ফার্মেসি বিক্রেতা

আমি চিকিৎসা দিই না। আমি ওষুধ বেচি। পার্থক্যটা কেউ জানতে চায় না

পর্ব ২৪ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রাজুর ফার্মেসি সকাল সাতটায় খোলে। বন্ধ হয় রাত এগারোটায়। সপ্তাহে সাত দিন। ছুটি নেই। ঈদের দিনেও খোলা। কারণ ওষুধের দরকার ঈদ মানে না।

ফার্মেসি বলতে রাস্তার পাশে একটা দোকান। আট ফুট চওড়া। তিন দিকে কাচের আলমারি। আলমারিতে সারি সারি ওষুধের বাক্স। প্যারাসিটামল, অ্যামোক্সিসিলিন, মেট্রোনিডাজল, ওমিপ্রাজল, সেটিরিজিন। উপরের তাকে সিরাপ। নিচের তাকে ইনজেকশন। ফ্রিজে ইনসুলিন আর কিছু অ্যান্টিবায়োটিক সাসপেনশন।

রাজু কাউন্টারে বসে। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার। সামনে কাচের কাউন্টার, তার ওপর একটা ক্যালকুলেটর, একটা প্রেসক্রিপশন প্যাড যেটা তার না, ওষুধ কোম্পানি দিয়েছে, আর একটা কলমদানি।

রাজু এসএসসি পাস। কমার্স গ্রুপ। ফার্মেসি বিষয়ে কোনো ডিগ্রি নেই। ফার্মাসিস্ট লাইসেন্স নেই। ড্রাগ লাইসেন্স আছে, সেটা দোকানের মালিকের নামে। মালিক রশিদ সাহেব। রাজু বিক্রেতা। বেতন আট হাজার টাকা মাসে। প্লাস কমিশন।

প্রথম খদ্দের সকাল সাতটায়। একজন রিকশাচালক। রাতে ঘাড়ে ব্যথা হয়েছে, ঘুমাতে পারেনি।

"কী সমস্যা?" রাজু জিজ্ঞেস করে।

"ঘাড়ে ব্যথা। ঘুরাতে পারি না।"

রাজু তাকায়। আলমারি থেকে একটা ব্লিস্টার বের করে। "এটা খান। দিনে দুইবার। খাওয়ার পর।" ন্যাপ্রোক্সেন ২৫০ মিলিগ্রাম। সাথে একটা মাসল রিল্যাক্স্যান্ট। "এটাও খান, রাতে একটা।"

রিকশাচালক জিজ্ঞেস করে না কী ওষুধ, কেন খাচ্ছে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী। সে শুধু জিজ্ঞেস করে, "কত?"

"ত্রিশ টাকা।"

ত্রিশ টাকা দিয়ে ওষুধ নিয়ে চলে যায়। সময় লেগেছে নব্বই সেকেন্ড। এটাই বাংলাদেশের প্রাইমারি কেয়ার। ডাক্তারের চেম্বারে না। হাসপাতালে না। ফার্মেসির কাউন্টারে।

রাজু ফার্মাকোলজি কোথায় শিখেছে?

কলেজে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে না। সে শিখেছে এই কাউন্টারে বসে। চার বছর ধরে। প্রথমে রশিদ সাহেব শিখিয়েছিলেন। "মাথা ব্যথায় প্যারাসিটামল। জ্বরে প্যারাসিটামল। গায়ে ব্যথায় ন্যাপ্রোক্সেন। গ্যাস্ট্রিকে ওমিপ্রাজল। ডায়রিয়ায় মেট্রোনিডাজল। এলার্জিতে সেটিরিজিন।"

তারপর শিখেছে কোম্পানি রিপ্রেজেন্টেটিভদের কাছে। তারা আসে, নতুন ওষুধ দেখায়, কাজ বোঝায়, স্যাম্পল দেয়। রাজু শোনে, মনে রাখে। সে এখন দুইশোটা ব্র্যান্ড নাম মুখস্থ জানে। কোনটা কিসের ওষুধ, কোন ডোজ, কোন কোম্পানির, দাম কত। এটা তার দক্ষতা। এটা দিয়ে সে কাজ করে।

আর শিখেছে রোগীদের কাছে। রোগীরা আসে, সমস্যা বলে, ওষুধ খায়, ভালো হয় বা হয় না, আবার আসে। রাজু ফিডব্যাক পায়। "ওমিপ্রাজল খেয়ে কাজ হয়নি, আরেকটু ভালো কিছু দেন।" রাজু তখন এসোমিপ্রাজল দেয়। কাজ হয়। রাজু শেখে: এসোমিপ্রাজল ওমিপ্রাজলের চেয়ে ভালো কাজ করে। এটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না। এটা কাউন্টার-টপ এভিডেন্স।

দুপুরে একজন মধ্যবয়সী মহিলা এলেন। তাঁর হাতে একটা প্রেসক্রিপশন। ডাক্তারের লেখা। রাজু প্রেসক্রিপশন নিল।

ওষুধ তিনটা। একটা অ্যান্টিবায়োটিক। একটা পেইনকিলার। একটা ভিটামিন।

মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, "কত হবে?"

রাজু হিসাব করল। "সাতশো বিশ টাকা।"

মহিলা চুপ হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, "এত টাকা নেই। শুধু অ্যান্টিবায়োটিকটা দেন।"

রাজু দিল। দুইশো ষাট টাকা। মহিলা চলে গেলেন।

এটা প্রতিদিন হয়। রোগী আসে প্রেসক্রিপশন নিয়ে। তিনটা ওষুধ লেখা। দুইটা কেনে। অথবা একটা। বাকিটা বাদ দেয়। কোনটা বাদ দেয়? রোগী জানে না কোনটা জরুরি। রাজু? রাজু জানে কোনটা সবচেয়ে বেশি দামের, সেটা রোগী বাদ দিতে চায়। সবচেয়ে জরুরি কোনটা, সেটা রাজু সবসময় জানে না।

রাজুর একটা অভ্যাস আছে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা।

"গলা ব্যথা।" রাজু অ্যাজিথ্রোমাইসিন দেয়। "কাশি তিন দিন ধরে।" রাজু অ্যামোক্সিসিলিন দেয়। "বাচ্চার কান পাকছে।" রাজু সেফিক্সিম সাসপেনশন দেয়।

সমস্যা কোথায়? গলা ব্যথা ভাইরাল হতে পারে, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। কাশি অ্যালার্জিক হতে পারে, অ্যান্টিবায়োটিক অপ্রয়োজনীয়। কানের সমস্যা ফাঙ্গাল হতে পারে, অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতিকর।

কিন্তু রাজু দেয়। কেন? কারণ অ্যান্টিবায়োটিকের মার্জিন বেশি। প্যারাসিটামল বিক্রি করলে লাভ দুই টাকা। অ্যাজিথ্রোমাইসিন বিক্রি করলে লাভ পনেরো টাকা। রশিদ সাহেব মাস শেষে হিসাব দেখেন। বিক্রি বেশি হলে বোনাস দেন। অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বেশি মানে লাভ বেশি মানে বোনাস বেশি।

রাজু ডাক্তার না। সে ডায়াগনসিস করে না। সে ওষুধ বেচে। রোগী আসে, সমস্যা বলে, রাজু ওষুধ দেয়। এটা চিকিৎসা না। এটা লেনদেন।

বিকালে একটা ছেলে এল। কুড়ি-একুশ বছর। নার্ভাস। চোখ এদিক-ওদিক করছে।

"ভাই, একটা জিনিস দরকার।"

"কী?"

"ওই... ট্যাবলেট... মেয়েদের জন্য..."

রাজু বুঝল। "ইমার্জেন্সি কন্ট্রাসেপটিভ?"

ছেলেটা মাথা নাড়ল।

রাজু দিল। ত্রিশ টাকা। কোনো প্রশ্ন করল না। কে খাবে, কেন খাবে, বয়স কত, সমস্যা আছে কি না, এসব জিজ্ঞেস করল না। ওষুধ বেচল। ব্যস।

এটা প্রতিদিন হয়। কখনো ছেলেরা আসে, কখনো মেয়েরা। কখনো বিবাহিত দম্পতি, কখনো অবিবাহিত। রাজু ওষুধ দেয়। সে বিচারক না। সে বিক্রেতা।

একদিন একটা মহিলা এলেন। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। শাড়ি পরা। মুখ চাপা। কণ্ঠ নিচু।

"মিসোপ্রস্টল আছে?"

রাজু তাকাল। মিসোপ্রস্টল। এটা একটা ওষুধ যার অনেক ব্যবহার আছে। পেটের আলসারে দেওয়া হয়। প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে দেওয়া হয়। আর... অন্য একটা কাজে ব্যবহার হয়। রাজু জানে কোন কাজে।

"কটা লাগবে?"

"চারটা।"

চারটা। রাজু জানে চারটা কেন। সে কিছু জিজ্ঞেস করল না। আলমারি থেকে ট্যাবলেট বের করল। প্যাকেটে দিল।

"কীভাবে খাবেন জানেন?"

মহিলা মাথা নাড়লেন।

"দুইটা জিভের নিচে রাখবেন। তিন ঘণ্টা পর আরো দুইটা। পেটে ব্যথা হবে। রক্তপাত হবে। বেশি হলে হাসপাতালে যাবেন।"

মহিলা ওষুধ নিয়ে চলে গেলেন। রাজু কাউন্টারে ফিরে বসল।

সে কি জানে মহিলা গর্ভবতী? হ্যাঁ। সে কি জানে মিসোপ্রস্টল কী করবে? হ্যাঁ। সে কি জানে এটা আইনি না? জানে। তবু দিল। কেন? কারণ মহিলা না পেলে অন্য কোথাও যাবে। অন্য ফার্মেসিতে। অথবা গ্রামে কোনো দাইয়ের কাছে। অথবা নিজে কিছু একটা করবে। রাজু অন্তত ডোজটা ঠিক বলে দিয়েছে।

রাজু নিজেকে এভাবে বোঝায়। এটা সত্য কি না, সেটা অন্য প্রশ্ন।

রাতে রশিদ সাহেব আসেন। হিসাব দেখেন। আজকের বিক্রি। কত টাকা ক্যাশ, কত বাকি, কোন ওষুধ কম পড়ছে, কোনটা অর্ডার দিতে হবে।

"রাজু, অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কমেছে এই মাসে।"

"রোগী কম এসেছে।"

"রোগী কম আসবে কেন? সবসময়ই রোগী আসে।"

রশিদ সাহেব বুঝিয়ে বলেন: "দেখো, যে আসবে, তাকে একটু বেশি দিবা। গলা ব্যথা? শুধু গার্গল বললে তো হবে না। একটা অ্যান্টিবায়োটিক দাও। সাথে একটা ভিটামিন। সাথে একটা প্রোবায়োটিক। তিনটা জিনিস বিক্রি। মার্জিন বাড়বে।"

রাজু শোনে। রশিদ সাহেব মালিক। তাঁর কথা শুনতে হয়। তাছাড়া রশিদ সাহেব ভুল বলছেন না ব্যবসায়িক দিক থেকে। তিনটা ওষুধ মানে তিনগুণ লাভ। রোগীর কি ক্ষতি হবে? প্রোবায়োটিক ক্ষতি করে না। ভিটামিন ক্ষতি করে না। অ্যান্টিবায়োটিক? সেটা একটু... কিন্তু কে দেখবে?

ঔষধ প্রশাসন? তারা বছরে একবার আসে। হয়তো আসে না। এলেও দেখে ড্রাগ লাইসেন্স আছে কি না। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে কি না, সেটা কেউ চেক করে না।

রাজু রাতে বাসায় ফেরে। একটা ভাড়া ঘর। ছোটো। একটা বিছানা, একটা টেবিল, একটা গ্যাসের চুলা। রাজু অবিবাহিত। মা গ্রামে। বাবা মারা গেছেন। ছোটো ভাই পড়ে, এইচএসসিতে। রাজু ভাইয়ের খরচ পাঠায়।

সে ভাত রান্না করে। ডিম ভাজে। খায়। একা। ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করে। ভিডিও দেখে। ঘুমায়।

রাজু কি জানে সে যা করে সেটা ঠিক না? জানে। সে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বেচে, যেটা আইনত নিষিদ্ধ। সে রোগ নির্ণয় করে, যেটা তার যোগ্যতার বাইরে। সে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক দেয়, যেটা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়।

কিন্তু রাজু ভাবে: আমি না দিলে কে দেবে? রোগী ডাক্তারের কাছে যাবে? ডাক্তারের ভিজিট পাঁচশো টাকা। রোগীর কাছে পঞ্চাশ টাকাও নেই। রোগী আমার কাছে আসে কারণ আমি সস্তা, দ্রুত, আর সহজ। কোনো লাইন নেই, কোনো ফর্ম নেই, কোনো প্রেসক্রিপশন লাগে না। সমস্যা বলো, ওষুধ নাও, চলে যাও।

১০

সকাল। ফার্মেসি খোলা। রাজু কাউন্টারে বসে আছে।

একজন আসে। "মাথা ব্যথা।" রাজু প্যারাসিটামল দেয়।

আরেকজন আসে। "বাচ্চার পাতলা পায়খানা।" রাজু ওআরএস আর জিংক ট্যাবলেট দেয়।

আরেকজন আসে। "বুকে চাপ ধরেছে।" রাজু তাকায়। বয়স পঞ্চাশের ওপর। ঘামছে। "হাসপাতালে যান। এখনই।"

রাজু সবসময় ভুল করে না। সবসময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দেয় না। কখনো কখনো সে ঠিক ওষুধ দেয়। কখনো কখনো সে জীবন বাঁচায়, হার্ট অ্যাটাকের রোগীকে হাসপাতালে পাঠিয়ে। কখনো কখনো সে ক্ষতি করে, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে।

সে কি ডাক্তার? না। সে কি ফার্মাসিস্ট? না। সে একটা ছেলে যে কাউন্টারে বসে ওষুধ বেচে। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামে, মফস্বলে, এমনকি ঢাকার গলিতে, রাজুই প্রথম স্বাস্থ্যসেবা। ডাক্তারের আগে। হাসপাতালের আগে। রাজু।

"আমি চিকিৎসা দিই না," রাজু একদিন তার বন্ধুকে বলেছিল। "আমি ওষুধ বেচি। পার্থক্যটা কেউ জানতে চায় না।"

বন্ধু হেসেছিল। রাজুও।

পার্থক্যটা সত্যিই কেউ জানতে চায় না। রোগী চায় ওষুধ। রাজু দেয় ওষুধ। মাঝখানে ডায়াগনসিস, প্যাথোলজি, ফার্মাকোকাইনেটিক্স, এসব কিছু নেই। শুধু একটা কাউন্টার, একটা ক্যালকুলেটর, আর দুইশো ব্র্যান্ড নাম মুখস্থ।