোমিটার। কুড়িগ্রাম বা রংপুরের মেডিকেল কলেজ? সেটা অন্য জগত।
মঈন এখানে বসেন। সকাল আটটা থেকে রাত নয়টা। ভিজিট পঞ্চাশ টাকা। গরিব রোগী? বিশ টাকা। একদম গরিব? ফ্রি। মঈন হিসাব করেন না সবসময়। করলে ক্ষতি দেখবেন।
২
সকালের প্রথম রোগী। বুড়ো আব্দুল। কাশি দুই সপ্তাহ ধরে।
মঈন স্টেথোস্কোপ লাগালেন। বুকের আওয়াজ শুনলেন। শ্বাসকষ্ট আছে। কফ? হ্যাঁ। রক্ত? না। জ্বর? হালকা।
"ধূমপান করেন?"
"করতাম। ছেড়ে দিছি।"
"কত বছর করেছেন?"
"চল্লিশ বছর।"
মঈন জানেন এটা সিওপিডি হতে পারে। টিবিও হতে পারে। নিশ্চিত হতে গেলে এক্সরে লাগবে, স্পুটাম টেস্ট লাগবে। নিকটতম এক্সরে মেশিন আঠারো কিলোমিটার দূরে। বুড়ো আব্দুল যাবেন না। তাঁর যাওয়ার ক্ষমতা নেই, ইচ্ছাও নেই।
মঈন প্রেসক্রিপশন লিখলেন। অ্যামোক্সিসিলিন। একটা কাশির সিরাপ। ট্যাবলেট মন্টিলুকাস্ট। ব্র্যান্ড নামে লেখেন। জেনেরিক নামে লিখলে রোগী বিভ্রান্ত হবে। "মন্টিকা" লিখলেন, স্কয়ারের ওষুধ। কেন স্কয়ারের? কারণ স্কয়ারের রিপ্রেজেন্টেটিভ গত মাসে এসেছিল। স্যাম্পল দিয়ে গেছে। কমিশন আছে: প্রতি প্রেসক্রিপশনে পাঁচ টাকা। মঈন এটা নিয়ে ভাবেন না। ওষুধ ভালো। কোম্পানি দেয়। কোনো ক্ষতি নেই।
৩
দুপুরের পর একটা মেয়ে এল। ষোলো-সতেরো বছর। তার মা সাথে। মেয়ের পেটে ব্যথা। বমি হচ্ছে।
মঈন জিজ্ঞেস করলেন, "কদিন থেকে?"
"তিন দিন।"
"মাসিক হয়েছে?"
মা চুপ। মেয়ে চুপ। মঈন বুঝলেন। জিজ্ঞেস করলেন না আর। পেটে হাত দিয়ে দেখলেন। নরম। কোনো শক্ত কিছু নেই। জ্বর নেই। ডায়রিয়া নেই।
"গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দিচ্ছি। তিন দিন খাবে। ভালো না হলে আবার আসবেন।"
এটা সঠিক ডায়াগনসিস কি না মঈন জানেন না পুরোপুরি। আল্ট্রাসাউন্ড করলে ভালো হতো। আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন আঠারো কিলোমিটার দূরে। রোগী যাবে না। মঈন যা পারেন তাই করেন। পেটে ব্যথা? গ্যাস্ট্রিক, ওয়ার্ম, বা অ্যাপেনডিসাইটিস। গ্যাস্ট্রিক সবচেয়ে কমন। তাই সেটা ধরে নেন। বেশিরভাগ সময় ঠিক ধরেন। কখনো কখনো ভুল।
৪
মঈন উদ্দিন ত্রিশ বছর ধরে এই বাজারে বসেন। তিনি সবকিছু দেখেন। জ্বর, ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগ, হাঁপানি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস। গর্ভবতী মায়েদের চেকআপ। শিশুদের নিউমোনিয়া। বৃদ্ধদের গেঁটেবাত।
সাপে কাটা? হ্যাঁ, সেটাও। বর্ষাকালে মাসে দুই-তিনজন আসে। মঈন অ্যান্টিভেনম রাখেন না। দাম বেশি, সংরক্ষণ কঠিন। তিনি যা করেন: ক্ষতস্থান বাঁধেন, ব্যথার ওষুধ দেন, আর পরিবারকে বলেন এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে। "এখনই" মানে তিন ঘণ্টা। কেউ কেউ পৌঁছায়। কেউ কেউ পথে মারা যায়।
মঈন রেফার করেন যখন দেখেন তাঁর পক্ষে সম্ভব না। কখন? যখন রোগীর অবস্থা তাঁর বোঝার বাইরে চলে যায়। যখন ওষুধ কাজ করে না। যখন রক্তক্ষরণ থামে না। যখন জ্বর নামে না পাঁচ দিনেও। তখন বলেন, "হাসপাতালে নিয়ে যান।"
কিন্তু "হাসপাতালে নিয়ে যান" বলাটা সহজ, নিয়ে যাওয়াটা কঠিন। আঠারো কিলোমিটার। অ্যাম্বুলেন্স নেই। ভ্যান আছে, সেটায় রোগী শুইয়ে নিয়ে যেতে হবে। কাঁচা রাস্তা। ঝাঁকুনি। গর্ভবতী মহিলা ভ্যানে যেতে যেতে রক্তক্ষরণে মারা যায়। শিশু নিউমোনিয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায়। বৃদ্ধ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়।
মঈন এগুলো দেখেছেন। দেখেন। দেখবেন।
৫
সপ্তাহ দুয়েক আগে একটা ঘটনা হলো।
ফজলুর রহমানের ছেলে, বয়স তিন। জ্বর তিন দিন। কাশি আছে। নাক দিয়ে পানি পড়ছে। ফজলু ছেলেটাকে নিয়ে এল মঈনের কাছে।
মঈন দেখলেন। জ্বর ১০১ ডিগ্রি। গলা লাল। নাক বন্ধ। কাশি শুকনো। মঈন ভাবলেন সর্দিজ্বর। ঠান্ডা লেগেছে। প্যারাসিটামল দিলেন। একটা অ্যান্টিহিস্টামিন। নাকের ড্রপ।
"তিন দিন খাওয়ান। ভালো হয়ে যাবে।"
দুই দিন পর ফজলু আবার এল। ছেলের জ্বর বেড়েছে। ১০৩। কাশি আরো খারাপ। শ্বাস টানছে দ্রুত।
মঈন আবার দেখলেন। এবার স্টেথোস্কোপে বুকে একটা আওয়াজ পেলেন। ক্র্যাকলিং সাউন্ড। ডান দিকে। মঈনের ভেতরে কিছু নড়ল। এটা নিউমোনিয়া হতে পারে। হওয়া উচিত ছিল প্রথম দিনেই বোঝা। কিন্তু প্রথম দিনে বুকে কোনো আওয়াজ ছিল না, অথবা ছিল কিন্তু মঈন ধরতে পারেননি। তিন বছরের বাচ্চার বুকে স্টেথোস্কোপ দিয়ে শোনা কঠিন। বাচ্চা কাঁদে, নড়ে, চিৎকার করে। সূক্ষ্ম শব্দ হারিয়ে যায়।
"হাসপাতালে নিয়ে যান। এখনই।"
ফজলু বলল, "ওষুধ দেন। হাসপাতাল অনেক দূর।"
"না, হাসপাতালে যেতে হবে। এটা সর্দি না। ফুসফুসে ইনফেকশন হতে পারে।"
ফজলু চলে গেল। রাতে যাবে বলল। রাতে ভ্যান পাওয়া যায় না। পরদিন সকালে রওনা দিল।
বাচ্চাটা পথে মারা গেল। হাসপাতালে পৌঁছানোর ছয় কিলোমিটার আগে।
৬
মঈন উদ্দিন খবরটা শুনলেন দুপুরে। চেম্বারে বসে ছিলেন। কেউ একজন এসে বলল, "ফজলুর রহমানের ছেলে মারা গেছে।"
মঈন কিছু বললেন না। তাঁর হাত টেবিলের ওপর ছিল। হাতটা একটু কাঁপল। তারপর স্থির হলো।
তিনি বাকি রোগী দেখলেন। বিকালে চেম্বার বন্ধ করলেন। বাড়ি গেলেন। ভাত খেলেন। মাগরিবের নামাজ পড়লেন।
রাতে ঘুমাতে পারলেন না। ভাবলেন। প্রথম দিনেই কি তিনি নিউমোনিয়া ধরতে পারতেন? হয়তো। হয়তো না। ক্লিনিক্যাল সাইন ছিল না স্পষ্ট। একটা তিন বছরের বাচ্চা, জ্বর ১০১, নাক দিয়ে পানি, কাশি। নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে এটা ভাইরাল ইনফেকশন। প্যারাসিটামল আর বিশ্রামে সেরে যায়। দশ শতাংশ ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ায় চলে যায়। মঈন নব্বই শতাংশে বাজি ধরেছিলেন। হেরেছেন।
একজন এমবিবিএস ডাক্তার হলে কি ধরতে পারতেন? হয়তো। পালস অক্সিমিটার থাকলে ধরতে পারতেন। অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখতেন। চেস্ট এক্সরে করলে নিশ্চিত হতেন। কিন্তু মঈনের কাছে পালস অক্সিমিটার নেই। এক্সরে নেই। তাঁর কাছে আছে একটা স্টেথোস্কোপ, একটা থার্মোমিটার, দুটো হাত, আর ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা।
ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা একটা তিন বছরের বাচ্চার প্রাণ বাঁচাতে পারল না।
৭
ফজলু পরদিন এল। চেম্বারের সামনে দাঁড়াল। চোখ লাল। মুখ শুকনো।
মঈন উঠে দাঁড়ালেন। কী বলবেন? "আমি দুঃখিত"? এটা কি যথেষ্ট? একটা মরা বাচ্চার জন্য "আমি দুঃখিত"?
ফজলু বলল, "হুজুর, আপনার দোষ না। আমার ছেলের ভাগ্যে এতটুকুই ছিল।"
মঈন কিছু বলতে পারলেন না। ফজলু চলে গেল।
গ্রামের মানুষ ক্ষমা করে সহজে। তারা জানে মঈন যা পেরেছেন করেছেন। তারা জানে হাসপাতাল দূরে। তারা জানে অ্যাম্বুলেন্স নেই। তারা ভাগ্যকে দোষ দেয়, আল্লাহর ফয়সালা বলে মেনে নেয়। মঈনকে দোষ দেয় না।
কিন্তু মঈন নিজে? তিনি কি নিজেকে ক্ষমা করতে পারেন?
৮
মঈন উদ্দিনের একটা অভ্যাস আছে। রাতে, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, তিনি চেয়ারে বসে হিসাব করেন। কতজন রোগী দেখেছেন আজ। কী কী রোগ। কী কী ওষুধ দিয়েছেন। কোনোটা কি ভুল হয়েছে?
বেশিরভাগ দিন ভুল হয় না। মানে, ভুল হলেও ধরা পড়ে না। রোগী সুস্থ হয়ে যায়, অথবা অন্য কোথাও যায়, অথবা এমনিতেই ভালো হয়। মঈনের ওষুধে হয়েছে না এমনিতে হয়েছে, সেটা কেউ জানে না।
কিন্তু কখনো কখনো ভুল হয়। এবং সেটার মূল্য একটা জীবন।
মঈন ত্রিশ বছরে কতজনকে বাঁচিয়েছেন? হিসাব নেই। শত শত। হয়তো হাজার। ডায়রিয়ায় মরতে বসা শিশুকে স্যালাইন দিয়ে বাঁচিয়েছেন। টাইফয়েডে কাঁপতে থাকা বৃদ্ধকে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সারিয়েছেন। প্রসবকালীন রক্তক্ষরণে একটা মাকে ইনজেকশন দিয়ে সময় কিনেছেন, যতক্ষণ না হাসপাতালে পৌঁছানো গেছে।
আর কতজনকে বাঁচাতে পারেননি? সেই হিসাবও নেই। কিন্তু প্রতিটা মুখ মনে আছে। ফজলুর ছেলে এখন সেই তালিকায় যোগ হলো।
৯
মেডিকেল কোম্পানির প্রতিনিধি আসেন মাসে একবার। ব্যাগ ভর্তি স্যাম্পল। নতুন ওষুধের পাতা। ব্রোশার।
"মঈন সাহেব, এই নতুন অ্যান্টিবায়োটিক। সেফিক্সিম থার্ড জেনারেশন। দাম একটু বেশি, কিন্তু কাজ ভালো।"
মঈন ব্রোশার পড়েন। এটাই তাঁর সিএমই। কন্টিনিউইং মেডিকেল এডুকেশন। জার্নাল পড়েন না। সেমিনারে যান না। নতুন গাইডলাইন জানেন না। কোম্পানির প্রতিনিধি যা বলে, সেটাই তাঁর আপডেট।
প্রতিনিধি স্যাম্পল দিয়ে যান। মঈন রোগীদের দেন। কমিশন পান। এটা দুর্নীতি? মঈন ভাবেন না এভাবে। তিনি ভাবেন, ওষুধ তো একই কাজ করে। স্কয়ারের হোক, বেক্সিমকোর হোক, ইনসেপ্টার হোক। পার্থক্য দামে। রোগীকে তিনি সস্তাটাই দেন। কমিশন? সেটা বোনাস। পঞ্চাশ টাকা ভিজিটে কি সংসার চলে?
১০
সন্ধ্যায় মঈন উদ্দিন চেম্বার বন্ধ করেন। টিনের দরজায় তালা দেন। বাড়ি যান। পায়ে হেঁটে, দশ মিনিটের পথ।
রাস্তায় মানুষ দেখলে সালাম দেয়। "মঈন ডাক্তার, কেমন আছেন?" সবাই চেনে। সবাই বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসটা মঈনের সম্পদ। এটাই তাঁর লাইসেন্স। কাগজের সার্টিফিকেট না, মানুষের বিশ্বাস।
বাড়িতে বউ আমেনা ভাত রেঁধেছে। ছেলে ফারুক ঢাকায় থাকে, গার্মেন্টসে চাকরি। মেয়ে রুম্পা শ্বশুরবাড়িতে। মঈন আর আমেনা দুজনে খান। চুপচাপ।
রাতে মঈন বিছানায় শোয়েন। চোখ বন্ধ করেন। ফজলুর ছেলের মুখ ভাসে। তিন বছরের মুখ। জ্বরে লাল। শ্বাস ভারী।
মঈন চোখ খোলেন। অন্ধকারে সিলিং দেখেন।
"আমি ডাক্তার না," তিনি মনে মনে বলেন। "কিন্তু এখানে আমি ছাড়া কে আছে?"
কেউ নেই। আঠারো কিলোমিটারের মধ্যে কোনো এমবিবিএস ডাক্তার নেই যে এই বাজারে বসে পঞ্চাশ টাকা ভিজিটে রোগী দেখবে। কেউ আসবে না। কেউ আসতে চায় না। ঢাকায়, চট্টগ্রামে, সিলেটে ডাক্তার আছে। এখানে মঈন আছে।
তিনি ঘুমান। সকালে আবার চেম্বার খুলবেন। আবার রোগী দেখবেন। আবার স্টেথোস্কোপ লাগাবেন। আবার ওষুধ লিখবেন ব্র্যান্ড নামে। আবার কাউকে হাসপাতালে পাঠাবেন। কেউ পৌঁছাবে। কেউ পৌঁছাবে না।
মঈন উদ্দিন। পল্লী ডাক্তার। না এমবিবিএস, না বিশেষজ্ঞ, না কিছু। শুধু একটা মানুষ, যে মাটির কাছাকাছি বসে অন্য মানুষদের দেখে। কখনো বাঁচায়। কখনো পারে না। পার্থক্যটা মাঝে মাঝে একটা এক্সরে মেশিন। মাঝে মাঝে একটা অ্যাম্বুলেন্স। মাঝে মাঝে আঠারো কিলোমিটার।