কবিরাজ
আমার ওষুধ সত্য না মিথ্যা, সেটা তর্ক করা যায়। কিন্তু আমি যে মানুষ বাঁচিয়েছি, সেটা তর্ক করা যায় না
১
তমিজ উদ্দিনের হাতে গাছ চেনা যায়। নখের ফাঁকে সবুজ দাগ। তালুতে পাতার রস। আঙুলের ডগায় শেকড়ের মাটি। এই হাত চল্লিশটা গাছ চেনে। চোখ বন্ধ করে, ছুঁয়ে, শুঁকে, জিভে ঠেকিয়ে বলে দিতে পারে কোনটা কী।
নিমের ছাল। বাসকের পাতা। থানকুনি। চিরতা। তুলসী। কালমেঘ। হরিতকী। বহেড়া। আমলকী। অর্জুনের ছাল। এগুলো সহজ। যে কেউ চেনে। কিন্তু তমিজ চেনে যেগুলো আর কেউ চেনে না। ঘাটুফুলের শেকড়, যেটা নদীর ধারে জন্মায়, মাটি থেকে তিন ইঞ্চি ওপরে কাটতে হয়, কম হলে বিষ, বেশি হলে অকেজো। সর্পগন্ধা, যেটার পাতা দেখতে সাধারণ কিন্তু শেকড়ে রেসারপিন আছে, রক্তচাপ কমায়। এগুলো তমিজ জানে। তার বাবা জানতেন। তার দাদা জানতেন।
সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলা। হাওর অঞ্চল। বর্ষায় পানি, শুকনায় মাটি। এখানকার মাটিতে কী না জন্মায়। ভেষজ গাছের জন্য এই মাটি উর্বর। তমিজের ঘরের পেছনে একটা বাগান আছে। পঁচিশটা প্রজাতির গাছ। বাকিগুলো জঙ্গলে পাওয়া যায়, হাওরের ধারে, বাঁশঝাড়ের গোড়ায়, পরিত্যক্ত জমিতে।
২
তমিজের খ্যাতি সাপে কাটার চিকিৎসায়।
হাওর অঞ্চলে সাপ বেশি। বর্ষায় পানি ওঠে, সাপ উঁচু জায়গায় আসে, মানুষের ঘরে ঢোকে। গোখরা, কেউটে, শঙ্খচূড়। কামড়ায়। বিষ ঢোকে। মানুষ মরে।
হাসপাতাল তিন ঘণ্টা দূরে। অ্যান্টিভেনম হাসপাতালে আছে, কিন্তু তিন ঘণ্টায় অনেক কিছু হয়ে যায়। বিষ ছড়ায়। অঙ্গ অবশ হয়। শ্বাস বন্ধ হয়।
তমিজের কাছে মানুষ আসে। সাপে কাটা রোগী নিয়ে আসে। তমিজ দেখেন। দাঁতের দাগ দেখেন। কোন সাপ কামড়েছে বলতে পারেন দাগ দেখে। গোখরা হলে দুটো ছিদ্র গভীর, পাশাপাশি। কেউটে হলে ছিদ্র ছোটো, কাছাকাছি। শঙ্খচূড় হলে চারটা দাগ, একটু ছড়ানো। বিষধর না অবিষধর, সেটাও বোঝেন।
তিনি কী করেন? প্রথমে ক্ষতস্থানে একটা পাতার রস লাগান। কোন পাতা? তমিজ বলেন না। এটা তাঁর গোপন। তাঁর বাবা শিখিয়েছিলেন, "কাউকে বলবি না। বললে কাজ করবে না।" তমিজ বিশ্বাস করেন এটা। রস লাগান। তারপর একটা শেকড়ের পেস্ট দিয়ে ক্ষতস্থান ঢাকেন। তারপর মন্ত্র পড়েন। আরবি না। বাংলা না। কী ভাষা? তমিজ জানেন না। তাঁর বাবা এটাকে বলতেন "পুরনো কথা।"
এটা কাজ করে? বিজ্ঞান বলে না। পাতার রসে কোনো অ্যান্টিভেনম নেই। মন্ত্রে কোনো রাসায়নিক ক্রিয়া নেই।
কিন্তু তমিজ ত্রিশ বছরে দুইশোর বেশি সাপে কাটা রোগী দেখেছেন। তাঁর কাছে আসা রোগীদের মধ্যে মারা গেছে সাত-আটজন। বাকি সবাই বেঁচে আছে।
৩
এই সংখ্যাটা কী প্রমাণ করে?
তমিজের ভাষায়: "আমার ওষুধ কাজ করে।"
বিজ্ঞানের ভাষায়: এটা প্রমাণ করে না যে তমিজের ওষুধ কাজ করে। অনেক সাপের কামড়ে বিষ ঢোকে না, যেটাকে বলে "ড্রাই বাইট।" সাপ কামড়ায় কিন্তু বিষ ছাড়ে না। বিষধর সাপের কামড়ের ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ ড্রাই বাইট। সেক্ষেত্রে কিছু না করলেও রোগী বাঁচবে। তমিজ পাতা লাগিয়েছেন, মন্ত্র পড়েছেন, রোগী বেঁচেছে। কিন্তু রোগী বেঁচেছে পাতার জন্য না। বেঁচেছে কারণ বিষ ঢোকেনি।
কিন্তু তমিজ এটা জানেন না। ড্রাই বাইট কী সেটা তিনি শোনেননি। তিনি জানেন: সাপ কামড়েছে, আমি চিকিৎসা করেছি, রোগী বেঁচেছে। কারণ আর ফলের মাঝখানে যে জটিল জীববিজ্ঞান আছে, সেটা তমিজের পৃথিবীতে নেই।
আর যে সাত-আটজন মারা গেছে? তমিজ বলেন, "তাদের বিষ বেশি ছিল। দেরি করে এনেছিল। আমার হাতে আসতে আসতে বিষ ছড়িয়ে গেছিল।" এটাও আংশিক সত্য। যে ক্ষেত্রে সত্যিই বিষ ঢুকেছে, ঢুকেছে গভীরে, সেক্ষেত্রে তমিজের পাতা আর মন্ত্র কিছু করতে পারে না। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিভেনম লাগে। অ্যান্টিভেনম তমিজের কাছে নেই।
৪
তমিজ শুধু সাপে কাটা দেখেন না। আরো অনেক কিছু দেখেন।
জ্বর? নিমের ছালের ক্বাথ। ডায়রিয়া? থানকুনি পাতার রস। কাশি? বাসকের পাতা সেদ্ধ। চর্মরোগ? নিমের তেল। পেটে কৃমি? বিড়ঙ্গের গুঁড়ো। বাতের ব্যথা? অর্জুনের ছাল পানিতে ভিজিয়ে খাওয়া।
এগুলোর মধ্যে কিছু কাজ করে। বাসকের পাতায় ভ্যাসিসিন আছে, যেটা কফ বের করে। নিমে অ্যান্টিফাঙ্গাল আর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল যৌগ আছে। অর্জুনের ছালে কার্ডিওপ্রোটেক্টিভ উপাদান আছে। আধুনিক ফার্মাকোলজি এগুলো জানে, গবেষণায় প্রমাণিত।
কিন্তু তমিজ এসব গবেষণার কথা জানেন না। তিনি জানেন তাঁর বাবা দিয়েছিলেন, কাজ করেছিল, তাই তিনি দেন। এটা এমপিরিক্যাল জ্ঞান। শত শত বছরের পর্যবেক্ষণ থেকে আসা। কখনো সঠিক, কখনো ভুল, কখনো ক্ষতিকর।
ক্ষতিকর কখন? যখন রোগী গুরুতর অসুস্থ কিন্তু তমিজ ভেষজ দিয়ে সময় কাটান। একটা ছেলের অ্যাপেনডিসাইটিস হয়েছে, পেটে ব্যথা, তমিজ পেটের ওষুধ দিয়েছেন, অ্যাপেনডিক্স ফেটে গেছে, পেরিটোনাইটিস, মৃত্যু। এটা হয়নি তমিজের সাথে, কিন্তু অন্য কবিরাজদের সাথে হয়েছে। তমিজ গুরুতর দেখলে বলেন, "হাসপাতালে নিয়ে যাও।" সবসময় বলেন না। কখনো বোঝেন না যে গুরুতর।
৫
স্মার্টফোন এল গ্রামে।
প্রথমে কয়েকটা। তারপর অনেকগুলো। এখন প্রতি ঘরে একটা। ইন্টারনেট সস্তা। ইউটিউব সবাই দেখে।
তমিজ প্রথম বুঝলেন কিছু বদলে যাচ্ছে যখন করিম মিয়ার ছেলে রাসেল এল। রাসেলের বাচ্চার জ্বর হয়েছিল। আগে হলে রাসেল সোজা তমিজের কাছে আসত। এবার এল না। দুই দিন পর দেখা হলো বাজারে।
"বাচ্চার জ্বর কেমন?" তমিজ জিজ্ঞেস করলেন।
"ভালো হয়ে গেছে। প্যারাসিটামল খাইয়েছি।"
"ডাক্তার দেখিয়েছ?"
"না। ইউটিউবে দেখলাম, ভাইরাল ফিভারে প্যারাসিটামল খাওয়াতে হয়। তিন দিনে ভালো না হলে ডাক্তার।"
তমিজ চুপ রইলেন। ছেলেটা ইউটিউবে দেখেছে। ইউটিউব তমিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। তমিজ ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বসে আছেন, আর একটা ছেলে ফোনে ভিডিও দেখে নিজেই চিকিৎসা করে ফেলেছে।
৬
আস্তে আস্তে মানুষ কমে গেল।
আগে দিনে পাঁচ-ছয়জন আসত। এখন দুইজন, কখনো একজন, কখনো কেউ না। বয়স্করা এখনো আসেন। যাদের বয়স ষাটের ওপর, যারা তমিজের বাবার কাছেও গেছে, তারা এখনো বিশ্বাস করে। কিন্তু তরুণরা? তারা ফোন দেখে। ইউটিউব দেখে। ফেসবুকে পড়ে।
"কবিরাজি ভুয়া।" এই কথাটা তমিজ শুনেছেন। কে বলেছে? পাড়ার কোনো ছেলে। ফোনে ভিডিও দেখে। ভিডিওতে একজন ডাক্তার বলছেন, "ভেষজ ওষুধের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এগুলো কুসংস্কার।"
তমিজ শুনেছেন। কিছু বলেননি। কী বলবেন? তিনি "বৈজ্ঞানিক ভিত্তি" বলতে কী বোঝায় জানেন না। তিনি জানেন বাসকের পাতা দিলে কাশি কমে। থানকুনি খেলে পেট ঠান্ডা হয়। সর্পগন্ধার শেকড়ে রক্তচাপ নামে। এগুলো তিনি দেখেছেন। নিজের চোখে। ত্রিশ বছর ধরে।
কিন্তু "দেখেছেন" আর "প্রমাণিত" এক জিনিস না। তমিজ এটা জানেন না। তিনি জানেন তাঁর চোখ মিথ্যা বলে না।
৭
এখন তরুণরা হাসপাতালে যায়।
তিন ঘণ্টার পথ। আগে গরুর গাড়িতে যেতে হতো, পাঁচ ঘণ্টা লাগত। এখন ইজিবাইকে তিন ঘণ্টা। রাস্তা একটু ভালো হয়েছে। ব্রিজ হয়েছে দুটো। আগে নৌকায় পার হতে হতো, এখন সেতু দিয়ে।
তিন ঘণ্টা। সাপে কাটলে তিন ঘণ্টা। কেউ পৌঁছায়। অ্যান্টিভেনম পায়। বাঁচে। কেউ পৌঁছায় না। পথে শ্বাস বন্ধ হয়। মারা যায়।
আগে তমিজের কাছে আনলে অন্তত কিছু একটা করা হতো। পাতা। শেকড়। মন্ত্র। সেটা কাজ করত কি না, তর্ক আছে। কিন্তু রোগী এখানে ছিল। তমিজ দেখতেন। সময় কিনতেন। হয়তো শরীর নিজেই লড়াই করত। হয়তো ড্রাই বাইট ছিল। হয়তো বিষ কম ছিল। যে কারণেই হোক, বেশিরভাগ বাঁচত।
এখন? এখন সবাই হাসপাতালে যায়। তিন ঘণ্টা। কেউ বাঁচে। কেউ বাঁচে না। তমিজের ঘরে কেউ আসে না।
৮
তমিজ বসে থাকেন।
তাঁর ঘরের সামনে একটা নিমগাছ। পুরনো। তাঁর বাবা লাগিয়েছিলেন। এই গাছের ছায়ায় তিনি রোগী দেখতেন। রোগী বসত মাটিতে, তমিজ একটা কাঠের পিঁড়িতে। মাঝখানে ওষুধের পোটলা, মাটির বাটিতে পাতার রস, পাথরের শিলে বাটা শেকড়ের পেস্ট।
এখন গাছটা আছে। পিঁড়িটা আছে। পোটলা আছে। রোগী নেই।
তমিজের বউ জাহানারা বলেন, "গাছের ওষুধ কে আর খায়? এখন সবাই ট্যাবলেট খায়।"
তমিজ কিছু বলেন না। তিনি জানেন জাহানারার কথা সত্য। ট্যাবলেট সহজ। গিলে ফেললেই হলো। পাতার রস তেতো, শেকড়ের পেস্ট কষা, ক্বাথ গরম করতে হয়, ছেঁকে খেতে হয়। কে এত কষ্ট করবে?
তমিজের ছেলে শফিক ঢাকায় থাকে। রিকশা চালায়। কবিরাজি শেখেনি। শিখতে চায়নি। "বাবা, এটা দিয়ে কিছু হবে না। তুমি যে গাছ-পাতা দাও, সেটা কেউ আর নেয় না।"
তমিজ চুপ ছিলেন। শফিক ঠিকই বলেছে। কেউ আর নেয় না।
৯
কিন্তু মাঝে মাঝে কেউ আসে।
গত বর্ষায় একটা ছেলে এসেছিল। বয়স আঠারো-উনিশ। সাপে কেটেছে। কেউটে। ডান পায়ের গোড়ালিতে। রাত দুইটা। বৃষ্টি পড়ছে। ছেলের বাবা কাঁধে করে নিয়ে এসেছে। হাসপাতাল তিন ঘণ্টা দূর। রাতে ইজিবাইক পাওয়া যায় না। নৌকায় যাওয়া যায়, কিন্তু বৃষ্টিতে হাওরের পানি উত্তাল।
তমিজ উঠলেন। দরজা খুললেন। রোগী দেখলেন। পায়ে দুটো ছিদ্র। ফুলে গেছে। ছেলে কাঁপছে। বমি করছে।
তমিজ কাজে লাগলেন। পাতা আনলেন বাগান থেকে। রস বের করলেন। লাগালেন ক্ষতস্থানে। শেকড়ের পেস্ট দিলেন। মন্ত্র পড়লেন। ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, "ভয় নাই। ভয় নাই।"
সারারাত বসে রইলেন। ছেলের পালস দেখলেন। শ্বাস দেখলেন। কপালের ঘাম মুছলেন।
সকালে ছেলে বেঁচে ছিল। বমি বন্ধ হয়েছে। ফোলা কমেনি, কিন্তু বাড়েওনি। ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার বললেন, "বিষ কম ছিল। অথবা ড্রাই বাইট হতে পারে।"
তমিজ এটা শোনেননি। শুনলেও বুঝতেন না। তিনি জানেন: ছেলে কামড় খেয়েছিল, আমি চিকিৎসা করেছি, ছেলে বেঁচে আছে।
১০
তমিজ উদ্দিন নিমগাছের নিচে বসে আছেন।
বিকাল। হাওরের ওপর দিয়ে বাতাস আসছে। ভেজা বাতাস, মাটির গন্ধ, দূরে ধানের গন্ধ। আকাশে পাখি ফিরছে। তমিজ দেখছেন।
তাঁর বাগানে পঁচিশটা প্রজাতির গাছ। কিছু ফুল ধরেছে। কিছু ফল। তমিজ প্রতিদিন গাছে পানি দেন। গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করেন। ডাল ছাঁটেন। এটাই তাঁর কাজ এখন। আগে এই গাছ থেকে ওষুধ বানাতেন। এখন শুধু গাছ রাখেন।
কেউ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "তমিজ চাচা, গাছগুলো রেখে কী করবেন? কেউ তো আর ওষুধ নিতে আসে না।"
তমিজ বলেছিলেন, "গাছ রাখি কারণ গাছ আছে। গাছের জন্য রোগী লাগে না।"
সন্ধ্যা নামছে। তমিজ ঘরে যাবেন। জাহানারা ভাত রাঁধছে। খাবেন। নামাজ পড়বেন। শোবেন।
তাঁর জ্ঞান তাঁর সাথে যাবে। শফিক শেখেনি। গ্রামের কেউ শিখতে আসেনি। চল্লিশটা গাছের নাম, তাদের ব্যবহার, কোন রোগে কোন পাতা, কোন শেকড়, কতটুকু, কখন, এই সবকিছু তমিজের মাথায়। তিনি মারা গেলে এগুলো মাটিতে মিশে যাবে। কোনো বইতে লেখা নেই। কোনো ডেটাবেসে নেই। কোনো জার্নালে নেই।
তমিজ বলেন, "আমার ওষুধ সত্য না মিথ্যা, সেটা তর্ক করা যায়। কিন্তু আমি যে মানুষ বাঁচিয়েছি, সেটা তর্ক করা যায় না।"
কেউ তর্ক করে না। কেউ আর আসেও না।
নিমগাছের পাতা ঝরছে। তমিজ বসে আছেন। একা।